📄 জান-মাল-সতীত্বের ওপর আক্রমণ ও তা প্রতিহতকরণ
কোন ব্যক্তি যদি কারো জান-মাল ও পরিবারের ওপর আক্রমণ করে, তা হলে যতটুকু সম্ভব সহজতর উপায়ে তা প্রতিহত করতে চেষ্টা করতে হবে। যদি দেখা যায়, সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া ছাড়া তাকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়, তা হলেই নিজেকে বা নিজের পরিবারকে কিংবা ধন-সম্পদকে রক্ষার প্রয়োজনে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে বাধা নেই। যদি এ সংঘর্ষে প্রতিহতকারী ব্যক্তি মারা যায়, তা হলে সে শহীদ হবে' আর আক্রমণকারী মারা গেলে প্রতিহতকারীর ওপর কোন রূপ কিসাস বা দিয়াতের বিধান কার্যকর হবে না। কেননা আক্রমণকারী অন্যায়ভাবে অপরের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে গিয়ে নিজেই নিজের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছে। আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের জীবনের নিরাপত্তা বিধানের প্রয়োজনে অস্ত্র ধারণ করেছে মাত্র। এর দলীল হল: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, قاتل دون نفسك - "তোমার জীবন রক্ষার জন্য লড়াই কর।" অন্য হাদীসে রয়েছে, হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যদি কেউ এসে আমার মাল জোর করে নিয়ে যেতে চায়, তা হলে আমি কি করতে পারি? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তুমি তাকে তোমার মাল দিয়ে দেবে না। তখন লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, যদি সে আমার সাথে লড়াই করে, তাহলে আমি কি করতে পারি? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তুমিও তার সাথে লড়াই করবে। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, সে যদি আমাকে মেরে ফেলে, তা হলে আমার পরিণতি কি হবে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তাহলে তুমি শহীদ। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, যদি আমি তাকে হত্যা করি, তা হলে কি অবস্থা হবে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সে জাহান্নামে যাবে।"
অধিকাংশ ইসলামী আইনতত্ত্ববিদের মতে, আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে যদি পালিয়ে গিয়ে কিংবা কোন সুরক্ষিত বাসা-বাড়িতে ঢুকে বা জনভীড়ে প্রবেশ করে বা নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে আত্মরক্ষা করা সম্ভব হয়, তা হলে তার জন্য তা-ই করা ওয়াজিব হবে। সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া জায়িয নয়। কেননা শরী'আতের নির্দেশ হল: আক্রমণকারীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য যথাসাধ্য সহজতর পথ অবলম্বন করতে হবে। তাই যে ক্ষেত্রে অন্যকে কোন ধরনের ঘায়েল না করে সহজভাবে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে, সে ক্ষেত্রে সংঘাতের পথ অবলম্বন পরিহার করতে হবে।"
টিকাঃ
৪. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: من قتل دون ماله فهو شهید و من قتل دون دينه فهو شهيد و من قتل دون دمه فهو شهيد و من قتل دون أهله فهو شهید - "যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেল সে শহীদ হবে। যে ব্যক্তি নিজের দীন রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেল সেও শহীদ। আর যে ব্যক্তি নিজের জান রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেল সেও শহীদ। অনুরূপভাবে যে নিজের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেল, সেও শহীদ।" ('আবদ ইবন হুমায়দ, আল-মুসনাদ, হা.নং: ১০৬; কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা.নং: ৩৪০, ৩৪১, ৩৪২, ৩৪৩)
