📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 সাক্ষীদের সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী

📄 সাক্ষীদের সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী


১. সাক্ষীদেরকে মুসলিম হতে হবে অমুসলিমদের সাক্ষ্য যিনার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। সাক্ষীদের প্রত্যেককে মুসলিম হতে হবে। যদি কোন একজন সাক্ষীও অমুসলিম হয়, তাহলে সাক্ষ্যের নিসাব পূর্ণ হবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, فاستشهدوا عليهن .أربعة منكم - “তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী দাঁড় করাও।” এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা منكم (তোমাদের মধ্য থেকে) বলে কেবল মুসলিমগণকে বুঝিয়েছেন।
২. সাক্ষীদেরকে বয়ঃপ্রাপ্ত ও সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন হতে হবে যিনার ক্ষেত্রে অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক ও পাগলের সাক্ষ্য গ্রহণ যোগ্য হবে না। অনুরূপভাবে নেশাগ্রস্ত ও মাতাল ব্যক্তির সাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য হবে না।
৩. সাক্ষীদেরকে ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। যিনার ক্ষেত্রে ফাসিকের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। সাক্ষীদের প্রত্যেককে ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, واشهدوا ذوي عدل .منكم- “তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিদেরকেই সাক্ষী বানাবে।”
৩. সাক্ষীদেরকে পুরুষ হতে হবে। চার মাযহাবের ইমামগণের মতে, যিনার চারজন সাক্ষীর প্রত্যেককেই পুরুষ হতে হবে। মহিলাদের সাক্ষ্য যিনার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, .فاستشهدوا عليهن أربعة منكم - "তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী দাঁড় করাও।” এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা পুরুষদেরকেই বিশেষভাবে সম্বোধন করেছেন। তা থেকে জানা যায় যে, যিনা প্রমাণের জন্য পুরুষদের সাক্ষ্যই কেবল গ্রহণযোগ্য হবে।
৪. সাক্ষীদের সংখ্যা চার হতে হবে। যিনা প্রমাণের জন্য চার জন্য সাক্ষীর প্রয়োজন। যদি সাক্ষীদের সংখ্যা একজনও কম হয়, তাহলে শরী'আতের দৃষ্টিতে যিনা প্রমাণিত হবে না। উপরন্তু, যারা সাক্ষ্য দেবে, তাদের ওপর অপবাদ রটানোর হদ্দ কার্যকর করা হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, والذين يرمون المحصنات ثم لم يأتوا بأربعة شهداء فاجلدوهم ثمانين جلدة "আর যারা অবিবাহিত সতী মহিলাদেরকে অপবাদ দেয়, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাহলে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর।”
৫. সাক্ষীদেরকে বাকশক্তিসম্পন্ন হতে হবে। যিনা প্রমাণের জন্য বোবার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা সে ইশারা-ইঙ্গিত ছাড়া সরাসরি সাক্ষ্য প্রদান করতে পারে না。

টিকাঃ
১০৭. আল-কুর'আন, ৪ (সূরা আন-নিসা): ১৫
১০৮. আল-কুর'আন, ৬৫ (সূরা আত-তালাক)ঃ ২
১০৯. যায়ল'ঈ, আত-তাবয়ীন, খ.৩, পৃ.১৬৪; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.৪; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৬৪
১১০. আল-কুর'আন, ৪ (সূরা আন-নিসা) : ১৫
১১১. - ১১২. আল-কুর'আন ২৪ (সূরা আন-নূর) : ৪
১১৩. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.১৬, পৃ.১৩০; আল-কাসানী, বাদাই, খ.৬, পৃ.২৬৭; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.১০, পৃ.১৮৫-৬

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 সাক্ষ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী

