📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 স্বীকারোক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী

📄 স্বীকারোক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী


১. চার বার স্বীকারোক্তি প্রদান করতে হবে। এটা হানাফী ও হাম্বলীগণের অভিমত। তাঁদের মতানুযায়ী চারবারের কম স্বীকারোক্তি করলে যিনার শাস্তি কার্যকর হবে না। বর্ণিত রয়েছে, হযরত মা'ইয (রা) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দরবারে এসে যিনার স্বীকারোক্তি দেয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এভাবে তিনি চারবারই স্বীকারোক্তি দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথম তিন বারেই মুখ ফিরিয়ে নিলেন। চতুর্থবার তার কথা আমলে নিলেন। এ থেকে জানা যায় যে, যদি একবার স্বীকারোক্তিই হদ্দের জন্য যথেষ্ট হত, তা হলেই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কেনই বা চতুর্থবার স্বীকারোক্তি দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। মালিকী ও শাফি'ঈগণের মতে, চার চারবার স্বীকার করার প্রয়োজন নেই; বরং একবার স্বীকার করাই শাস্তি কার্যকর করার জন্য যথেষ্ট।
২. ভিন্ন ভিন্ন এজলাসে স্বীকারোক্তি প্রদান করতে হবে
যে সব ইমামের দৃষ্টিতে, চার বার স্বীকৃতি দিতে হবে, তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ হানাফীগণের মতে, এই চারবার স্বীকৃতি ভিন্ন ভিন্ন চারটি এজলাসে সম্পন্ন হতে হবে। তবে অন্যদের মতে, এক মজলিসে চারবার স্বীকৃতি দানও যথেষ্ট হবে।
৩. বিচারকের এজলাসে স্বীকারোক্তি প্রদান করতে হবে।
৪. স্বীকারোক্তি সুস্পষ্ট ও বিশদ বর্ণনাসম্বলিত হতে হবে। অস্পষ্ট স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কখন, কার সাথে, কোন স্থানে, কোন অবস্থায় ও কিভাবে সঙ্গম করা হল তার বিশদ বিবরণ স্বীকারোক্তিতে থাকা প্রয়োজন।
৫. স্বীকারোক্তির ওপর অটল থাকতে হবে। যদি স্বীকারোক্তি প্রদানকারী নারী-পুরুষ কোন পর্যায়ে নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। তাছাড়া হদ্দ কার্যকর করার সময়েও যদি কেউ নিজের স্বীকারোক্তি থেকে ফিরে আসে, তাহলে বাকী হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। বর্ণিত রয়েছে, হযরত মা'ইয (রা) যখন পাথরের প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করতে না পেরে পালাতে শুরু করলেন, তখন লোকেরা তার পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে ধরে ফেলে এবং প্রস্তারাঘাতে সে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘটনাটি জানতে পেরে বললেন, هلا تركتموه لعله .أن يتوب فيتوب الله عليه - “তোমরা কেন তাকে ছেড়ে দিলে না? হয়ত সে তাওবা করত এবং আল্লাহও তার তাওবা কবুল করতেন।" এ থেকে জানা যায় যে, স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে নিলে তার ওপর হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করলে সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং এ রূপ অবস্থায় হদ্দ প্রয়োগ করা যায় না。

টিকাঃ
৯৫. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদুদ), হা.নং: ১৬৯১, ১৬৯২; আবু দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ৪৪১৯
৯৬. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৮৯-৯২; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৫০-১; মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ. ৪৭২; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৭, পৃ. ১৩২; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.১, পৃ.৬০
৯৭. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৮৯-৯২; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৫০-১; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৭, পৃ. ১৩২; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৬১
৯৮. শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৭, পৃ. ১৩২; মুল্লা খসরু, দুরারুল হুক্কাম, খ.২, পৃ.৭৪
৯৯. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ১৬৬; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ.২৩৩; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.১, পৃ.৬১
১০০. আবূ দাউদ (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ৪৪১৯
১০১. ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ.২২২-৩; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ. ১০; আল-বুজায়রমী, আত-তাজরীদ, খ.৪, পৃ.২১৩

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 অপরাধ সংঘটিত করার দীর্ঘ দিন পর স্বীকারোক্তি দান