৫. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৯২; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৬, পৃ.৫৪৫-৬; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৫১-২; আল-খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.১১২; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ.৩০৩; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৫৫
৬. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭,পৃ.২২৬
৭. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল ঈমান), হা.নং: ১৪০
৮. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৫১; আল-খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.১১২; আল-মাওয়াক, আত-তাজ ওয়াল ইকলীল, খ.৮, পৃ.৪৪৩; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ. ৩০০; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১৬৭
📄 সতীত্বের ওপর আক্রমণ ও তা প্রতিহতকরণ
ইমামগণের সর্বসম্মত মতানুযায়ী নারীর সতীত্বের ওপর আক্রমণকারীকে সম্ভাব্য যে কোন উপায়ে, প্রয়োজনে লড়াই করে হলেও প্রতিহত করা ওয়াজিব। কারণ সতীত্ব জান মালের মতোই অতি পবিত্র। তা নষ্ট করা কারো জন্য জায়িয নয়। ইমাম শাফি'ঈ (রহ) ও আহমাদ (রহ) প্রমুখ বলেন, যদি কোন মহিলা তার সতীত্বকে রক্ষা করতে গিয়ে ধর্ষণেচ্ছু কোন পুরুষকে হত্যা করে ফেলে, তা হলে এর জন্য মহিলাটির ওপর কোন শাস্তি বর্তাবে না। অনুরূপভাবে কোন পুরুষ যদি দেখতে পায় যে, তার স্ত্রী কিংবা নিজের পরিবারের কেউ কিংবা অন্য কোন মহিলা কোন যালিমের হাতে জোরপূর্বক সতীত্ব হারাতে চলছে, তাহলে পুরুষটির কর্তব্য হল যালিমকে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও প্রতিহত করা। কেননা শক্তি থাকতে কাউকে চোখের সামনে কোন মহিলার সতীত্ব নষ্ট করতে দেয়া জায়িয নয়। যদি তাকে প্রতিহত করতে গিয়ে ধর্ষণকারীকে হত্যা করতে হয়, তাও জায়িয হবে এবং এ জন্য হত্যাকারীর ওপর কোন রূপ দণ্ড আরোপিত হবে না। প্রতিহত করতে গিয়ে কেউ মারা গেলে সে শহীদ হবে।” রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন : من قتل دون أهله فهو شهيد - “যে নিজের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেল, সেও শহীদ।”
শাফি'ঈগণের মতে নিজের জান কিংবা সতীত্ব রক্ষার জন্য চেষ্টা করা জরুরী, যদি এতে নিজের প্রাণ নাশ কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ধ্বংস সাধনের আশঙ্কা না থাকে।
আক্রান্ত মহিলা নিজের সতীত্বকে বজায় রাখার জন্য যথাসাধ্য ধর্ষণেচ্ছুকে প্রতিহত করতে চেষ্টা করবে। কেননা তাকে কোনভাবে সুযোগ দেয়াই জায়িয নয়। যদি তাকে প্রতিহত করা না হয়, তা হলে ধরে নেয়া হবে যে, সেও এ অপকমের সুযোগ দান করেছে। যদি মহিলা প্রতিহত করতে গিয়ে তাকে হত্যাই করে ফেলে যদি হত্যা করা ছাড়া তাকে প্রতিহত করার কোন পথ না থাকে- তাহলে তার ওপর কোন রূপ শাস্তি বর্তাবে না। বর্ণিত আছে, হুযায়ল গোত্রের এক লোক জনৈক ব্যক্তির আতিথ্য গ্রহণ করেছিল। এ সুযোগে সে তার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করতে চাইলে মহিলাটি তাকে পাথর নিক্ষেপ করে। এর ফলে সে মারা যায়। ঘটনাটি জেনে হযরত 'উমার (রা) বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনোই তার রক্তমূল্যের কথা বলতে পারি না।" বিশিষ্ট ইসলামী আইনতত্ত্ববিদ ইবনু কুদামাহ ও ইবনুল হুমام (রহ) প্রমুখ বলেন, যদি কেউ তার স্ত্রীর সাথে কিংবা অন্য কোন মহিলার সাথে কোন বিবাহিত পুরুষকে ব্যভিচার করতে দেখে চিৎকার করল; কিন্তু এরপরও লোকটি পালিয়ে গেল না এবং যিনা থেকে বিরত রইল না, তাহলে লোকটির জন্য তাকে হত্যা করা বৈধ হবে। যদি সে তাকে হত্যা করে, তা হলে তার ওপর কিসাস বা দিয়াত-কোন রূপ শাস্তি বর্তাবে না।
