📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 পর্যায়ক্রমে মদের নিষেধাজ্ঞা অবতরণ

📄 পর্যায়ক্রমে মদের নিষেধাজ্ঞা অবতরণ


মুসলিম উম্মাতের ওপর আল্লাহ তা'আলার একটি বড় অনুগ্রহ হচ্ছে, তিনি শরী'আতের সকল বিধান একযোগে নাযিল করেন নি; বরং ক্রমাগতভাবে শরী'আতের বিধানগুলো জারি করেছেন। তদুপরি অনেক বিষয়ের চূড়ান্ত বিধি-নিষেধ এক দিনেও কার্যকর করেন নি। ইসলামের আবির্ভাবের সময় মদ্যপান ছিল তৎকালীন আরবের তথা গোটা পৃথিবীর মানুষের সাধারণ অভ্যাস এবং তারা মদ্যপানকে কোনরূপ অপরাধযোগ্য কর্ম মনে করত না। কিন্তু ইসলামে মদ্যপান একটি মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে মানুষের এই চিরাচরিত অভ্যাস পরিবর্তন সাধনে ইসলাম ধীর পদক্ষেপে পর্যায়ক্রমে অগ্রসর হয়েছে। কেননা এ বস্তুটিকে যদি হঠাৎ করে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হতো তাহলে তা মেনে চলা তখনকার লোকদের পক্ষে খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ত। অনেকেই হয়ত তা গ্রাহ্যই করত না। এ প্রসঙ্গে হযরত 'আয়িশা (রা) বলেছেন, و لو نزل أول شيئ لا تشربوا الخمر لقالوا لا ندع الخمر أبدا. হতো যে, তোমরা মদ পান করো না, তা হলে তারা অবশ্যই বলতো যে, আমরা কখনোই মদ্যপান ত্যাগ করবো না।"
মদপানের চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা জারী করার জন্য আল্লাহ তা'আলা চার পর্যায়ে চারটি আয়াত নাযিল করেছেন। মক্কা শরীফে প্রথম যে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়, و من ثمرات النخيل والأعناب تتخذون منه سكرا و رزقا حسنا . : 12 - "এমনিভাবে খেজুরের গাছ ও আঙ্গুরের ছড়া থেকেও আমরা একটি জিনিস তোমাদের পান করাই, যাকে তোমরা মাদকেও পরিণত কর এবং উত্তম পানীয়ও তাতে রয়েছে।" এ আয়াতটিতে ইঙ্গিতে বলা হয়েছে যে, ফলের এই রসে উপাদেয় খাদ্যের উপকরণ যেমন রয়েছে, তেমনি তাতে রয়েছে মাদকে পরিণত হবার যোগ্যতা। তাই এ হালাল ফল থেকে মানুষ উপাদেয় খাদ্য গ্রহণ করবে, না তাকে বিবেক-বুদ্ধি বিনষ্টকারী মাদকে পরিণত করবে, তা লোকদের রুচির ব্যাপার। প্রসঙ্গত এ কথাও ইঙ্গিতে বলা হয়েছে যে, মদ পবিত্র রিযকরূপে গণ্য হতে পারে না। তাই তা নিষিদ্ধ হওয়া উচিত।
মদের প্রতি ঘৃণার বীজ লোকদের মনে বপন করাই ছিল এই প্রথমবারে অবতীর্ণ আয়াতটির মূল উদ্দেশ্য। এরপর মদীনা জীবনের প্রথম দিকে অবতীর্ণ হয়েছে: يسألونك عن الخمر والميسر قل فيهما إثم كبير و منافع للناس و إثمهما أكبر من نفعهما - ")হে রাসূল,) আপনাকে তারা মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলুন, এ দুটিতে রয়েছে বড় পাপ, লোকদের উপকারও রয়েছে বটে। তবে উপকারের চাইতে পাপ অনেক বড়।” এ আয়াতে মদে যে কিছু উপকার আছে তা অস্বীকার করা হচ্ছে না; কিন্তু তাতে যে ক্ষতিকর দিকগুলো রয়েছে, তা উপকারের তুলনায় অনেক বেশি মারাত্মক। এ আয়াতের সাহায্যে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, মদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। কেননা যে বস্তু বেশি মারাত্মক, তা অবশ্যই পরিহার যোগ্য, যদিও তা এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ হারাম করা হচ্ছে না।
