📄 মালের ওপর আক্রমণ ও তা প্রতিহতকরণ
মালের ওপর আক্রমণের ক্ষেত্রে আক্রমণকারীকে সম্ভাব্য যে কোন উপায়ে, প্রয়োজনে লড়াই করে হলেও প্রতিহত করা ওয়াজিব। চাই মাল কম হোক বা বেশি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, قاتل دون مالك “তোমার মাল রক্ষার জন্য লড়াই কর।” সংঘর্ষের সময় আক্রমণকারী মারা গেলে অথবা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হলে তার জন্য কোন কিসাস কিংবা দিয়াত বা কাফফারা অথবা ক্ষতিপূরণের বিধান কার্যকর হবে না। এটা হানাফীগণের এবং মালিকীগণের বিশুদ্ধতম অভিমত। তাঁদের দৃষ্টিতে নিজের কিংবা অপরের মালের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যদি কেউ তার মাল চুরি করছে দেখে চিৎকার করল; কিন্তু চোর পালিয়ে যাচ্ছে না অথবা কেউ কোন কুখ্যাত চোরকে তার ঘরের কিংবা অপরের ঘরের সিঁদ কাটতে দেখে চিৎকার করল; কিন্তু সে পালিয়ে যাচ্ছে না, তাহলে তাকে সম্ভাব্য যে কোন উপায়ে, প্রয়োজনে হত্যা করে হলেও তাকে দমন করা জায়িয। এ রূপ অবস্থায় চোরকে হত্যা করা হলে হত্যাকারীর জন্য কিসাস কিংবা দিয়্যাতের বিধান প্রযোজ্য হবে না। মালিকীগণের মতে, মাল রক্ষার্থে আক্রমণকারীকে হত্যা করা তখনই জায়িয হবে, যদি তাকে ধরতে গিয়ে নিজের প্রাণনাশের কিংবা প্রচণ্ড ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। যদি এ রূপ আশঙ্কা না থাকে, তা হলে তাকে হত্যা করা জায়িয হবে না।
তবে শাফি'ঈ ও অধিকাংশ হাম্বলীর মতে, মাল রক্ষার জন্য আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা এবং এ জন্য তার সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া ওয়াজিব নয়। কেননা মাল তো অপরকে, এমনকি যালিম অত্যাচারীকেও দান করা জায়িয। তবে শাফি'ঈগণের মতে মাল যদি কোন প্রাণি হয় কিংবা মালে অন্য কারো কোন রূপ হক জড়িত থাকে, তাহলেই মাল রক্ষা করা ওয়াজিব হবে, যদি নিজের প্রাণনাশের কিংবা সতীত্ব নষ্ট হবার আশঙ্কা না থাকে।
তাঁদের দৃষ্টিতে নিচের দুটি অবস্থায় মাল রক্ষার জন্য সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া জায়িয নয়।
১. তীব্র জঠর জ্বালায় কেউ কারো খাবার জোর করে নিতে চাইলে মালিকের পক্ষে তাকে শক্তি প্রয়োগ করে বারণ করা সমীচীন নয়, যদি সে তার মত ক্ষুধায় কাতর না হয়। যদি মালিক এ রূপ ব্যক্তিকে হত্যা করে তাহলে তার ওপর কিসাস ওয়াজিব হবে।
২. যদি কেউ একান্তে চাপে পড়ে কারো মাল ধ্বংস করতে বাধ্য হয়, তা হলে তাকেও শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিহত করা জায়িয নয়; বরং এমতাবস্থায় মালিকের কর্তব্য হল মালের বিনিময়ে হলেও তার প্রাণ রক্ষা করা।
হাম্বলীগণের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী নিজের হোক কিংবা অপরের মাল রক্ষার জন্য আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা জরুরী নয়। তাঁদের মতে মালের জন্য লড়াই করার চাইতে লড়াইয়ে না জড়ানোই উত্তম। আবার তাঁদের অনেকের মতে, অপরের মাল রক্ষার জন্যও চেষ্টা করা সমীচীন, যদি তাতে কোন পক্ষের প্রাণ নাশের কিংবা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে। কেননা পারস্পরিক সহযোগিতা করা না হলে তো মানুষের জান-মাল রক্ষা করাই দুরূহ হয়ে পড়বে। ডাকাতরা এক একজনকে ধরে তার সর্বস্ব ছিনিয়ে নেবে আর সবাই এ পরিস্থিতি দেখতে থাকবে। তবে কারো প্রাণ নাশের কিংবা মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে মাল রক্ষার জন্য চেষ্টা করা জায়িয নয়।
টিকাঃ