টিকাঃ
৯. মালিকী ও শাফি'ঈগণের মতে, যদি বিনা কষ্টে পলায়ন করা সম্ভব হয়, তা হলেই পলায়ন করা ওয়াজিব হবে। অন্যথায় পলায়ন করা জরুরী নয়। শাফি'ঈগণের মতে, অমুসলিম দেশের কোন নাগরিক অবৈধভাবে ইসলামী রাষ্ট্রে অনুপ্রবেশ করে কারো ওপর আক্রমণ করলে পলায়ন করা ওয়াজিব নয়; বরং হারাম। যে ক্ষেত্রে পলায়ন করা ওয়াজিব সে ক্ষেত্রে পলায়ন না করে যদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং আক্রমণকারীকে হত্যা করে তাহলে শাফি'ঈ ইমামগণের এক বর্ণনা মতে, হত্যাকারীর জন্য কিসাসের বিধান প্রযোজ্য হবে। তাদের অন্য মতানুযায়ী তাকে দিয়্যাত দিতে হবে। কোন কোন হাম্বলী ও শাফি'ঈ ইমামের মতে, কোন অবস্থায় পলায়ন করা ওয়াজিব নয়। নিজের জায়গায় অবস্থান করে যথাসাধ্য সহজ উপায়ে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করতে চেষ্টা করবে। শাফি'ঈ ইমামগণের তৃতীয় একটি মতও বর্ণিত রয়েছে। তা হলঃ যদি আক্রান্ত ব্যক্তি নিশ্চিত হয় যে, সে পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করতে পারবে, তাহলেই পালিয়ে যাওয়া ওয়াজিব হবে। অন্যথায় পালানো ওয়াজিব হবে না। (আল-খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.১১২; দাসুকী, আল-হাশিয়াতু 'আলাশ্ শারহিল কাবীর, খ.৪, পৃ.৩৫৮; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ. ৩০৩; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১৬৭)
১০. শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৪, পৃ. ২৩৫; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৫২
১১. শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৪, পৃ. ২৩৫; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৫২; আল- আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১৬৭; রুহায়বানী, মাতালিব.., খ.৬, পৃ.৪২
১২. আল-কাদা'ঈ, মুসনাদুশ শিহাব, হা.নং: ৩৪১; ইবনু হাজর আল-কালানী, তালখীসুল হাবীর, (কিতাবুস সিয়াল), হা.নং: ১৮০৯
১৩. আল-আনসারী, আল-গুরার.., খ.৫, পৃ.১১২-৩; আল-জুমাল, ফুতুহাত.., খ.৫, পৃ.১৬৮
১৪. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৫২
১৫. আবদুর রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, হা.নং: ১৭৯১৯
১৬. ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ.১৫৩; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ.৩৪২; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৫, পৃ.৪৫;
📄 জান কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর আক্রমণ ও তা প্রতিহতকরণ
