📄 দলের প্রতি যিনার অপবাদ আরোপের শাস্তি
একটি দলকেই যিনার অপবাদ দেয়া হলে তার শাস্তি কি হবে- তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। হানাফী ও মালিকীগণের মতে, অভিযোগকারীকে একটি বার শাস্তি দেয়া হবে। চাই সে এক বাক্যে সকলকে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন বাক্যে সকলকেই অভিযুক্ত করুক। চাই সকলে মিলে এক সাথে তার বিচার দাবী করুক কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে দাবী করুক। প্রথম জনের দাবীর প্রেক্ষিতে যদি তার ওপর হদ্দ কার্যকর করা হয়, তাহলে পরবর্তীদের দাবীর প্রেক্ষিতে আর তার ওপর দ্বিতীয় হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। যেহেতু তার অপরাধ দলের বিরুদ্ধে, তাই দলের একজনের দাবী সকলের দাবী হিসেবে ধর্তব্য হবে। তবে দলের কারো বিরুদ্ধে নতুন কোন যিনার অভিযোগ তুললে, সে জন্য নতুন হদ্দ প্রযোজ্য হবে। তাঁদের বক্তব্য হল, হিলাল ইবন উমাইয়্যা (রা), যিনি এক সাথে তার স্ত্রী ও শুরায়ক ইবন সাহমাকে অপবাদ দিয়েছিলেন তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লালল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কেবল একটি শাস্তিই দিয়েছিলেন। তদুপরি অন্যান্য হদ্দের অপরাধসমূহ যেমন- যিনা, চুরি, মদ্যপায়িতা যখন বারংবার করা হয়, তখন বারবার কৃত অপরাধের জন্য একাধিক শাস্তি না দিয়ে একবারই শাস্তি দেয়া হয়。
শাফি'ঈ ও হাম্বলী মতাবলম্বী ইমামগণের মতে, বিভিন্ন বাক্য দ্বারা (যেমন প্রত্যেককে উদ্দেশ্য করে বলল, হে ব্যভিচারী) যদি একটি দলের সবাইকে অভিযুক্ত করা হয়, তাহলে দলের প্রতিটি ব্যক্তির অপবাদের জন্য পৃথক পৃথক শাস্তি দেয়া হবে। কেননা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের মতে অপবাদের অপরাধ মানুষের অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট। এ ধরনের অপরাধসমূহের শাস্তি একটি অপরটির মধ্যে অনুপ্রবেশ করতে পারে না। তাই উপর্যুক্ত অবস্থায় অপবাদের সাথে বিভিন্ন মানুষের অধিকার জড়িত হবার কারণে তার হদ্দসমূহ পরস্পর প্রবিষ্ট হবে না। তবে যদি একটি বাক্য দ্বারা দলের সকলকেই অভিযুক্ত করা হয় (যেমন সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, হে ব্যভিচারীরা), তাহলে ইমাম শাফি'ঈ (রহ)-এর পুরাতন মতানুযায়ী তার ওপর একটি হদ্দ বর্তাবে। ইমাম আহমাদ (রহ) থেকেও এ ধরনের একটি মত বর্ণিত রয়েছে। ইমাম হাসান আল-বসরী ও ইমাম শাফি'ঈ (রহ)-এর নতুন মতানুযায়ী এমতাবস্থায়ও দলের প্রতিটি ব্যক্তির অপবাদের জন্য পৃথক পৃথক শাস্তি দেয়া হবে। কেননা তার এ অপবাদের ফলে দলের প্রত্যেকের মান-সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তাই প্রত্যেকের জন্যই পৃথক পৃথক শাস্তির বিধান কার্যকর করা হবে। যেমন প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতি পৃথক পৃথকভাবে অভিযোগ আরোপ করার জন্য পৃথক পৃথক হদ্দ কার্যকর করা হয়।
উল্লেখ্য যে, শাফি'ঈ ও হাম্বলী ইমামগণের মতে, যদি কেউ এমন কোন বিরাট দলের প্রতি যিনার অভিযোগ উত্থাপন করে, স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে যাদের প্রত্যেকের ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া অসম্ভব ব্যাপার, তাহলে হদ্দ ওয়াজিব হবে না। তাঁদের বক্তব্য হল, কাযাফের হদ্দ অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রতি আরোপিত কলঙ্ক মোচনের একটি প্রয়াস মাত্র। কিন্তু উপর্যুক্ত অবস্থায় যেহেতু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কলঙ্কিত হবার আশঙ্কা নেই, তাই অভিযোগকারীর মিথ্যাবাদী হবার ব্যাপারটি প্রচুর সম্ভাবনাময়। তবে তার মিথ্যাচারিতার জন্য তা'যীরের আওতায় তাকে শাস্তি দেয়া হবে।
টিকাঃ
৪৯. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.১১১; আল-খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.৮৮; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৮৯
৫০. তবে এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে যে, একটি অপবাদের জন্য কাউকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে এবং শাস্তি দেয়া শেষ না হওয়ার আগেই যদি সে অন্য এক জনের প্রতি যিনার অপবাদ দেয়, তাহলে হানাফীগণের মতে, তাকে নতুন করে দ্বিতীয় শাস্তি দেয়া যাবে না; তার ওপর একটি হদ্দই কার্যকর করা হবে। এমনকি, যদি প্রথম হদ্দের শাস্তি থেকে যদি কেবল একটি বেত্রাঘাতও অবশিষ্ট থাকে, তাহলে দ্বিতীয় অপবাদের জন্য অবশিষ্ট একটি বেত্রাঘাতই কার্যকর করা হবে। মালিকীগণের মতে, প্রথম অপবাদের জন্য বেত্রাঘাতের শাস্তি কার্যকর করার সময় যদি অপর কোন ব্যক্তির প্রতি অপবাদ দেয়, এমতাবস্থায় দেখতে হবে যে, বেত্রাঘাত যা কার্যকর করা হয়েছে তার পরিমাণ বেশি না অল্প। যদি পরিমাণ অল্পই হয়, তাহলে তা গণনা করা হবে না; নতুনভাবে বেত্রাঘাত গণনা শুরু করতে হবে। যদি দেখা যায়, অল্প পরিমাণ বেত্রাঘাত বাকী রয়েছে, তাহলে প্রথম হদ্দ পূর্ণভাবে কার্যকর করার পর দ্বিতীয় অপবাদের জন্য নতুনভাবে বেত্রাঘাত শুরু করতে হবে। (আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯,পৃ.১১১; আল- খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.৮৮)
৫১. শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৫, পৃ.৩১৪; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৩, পৃ.৩৭৯; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৮৯; ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৬, পৃ.৯৬; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ.২২৩
৫২. রামালী, নিহায়াতুল মুহতাজ, খ.৭, পৃ.১০৮; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১১২-৩; আর-রুহায়বামী, মাতালিব.., খ.৬, পৃ.২০৬