📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 ‘কাযাফ’ (যিনার অপবাদ)-এর সংজ্ঞা

📄 ‘কাযাফ’ (যিনার অপবাদ)-এর সংজ্ঞা


'কাযাফ'-এর আভিধানিক অর্থ হল নিক্ষেপ করা, সঞ্চার করা। কাউকে গালি দেয়া, দোষারোপ করার অর্থেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শরী'আতের পরিভাষায় কোন পুরুষ বা নারীর বিরুদ্ধে স্পষ্টাকারে কিংবা ইঙ্গিতে যিনার অপবাদ আরোপ করাকে 'কাযাফ' বলা হয়। অনুরূপভাবে কোন পুরুষের বিরুদ্ধে সমকামিতা বা পশুর সাথে সঙ্গম কিংবা কোন মহিলার সাথে পশ্চাদ্ধার দিয়ে সঙ্গমক্রিয়ার অভিযোগ আরোপও 'কাযাফ'-এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে।

টিকাঃ
১. তবে ক্ষেত্র বিশেষে যিনার অভিযোগ আরোপ করা ওয়াজিবে পরিণত হয়। যেমন কেউ যদি তার স্ত্রীকে এমন তুহরের (মাসের পবিত্র অবস্থায়) মধ্যে যিনা করতে দেখে, যে সময় সে তার সাথে সঙ্গম করেনি। এর পর সে তার নিকট থেকে দূরে সরে থাকল। যদি দেখা যায় যে, যিনার পর ছয়মাসের মধ্যে সন্তান প্রসব করেছে, তাহলে স্ত্রীর প্রতি যিনার অভিযোগ আরোপ করা এবং সন্তানকে অস্বীকার করা তার জন্য ওয়াজিব হবে। অনুরূপভাবে ক্ষেত্র বিশেষে যিনার অভিযোগ আরোপ করা মুবাহে পরিণত হয়। যেমন কেউ যদি নিজের স্ত্রীকে যিনা করতে দেখে কিংবা স্ত্রীর যিনার ব্যাপারটি তার নিকট সুপ্রমাণিত হয়, তবে বংশীয় সম্পর্ক সৃষ্টি করার মতো কোন সন্তান জন্ম গ্রহণ করেনি, তাহলে স্ত্রীর প্রতি যিনার অভিযোগ আরোপ করতে কোন দোষ নেই। (ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৮, পৃ. ৫৮-৯)
২. আল-কুর'আন, ২৪ (আন-নূর): ২৩
৩. ইবনু মানযুর, লিসানুল আরব, খ.৯, পৃ. ২৭৭
৪. আল-বাবরতী, আল-ইনায়াহ, খ.৫, পৃ. ৩১৭; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.৩২; মালিকীগণের মতে 'কাযাফ' হল- কোন বালিগ ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি অপর কোন বালিগ ও বুদ্ধিমান মুসলমানকে যিনার অপবাদ দেয়া কিংবা কারো পিতৃ পরিচয় অস্বীকার করা। (আল-মাওয়াক, আত-তাজ ওয়াল ইকলীল, খ.৮, পৃ.৪০১-২; আল-খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.৮৬)
৫. মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ. ৪৮৬,৫০১; ইবনু আবী শায়বাহ, আল-মুহান্নাফ, খ.৬, পৃ. ৪৯৬, ৫৮১; আল-হায়তমী, আয-যাওয়াযির.., খ.২, পৃ.৮৫; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৮, পৃ.৭৯; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.৩৪

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 ‘কাযাফ’-এর শাস্তি

📄 ‘কাযাফ’-এর শাস্তি


যে কোন ব্যক্তি অপর কোন পুরুষ বা নারীর বিরুদ্ধে যিনা বা সমকামিতার অভিযোগ উত্থাপন করে তা চারজন উপযুক্ত সাক্ষী দ্বারা প্রমাণ করতে না পারলে উক্ত অভিযোগ 'কাযাফ' হিসেবে গণ্য হবে এবং অভিযোগকারীকে আশিটি বেত্রাঘাতের দণ্ড দেয়া হবে এবং চিরদিনের জন্য তাদের কোন সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَ الَّذِيْنَ يَرْمُوْنَ الْمُحْصَنٰتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوْا بِاَرْبَعَةِ شُهَدَآءَ فَاجْلِدُوْهُمْ ثَمٰنِيْنَ جَلْدَةً وَّ لَا تَقْبَلُوْا لَهُمْ شَهَادَةً اَبَدًاۚ وَ اُولٰٓئِكَ هُمُ الْفٰسِقُوْنَ.
- 11 - اِلَّا الَّذِيْنَ تَابُوْا مِنْۢ بَعْدِ ذٰلِكَ وَ اَصْلَحُوْا۫ فَاِنَّ اللّٰهَ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ. - সাধ্বী নারীর প্রতি যিনার অভিযোগ আরোপ করে, পরে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি কোড়া মার। উপরন্তু, তাদের সাক্ষ্য কখনোই গ্রহণ করবে না। তারা ফাসিক। তবে যারা এরপর তাওবা করবে এবং নিজেদের সংশোধন করে নেবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ (তাদের জন্য) ক্ষমাশীল, অতীব দয়াবান। এ আয়াতেও যদি মহিলাদের প্রতি যিনার অভিযোগের কথা বলা হয়েছে; তথাপি পুরুষদের প্রতি অভিযোগের বেলায়ও একই হুকম প্রযোজ্য হবে।
এ আয়াত থেকে দুনিয়াতে 'কাযাফ'-এর দু'প্রকারের শাস্তির কথা জানা যায়। একটি হল ৮০টি বেত্রাঘাত। অপর শাস্তি হল- সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান। চিরদিনের জন্য অপবাদদানকারীর কোন সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না।