জান কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর আক্রমণের ক্ষেত্রে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করে নিজেকে রক্ষা করা ওয়াজিব। চাই আক্রমণকারী মানুষ হোক কিংবা কোন প্রাণি, চাই মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম, চাই সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হোক কিংবা পাগল, চাই প্রাপ্ত বয়স্ক হোক কিংবা অপ্রাপ্ত বয়স্ক। ইসলামের দৃষ্টিতে নিজেকে হত্যা করা যেমন পাপ, তেমনি অপরের কাছে নিজেকে হত্যার জন্য সঁপে দেয়াও পাপ। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, “ ولا تلقوا بأيديكم إلى التهلكة ” - “তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের কবলে নিক্ষেপ করো না।” এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করা প্রত্যেকেরই কর্তব্য। অতএব, আক্রমণকারীর কাছে নিজেকে সঁপে দেয়া যেহেতু প্রকারান্তরে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়ারই নামান্তর, তাই আক্রমণকারীকে প্রতিহত করে নিজেকে রক্ষা করা ওয়াজিব হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, من أشار بحديدة إلى أحد من المسلمين - يريد قتله - فقد وجب دمه. কোন মুসলিমকে ইঙ্গিতে কোন লৌহাস্ত্র দেখালে তাকে হত্যা করা বিধিসম্মত হয়ে যাবে।” অতএব, আক্রমণকারীকে প্রতিহত করে নিজের জীবন বাঁচাতে চেষ্টা করা দূষণীয় নয়; বরং ওয়াজিব। এটা হানাফী ও মালিকীগণের অভিমত। পক্ষান্তরে শাফি'ঈগণের প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী আক্রমণকারী অমুসলিম এবং আক্রান্ত ব্যক্তি মুসলিম হলে তবেই আক্রমণ প্রতিহত করা ওয়াজিব হবে। যদি আক্রমণকারী মৃত্যু দণ্ডে দণ্ডিত নয় এমন মুসলিম হয়, তাহলে আক্রমণ প্রতিহত করা ওয়াজিব নয়; ইচ্ছে করলে সে নিজেকে তার কাছে সঁপে দিতে পারবে। চাই আক্রমণকারী অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিংবা পাগল হোক, চাই তাকে হত্যা ছাড়াও প্রতিহত করা সম্ভব হোক বা না হোক। কতিপয় শাফি'ঈ ইমামের মতে, এ রূপ অবস্থায় আক্রমণ প্রতিহত না করে নিজেকে আক্রমণকারীর কাছে সঁপে দেওয়া উত্তম। তাঁদের দলীল হল: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, كن كابن آدم - "তুমি আদম (আ)-এর পুত্রের (হাবিল) মত হও।” আহনাফ ইবনু কায়স (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি গোলযোগের সময় আমার অস্ত্র নিয়ে বেরুলাম। পথিমধ্যে হযরত আবূ বাকরাহ (রা)-এর সাথে আমার সাক্ষাত হল। তিনি আমার গন্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চাচাতো ভাইকে সাহায্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছি। তখন তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন, “দুজন মুসলিম তরবারি নিয়ে পরস্পর মুখোমুখি হলে দুজনেই জাহান্নামে যাবে।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল : এ তো হত্যাকারী। (সে তো প্রকৃত অপরাধী।) কিন্তু নিহত ব্যক্তির অপরাধ কি? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ “সেও তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে চেয়েছে।” এ হাদীস থেকে জানা যায়, যদি আক্রমণকারী মুসলিম হয়, তা হলে আক্রমণ প্রতিহত করার পরিবর্তে নিজেকে তার কাছে সপে দেয়াই উত্তম। বিদ্রোহীদের দমন করার শক্তি থাকা সত্ত্বেও হযরত 'উসমান (রা) নিজেকে তাঁদের কাছে সপে দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর রক্ষীদেরকেও তাদের প্রতিহত করতে বারণ করেছিলেন।
টিকাঃ
১৭. শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৮, পৃ. ৩৭৫; আল-বাবরতী, আল-ইনায়াহ, খ.১০, পৃ. ২৩২; আল- বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৫৫; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১৬৬