📄 অপরাধ সংঘটিত করার দীর্ঘ দিন পর স্বীকারোক্তি দান


অধিকাংশ ইমামের মতে, অপরাধ সংঘটিত করার দীর্ঘ দিন পরেও যদি কেউ যিনার স্বীকৃতি দেয়, তাহলে তা আমলে নিয়ে হদ্দ কার্যকর করা হবে। ইমাম মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ যদি কেউ চল্লিশ বৎসর পরে এসেও স্বীকার করে, তাহলেও আমি তার ওপর হদ্দ কার্যকর করব。

টিকাঃ
১০২. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৯৭; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৫১

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 স্বীকারোক্তি দানকারীকে বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধকরণ

📄 স্বীকারোক্তি দানকারীকে বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধকরণ


অধিকাংশ ইমামের মতে, যদি কেউ স্বেচ্ছায় বিচারকের কাছে গিয়ে যিনার স্বীকৃতি দেয়, তাহলে বিচারক তাকে তার স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য ফিরিয়ে নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারবে। শাফি'ঈগণের মতে, এটা জায়িয। আর হানাফী ও হাম্বলী ইমামগণের মতে, এটা বিচারকের জন্য মুস্তাহাব। তাঁদের বক্তব্য হল, বর্ণিত রয়েছে, হযরত মা'ইজ (রা) যিনার স্বীকৃতি দেবার পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেন, সম্ভবত তুমি তাকে চুমা দিয়েছ বা হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছ কিংবা তার প্রতি নজর দিয়েছ। এ থেকে জানা যায়, বিচারকের জন্য স্বীকৃতি দানকারীকে নিজের বক্তব্য ফিরিয়ে নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা সমীচীন।

টিকাঃ
১০৩. আবুদাউদ (কিতাবুল হুদুদ), হা.নং: ৪৪১৯, ৪৪২৭
১০৪. যায়ল'ঈ, আত-তাবয়ীন, খ.৩, পৃ.১৬৭; আল-বাবরতী, আল-'ইনায়াহ, খ.৫, পৃ.২২৩; বহুতী, কশশাফ, খ.৬, পৃ. ১০৩; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৭৪

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 একজনের স্বীকারোক্তি এবং অন্যজনের অস্বীকার

📄 একজনের স্বীকারোক্তি এবং অন্যজনের অস্বীকার


একজন যেনার স্বীকারোক্তি করলে এবং অপরজন অস্বীকার করলে স্বীকারোক্তিকারীর ওপর হদ্দ কার্যকর হবে এবং অস্বীকারকারী রেহাই পাবে। যেমন একজন পুরুষ একজন মেয়ের সাথে যিনা করল। পুরুষটি অপরাধ স্বীকার করল; কিন্তু মেয়েটি অপরাধ অস্বীকার করল। এ অবস্থায় যে অপরাধ স্বীকার করেছে, তার ওপর হদ্দ কার্যকর হবে এবং যে অপরাধ অস্বীকার করেছে সে শাস্তি থেকে রেহাই পাবে। হযরত সাহল ইবন সা'দ (রা) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে যিনার স্বীকারোক্তি করল এবং যে নারীর সাথে যিনা করেছে তার নামও বলল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সে নারীকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। সে অপরাধ অস্বীকার করল। তিনি স্বীকারোক্তিকারী পুরুষটির ওপর হদ্দ কার্যকর করলেন এবং মেয়েটিকে রেহাই দিলেন。
অনুরূপভাবে সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হওয়া ছাড়া কেউ যিনা করে অস্বীকার করলে তার ওপরও হদ্দ প্রয়োগ করা যাবে না। এমনকি এ অপরাধ প্রকাশিত হয়ে না পড়লে তা গোপন করে রাখাই শ্রেয়।

টিকাঃ
১০৫. এটা সাহেবাইন ও অন্যান্য ইমামগণের অভিমত। ইমাম আবু হানীফা (রহ)-এর মতে, এ রূপ অবস্থায় স্বীকারোক্তিকারীর ওপর হদ্দ কার্যকর করা হবে। তবে মহিলাটি স্বীকারোক্তিকারী পুরুষের প্রতি যদি মিথ্যা অপবাদ আরোপের অভিযোগ করে এবং সে যদি চার জন সাক্ষী পেশ করতে সমর্থ না হয়, তাহলে তার ওপর যিনার নয়, কাযাফের হদ্দ কার্যকর করা হবে। ( যায়ল'ঈ, আত-তাবয়ীন, খ.৩, পৃ.১৮৪; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ. ২৯; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৬১)
১০৬. আবূ দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ৪৪৩৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00