📄 কিনায়া (অস্পষ্ট ভাষায় অপবাদ)
'কিনায়া' বলতে সে শব্দকে বোঝানো হয়, যা থেকে স্পষ্টরূপে যিনার কথা বোঝা যায় না; তবে তা ব্যুৎপত্তিগতভাবে যিনার অর্থ প্রদানের সম্ভাবনা রাখে। যেমন কেউ কোন পুরুষকে পাপিষ্ট বা নষ্ট অথবা লম্পট বলে সম্বোধন করল। অনুরূপভাবে কেউ কোন মহিলাকে পাপিষ্টা, নষ্টা মেয়ে বলে সম্বোধন করল অথবা বলল যে, তুমি তো কাউকে ফিরাওনা, তোমাকে তো নির্জনে খুব দেখা যায় ইত্যাদি।
এ প্রকারের ভাষা যেহেতু স্পষ্ট অপবাদ নয়; তাই এ প্রকারের অপবাদের হুকম কি হবে- তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। হানাফী ও হাম্বলী স্কুলের ইমামগণের মতে, এ প্রকারের অপবাদ হদ্দ যোগ্য অপরাধ নয়। তাঁদের কথা হলো, যেহেতু এ ধরনের ভাষায় যিনার সুস্পষ্ট অপবাদ নেই; তদুপরি যিনা ছাড়া অন্য কাজের জন্যও এ সব ভাষা ব্যবহার করা হয়, তাই এ সব কথা যিনার অপবাদ রূপে গণ্য হবে না। তবে এ সব কথা হদ্দযোগ্য অপরাধ না হলেও তা নিঃসন্দেহে একটি অশোভনীয় বাক্যবাণ। তাই তা'যীরের আওতায় আদালত অপরাধীর অবস্থা ও অপবাদ আরোপিত ব্যক্তির মর্যাদা বিবেচনা করে উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারবে।' শাফি'ঈ ও মালিকীগণের মতে, এ প্রকারের কথার হুকম নিয়াতের ওপর নির্ভরশীল হবে। যদি অভিযোগ আরোপকারী শপথ করে বলে যে, এ কথা দ্বারা তার উদ্দেশ্য যিনার অপবাদ দেয়া নয়; বরং গালি দেয়া কিংবা মান হানি করাই উদ্দেশ্য, তাহলে তার কথা আমলে নেয়া হবে এবং তার ওপর হদ্দ কার্যকর করা যাবে না; তবে তা'যীরের আওতায় আদালতের সুবিবেচনা অনুযায়ী শাস্তি যোগ্য হবে।
টিকাঃ
৭. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.১০, পৃ.১৮৮-৯; আল-কাসানী, বদাই, খ.৭, পৃ.৪২-৩; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ.২১৫-৭; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.১০৯-১১২
৮. আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৩, পৃ. ৩৭১-২; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.১৪৯-১৫০
📄 তা‘রীদ (পরোক্ষ ভাষায় অপবাদ)
'তারীদ' বলতে এমন শব্দপ্রয়োগকে বোঝানো হয়, যার মধ্যে স্পষ্ট কিংবা অস্পষ্টভাবে যিনার অর্থ নেই; কিন্তু পরোক্ষভাবে যিনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যেমন ঝগড়া-বিবাদের সময় কেউ অপরকে লক্ষ্য করে বলল যে, আমি তো আর ব্যভিচারী নই। এতে ইঙ্গিত থাকে, যাকে লক্ষ্য করে কথাটি বলা হচ্ছে, তাকে যিনার অপবাদ দেয়া হলো। অনুরূপভাবে কেউ বলল যে, আমার মা তো আর ব্যভিচারিণী নয়। এতে ইঙ্গিত থাকে যে, তোমার মা ব্যভিচারিণী।"
এ প্রকারের ভাষা যেহেতু সরাসরি অপবাদ নয়; তাই এ প্রকারের বাক্যবাণের হুকম কি হবে- তা নিয়েও ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
