📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 বেত্রাঘাত দণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি

📄 বেত্রাঘাত দণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি


বেত্রাঘাত দণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। এগুলো হলঃ
১. প্রহারের ছড়িটি মাঝারি আকারের হতে হবে। অর্থাৎ বেশি মোটাও হবে না এবং বেশি সরুও হবে না। তদুপরি তাতে কোন গিরা থাকতে পারবে না।
২. প্রহারও মধ্যম মানের হতে হবে। বেশি জোরেও মারা যাবে না, যাতে তার প্রাণ নাশ কিংবা কোন অঙ্গের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে এবং এমন হালকাভাবেও মারা যাবে না, যাতে সে কোন কষ্টই অনুভব করবে না।
৩. শরীরের এক জায়গায় প্রহার করা যাবে না; বরং বিভিন্ন অঙ্গে ভাগ করে করে প্রহার করতে হবে, যাতে ত্বক ফেটে না যায় এবং কোন অঙ্গের ভীষণ ক্ষতি সাধিত না হয়।
৪. মাথা, চেহারা, বক্ষ, পেট, গুপ্তাঙ্গ ও কটিদেশ প্রভৃতি স্পর্শকাতর অঙ্গে প্রহার করা জায়িয নেই।
৫. প্রহার করার জন্য মাটিতে শোয়ানো যাবে না। অনুরূপভাবে কোন কিছুর সাথে বেঁধে কিংবা গর্তে খুঁড়ে সেখানে দাঁড় করিয়ে প্রহার করাও বিধেয় নয়। পুরুষকে দাঁড়ানো অবস্থায় এবং নারীকে বসা অবস্থায় প্রহার করতে হবে। হযরত 'আলী (রা) বলেন, "পুরুষদেরকে দাঁড়ানো অবস্থায় এবং নারীদেরকে বসা অবস্থায় হদ্দের বেত্রাঘাত করতে হবে।" তবে ইমাম মালিকের মতে, মহিলাদের মতো পুরুষদেরকেও বসা অবস্থায় প্রহার করা হবে।
৬. প্রহার করার জন্য সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করা যাবে না। হানাফী ও মালিকীগণের মতে, পুরুষের ইজার বা শরীরের নিম্নাংশ আবৃতকারী বস্ত্র ছাড়া অন্যান্য কাপড় খুলে নেয়া হবে। তবে মহিলার কাপড় খোলা যাবে না। তবে তার গায়ে যদি কোন অতিরিক্ত কাপড় কিংবা চামড়ার কোন বস্ত্র থাকে, তাহলে তা খুলে নিতে হবে।” শাফি'ঈ ও হাম্বলীগণের মতে, পুরুষ হোক বা নারী- কারো স্বাভাবিক বস্ত্র খুলা যাবে না। তবে চামড়ার কোন বস্ত্র থাকলে কিংবা মোটা কাপড়ের জুব্বা থাকলে তা খুলে নিতে হবে。
বেত্রাঘাত করার সময় বিপুল সংখ্যক মুসলিম জনতার উপস্থিত থাকা একান্ত প্রয়োজন। কেননা হদ্দের একটি প্রধান উদ্দেশ্য হল- লোকদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা, যাতে তারা অপরাধে লিপ্ত হতে সাহস না পায়। আর এ উদ্দেশ্য তখনই অতীব উত্তমভাবে অর্জিত হতে পারে, যখন তা প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমক্ষে কার্যকর করা হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وليشهد عذابهما طائفة من المؤمنين - "এক দল ঈমানদার যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। "
ব্যভিচারিনী গর্ভবতী হলে গর্ভ খালাসের পর নিফাস শেষে বেত্রাঘাতের শাস্তি কার্যকর করা হবে。

টিকাঃ
১৪. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ১৬৯-১৭৭; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ২৩০-১
১৫. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ১৭০; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ২৩০-১
১৬. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ১৭০; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ২৩১-২
১৭. ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ২৩২; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.১০
১৮. আল-কাসানী, বাদাই, খ.৭, পৃ. ৫৯-৬০; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ২৩২-৩; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক খ.৫, পৃ.১০; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯,৪০
১৯. বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৭৩৬০
২০. আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ. ১৪২; দাসূকী, আল-হাশিয়াতু.., খ.৪, পৃ. ৩৫৪
২১. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ৭০; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ১৭৯; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ. ১৪২; দাসূকী, আল-হাশিয়াতু.., খ.৪, পৃ. ৩৫৪
২২. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৪২; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১৬১; আল-হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯, পৃ. ১৭৪
২৩. মালিকী ও শাফি'ঈগণের মতে, ন্যূনতম চারজন ব্যক্তি উপস্থিত থাকতে হবে। তবে হাম্বলীগণের মতে, এক দল লোক উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। (ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৪৭; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ২৩৪; আল-কাসানী, বদাই, খ.৭, পৃ.৫৬০)
২৪. আল-কুর'আন, ২৪ (সূরা আন-নূর): ২
২৫. স্ত্রীলোকের সন্তান প্রসবের পর তার যে রক্তস্রাব হয়, তাকে নিফাস বলে। নিফাসের সর্বোচ্চ মেয়াদ চল্লিশ দিন।
২৬. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ৭০; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ১৭৫; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৪৮