📄 সাক্ষ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী


১. চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্য একই মজলিসে পেশ করতে হবে। অধিকাংশ ইমামের মতে, সাক্ষীদের সাক্ষ্য একই মজলিসে হতে হবে। যদি সাক্ষীরা বিচ্ছিন্নভাবে এক এক জন করে কিংবা দুজন দুজন করে বা তিন জন এক সাথে আর অপর একজন পৃথকভাবে সাক্ষ্য দেয়, তাহলে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। অধিকন্তু, তাদের সকলের ওপর যিনার অপবাদ দেয়ার শাস্তি কার্যকর করা হবে। তবে শাফি'ঈগণের মতে- এ শর্ত মেনে চলা প্রয়োজন নয়। যদি তারা সম্মিলিত কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে সাক্ষ্য দেয়, একই মজলিসে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন মজলিসে, তাহলে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে。
২. সাক্ষীদের সাক্ষ্য সুস্পষ্ট ও বিশদ হতে হবে।
সাক্ষীদেরকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে বলতে হবে যে, সুরমাদানীর মধ্যে সুরমা লাগানোর কাঠি যেমন ঢোকা অবস্থায় থাকে, তেমনি তারা পুরুষাঙ্গকে নারীর যোনীর মধ্যে ঢোকানো অবস্থায় দেখেছে। কেননা অনেক সময় সাক্ষীরা এমন অনেক আচরণকে যিনা মনে করে নিতে পারে যে, যা মূলত যিনা নয়। তাই এ ক্ষেত্রে যিনার বিবরণ অত্যন্ত সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তদুপরি এ কথাও সুনির্দিষ্ট ও বিশদভাবে বলতে হবে যে, কার সাথে, কি অবস্থায়, কখন ও কোথায় যিনা সংঘটিত হয়েছে। এ থেকে জানা যায়, তারা দুজনে যিনা করেছে- সাক্ষীদের এমন কথার ওপর ভিত্তি করে কারো ওপর হদ্দ কার্যকর করা যাবে না।
৩. সাক্ষ্য মৌলিক হতে হবে।
অধিকাংশ ইমামের মতে, যিনার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য মৌলিক হতে হবে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যই একমাত্র গ্রহণযোগ্য হবে। সাক্ষীদের থেকে শুনে কেউ সাক্ষ্য দিলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না。
৪. সাক্ষ্যের মধ্যে পূর্ণ মিল থাকতে হবে।
সাক্ষ্যে পূর্ণ মিল থাকতে হবে। যদি তাতে কোন রূপ পার্থক্য দেখা দেয়, তাহলে সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। যেমন- যদি দুজন সাক্ষী এ মর্মে সাক্ষ্য দেয় যে, তারা জুম'আবারে যিনা করেছে এবং অপর দুজন সাক্ষ্য দেয় যে, তারা শনিবারে যিনা করেছে, তাহলে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। অনুরূপভাবে যদি তাদের দুজন দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে যিনার সাক্ষ্য দেয় আর অপর দুজন যদি দিনের অন্য সময়ে যিনার সাক্ষ্য দেয়, তাহলেও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে চারের অতিরিক্ত সাক্ষীদের সাক্ষ্যে গরমিল হলে তা ধর্তব্য হবে না। তদুপরি সাক্ষীদের মধ্যে কেউ সাক্ষ্য প্রত্যাহার করে নিলেও যিনা প্রমাণিত হবে না। তবে চারের অতিরিক্ত সাক্ষীগণের কেউ সাক্ষ্য প্রত্যাহার করলে তা বিবেচ্য হবে না。
৫. সাক্ষ্য দানে বিলম্ব না করা
হানাফীগণের মতে, যিনার অপরাধ সংঘটিত হবার দীর্ঘ দিন পর যিনার সাক্ষ্য দেয়া হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা কাউকে কোন অপরাধে লিপ্ত হতে দেখার পর প্রত্যক্ষকারীর এ ইখতিয়ার রয়েছে যে, সে ইচ্ছে করলে সমাজের সার্বিক শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে নিরেট আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় সাক্ষ্য পেশ করবে অথবা অপরাধটি গোপন করে রাখবে। অপরাধ দেখার পর দীর্ঘ দিন নীরব থাকার মানে হল সে দ্বিতীয় পথকেই বেছে নিয়েছে। আর দীর্ঘ দিন পর সাক্ষ্য দেয়ার অর্থ এ দাঁড়ায় যে, সে কোন অসৎ উদ্দেশ্য কিংবা হিংসা-বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে এখন সাক্ষ্য প্রদান করছে। অধিকন্তু, যে সাক্ষ্য সম্পর্কে জানা যাবে যে, সাক্ষীদাতা কোন অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেছে, তাহলে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। হযরত 'উমার (রা) বলেন, أيما قوم شهدوا على حد لم يشهدوا عند حضرته فإنما شهدوا عن ضغن و لا .شهادة لهم - "যে সব লোক হদ্দের কোন অপরাধ সংঘটিত হবার সময় সাক্ষ্য না দিয়ে অন্য সময় সাক্ষ্য দেয়, তাহলে বোঝে নিতে হবে যে, তারা হিংসা-বিদ্বেষমূলকভাবে সাক্ষ্য দিচ্ছে। তাই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। "
অন্যান্য ইমামগণের মতে, যিনার অপরাধ সংঘটিত হবার দীর্ঘ দিন পরেও যদি যিনার সাক্ষ্য দেয়া হয়, তাও গ্রহণযোগ্য হবে। তাঁদের কথা হল, যুক্তিসঙ্গত বিভিন্ন কারণেও সাক্ষ্য প্রদানে বিলম্ব হতে পারে。

