📄 অপহরণকারীর শাস্তি
অপরাধের প্রকৃতি ও মাত্রা বিবেচনা করে বিচারক অপহরণকারীকে কারাদণ্ড কিংবা বেত্রাঘাত অথবা উভয়বিধ শাস্তি দিতে পারবে। উল্লেখ্য যে, অপহরণের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির অধিকার যেমন খর্ব হয়, তেমনি জনস্বার্থও বিঘ্নিত হয়। তাই অপহরণের মামলা আদালতে উপস্থাপিত হবার পর সম্পদের মালিক যদি তাকে ক্ষমাও করে দেয়, তা হলেও বিচারক জনস্বার্থ বিবেচনা করে এবং সমাজে সার্বিক ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার খাতিরে শাস্তি কার্যকর করবে; তাকে ক্ষমা করে দেবে না।
উপরন্তু, অপহৃত বস্তু যদি অপহরণকারীর দখলে থাকে, তাহলে তাও মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ১ يأخذن أحدكم متاع أخيه لاعبا و لا جادا و من أخذ عصا أخيه فليردها. - "তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের কোন বস্তু গ্রহণ না করে, খেলাচ্ছলেও নয় এবং বাস্তবিকভাবে তো নয়ই। যদি কেউ তার ভাইয়ের ছড়িও নেয়, সে যেন তা ফিরিয়ে দেয়।"
অপহৃত বস্তু যদি নষ্ট হয়ে যায় কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা হারিয়ে যায়, তাহলে অপহৃত বস্তুর হুবহু সমজাতীয় ও সমমানের বস্তু পাওয়া গেলে মালিককে ক্ষতিপূরণ হিসেবে তা-ই দিতে হবে। আর যদি অপহৃত বস্তুর হুবহু সমজাতীয় ও সমমানের বস্তু পাওয়া না যায়, তাহলে মালিককে অপহৃত বস্তুর মূল্য ফেরত দিতে হবে। মূল্য ফেরত দেবার ক্ষেত্রে অপহরণের দিনে বস্তুর যে মূল্য ছিল তা-ই বিবেচনায় নিতে হবে। এটা হানাফী ও মালিকীগণের অভিমত। শাফি'ঈগণের মতে, সম্পদ অপহরণের দিন থেকে ধ্বংস হবার সময় পর্যন্ত যে চড়া দামটি ছিল, তা-ই পরিশোধ করতে হবে। হাম্বলীগণের মতে, সম্পদ নষ্ট হবার দিনের মূল্যকে বিবেচনায় নিতে হবে।
উল্লেখ্য যে, সম্পদ যে জায়গা থেকে অপহরণ করা হয়েছে, তা ঠিক সে জায়গায় পৌঁছিয়ে দিতে হবে। কেননা অনেক সময় স্থানভেদে জিনিসের মূল্যের মধ্যে তফাত হয়ে থাকে। আর পৌঁছানোর যাবতীয় ব্যয়ভার অপহরণকারীকেই বহন করতে হবে।
টিকাঃ
৬. মুল্লা খসরু, দুরারুল হুক্কام, খ.২, পৃ.২৬৩
৭. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যা, খ.৩১, পৃ.২৩৫; ইবনু 'আবিদীন, আল-'উকুদ.., খ.২, পৃ.১৬১; ইবনু ফারহুন, তাবছিরাহ.., খ.২, পৃ.২০৯
৮. আবূ দাউদ, হা.নংঃ ৫০০৩; বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, হা.নং: ১১২৭৯, ১১৩২৪
৯. আল-কাসানী, বদাই, খ.৭, পৃ. ১৪৮-১৫১; আল-বাবরতী, আল-'ইনায়াহ, খ.৯, পৃ.৩২২-৩;
১০. আস-সারাঙ্গী, আল-মাবসূত, খ.১১, পৃ.৪৯; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ১৫০-১; আল- বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৫, পৃ.২৭৪; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.২, পৃ. ৩৪৭; আল- মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.৬, পৃ.১৯১-২
১১. আস-সারাঙ্গী, আল-মাবসূত, খ.১১,পৃ.৫৩; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৮, পৃ.১২৪
📄 একটি আপত্তির জবাব
চুরির মত অপহরণও একটি গুরুতর সামাজিক অপরাধ। চুরির জন্য ইসলামে সুনির্দিষ্ট শাস্তির বর্ণনা রয়েছে। অথচ অপহরণের কোন সুনির্দিষ্ট শাস্তির উল্লেখ নেই। এটা অবশ্যই একটা দুর্বোধ্য বিষয়। এর উত্তর হল, চুরি ও অপহরণের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। অপহরণের ব্যাপারটি প্রায়ই প্রকাশ্যে সংঘটিত হয়। তাই সাবধান হলে এ ধরনের অবস্থা থেকে নিজেকে রক্ষা করা অনেকটা সহজ হয় এবং তার প্রমাণ উপস্থিত করাও তেমন কঠিন ব্যাপার হয় না।
পক্ষান্তরে চুরির ঘটনা ঘটে গোপনে, লোক চক্ষুর আড়ালে। ফলে তা প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অধিকন্তু, চোর থেকে বেঁচে থাকা অসম্ভব। সে ঘরে সিঁদ কাটে, তালা ভাঙ্গে, গ্রিল কাটে। এ রূপ অপরাধে কঠোরতর শাস্তি দেয়া না হলে সমাজে চুরির মাত্রা দিন দিন বেড়ে যাবে এবং এর ফলে লোকেরা কঠিন বিপদে পড়ে যেতে পারে। তাই গোপনে সংঘটিত অপরাধটি যদি অকাট্যভাবে প্রমাণ করা যায়, তা হলে তার শাস্তি কঠোরতর হওয়া বাঞ্ছনীয়, যাতে তা অন্যরা দেখে শিক্ষা অর্জন করতে পারে, সতর্ক হবার প্রয়োজন অনুভব করে। অপরদিকে অপহরণ প্রায়শ জনগণের চোখের সামনে প্রকাশ্যে সংঘটিত হয়। জনগণ সতর্ক হলে অপহরণকারীকে হাতে-নাতে ধরা সম্ভব এবং অপহৃত বস্তুটি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়া যায়। তদুপরি লুটকারীর বিরুদ্ধে সরকারের নিকট মামলাও দায়ের করা যায়; কিন্তু চোরের ব্যাপারটি সে ধরনের নয়।
টিকাঃ
১২. ইবনুল কাইয়িম, ই'লামুল মুআক্কি 'ঈন, খ.২, পৃ.৪৭; আবদুর রহীম, অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম, পৃ. ২৪৭