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 বিবাহিতের যিনার শাস্তি

📄 বিবাহিতের যিনার শাস্তি


'মুহসান' - পুরুষ হোক বা নারী- যিনা করলে তার শাস্তি হল 'রজম' (প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা করা)। এ শাস্তির বর্ণনা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথা ও কাজ উভয় দিক থেকে সন্দেহাতীতভাবে পাওয়া গেছে।
ইতঃপূর্বে হযরত 'উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা)-এর বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে - الثيب بالثيب جلد مائة و الرجم - “বিবাহিতের শাস্তি বেত্রাঘাত ও রজম।” অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, মালিকের স্ত্রীর সাথে জনৈক মজুরের যিনার ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত উনায়স আল-আসলামী (রা)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন, فإن اعترفت فارجها - “যদি মেয়েটি স্বীকার করে, তাহলে তুমি তাকে রজম কর।” মেয়েটি যিনার কথা স্বীকার করে এবং তাকে রজম করা হয়। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই যে কয়েকটি রজমের দণ্ড প্রদান করেছেন, তাও বিভিন্ন বিশুদ্ধ হাদীসের বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে জানা যায় যে, বিবাহিত নারী-পুরুষ যিনা করলে তার শাস্তি রজম; কিন্তু তার পূর্বে তাকে বেত্রাঘাত করতে হবে কি না - তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তবে চার মাযহাবের ইমামগণের সর্বস্বীকৃত মত হল- বিবাহিতদেরকে শুধু রজমই করতে হবে; বেত্রাঘাত নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও খুলাফা রাশিদূনের যুগে বিবাহিতদের যিনার কিছু সংখ্যক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কোন ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও খুলাফা রাশিদূন রজমের পূর্বে বেত্রাঘাতের নির্দেশ প্রদান করেছিলেন- এ ধরনের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, বিবাহিতদের শাস্তি -রজমের ওপর ইজমা' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

টিকাঃ
২৭. এখানে محصن বলতে বোঝানো হয়েছে বালিগ, বুদ্ধিমান, মুসলিম ও স্বাধীন ব্যক্তি যে বিশুদ্ধ নিয়মে বিয়ে করল এবং একবার হলেও স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করল। সুতরাং নাবালেগ, পাগল ও কাফির বিয়ে করলেও 'মুহসান' রূপে গণ্য হবে না। অনুরূপভাবে অশুদ্ধ বিবাহ দ্বারাও মুহসান গণ্য হবে না। বিশুদ্ধ বিয়ের পর যৌনসঙ্গম না হলেও 'মুহসান' বিবেচিত হবে না। কোন ব্যক্তি বিবাহিত কি না- তা প্রমাণের জন্য অন্ততপক্ষে দুজন সাক্ষী লাগবে। ইমাম আবু হানীফা ও সাহেবাইনের মতে, দুজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারীর সাক্ষ্য দ্বারা কোন ব্যক্তি বিবাহিত কি না তা প্রমাণিত হবে। তবে ইমাম যুফার (রহ)-এর মতে, চারজন পুরুষ সাক্ষীর প্রয়োজন। (আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৩৯-৪০; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ. ১৭-১৮; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৪১-৪২)
২৮. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৯০; আবু দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ৪৪১৫
২৯. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুশ শুরূত), হা.নং: ২৫৭৫; সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদুদ), হা.নং: ১৬৯৭
৩০. হযরত মা'ইয ইবন মালিক আল-আসলামী, গামিদ গোত্রের জনৈকা মহিলা ও দু ইয়াহুদীকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কর্তৃক রজমের দণ্ড প্রদান করার ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
৩১. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদুদ), হা.নং: ১৬৯৫; আবু দাউদ, (কিতাবুল হুদুদ), হা.নং: ৪৪৩৪, ৪৪৪৬
৩২. যাহিরী ও যায়দিয়্যা শী'আ ইমামগণ ইতঃপূর্বে বর্ণিত হযরত 'উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা)-এর হাদীসের ভিত্তিতে বলেন যে, রজমের আগে বেত্রাঘাত করাও জরুরী। ইমাম আহমাদ (রহ) থেকেও এক ধরনের একটি মত বর্ণিত রয়েছে। (ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লা, খ.১২, পৃ. ১৭৩-৫; আল-মুরতদা, আল-বাহরুয যখখার, খ.৬, পৃ. ১৪১; ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৬, পৃ. ৬৭)
৩৩. আশ-শাফি'ঈ, আল-উন্ম, খ.৬, পৃ.১৬৭; আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৩৬-৭; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৩৯