মালিকীগণের মতে, পরস্পরের বিবাদ-বিসম্বাদের সময় এ ধরনের পরোক্ষ ভাষার ব্যবহার হদ্দযোগ্য অপবাদের আওতায় পড়বে। তাঁর দলীল হল, হযরত 'উমরাহ বিনতে 'আবদুর রহমান (রা) থেকে বর্ণিত, হযরত 'উমার (রা)-এর আমলে দু ব্যক্তি ঝগড়া করতে গিয়ে একজন অপরজনকে বললো, আল্লাহর শপথ! আমার পিতা তো আর যিনাকারী নয় এবং আমার মাতাও যিনাকারিণী নয়। এ ধরনের উক্তি অপবাদের পর্যায়ে পড়বে কি না- এ নিয়ে হযরত উমার (রা) কয়েকজন সাহাবীর নিকট থেকে পরামর্শ চাইলেন। তাঁদের একজন বললেন, এ দ্বারা তো সে তার বাবা-মার প্রশংসাই করেছে। অন্যরা বললো, এতে তার বাবা-মার প্রশংসা থাকলেও তা দ্বারা উদ্দেশ্য অন্য একটা। তার পিতামাতা যিনাকারী নয়-এ কথা দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, তার প্রতিপক্ষের পিতামাতা যিনাকারী। হযরত 'উমার (রা) তাঁদের বক্তব্য গ্রহণ করে তার ওপর অপবাদের হদ্দ কার্যকর করলেন।”
হানাফী ও শাফি'ঈ মতাবলম্বী ইমামগণের মতে, এ প্রকারের কথা হদ্দ যোগ্য অপরাধ নয়। তাঁদের বক্তব্য হলো, এ ধরনের কথার মধ্যে যেমন অপবাদ আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি অন্য অর্থ নেবার অবকাশও থাকে। আর এ অবকাশ সন্দেহের নামান্তর। আর হদ্দযোগ্য অপরাধে কোন রূপ সন্দেহ সৃষ্টি হলে তাতে হদ্দ কার্যকর করা হয় না। তবে এ ধরনের পরোক্ষ বাক্যবাণ নিঃসন্দেহে অশোভনীয়। তাই তা'যীরের আওতায় আদালত অপরাধীর অবস্থা ও অপবাদ আরোপিত ব্যক্তির মর্যাদা বিবেচনা করে উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারবে। এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ (রহ) থেকে দুটি মত বর্ণিত রয়েছে। একটি মত হল-পরোক্ষ ভাষায় অভিযোগ যেহেতু সরাসরি অপবাদ নয়, তাই এতে হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। অপর মত হল, পরোক্ষ ভাষায় অভিযোগ বিবাদ-বিসম্বাদের সময় অপবাদ; কিন্তু সাধারণ অবস্থায় অপবাদ হিসেবে গণ্য হবে না।
টিকাঃ
৯. ইবনু 'আরাফাহ, আল-হুদূদ, পৃ. ৪৯৯; যারকশী, আল-মানছুর.., খ.১, পৃ.৩৬১
১০. মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ.৪৯০. ৪৯৪; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.১৪৯-১৫০ তবে কোন পিতা যদি তার ছেলের জন্য এ রূপ ভাষা ব্যবহার করে, তা অবশ্যই অপবাদের আওতায় পড়বে না। কারণ সাধারণত এ ধরনের কথা দ্বারা পিতার উদ্দেশ্য সন্তানকে অভিযুক্ত করা হয় না; তাকে শাসানোই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। (আল-মাওয়াক, আত-তাজ ওয়াল ইকলীল, খ.৮, পৃ.৪০১)
১১. বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা', হা.নং: ১৬৯২৪
১২. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.১২০; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ২০০; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৫, পৃ.১৪২; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৩, পৃ. ৩৭১-২
১৩. ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৬, পৃ.৯০; আর-রুহায়বানী, মাতালিব.., খ.৬, পৃ.২০৪-৫