২৬. হাম্বলীগণের মতে, শান্তির সময় আক্রমণকারীর আক্রমণ প্রতিহত করে নিজেকে রক্ষা করা ওয়াজিব। তবে গোলযোগের সময় নিজেকে আক্রমণকারীর কাছে সপে দেয়া জরুরী নয়। কেননা হযরত উসমান (রা.) শক্তি থাকা সত্ত্বেও বিদ্রোহীদেরকে দমন করেন নি; বরং ধৈর্য ধারণ করেছেন। যদি তা না জায়িযই হত, তা হলে সাহাবা কিরাম তা মেনে নিতেন না। (আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬,পৃ.১৫৫)
২৭. নাসা'ঈ, আস-সুনান আল-কুবরা', হা.নং: ৩৫৪৪; তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, হা.নং: ৭৪৬
২৯. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৬, পৃ.৫৪৬; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৮, পৃ.৩৪৫
২৮. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৬, পৃ.৫৪৫-৬
২৯. আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.১৭২; আল-খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.১০৫
৩০. তবে ইমাম আহমাদ (রহ) থেকে ভিন্ন অন্য একটি মতও বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, "যদি চোরেরা তোমার জান ও মালের ওপর চড়াও হয়, তাহলে তুমি জান ও মাল রক্ষার জন্য তাদের সাথে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হও।" (আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৫৪)
৩১. আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১৬৬; হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯, পৃ. ১৮৩; ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৬, পৃ.১৪৬; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৫৬
৩২. আল-আনসারী, আল-গুরার.., খ.৫, পৃ.১১১-২; আল-বুজায়রমী, তুহফাতুল হাবীব, খ,৪, পৃ.২২১-২
📄 ক্রমশ সহজতর থেকে কঠোরতর পদ্ধতিতে প্রতিহতকরণ
আক্রমণকারীর আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রে যতদূর সম্ভব সহজতর পথ থেকে ক্রমশ কঠোর পথে অগ্রসর হওয়া চাই। অর্থাৎ যাকে কথা বলে কিংবা মানুষের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে দমন করা সম্ভব, তাকে প্রহার করা হারাম। আর যাকে হাত দিয়ে প্রহার করে নিবারণ করা সম্ভব তাকে বেত্রাঘাত করা হারাম। আর যাকে বেত্রাঘাত করে দমন করা সম্ভব তাকে লাঠিপেটা করা হারাম। আর যাকে কোন অঙ্গহানি করে প্রতিহত করা সম্ভব তাকে হত্যা করা হারাম। কেননা এ সব প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে বৈধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাই যে ক্ষেত্রে সহজতর উপায়ে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা সম্ভব সে ক্ষেত্রে প্রতিহতকরণের কঠোরতর উপায় অবলম্বন করা জায়িয নয়।
অনুরূপভাবে আক্রমণকারী দৈবাত কোন বিপদে পড়ার কারণে (যেমন পানিতে বা আগুনে পড়ে গেল, কিংবা পা ভেঙ্গে গেল অথবা কোন গর্তে পড়ে গেল) যদি আক্রান্ত ব্যক্তি তার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়ে যায়, এমতাবস্থায় তাকে মারধর করা জায়িয নয়। কেননা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তো তার অনিষ্টতা থেকে রক্ষা পেয়ে গেছে। উপরন্তু যে উপায়ে তাকে সহজভাবে দমন করা সম্ভব তার চাইতে কঠোরতর পন্থা অবলম্বনের প্রয়োজনও নেই।
এ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি তার প্রবল ধারণা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। নিছক ধারণা বা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কোন পদক্ষেপ নেবে না।