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 রজমের ব্যাপারে আপত্তি

📄 রজমের ব্যাপারে আপত্তি


কারো কারো মতে, বিবাহিতের যিনার শাস্তি রজম নয়; বেত্রাঘাতই। তাদের বক্তব্য হল, পবিত্র কুর'আনে রজমের কথা নেই। তদুপরি তা খুবই কঠোর ও নির্মম শাস্তি। তা যদি বাস্তবিকই শরী'আতের বিধান হতো, তাহলে তার উল্লেখ কুর'আনে অবশ্যই থাকতো। তাদের কারো কারো মতে, 'রজম' তা'যীরী শাস্তির আওতাভুক্ত, হদ্দ নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা'যীরী শাস্তি হিসেবেই বিভিন্ন ঘটনায় রজমের দণ্ড দিয়েছিলেন।
এ আপত্তির জবাব হল, তাদের এ বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা কুর'আনে কোন বিষয়ে স্পষ্ট ভাষায় কিছু উল্লেখ না থাকলেই যে তা শরী'আতের দলীল হতে পারবে না, তা ঠিক নয়। কারণ, কুর'আনের মতো সুন্নাতও শরী'আতের একটি প্রধান উৎস। সুন্নাতে স্পষ্টভাবে রজমের কথা উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া খুলাফা রাশিদূনও এ বিধান কার্যকর করেছেন। 'রজম' হদ্দ নয়; তা'যীরী শাস্তি- তাদের এ কথাও ঠিক নয়। কেননা বিভিন্ন ঘটনা প্রমাণ করে যে, যিনার হদ্দ প্রমাণ করতে সাক্ষ্যের নিসাব পূরণের প্রয়োজন পড়ে। অথচ তা'যীর প্রমাণ করতে চার জন সাক্ষ্যের প্রয়োজন পড়ে না। এ প্রসঙ্গে হযরত 'উমার (রা)-এর বক্তব্যটি প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, إن الله بعث محمدا (ص) بالحق و أنزل عليه الكتاب " فكان فيما أنزل عليه آية الرجم . فقرأناها و وعيناها " و رجم رسول الله (ص) و رجمنا من بعده ، و إني خشيت أن طال بالناس الزمان أن يقول قائل : ما نجد آية الرجم في كتاب الله فيضلوا بترك فريضة أنزلها الله تعالى فالرجم حق على من زنى من الرجال و النساء إذا كان محصنا إذا قامت البينة أو كان حمل أو اعتراف.
মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। তাঁর প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। সে অবতীর্ণ বিষয়াবলীর মধ্যে রজমের আয়াতও ছিল। আমরা তা পড়েছি এবং তা সংরক্ষণও করেছি। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রজমের দণ্ড দিয়েছিলেন। পরে আমরাও তা করিয়েছি। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সময়ের ব্যবধানে লোকেরা হয়ত বলবে, আল্লাহর কিতাবে আমরা রজমের আয়াত পাচ্ছিনা। এভাবে তারা আল্লাহর নির্ধারিত ফরয ত্যাগ করে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। মনে রেখো, রজম আল্লাহর কিতাবেরই বিধান। বিবাহিত নারী-পুরুষ যিনা করলেই এবং তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলেই, অথবা গর্ভ হয়ে গেলে কিংবা কেউ স্বীকার করলেই তা কার্যকর হবে।" তিনি আরো বলেন, আল্লাহর শপথ! 'উমার আল্লাহর কিতাবে বৃদ্ধি করেছে লোকেরা এ কথা বলে বেড়াবে- এ আশঙ্কা না হলে আমি অবশ্যই কুর'আনে আয়াতটি লিখে দিতাম।"
আবার কেউ মনে করেন যে, সূরা আন্ নূরের যিনা সংক্রান্ত পূর্বোক্ত আয়াত নাযিল হবার পর রজমের বিধান রহিত হয়ে গেছে। এ কথাও ঠিক নয়। কেননা এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, সূরা আন্ নূর নাযিল হবার পরও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বয়ং রজমের দণ্ড কার্যকর করেছেন। সূরা আন্ নূরে বর্ণিত বেত্রাঘাতের হুকম থেকে রজমের বিধানকে খাস করা হয়েছে। অধিকাংশ ইমামের মতে, খবরে ওয়াহিদ দ্বারা এরূপ খাস করা জায়িয। হানাফীগণের মতে, মাশহুর ও মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা আয়াতকে খাস করা বৈধ। যেহেতু রজমের হাদীসসমূহ অর্থগত দিক থেকে মুতাওয়াতির হাদীসের পর্যায়ভুক্ত, তাই বেত্রাঘাতের বিধান থেকে রজমের বিধানকে খাস করা অধিকাংশ ইমামের মতে সঠিক হয়েছে।