টিকাঃ
১৪. আল-কুর'আন, ২৪ (সূরা নূর): ৪-৫

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 অপবাদ আরোপকারীর সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান

📄 অপবাদ আরোপকারীর সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান


ইমামগণ সকলেই এ বিষয়ে একমত যে, যদি অপবাদদানকারী তাওবা না করে, তবে তার কোন সাক্ষ্যই কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না এবং সে সারা জীবন ফাসিক হিসেবেই পরিচিত থাকবে। যদি সে তাওবা করে, তাহলেও কি সে সারা জীবন ফাসিক হিসেবেই পরিচিত থাকবে এবং তার কোন সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না- এ নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। হানাফীগণের মতে, যদি সে তাওবা করে, তাহলে তার থেকে ফাসিকের কলঙ্ক মুছে যাবে; তবে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। তাঁদের বক্তব্য হলো- কুর'আনে । (চিরদিনের জন্য) শব্দের ব্যবহার দ্বারা জানা যায় যে, তাদের সাক্ষ্য চিরদিনের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে না, যদিও সে তাওবাহ করে। আর إلا الذين تابوا من بعد ذلك وأصلحوا وأولئك هم الفسقون -এর সাথে সম্পর্কিত। এ থেকে জানা যায়, তাওবা করলে ফাসিকীর কলঙ্ক মুছে যাবে। তদুপরি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, المسلمون عدول بعضهم على بعض إلا محدودا في قذف. “অপরাধের দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া মুসলিমরা একে অপরের জন্য ন্যায়পরায়ণ।” এ হাদীস থেকেও স্পষ্ট জানা যায় যে, অপবাদ আরোপকারীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না।
অন্যান্য ইমামগণের মতে, তাওবার পর ফাসিকের কলঙ্ক মুছে যাবার সাথে তাদের সাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য হবে। তাদের দলীল হল, তাওবাহ কারণে যাবতীয় পাপ মুছে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, التائب من الذنب كمن لا ذنب له - “পাপকর্ম থেকে তাওবাকারী এমন ব্যক্তির মতো হয়ে যায়, যার কোন পাপ নেই।” এ হাদীসের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তাঁরা বলেন, কুফরী অপবাদ থেকেও বড় অপরাধ। কাফির তাওবা করে মুসলিম হলে যদি তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে মুসলিম তাওবা করলে তার সাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য হবে। তাঁদের মতে, إلا الذين تابوا من بعد ذلك وأصلحوا ولا تقبلوا لهم شهادة أبدا وأولئك هم الفسقون -এর সাথে সম্পর্কিত। এ থেকে জানা যায়, তাওবা করলে যেমন ফাসিকীর কলঙ্ক মুছে যাবে, তেমনি তাদের সাক্ষ্য গ্রহণেও কোন আপত্তি থাকবে না।
কারো কারো মতে, স্বীকারোক্তি দ্বারা অপবাদের দোষ প্রমাণিত হলে এবং এরপর খালিস তাওবাহ করলে তবেই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যদি তাদের আচার-আচরণ দ্বারা তাদের তাওবার প্রমাণ মিলে। এটা ইমাম শা'বী ও দাহহাকের অভিমত।
এ প্রসঙ্গে হানাফীগণের মতটিই অধিকতর বিশুদ্ধ ও যুক্তিযুক্ত মনে হয়। কেননা খালিস তাওবার ব্যাপারটি আল্লাহ ছাড়া কারো পক্ষে নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়। যদি তারা খালিস তাওবাই করে থাকে তাহলে তারা পরকালে অবশ্যই নাজাত পাবে। তবে দুনিয়ার কাজে-কর্মে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। এমতাবস্থায় কুর'আনে আ-বাদা (চিরদিনের জন্য) শব্দের অর্থও ঠিক থাকবে। তদুপরি তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য না হবার ব্যাপারে যেখানে সরাসরি হাদীসের বক্তব্য রয়েছে, সে ক্ষেত্রে কিয়াস করা সমীচীন নয়।

টিকাঃ
১৫. জাসসাস, আহকামুল কুর'আন, খ.৩, পৃ.৩৯৯-৪০১; আল-বাবরতী, আল-ইনায়াহ, খ.৫, পৃ.৩৩৮-৯
১৬. বাইহাকী, আস-সুনান আল-কুবরা', হা.নং: ১৬৯২৪; দারু কুতনী, আস-সুনান, (কিতাবুল আকদিয়‍্যাহ), হা.নং: ১৫, ১৬
১৭. ইবনুল 'আরবী, আহকামুল কুর'আন, খ.৩, পৃ.৩৪৫-৬; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.১০, পৃ.১৯২-৪
১৮. ইবনু মাজাহ, (বাব: যিকরুত তাওবাহ), হা.নং: ৪২৫০; বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা', হা.নং: ২০৩৪৮, ২০৩৪৯; তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা.নং: ১০২৮১
১৯. ইবনুল 'আরবী, আহকামুল কুর'আন, খ.৩, পৃ.৩৪৫-৬; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.১০, পৃ.১৯২-৪

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 ‘কাযাফ’-এর শর্তাবলী

📄 ‘কাযাফ’-এর শর্তাবলী


'কাযাফ'-এর কতিপয় শর্ত রয়েছে। হদ্দ কার্যকর করার জন্য এ সব শর্ত পাওয়া যেতে হবে। এ সব শর্তের কতিপয় অভিযোগ আরোপকারীর মধ্যে, আর কতিপয় অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে, আর কতিপয় অভিযোগের ভাষার মধ্যে পাওয়া যেতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00