যদি প্রতিহতকরণের উপর্যুক্ত ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা না হয় অর্থাৎ যে ক্ষেত্রে সহজ উপায়ে তাকে প্রতিহত করা সম্ভব, সে ক্ষেত্রে যদি কঠোর পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, তা হলে প্রতিহতকারীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যদি আক্রমণকারী পালিয়ে যায় আর আক্রান্ত ব্যক্তি তার পেছনে ধাওয়া করে তাকে হত্যা করে, তা হলে তার জন্য কিসাস কিংবা দিয়াতের বিধান প্রযোজ্য হবে। অনুরূপভাবে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করতে গিয়ে যদি প্রথমবার মেরে ক্ষতবিক্ষত করা হয় এবং এরপর সে পালিয়ে যায়, অতঃপর প্রতিহতকারী তাকে পুনরায় ধরে যদি মারধর করে ক্ষতবিক্ষত করে এবং আক্রমণকারী যদি উভয় আঘাতের কারণে মারা যায়, তাহলে তাকে অর্ধেক রক্তমূল্য দিতে হবে। কারণ প্রথমবারের মারধরের প্রয়োজন থাকায় সে এর জন্য অভিযুক্ত হবে না। কিন্তু দ্বিতীয়বারের মারধরের প্রয়োজন না থাকার কারণে তাকে এর জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে。
তবে নিম্নের অবস্থাসমূহে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা না হলেও প্রতিহতকারীকে কোন রূপ দায়ভার গ্রহণ করতে হবে না।
১. যদি আক্রমণকারীকে বেত্রাঘাত কিংবা লাঠিপেটা দ্বারা প্রতিহত করা সম্ভব হয়; কিন্তু আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে তাকে প্রতিহত করার জন্য তরবারী কিংবা ধারালো কোন অস্ত্র ছাড়া অন্য কিছু না থাকে, তা হলে এরূপ অবস্থায় যেহেতু তার পক্ষে তরবারী বা এ জাতীয় অস্ত্র ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা যাচ্ছে না, তাই তাকে তরবারী বা এ জাতীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা জায়িয হবে।
২. যদি আক্রমণকারী ও আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে প্রচণ্ড সংঘর্ষ বেঁধে যায় এবং তা ভয়ানক রূপ লাভ করে, তা হলেও প্রতিহতকারী তার হাতের নাগালে যা পাবে তা দিয়ে তাকে প্রতিহত করতে পারবে।
৩. যদি আক্রান্ত ব্যক্তির প্রবল ধারণা জন্ম নেয় যে, হত্যা করা ছাড়া আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়, তাহলেও তার জন্য উপর্যুক্ত ধারাবাহিকতা মেনে চলা জরুরী হবে না।
৪. আক্রমণকারী যদি অন্য কোন অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়, তাহলে তার আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও উপর্যুক্ত ধারাবাহিকতা মেনে চলা জরুরী হবে না。
টিকাঃ
৩৩. ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৬, পৃ.১৪৬; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৫৬
৩৪. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৫১; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ. ৩০৩; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৫৪
৩৫. আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৫৪
৩৬. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৫১; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৫৫
৩৭. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২৮, পৃ. ১০৭
📄 আক্রমণের প্রমাণ
কোন ব্যক্তি কাউকে হত্যা করে যদি দাবী করে যে, সে তাকে তার স্ত্রীর সাথে সঙ্গমরত অবস্থায় দেখতে পেয়েছে; কিন্তু নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা যদি তা অস্বীকার করে, তা হলে তাদের কথাই গ্রহণযোগ্য হবে। তবে হত্যাকারী যথার্থ সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করতে পারলে তার কথা আমলে নেয়া হবে। তবে ইমামগণের মধ্যে সাক্ষীর সংখ্যা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। অধিকাংশের মতে, চারজন সাক্ষী লাগবে। বর্ণিত রয়েছে, হযরত সা'দ ইবনু 'উবাদাহ (রা) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আপনার অভিমত কি, আমি যদি আমার স্ত্রীর সাথে কোন পুরুষকে দেখতে পাই, তা হলে কি আমি তাকে এ অবস্থায় ছেড়ে রেখে চার জন সাক্ষী ডেকে নিয়ে আসব? তিনি বললেন, হ্যাঁ...।" হাম্বলীগণের এক বর্ণনা মতে, এ ক্ষেত্রে দুজন সাক্ষীই যথেষ্ট হবে। কেননা এখানে যে সাক্ষ্য, তা হল মেয়ের সাথে পুরুষের একত্রে মিলিত হওয়ার প্রসঙ্গে; যিনার ব্যাপারে নয়。