টিকাঃ
৩৪. এটা খারিজীদের অভিমত। (আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৩৬-৭) বর্তমানে পাশ্চাত্য চিন্তার অনুসারী মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউও এ কথা বলে থাকে।
৩৬. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৯১; আবূ দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ৪৪১৮
৩৭. আবু দাউদ, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ৪৪১৮
৩৮. ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ২২৪-৫; আল-জাসসাস, আহকামুল কুর'আন, খ. ৩, পৃ. ৩৮৮-৯

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 রজম কার্যকর করার পদ্ধতি

📄 রজম কার্যকর করার পদ্ধতি


১. রজমের দণ্ডপ্রাপ্ত পুরুষকে দাঁড়ানো অবস্থায় প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা করতে হবে। তাকে শক্তভাবে বাঁধার কিংবা গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে তাকে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। হযরত 'আবূ সা'ঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন হযরত মা'ইয (রা)-কে রজম করার জন্য নির্দেশ দিলেন, তখন আমরা তাকে বাকী'র দিকে নিয়ে গেলাম। তাঁর জন্য আমরা গর্তও খনন করিনি, তাঁকেও বাঁধিও নি। রজমের দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি মেয়ে হয়, তাহলে তাকে বসা অবস্থায় প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা করতে হবে। তার জন্য গর্ত খনন করা জরুরী কি না- তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। হানাফীগণের মতে, গর্ত খনন করা আর না করা বিচারক কিংবা শাসকের ইখতিয়ার। বিচারক কিংবা শাসক অবস্থানুপাতে যা ভাল মনে করবেন, তা-ই করতে পারবেন। ইমাম আবূ ইউসূফ (রা) ও অন্যান্যের মতে, তাকে গর্তের মধ্যে দাঁড় করানোই উত্তম। কেননা গর্তের মধ্যে দাঁড় করিয়ে প্রস্তর নিক্ষেপ করা হলে, তা হবে মহিলাদের পর্দার জন্য অধিকতর উপযোগী। বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গামিদিয়্যাকে রজম করার জন্য তার বুক পর্যন্ত একটি গভীর গর্ত খনন করেছিলেন। তবে ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ (রহ) প্রমুখের মতে, গর্ত খনন না করাই উত্তম। তবে তার দেহ যাতে কোনভাবে প্রকাশ পেয়ে না যায়, এ জন্য কাপড় দিয়ে শরীরকে শক্ত করে জড়িয়ে রাখা প্রয়োজন।
যিনা যদি সাক্ষ্য-প্রমাণ যোগে প্রমাণিত হয়, তাহলে শাস্তিদানের অনুষ্ঠানে সাক্ষীদের উপস্থিত থাকতে হবে এবং তারাই সর্বাগ্রে প্রস্তর নিক্ষেপ শুরু করবে। যদি তারা প্রস্তর নিক্ষেপ করতে অস্বীকার করে, তা হলে হদ্দ রহিত হয়ে যাবে। এটা হানাফীগণের অভিমত। অন্যান্যদের মতে, সাক্ষীদের উপস্থিতি জরুরী নয়。
প্রস্তর নিক্ষেপের সময় কেউ পালিয়ে যেতে থাকলে তার পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে হত্যা করতে হবে। কারো কারো মতে, যদি পালানোর আশঙ্কা থাকে, তা হলে তাকে কোন কিছুর সাথে বেঁধে রেখে কিংবা গর্ত খুঁড়ে সেখানে দাঁড় করিয়ে প্রস্তর নিক্ষেপ করা যাবে। তবে সে স্বেচ্ছায় স্বীকৃতিদানকারী ব্যভিচারী হলে তার পশ্চাদ্ধাবন করা যাবে না; তার ওপর প্রস্তর নিক্ষেপ স্থগিত রাখতে হবে। কেননা তার এ পলায়ন তার স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে নেয়ার ব্যাপারে সন্দেহের জন্ম দেয়。
8. বিশাল খোলামেলা জায়গায় রজম কার্যকর করা দরকার, যাতে কারো গায়ে কোন চোট লাগা ছাড়াই সহজে প্রস্তর নিক্ষেপ করা যায়। এ সময় বিপুল সংখ্যক মুসলিম জনতার উপস্থিত থাকা একান্ত প্রয়োজন। শাসক কিংবা তাঁর কোন প্রতিনিধি এ সময় উপস্থিত থাকবেন। লোকজন নামাযের কাতারের মতো বিভিন্ন সারিতে ভাগ হয়ে দাঁড়াবে। একদল প্রস্তর নিক্ষেপ করার পর পেছনে সরে যাবে আর অন্য এক দল এগিয়ে এসে প্রস্তর নিক্ষেপ করবে। এটা হানাফীগণের অভিমত। হাম্বলী ও শাফি'ঈগণের মতে, যিনা যদি সাক্ষ্য-প্রমাণ যোগে প্রমাণিত হয়, তাহলে তারা অপরাধীকে বৃত্তাকারে চারদিক থেকে পরিবেষ্টিত করে রাখবে, যাতে সে কোনভাবে পালাতে না পারে। তবে হাম্বলীগণের মতে, স্বেচ্ছায় স্বীকৃতিদানকারীর ক্ষেত্রে এ রূপ না করাই উত্তম। যাতে সে পালিয়ে শাস্তি থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে।