এ আয়াতদুটি নাযিলের পর মুসলিমদের মধ্যে শুভ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। অনেক মদ্যপাগল লোক তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্পূর্ণ পরিহার করেছিল; কিন্তু তখনো তা সম্পূর্ণরূপে হারাম করা হয়নি। এ কারণে কেউ কেউ তা পান করে মাতাল অবস্থায় নামাযেও দাঁড়িয়ে যেত। ফলে তারা ঠিকভাবে নামায আদায় করতে পারত না। হয় ঢলে পড়ে যেত, না হয় নামাযে কুর'আনের আয়াত ও দু'আসমূহ ভুল পড়ত। এ সব কারণে তৃতীয় পর্যায়ে অবতীর্ণ হয় : يأيها الذين آمنوا لا تقربوا الصلوة وأنتم سكرى حتى تعلموا ما تقولون. “হে ঈমানদারগণ, তোমরা মাতাল অবস্থায় নামাযের নিকটেও যাবে না, যতক্ষণ না তোমরা যা বল বোঝতে পার।” এ আয়াতে নামায আদায়ের সময় মদপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। কিন্তু নামাযের বাইরে অন্যান্য সময় লোকেরা মদ পান করতে থাকে। এভাবে কিছুদিন চলল। ইত্যবসরে হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) নিজের ঘরে একটি যিয়াফতের ব্যবস্থা করেন। তাতে কয়েকজন আনসারী সাহাবী যোগদান করেন। তাদের সামনে উটের মস্তক ভূণা করে পেশ করা হয়। তাঁরা খাওয়া সেরে মদ্যপানে রত হলেন। মদের মাদকতায় মত্ত হয়ে তাঁদের কেউ কেউ হযরত সা'দ (রা) কেই আঘাত করেন। ফলে তাঁর নাকটি ভেঙ্গে যায়। আর এ সময়ই নাযিল হয় মদ্যপান চিরতরে হারাম হবার কুর'আনী ঘোষণা : يأيها الذين آمنوا إنما الخمر والميسر و الأنصاب والأزلام رجس من عمل الشيطان فاجتنبوه لعلكم تفلحون. إنما يريد الشيطان أن يوقع بينكم العداوة والبغضاء في الخمر والميسر و يصدكم عن ذكر الله و عن الصلوة فهل أنتم منتهون - "হে ঈমানদারগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, বলিদানের স্থান ও ভাগ্য পরীক্ষার কাজ নিঃসন্দেহে শয়তানী কদর্য কর্মকাণ্ড। অতএব তোমরা তা পরিত্যাগ কর। তাহলেই তোমরা সফলতা লাভ করবে। মনে রেখো, শয়তান এই মদ্যপান ও জুয়া খেলার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরে চরম শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষের সৃষ্টি করতে সদা সচেষ্ট। সে তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখতে ইচ্ছুক। তাহলে তোমরা কি এ কাজ থেকে বিরত থাকবে?”
থাকবে?)-এর মধ্যে আল্লাহ তা'আলার যে জিজ্ঞাসা রয়েছে, তা নাযিল হবার সাথে সাথে সাহাবা কিরাম উত্তরে বলে ওঠলেন, 'আমরা বিরত হলাম, আমরা বিরত হলাম। " এ আয়াত নাযিল হবার মাত্র কিছুদিন পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর এক ভাষণে বলেছিলেন, "মদ্যপান আল্লাহর নিকট অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ। তা হারাম হওয়ার নির্দেশ নাযিল হওয়াও অসম্ভব নয়।" তিনি আরো বলেন, "كل مسكر خمر وكل مسكر حرام - "প্রত্যেক নেশা উদ্রেককারী জিনিসই মদ। আর প্রত্যেক নেশা উদ্রেককারী জিনিসই হারাম। "
উল্লেখ্য যে, ইসলাম শুধু যে মদ্যপান হারাম করেছে, তা নয়; বরং মদ্য উৎপাদন, পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবেশন ও উপঢৌকন তথা মদকে কেন্দ্র করে যা কিছু করা হয় বা করার প্রয়োজন হয়, তার সবকিছুকেই সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إن الذي حرم شربها حرم بيعها و أكل ثمنها."যে মহান সত্তা মদ্যপান নিষিদ্ধ করেছেন, তিনিই তার ব্যবসা এবং তা থেকে প্রাপ্ত মূল্য ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন। " তিনি আরো বলেছেন, لعن الله الخمر و شاربها و ساقیها و مبتاعها و بائعها و عاصرها و معتصرها و حاملها و المحمولة إليه "আল্লাহ তা'আলা অভিশাপ বর্ষণ করেছেন মদের ওপর, মদ্যপায়ীর ওপর, মদ্য পরিবেশনকারীর ওপর, তার ক্রয়-বিক্রয়কারীর ওপর, তার উৎপাদনকারী ও যে উৎপাদন করায় তাদের ওপর, তার বহনকারী ও যার নিকট বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় তার ওপর।"