অনুরূপভাবে কেউ যদি তার ঘরে কাউকে হত্যা করে দাবী করে যে, সে তার ঘরে হানা দিয়েছিল; কিন্তু নিহত ব্যক্তির অভিভাবকরা যদি তা অস্বীকার করে, তা হলে তাদের কথাই গ্রহণযোগ্য হবে। তবে হত্যাকারী যথার্থ সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করতে পারলে তার কথা আমলে নেয়া হবে। হানাফীগণের মতে, যদি হত্যাকারীর কোন সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকে, তদুপরি নিহত ব্যক্তিও চোর কিংবা অসৎ ব্যক্তি হিসেবে কুখ্যাত না হয়, তাহলে হত্যাকারীর ওপর কিসাসের বিধান কার্যকর করা হবে। যদি সে চোর কিংবা অসৎ ব্যক্তি হিসেবে কুখ্যাত হয়, তা হলে হত্যাকারীর ওপর কিসাসের বিধান কার্যকর করা যাবে না। কেননা তার বাহ্যিক অবস্থা থেকে কিছুটা সন্দেহ দেখা দেয়। তবে তাকে রক্তমূল্য দিতে হবে। মালিকীগণের মতে, যদি তার সাক্ষীপ্রমাণ না থাকে, তা হলে তার কথা বিশ্বাস করা হবে না এবং তার ওপর কিসাসের বিধান প্রযোজ্য হবে। তবে এমন কোন স্থানে হত্যা করা হলে যেখানে কোন লোকের আনাগোনা নেই, তাহলে শপথের ভিত্তিতে তার কথাই গ্রহণযোগ্য হবে। শাফি'ঈ ইমামগণের মতে সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া তার কথা গ্রহণযোগ্য হবে না। সাক্ষীদের এ কথা- "তারা তাকে প্রকাশ্য অস্ত্র প্রদর্শন করে তার ঘরে প্রবেশ করতে দেখেছে”- সাক্ষ্যের জন্য যথেষ্ট হবে। তবে "তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ছাড়াই অস্ত্রসমেত তার ঘরে প্রবেশ করেছে"- সাক্ষীদের এ বক্তব্য সাক্ষ্যের জন্য যথেষ্ট হবে না, যদি সে কুখ্যাত সন্ত্রাসী না হয় এবং তার ও নিহত ব্যক্তির মধ্যে পূর্ব শত্রুতা না থাকে। হাম্বলীগণের মতে, সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া তার কথা গ্রহণযোগ্য হবে না। সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকলে তার ওপর কিসাসের হুকম বর্তাবে, চাই নিহত ব্যক্তি কুখ্যাত চোর কিংবা দাগী সন্ত্রাসী হোক বা না হোক। যদি সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেয় যে, তারা তাকে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে তার দিকে আসতে দেখেছে, তারপর সে তাকে আঘাত করেছে, তাহলে আক্রমণকারী নিজে আক্রান্ত হলে তার রক্ত বৃথা যাবে। যদি তারা সাক্ষ্য দেয় যে, তারা তাকে তার ঘরে প্রবেশ করতে দেখেছে; কিন্তু তারা তার সাথে অস্ত্র আছে কি না- তা উল্লেখ না করলে কিংবা অস্ত্রের কথা উল্লেখ করেছে; তবে প্রকাশ্য প্রদর্শনের কথা বলে নি, তাহলে কিসাস রহিত হবে না। কেননা সে তো সেখানে কোন প্রয়োজনেও প্রবেশ করতে পারে। নিরেট প্রবেশ দ্বারা কারো রক্তপাত অনর্থক বিবেচিত হবে না।
যদি দু ব্যক্তি পরস্পর আঘাত করে এবং প্রত্যেকেই দাবী করে যে, আমি তাকে আত্মরক্ষার্থে আঘাত করেছি, তাহলে প্রত্যেকেই তার প্রতিপক্ষের দাবী মিথ্যা হবার ব্যাপারে শপথ করবে এবং প্রত্যেককেই তার কৃত আঘাতের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কেননা এখানে প্রত্যেকেরই অপরের বিরুদ্ধে দাবী রয়েছে, যা কেউ স্বীকার করে নিচ্ছে না।
টিকাঃ
৩৮. শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৮, পৃ. ৩৭৫; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৫৩
৩৯. শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৮, পৃ. ৩৭৫; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৫৩
