📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 রজম কার্যকর করার পদ্ধতি

📄 রজম কার্যকর করার পদ্ধতি


১. রজমের দণ্ডপ্রাপ্ত পুরুষকে দাঁড়ানো অবস্থায় প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা করতে হবে। তাকে শক্তভাবে বাঁধার কিংবা গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে তাকে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। হযরত 'আবূ সা'ঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন হযরত মা'ইয (রা)-কে রজম করার জন্য নির্দেশ দিলেন, তখন আমরা তাকে বাকী'র দিকে নিয়ে গেলাম। তাঁর জন্য আমরা গর্তও খনন করিনি, তাঁকেও বাঁধিও নি। রজমের দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি মেয়ে হয়, তাহলে তাকে বসা অবস্থায় প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা করতে হবে। তার জন্য গর্ত খনন করা জরুরী কি না- তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। হানাফীগণের মতে, গর্ত খনন করা আর না করা বিচারক কিংবা শাসকের ইখতিয়ার। বিচারক কিংবা শাসক অবস্থানুপাতে যা ভাল মনে করবেন, তা-ই করতে পারবেন। ইমাম আবূ ইউসূফ (রা) ও অন্যান্যের মতে, তাকে গর্তের মধ্যে দাঁড় করানোই উত্তম। কেননা গর্তের মধ্যে দাঁড় করিয়ে প্রস্তর নিক্ষেপ করা হলে, তা হবে মহিলাদের পর্দার জন্য অধিকতর উপযোগী। বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গামিদিয়্যাকে রজম করার জন্য তার বুক পর্যন্ত একটি গভীর গর্ত খনন করেছিলেন। তবে ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ (রহ) প্রমুখের মতে, গর্ত খনন না করাই উত্তম। তবে তার দেহ যাতে কোনভাবে প্রকাশ পেয়ে না যায়, এ জন্য কাপড় দিয়ে শরীরকে শক্ত করে জড়িয়ে রাখা প্রয়োজন।
যিনা যদি সাক্ষ্য-প্রমাণ যোগে প্রমাণিত হয়, তাহলে শাস্তিদানের অনুষ্ঠানে সাক্ষীদের উপস্থিত থাকতে হবে এবং তারাই সর্বাগ্রে প্রস্তর নিক্ষেপ শুরু করবে। যদি তারা প্রস্তর নিক্ষেপ করতে অস্বীকার করে, তা হলে হদ্দ রহিত হয়ে যাবে। এটা হানাফীগণের অভিমত। অন্যান্যদের মতে, সাক্ষীদের উপস্থিতি জরুরী নয়。
প্রস্তর নিক্ষেপের সময় কেউ পালিয়ে যেতে থাকলে তার পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে হত্যা করতে হবে। কারো কারো মতে, যদি পালানোর আশঙ্কা থাকে, তা হলে তাকে কোন কিছুর সাথে বেঁধে রেখে কিংবা গর্ত খুঁড়ে সেখানে দাঁড় করিয়ে প্রস্তর নিক্ষেপ করা যাবে। তবে সে স্বেচ্ছায় স্বীকৃতিদানকারী ব্যভিচারী হলে তার পশ্চাদ্ধাবন করা যাবে না; তার ওপর প্রস্তর নিক্ষেপ স্থগিত রাখতে হবে। কেননা তার এ পলায়ন তার স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে নেয়ার ব্যাপারে সন্দেহের জন্ম দেয়。
8. বিশাল খোলামেলা জায়গায় রজম কার্যকর করা দরকার, যাতে কারো গায়ে কোন চোট লাগা ছাড়াই সহজে প্রস্তর নিক্ষেপ করা যায়। এ সময় বিপুল সংখ্যক মুসলিম জনতার উপস্থিত থাকা একান্ত প্রয়োজন। শাসক কিংবা তাঁর কোন প্রতিনিধি এ সময় উপস্থিত থাকবেন। লোকজন নামাযের কাতারের মতো বিভিন্ন সারিতে ভাগ হয়ে দাঁড়াবে। একদল প্রস্তর নিক্ষেপ করার পর পেছনে সরে যাবে আর অন্য এক দল এগিয়ে এসে প্রস্তর নিক্ষেপ করবে। এটা হানাফীগণের অভিমত। হাম্বলী ও শাফি'ঈগণের মতে, যিনা যদি সাক্ষ্য-প্রমাণ যোগে প্রমাণিত হয়, তাহলে তারা অপরাধীকে বৃত্তাকারে চারদিক থেকে পরিবেষ্টিত করে রাখবে, যাতে সে কোনভাবে পালাতে না পারে। তবে হাম্বলীগণের মতে, স্বেচ্ছায় স্বীকৃতিদানকারীর ক্ষেত্রে এ রূপ না করাই উত্তম। যাতে সে পালিয়ে শাস্তি থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে।
৫. পাথরের আকার মাঝারি অর্থাৎ সহজে হাতে বহন যোগ্য হতে হবে। তার আকার খুব বড়ও হবে না, যাতে সে খুব দ্রুত মারা যায়। আর তাতে প্রস্তর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ডও দানের উদ্দেশ্যই ক্ষুণ্ণ হবে। আবার এমন ছোটও হবে না, যাতে মৃত্যু খুবই বিলম্বিত হয় এবং পীড়ন দীর্ঘায়িত হবে。
৬. মালিকীগণের মতে, নাভী থেকে দেহের ওপর পর্যন্ত সহজে আক্রান্ত হয়- এরূপ দেহের যে কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রস্তর নিক্ষেপ করা বাঞ্ছনীয়। তবে চেহারা ও গুপ্তাঙ্গে প্রস্তর নিক্ষেপ করা সমীচীন নয়। হানাফী ও হাম্বলী ইমামগণের মতে, চেহারার একটি বিশেষ মর্যাদা থাকার কারণে প্রস্তরের আঘাত থেকে তাকে মুক্ত রাখা প্রয়োজন。
৭. ব্যভিচারিণী গর্ভবতী হলে গর্ভ খালাসের পর শাস্তি কার্যকর করা হবে। যদি সন্তানকে দুগ্ধদান করার মতো কেউ না থাকে, তাহল দুধ পানের মেয়াদ শেষ হবার পরেই শাস্তি কার্যকর করা হবে。