টিকাঃ
8. প্রখ্যাত ভাষাবিদ আসমা'ঈ বলেন,.الخمر ما خمر العقل " وهو المسكر من الشراب "যা বিবেক-বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে (অর্থাৎ নেশার উদ্রেককারী পানীয়) তা-ই হল خمر। (ইবনু মানযুর, লিসানুল আরব, খ.৪, পৃ. ২৫৪-৫)
৫. তাঁর মতে, তিন প্রকারের পানীয় খামার বা মাদকের অন্তর্ভুক্ত। ক. তাজা আঙ্গুরের রস অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রাখার পর তা গজিয়ে ফেনা ধারণ করলে। খ. আঙ্গুরের রস জ্বাল দেওয়ার পর তার দু-তৃতীয়াংশ শুকিয়ে গেলে। গ. কিসমিস ও শুষ্ক খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে সিদ্ধ না করা সত্ত্বেও তাতে মাদকতা সৃষ্টি হলে। কিন্তু তাজা আঙ্গুরের রস কিংবা কিসমিস ও শুষ্ক খেজুরের রস আগুনে সিদ্ধ করার ফলে তার দু-তৃতীয়াংশ বাষ্প হয়ে ওড়ে না গেলে এবং বার্লি, গম, ভুট্টা ইত্যাদির রস তা আগুনে জ্বাল দেয়া হোক না হোক, নেশা উদ্রেককারী হলেও খামার বা মাদক নয়। এগুলো পান করে মাদকতা সৃষ্টি হলেই কেবল পানকারী শাস্তিযোগ্য হবে। অন্যথায় নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হদ্দের শাস্তি প্রযোজ্য হবে না; বরং তা'যীরের আওতায় শাস্তি হবে। (আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৪, পৃ.২-৪; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৫, পৃ.১১২; বাবরতী, আল-ইনায়াহ, খ.১০, পৃ.৯০-৪)
৬. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৪, পৃ.২-৪; আল-কাসানী, বদা'ই খ.৫, পৃ.১১২
৭. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৩৬; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৬,১৫৬, ১৯৩-৫; মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ.৫২৪
৮. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবু ফাদা'ইলিল কুর'আন), হা.নং ৪৭০৭; নাসাঈ, আস-সুনান আল- কুবরা, হা.নং: ৭৯৮৭, ১১৫৫৮; 'আবদুর রযযাক, আল-মুছান্নাফ, হা.নং: ৫৯৪৩
৯. আল-কুর'আন, ১৬ (সূরা নাহল): ৬৭
১০. আল-কুর'আন, ২ (আল-বাকারা): ২১৯
১১. আল-কুর'আন, ৪ (আন-নিসা): ৪৩
১২. আল-কুর'আন, ৫ (আল-মা'ইদাহ): ৯০-৯১
১৩. সহীহ মুসলিম, হা.নং ১৭৪৮, ১৭৮৪; ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুর'আনিল 'আযীম, খ.২, পৃ.৯৬
১৪. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং ২০০২, ২০০৩; আবূ দাউদ, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং: ৩৬৭৯
১৫. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল মুসাকাত), হা.নং ১৫৭৯; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ, হা.নং: ৪৯৪২; আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৪, পৃ.৩
১৬. আবু দাউদ, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং: ৩৬৭৪; বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং : ১০৫৫৯