১৮. আল-কুর'আন, ২: ১৯৫
১৯. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা.নং: ২৬৩৩৭; আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক (কিতাবু কিতালি আহলিল বাগৃহ), হা.নং: ২৬৬৯
২০. আল-বাবরতী, আল-ইনায়াহ, খ.১০, পৃ. ২৩২; মুল্লা খসরু, দুরারুল হুক্কام, খ.২, পৃ.৯২; আল-খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.১১২
২১. হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯, পৃ. ১৮৩-৪; বুজায়রমী, তুহফাতুল হাবীব, খ,৪, পৃ.২২১
২২. হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯, পৃ. ১৮৪; বুজায়রমী, তুহফাতুল হাবীব, খ,৪, পৃ.২২১
২৩. জামে আত্ তিরমিযী, (কিতাবুল ফিতান), হা.নং: ২১৯৪; আহমদ, আল-মুসনাদ, হা.নং: ১৬০৯
২৪. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুল ফিতান), হা.নং: ৬৬৭২; সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল ফিতান), হা.নং: ২৮৮৮
২৫. শাফি'ঈগণের দ্বিতীয় মত হল- যে কোন অবস্থায় আক্রমণকারীর আক্রমণ প্রতিহত করে নিজেকে রক্ষা করা ওয়াজিব। চাই আক্রমণকারী কাফির হোক কিংবা মুসলিম, মানুষ হোক কিংবা কোন প্রাণি। তাদের থেকে অপর একটি মতও বর্ণিত রয়েছে। তা হলঃ যদি আক্রমণকারী অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিংবা পাগল হয়, তা হলে তাদের কাছে নিজেকে সপে দেয়া জায়িয নেই। তাদের উদাহরণ অন্য প্রাণিদের মত। অন্য যে কোন প্রাণির আক্রমণকে প্রতিহত করে যেমন নিজের জীবন রক্ষা করা ওয়াজিব, তেমনি তাদের আক্রমণ প্রতিহত করেও নিজের জীবন রক্ষা করা ওয়াজিব। (আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২৮, পৃ.১০৪)
📄 মালের ওপর আক্রমণ ও তা প্রতিহতকরণ
মালের ওপর আক্রমণের ক্ষেত্রে আক্রমণকারীকে সম্ভাব্য যে কোন উপায়ে, প্রয়োজনে লড়াই করে হলেও প্রতিহত করা ওয়াজিব। চাই মাল কম হোক বা বেশি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, قاتل دون مالك “তোমার মাল রক্ষার জন্য লড়াই কর।” সংঘর্ষের সময় আক্রমণকারী মারা গেলে অথবা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হলে তার জন্য কোন কিসাস কিংবা দিয়াত বা কাফফারা অথবা ক্ষতিপূরণের বিধান কার্যকর হবে না। এটা হানাফীগণের এবং মালিকীগণের বিশুদ্ধতম অভিমত। তাঁদের দৃষ্টিতে নিজের কিংবা অপরের মালের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যদি কেউ তার মাল চুরি করছে দেখে চিৎকার করল; কিন্তু চোর পালিয়ে যাচ্ছে না অথবা কেউ কোন কুখ্যাত চোরকে তার ঘরের কিংবা অপরের ঘরের সিঁদ কাটতে দেখে চিৎকার করল; কিন্তু সে পালিয়ে যাচ্ছে না, তাহলে তাকে সম্ভাব্য যে কোন উপায়ে, প্রয়োজনে হত্যা করে হলেও তাকে দমন করা জায়িয। এ রূপ অবস্থায় চোরকে হত্যা করা হলে হত্যাকারীর জন্য কিসাস কিংবা দিয়্যাতের বিধান প্রযোজ্য হবে না। মালিকীগণের মতে, মাল রক্ষার্থে আক্রমণকারীকে হত্যা করা তখনই জায়িয হবে, যদি তাকে ধরতে গিয়ে নিজের প্রাণনাশের কিংবা প্রচণ্ড ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। যদি এ রূপ আশঙ্কা না থাকে, তা হলে তাকে হত্যা করা জায়িয হবে না।
তবে শাফি'ঈ ও অধিকাংশ হাম্বলীর মতে, মাল রক্ষার জন্য আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা এবং এ জন্য তার সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া ওয়াজিব নয়। কেননা মাল তো অপরকে, এমনকি যালিম অত্যাচারীকেও দান করা জায়িয। তবে শাফি'ঈগণের মতে মাল যদি কোন প্রাণি হয় কিংবা মালে অন্য কারো কোন রূপ হক জড়িত থাকে, তাহলেই মাল রক্ষা করা ওয়াজিব হবে, যদি নিজের প্রাণনাশের কিংবা সতীত্ব নষ্ট হবার আশঙ্কা না থাকে।