টিকাঃ
৩৯. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৯৪; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, হা.নং: ৮০৭৯; বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৬৭৭৪
৩৯. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৯৫
৪০. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৫১-২; আল-কাসানী, বাদাই, খ.৭, পৃ.৫৯; মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ. ৫০৮; আল-বাজী, আল-মুন্তকা, খ.৭, পৃ.১৩৪; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৪০; আল-মরদাতী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ. ১৬১
৪১. ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইק, খ.৫, পৃ. ৯-১০; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.১২; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৪০; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ. ৮৪
৪২. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৬৯-৭০; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.১, পৃ.৪০, ৬৩; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রাইק, খ.৫,পৃ. ৮; আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১৩২
৪৩. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ১৬৭; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ২২৫; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৪০; আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১৩৩; বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ. ৮৪
৪৪. আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১৩৩; বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ. ৮৯; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ. ১৩৪;
৪৫. খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.৮১-২; ইবনু গুনায়ম, আল-ফাওয়াকিহ.., খ.২, পৃ.২০৫; আল-হাদ্দাদী, আল-জাওহারাহ, খ.২, পৃ. ১৫০; আর-রুহায়বানী, মাতালিব.., খ.৬, পৃ. ১৭৬
৪৬. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.১, পৃ.৭৩; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ.১৭৫; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৪৮

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 রজমের পরবর্তী কার্যক্রম

📄 রজমের পরবর্তী কার্যক্রম


প্রস্তর নিক্ষেপে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সাথে একজন মৃত মুসলিমের মত আচরণ করতে হবে। তাকে গোসল করাতে হবে, কাফন পরাতে হবে, তার জানাযা পড়তে হবে এবং যথারীতি মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করতে হবে। হযরত মা'ইযের মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন, اصنعوا به ما تصنعون بموتاكم - "তোমরা তোমাদের মৃত মুসলিমদের সাথে যে রূপ আচরণ করে থাক, তার সাথেও সে একই রূপ আচরণ কর।" তদুপরি তিনি নিজেই গামিদিয়্যার জানাযা পড়েছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে মালিকীগণের মতে, মুসলিম শাসক নিজে তার জানাযা পড়বে না। অন্যরা পড়বে। তাঁর কথার দলীল হল, হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ মা'ইযের মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার প্রশংসা করেছেন বটে, তবে তার জানাযা পড়েন নি।

টিকাঃ
৪৭. আস-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ৬৩; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ. ৯১; আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১৩৫
৪৮. ইবনু আবী শায়বাহ, আল-মুসান্নাফ, হা.নং: ১১০১৪
৪৯. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৯৬
৫০. মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ. ৫০৯
৫১. আল বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৬৭৩২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00