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 মদ সেবনের শাস্তি

📄 মদ সেবনের শাস্তি


উপরন্তু, অধিকাংশ ইমামের মতে যে বস্তু অধিক পরিমাণ গ্রহণে নেশার উদ্রেক হয় তার সামান্য পরিমাণ গ্রহণ করাও হারাম- চাই তাতে নেশার উদ্রেক হোক বা না হোক- এবং তা সেবন করা হদ্দযোগ্য অপরাধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ما أسكر كثيره فقليله حرام - "যে জিনিস অধিক পরিমাণ পান করলে নেশা সৃষ্টি করে, তার স্বল্প পরিমাণও হারাম।” كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ و ما أسكر منه الفرق فملء “প্রত্যেক নেশা উদ্রেককারী জিনিসই হারাম। আর যে জিনিস এক পাত্র পান করলে নেশা সৃষ্টি করে তার এক অঞ্জলি পরিমাণও হারাম।”
মাদক সেবন ইসলামী আইনে একটি ফৌজদারী অপরাধরূপে গণ্য। এ জন্য শরী'আত অনুযায়ী শাস্তি দেয়া একান্তই কর্তব্য। তবে পবিত্র কুর'আনে এর কোন শাস্তির কথা উল্লেখ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা)ও সুনির্দিষ্টভাবে এর শাস্তি নির্ধারণ করে যান নি। বিভিন্ন হাদীসে মদ্যপায়ীদেরকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাস্তি দানের কথা বর্ণিত রয়েছে。
সকল ইমামই এ ব্যাপারে একমত যে, মদ্যপায়ীর শাস্তি হল বেত্রাঘাত। তবে বেত্রাঘাতের সংখ্যা নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায়। হানাফী ও মালিকীগণের মতে, মদ্যপানের শাস্তি হল আশিটি বেত্রাঘাত।” তাঁদের দলীল হল, সাহাবা কিরামের ইজমা'। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
“রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাদক দ্রব্য সেবনের অপরাধে খেজুরের দুটি ডালি দিয়ে চল্লিশটি আঘাত দিতেন। আবূ বাকর (রা)ও তাই করেছেন এবং উমার (রা) মদ্যপায়ীদের শাস্তি নির্ধারণের জন্য সাহাবীগণের নিকট থেকে পরামর্শ চাইলেন। তখন হযরত 'আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা) বললেন, اجعله كأخف الحدود ثمانين - "তার শাস্তি হালকাতম হদ্দ- আশিটি বেত্রাঘাতই নির্ধারণ করুন।" তখন হযরত 'উমার (রা) এ দণ্ডই কার্যকর করতে নির্দেশ দিলেন এবং সিরিয়ায় হযরত খালিদ ও আবূ 'উবায়দাহ (রা) কে লিখে এ নির্দেশ দিলেন। ২২ অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, হযরত 'আলী (রা) পরামর্শ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, نرى أن نضربه ثمانين " فإنه إذا شرب أسكر - "যদি শরাব পান করে, তবে মাতাল হবে. و إذا أسكر هذى " و إذا هذى افترى و على المفترين ثمانون . মত হল, আমরা তাকে আশিটি বেত্রাঘাত করব। কেননা যখন সে মদ সেবন করে তখন মাতাল হয়ে যায়। আর যখন মাতাল হয়, তখন অপলাপ করে। আর যখন সে অপলাপ করে তখন সে অপবাদ দেয়। আর অপবাদদানকারীর শাস্তি হল আশিটি বেত্রাঘাত।” এ থেকে জানা যায় যে, আশিটি বেত্রাঘাতের ওপর সাহাবীগণের ইজমা' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
শাফি'ঈ ও হাম্বলীগণের মতে, মদ্যপানের নির্ধারিত শাস্তি হল চল্লিশটি বেত্রাঘাত। তবে বিচারকের ইখতিয়ার রয়েছে, অপরাধীর অবস্থা ও অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে ৮০টি পর্যন্ত বেত্রাঘাত করতে পারবেন। তবে চল্লিশের অতিরিক্ত বেত্রাঘাতসমূহ হদ্দ নয়; তা'যীরের আওতাভুক্ত। তদুপরি কাপড়, খেজুরের ডাল ও জুতা দ্বারাও যদি মারা হয়, তা হলে সেটাও শুদ্ধ হবে। তাঁদের দলীল হল, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেছেন এবং হযরত আবূ বাকর (রা)ও তা-ই কার্যকর করেছেন। হযরত সা'ইব ইবন ইয়াযীদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), হযরত আবূ বাকর ও উমার (রা)-এর খিলাফাতের শুরুতে মদ্যপায়ীকে আমরা ধরে আনতাম। আমরা তাকে আমাদের হাত দিয়ে, আমাদের জুতা দিয়ে ও আমাদের চাদর দিয়ে মারতাম। হযরত উমার (রা)-এর খিলাফাতের শেষ দিকেও চল্লিশটি বেত্রাঘাত করা হত। তবে যদি সীমালঙ্ঘন বেড়ে যেত, তাহলে আশিটি বেত্রাঘাত করা হত। এ থেকে জানা যায়, হযরত 'উমার (রা) সাধারণত চল্লিশটি বেত্রাঘাতই করতেন। তবে অপরাধীর অবস্থা ও অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে কখনো আশিটি বেত্রাঘাতও করেছেন। হযরত 'উসমান (রা)-এর খিলাফাতের সময় জনৈক ব্যক্তি ওয়ালীদ ইবন ওকবার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিল যে, সে তাকে মদপান করতে দেখেছে এবং আরেক ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল যে, সে তাকে বমন করতে দেখেছে। হযরত 'উসমান (রা) আলী (রা) কে নির্দেশ দিলেন, তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। তাকে চল্লিশটা বেত্রাঘাত করার পর আলী (রা) প্রহারকারীকে থামতে নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেছেন, আবূ বাকর (রা)ও চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেছেন এবং 'উমার (রা) আশিটি বেত্রাঘাত করেছেন। সবগুলোই সঠিক সুন্নাত এবং এটাই আমার পছন্দনীয়。
হযরত মু'আবিয়া (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, - إذا شربوا الخمر فاجلدوهم ثم إذا شربوا الرابعة فاقتلوهم "মদ্যপানকারীদেরক প্রথম তৃতীয়বার পর্যন্ত শুধু বেত্রাঘাতই কর। চতুর্থবার পান করলে তাদের হত্যা কর।”
আমি মনে করি, মদ্যপানের হদ্দ অপরাধীর অবস্থা ও অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী আদালতের সুবিবেচনায় শাস্তির পরিমাণে হ্রাস-বৃদ্ধি হতে পারে। তবে ৪০-এর কম এবং ৮০-এর অধিক বর্ধিত করা যাবে না। চতুর্থবার মাদক সেবনের অপরাধের মৃত্যুদণ্ডের যে কথা হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে তা নিরেট ভীতিপ্রদর্শন ও সতর্কীকরণের জন্য। বর্ণিত রয়েছে যে, মদ্যপানে অভ্যস্ত নয় এবং দৈহিকভাবে ক্ষীণ ব্যক্তিকে হযরত 'উমার (রা) চল্লিশটি বেত্রাঘাত করতেন। আর হযরত 'উসমান (রা) অপরাধীর অবস্থা ও অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে কখনো ৪০, আবার কখনো ৮০টি বেত্রাঘাতের শাস্তি কার্যকর করতেন।