তাঁদের দৃষ্টিতে নিচের দুটি অবস্থায় মাল রক্ষার জন্য সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া জায়িয নয়।
১. তীব্র জঠর জ্বালায় কেউ কারো খাবার জোর করে নিতে চাইলে মালিকের পক্ষে তাকে শক্তি প্রয়োগ করে বারণ করা সমীচীন নয়, যদি সে তার মত ক্ষুধায় কাতর না হয়। যদি মালিক এ রূপ ব্যক্তিকে হত্যা করে তাহলে তার ওপর কিসাস ওয়াজিব হবে।
২. যদি কেউ একান্তে চাপে পড়ে কারো মাল ধ্বংস করতে বাধ্য হয়, তা হলে তাকেও শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিহত করা জায়িয নয়; বরং এমতাবস্থায় মালিকের কর্তব্য হল মালের বিনিময়ে হলেও তার প্রাণ রক্ষা করা।
হাম্বলীগণের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী নিজের হোক কিংবা অপরের মাল রক্ষার জন্য আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা জরুরী নয়। তাঁদের মতে মালের জন্য লড়াই করার চাইতে লড়াইয়ে না জড়ানোই উত্তম। আবার তাঁদের অনেকের মতে, অপরের মাল রক্ষার জন্যও চেষ্টা করা সমীচীন, যদি তাতে কোন পক্ষের প্রাণ নাশের কিংবা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে। কেননা পারস্পরিক সহযোগিতা করা না হলে তো মানুষের জান-মাল রক্ষা করাই দুরূহ হয়ে পড়বে। ডাকাতরা এক একজনকে ধরে তার সর্বস্ব ছিনিয়ে নেবে আর সবাই এ পরিস্থিতি দেখতে থাকবে। তবে কারো প্রাণ নাশের কিংবা মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে মাল রক্ষার জন্য চেষ্টা করা জায়িয নয়।
টিকাঃ
২৬. হাম্বলীগণের মতে, শান্তির সময় আক্রমণকারীর আক্রমণ প্রতিহত করে নিজেকে রক্ষা করা ওয়াজিব। তবে গোলযোগের সময় নিজেকে আক্রমণকারীর কাছে সপে দেয়া জরুরী নয়। কেননা হযরত উসমান (রা.) শক্তি থাকা সত্ত্বেও বিদ্রোহীদেরকে দমন করেন নি; বরং ধৈর্য ধারণ করেছেন। যদি তা না জায়িযই হত, তা হলে সাহাবা কিরাম তা মেনে নিতেন না। (আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬,পৃ.১৫৫)
২৭. নাসা'ঈ, আস-সুনান আল-কুবরা', হা.নং: ৩৫৪৪; তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, হা.নং: ৭৪৬
২৯. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৬, পৃ.৫৪৬; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৮, পৃ.৩৪৫
২৮. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৬, পৃ.৫৪৫-৬
২৯. আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.১৭২; আল-খারাশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.১০৫
৩০. তবে ইমাম আহমাদ (রহ) থেকে ভিন্ন অন্য একটি মতও বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, "যদি চোরেরা তোমার জান ও মালের ওপর চড়াও হয়, তাহলে তুমি জান ও মাল রক্ষার জন্য তাদের সাথে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হও।" (আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৫৪)
৩১. আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১৬৬; হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯, পৃ. ১৮৩; ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৬, পৃ.১৪৬; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৫৬
৩২. আল-আনসারী, আল-গুরার.., খ.৫, পৃ.১১১-২; আল-বুজায়রমী, তুহফাতুল হাবীব, খ,৪, পৃ.২২১-২