টিকাঃ
১১০. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৯০; আল-কাসানী, বদাই, খ.৭, পৃ.২৬৭; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ. ৬৬, খ.১০, পৃ.২২০; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭পৃ. ১৪৪
১১৪. আল-কাসানী, বাদাই, খ.৭, পৃ.২৬৭; বাবরতী, আল-ইনায়াহ, খ.৫, পৃ. ২১৫-৭; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৭, পৃ. ৪৬; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.১, পৃ. ৬৫
১১৫. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৬৬; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ.২৯১-২
১১৬. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৬১-৬; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ.২৮৪-৬; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.১০, পৃ. ২১৯-২২০; আর-রামালী, নিহায়াতুল মুহতাজ, খ.৭, পৃ. ৪৩২
১১৭. আল্লাহ তা'আলা বলেন, وأقيموا الشهادة لله - "আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তোমরা সত্য সাক্ষ্য দাও।" -সূরা আত-তালাক: ২
১১৮. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, من ستر مسلما ستره الله في الدنيا و الآخرة - "যে কোন মুসলিমের দোষ গোপন করে রাখবে, আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন করে রাখবে।" (ইবনু মাজাহ, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ২৫৪৪; আবদুর রযযাক, আল-মুছান্নাফ, হা.নং: ১৮৯৩৬)
১১৯. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৯৭, ১১৫; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৪৬
১২০. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.১০, পৃ.১৫১; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৪৬
১২১. যেমন অসুস্থ হয়ে যাওয়া বা জরুরী প্রয়োজনে দূরে কোথাও গমন করা প্রভৃতি।
১২২. আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ. ৪, পৃ. ১৩২; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৭১

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 যাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া হচ্ছে তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী

📄 যাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া হচ্ছে তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী


১. যাদের বিরুদ্ধে যিনার সাক্ষ্য দেয়া হচ্ছে তাদেরকে প্রাপ্ত বয়স্ক হতে হবে এবং যিনার উপযোগী হতে হবে। অতএব যে মেয়ের সাথে যিনার সাক্ষ্য দেয়া হচ্ছে যদি প্রমাণিত হয় যে, সে ছোট, সঙ্গমের উপযোগী নয়, তাহলে তার ওপর যিনার হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। মেয়েটি ছোট কি না- তা প্রমাণের জন্য হানাফী ও হাম্বলীগণের মতে, একজন মহিলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট। শাফি'ঈগণের মতে, এ জন্য চার জন মহিলা কিংবা দুজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন মহিলার সাক্ষ্যের প্রয়োজন。

টিকাঃ
১২৩. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ১৯০-১; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ. ২৪; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ. ১৯২-৩; আল-আনসারী, আল-গুরার.., খ.৫, পৃ. ৮৩-৪

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 সাক্ষীদের জেরা করা

📄 সাক্ষীদের জেরা করা


সাক্ষীরা যিনার সাক্ষ্য দেয়ার পর বিচারক তাদেরকে জেরা করবেন। তাদের কাছ থেকে জানতে চাইবেন, যিনা বলতে তারা কি বোঝাতে চাচ্ছে এবং কোন দিন, কোন সময়, কোন জায়গায় কারা যিনা করেছে। তাছাড়া যিনার অবস্থায় তারা কে কোন অবস্থায় ছিল তাও জানতে চাইবে। এ সব বিষয়ে যদি চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের মধ্যে গরমিল দেখা দেয় হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। তবে চারের অতিরিক্ত সাক্ষীদের সাক্ষ্যে গরমিল হলে তা ধর্তব্য হবে না。

টিকাঃ
১২৪. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৬১-৬; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ.২৮৪-৬; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.১০, পৃ. ২১৯-২২০; আর-রমলী, নিহায়াতুল মুহতাজ, খ.৭, পৃ. ৪৩২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00