টিকাঃ
১৭. আত্ তিরমিযী, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং: ১৮৬৫; ইবনু মাজাহ, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং: ৩৩৯১
১৮. আবূ দাউদ, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং: ৩৬৮৭; তিরমিযী, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং : ১৮৬৬
১৯. এ কারণে ইমাম শাওকানী, ইবনু মুনযির ও আত্ তাবারী প্রমুখ ইমামগণ মনে করেন, মদ্যপানের শাস্তি হদ্দের পর্যায়ভুক্ত নয়; বরং তা'যীরী শাস্তির আওতাভুক্ত। আদালত সুবিবেচনা অনুযায়ী যে কোন শাস্তি দিতে পারবে। ইমাম যুরকানীর মতে, চল্লিশ বেত্রাঘাত সুনির্ধারিত শাস্তি অর্থাৎ হদ্দ। আর এর অতিরিক্ত আশিটি বেত্রাঘাত হল তা'যীরের আওতাভুক্ত, যা বিচারকের রায়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চার মাযহাবের ইমামগণের মতে, মদ্যপানের শাস্তি হদ্দের পর্যায়ভুক্ত। কেননা বহু বর্ণনায় বড় বড় অনেক সাহাবীকেই মদ্যপায়িতার শাস্তির জন্য হদ্দ শব্দটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "একসময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এক মদ্যপায়ীকে উপস্থিত করা হল, তখন তিনি লোকদেরকে তাকে মারপিট করতে নির্দেশ দিলেন। আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, তখন আমাদের কেউ তাকে হাত দ্বারা আবার কেউ জুতা দ্বারা আবার কেউ পাকানো কাপড় দ্বারা তাকে প্রহার করেছিল। (আবূ দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা, নং: ৪৪৭৭) কাতাদাহ বলেন, "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লাঠি ও জুতা দ্বারা চল্লিশবার প্রহার করেছেন।" (আবূ দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা,নং ৪৪৮৯) আনাস (রা) বলেন, "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুটি লাঠি একত্র করে চল্লিশবার প্রহার করেছেন।" (সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা, নং: ১৭০৬) হযরত আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "রাসূলুলাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদ্যপায়িতায় একজোড়া জুতা দ্বারা চল্লিশবার মারেন।"
২০. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৩৭
২১. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৩৭; আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৪, পৃ.৩০; আল-কাসানী, বদা'ই খ.৫, পৃ.১১৩; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৩, পৃ. ১৪২-৪
২২. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা, নং ১৭০৬; বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৭৩১০
২৩. আল-কাসানী, বদা'ই খ.৭, পৃ.১১৩; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৩, পৃ. ১৪৩
২৪. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৩৭; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৮, পৃ. ৩৭৩; আল- আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১৬০; ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৬, পৃ.১০১; আল- মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ.২২৯-২৩০
২৫. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুল হুদূদ), হা, নং: ৬৩৯৩, ৬৩৯৭
২৬. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদুদ), হা, নং: ১৭০৭
২৭. আবূ দাউদ, (কিতাবুল আশরিবাহ), হা.নং: ৪৪৮২; ইবনু মাজাহ, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ২৫৮৩; তিরমিযী, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৪৪৪। ইমাম আত্ তিরমিযী বলেন, এ আইনটি প্রথম দিকে কার্যকর ছিল। পরে তা রহিত হয়ে যায়।)