৫. পাথরের আকার মাঝারি অর্থাৎ সহজে হাতে বহন যোগ্য হতে হবে। তার আকার খুব বড়ও হবে না, যাতে সে খুব দ্রুত মারা যায়। আর তাতে প্রস্তর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ডও দানের উদ্দেশ্যই ক্ষুণ্ণ হবে। আবার এমন ছোটও হবে না, যাতে মৃত্যু খুবই বিলম্বিত হয় এবং পীড়ন দীর্ঘায়িত হবে。
৬. মালিকীগণের মতে, নাভী থেকে দেহের ওপর পর্যন্ত সহজে আক্রান্ত হয়- এরূপ দেহের যে কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রস্তর নিক্ষেপ করা বাঞ্ছনীয়। তবে চেহারা ও গুপ্তাঙ্গে প্রস্তর নিক্ষেপ করা সমীচীন নয়। হানাফী ও হাম্বলী ইমামগণের মতে, চেহারার একটি বিশেষ মর্যাদা থাকার কারণে প্রস্তরের আঘাত থেকে তাকে মুক্ত রাখা প্রয়োজন。
৭. ব্যভিচারিণী গর্ভবতী হলে গর্ভ খালাসের পর শাস্তি কার্যকর করা হবে। যদি সন্তানকে দুগ্ধদান করার মতো কেউ না থাকে, তাহল দুধ পানের মেয়াদ শেষ হবার পরেই শাস্তি কার্যকর করা হবে。

টিকাঃ
৩৯. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৯৪; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, হা.নং: ৮০৭৯; বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, হা.নং: ১৬৭৭৪
৩৯. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৯৫
৪০. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৫১-২; আল-কাসানী, বাদাই, খ.৭, পৃ.৫৯; মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ. ৫০৮; আল-বাজী, আল-মুন্তকা, খ.৭, পৃ.১৩৪; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৪০; আল-মরদাতী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ. ১৬১
৪১. ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইק, খ.৫, পৃ. ৯-১০; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.১২; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৪০; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ. ৮৪
৪২. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.৬৯-৭০; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.১, পৃ.৪০, ৬৩; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রাইק, খ.৫,পৃ. ৮; আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১৩২
৪৩. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ১৬৭; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ২২৫; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৪০; আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১৩৩; বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ. ৮৪
৪৪. আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১৩৩; বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ. ৮৯; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ. ১৩৪;
৪৫. খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.৮১-২; ইবনু গুনায়ম, আল-ফাওয়াকিহ.., খ.২, পৃ.২০৫; আল-হাদ্দাদী, আল-জাওহারাহ, খ.২, পৃ. ১৫০; আর-রুহায়বানী, মাতালিব.., খ.৬, পৃ. ১৭৬
৪৬. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.১, পৃ.৭৩; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ.১৭৫; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.৪৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00