৪০. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল লি'আন), হা.নং: ১৪৯৮; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ, হা.নং: ৪২৮২
৪১. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.১, পৃ.১৫৩
৪২. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৬, পৃ.৫৪৬-৭
৪৩. তদেব
৪৪. দাসুকী, আল-হাশিয়াতু 'আলাশ্ শারজিল কাবীর, খ.৪, পৃ.৩৫৮; আল-খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.১১২
৪৫. শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৬, পৃ.৩৫; হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯, পৃ. ১৮৩
৪৬. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৫৪; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৫, পৃ.১৫৬-৭, খ.৬, পৃ.৫৩১-২; আর-রুহায়বানী, মাতালিব.., খ.৬, পৃ.৪১-২
৪৭. আর-রুহায়বানী, মাতালিব.., খ.৬, পৃ.৪২
📄 আক্রমণের শাস্তি এবং প্রতিহতকরণের বিধান
যদি আক্রমণের শিকার ব্যক্তি নিজের জীবন কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রক্ষা করতে গিয়ে আক্রমণকারীকে হত্যা করে, তা হলে অধিকাংশ ইমামের মতে আক্রমণকারী মানুষ হলে হত্যাকারীর ওপর কিসাস বর্তাবে না এবং তার রক্তমূল্য অথবা কাফফারা দিতে হবে না। কেননা আক্রমণকারী অন্যায়ভাবে অপরের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে নিজেই নিজের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছে। আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের জীবনের নিরাপত্তা বিধানের প্রয়োজনে অস্ত্র ধারণ করেছে মাত্র। তাই আক্রমণকারী তার হাতে নিহত হওয়ায় সে দোষী নয়।
আক্রমণকারী মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণি হলে তার মূল্য পরিশোধ করতে হবে না। তবে হানাফীগণের মতে প্রাণিটি অন্য ব্যক্তির মালিকানাধীন হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কেননা সে নিজেকে রক্ষা করার জন্য অপরের সম্পদ নষ্ট করেছে। যেমন ক্ষুধায় কাতর কোন ব্যক্তি কারো খাবার নিয়ে খেয়ে ফেললে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।
তাঁদের মতে, পাগল ও না বালিগরাও জীব জন্তুর মত। কোন আক্রান্ত ব্যক্তি যদি তাদের সশস্ত্র আক্রমণের সময় তাদের হত্যা করে অথবা তারা প্রতিহত হয়ে নিহত হয়, তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর তাদের রক্তমূল্য বাধ্যতামূলক হবে। তবে কিসাস ওয়াজিব হবে না।
তবে আক্রমণকারী যদি উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যা করতে সমর্থ হয় কিংবা তার কোন কিসাসযোগ্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হানি করে, তা হলে তার ওপর কিসাসের বিধান প্রযোজ্য হবে।
টিকাঃ
৪৮. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৯২; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৬, পৃ.৫৪৫-৬; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৫১
৪৯. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.২, পৃ.৬৭; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.১০, পৃ.২৩২-৩; গানিম, মাজমা'.., পৃ.১৯৩; শায়খী যাদাহ, মাজমা'উল আনহুর, খ.২, পৃ.৬২৪; দাসূকী, আল-হাশিয়াতু 'আলাশ্ শারহিল কাবীর, খ.৪, পৃ.৩৫৮; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ. ৩০৪
৫০. তবে শাফি'ঈ ইমামগণ এবং হানাফীগণের মধ্যে ইমাম আবূ ইউসূফ (রহ)-এর মতে দিয়াত (রক্তমূল্য) বাধ্যতামূলক হবে না। (ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.১০, পৃ.২৩২-৩; শায়খী যাদাহ, মাজমা'উল আনহুর, খ.২, পৃ.৬২৪)