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 শাস্তি কার্যকর করার সময়

📄 শাস্তি কার্যকর করার সময়


রুগ্ন ও মাতাল অবস্থায় হদ্দ কার্যকর করা বিধেয় নয়। মাদকের নেশা কেটে যাওয়ার পর এবং মাদক সেবনকারীর সুস্থ হবার পর হদ্দ কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় শাস্তির উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তদুপরি মাতাল অবস্থায় বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলার কারণে শাস্তির ব্যথাও তার কাছে কম অনুভূত হবে। অধিকাংশ ইমামের মতে, জ্ঞান ফিরে আসার আগে হদ্দ প্রয়োগ করা হলে জ্ঞান ফিরে আসার পর পুনরায় হদ্দ কার্যকর করতে হবে। তবে কারো কারো মতে, পুনরায় হদ্দ প্রয়োগ করার প্রয়োজন নেই। তবে বিশুদ্ধতম অভিমত হল, যদি মনে করা হয় যে, বেত্রাঘাতের ফলে সে যথার্থ শিক্ষাই পেয়েছে, তাহলে পুনরায় হদ্দ প্রয়োগ করার প্রয়োজন নেই। অন্যথায় পুনরায় হদ্দ প্রয়োগ করতে হবে。

টিকাঃ
৪৮. এটা ইমাম শাফি'ঈ ও আহমাদ (রহ) প্রমুখের এক একটি মত হিসেবে বর্ণিত।
৪৯. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.২৪, পৃ.১৩; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৪০; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১৬০; আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়‍্যাহ, খ.১০, পৃ.১৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00