📄 ‘غصب’-এর সংজ্ঞা
জোর করে অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ ছিনিয়ে নেয়াকে আরবীতে 'غصب' বলা হয়। এর আভিধানিক অর্থ কোন কিছু অন্যায়ভাবে জোর করে ছিনিয়ে নেয়া। ইসলামী শরী'আতের পরিভাষায় কোন বালিগ ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ব্যক্তি কর্তৃক অপরের অধিকারভুক্ত সম্পদ অন্যায়ভাবে জোর করে অপহরণ করাকে غصب বলা হয়।
টিকাঃ
১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা.নং: ২৩৫৩৬; তাবারানী, আল-মু'জামুল কবীর, হা.নং: ৫৩৮
২. আল-কুর'আন, ৪:২৯
৩. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা.নং: ২৩৫৩৬; দারু কুতনী, আস-সুনান, (কিতাবুল বুয়ু') হা.নং: ৯১
৪. ইমাম আবূ হানীফা ও আবু ইউসূফ (রহ)-এর মতে 'غصب'এর সংজ্ঞা হল: إزالة يد المالك عن ماله المتقوم على سبيل المجاهرة والمغالبة بفعل في المال. জবরদস্তি মূলক হস্তক্ষেপের ফলে আর্থিক মূল্য বিশিষ্ট সম্পদ থেকে মালিকের দখলস্বত্ব অপসারিত হওয়া।" (আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.১৪৩) মালিকী ইমামগণের মতে, أخذ مال قهرا تعديا بلا حرابة "বিনা অস্ত্রে কেবল জোর খাটিয়ে কারো সম্পদ অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নেয়া।" (আস-সাভী, বুলগাতুস সালিক, খ.৩, পৃ. ৫৮১) শাফি'ঈ ও হাম্বলীগণের মতে, কারো সম্পদ অন্যায়ভাবে জোর করে দখল করে নেয়াকে 'غصب' বলা হয়। (আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.২, পৃ.৩৩৬; ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৪, পৃ.৪৯২)
📄 ‘غصب’ -এর প্রকৃতি
কোন্ প্রকৃতির অপহরণ শরী'আতে 'غصب' রূপে গণ্য হবে- তা নিয়ে ইমামগণের দুটি মত দেখা যায়।
১. অধিকাংশ ইমামের মতে, কারো সম্পদ তার অনুমতি ছাড়া কেবল জোর করে করায়ত্ত করলেই 'غصب' সাব্যস্ত হবে। চাই তাতে মালিকের দখলস্বত্ব বজায় থাকুক বা না থাকুক।
২. ইমাম আবূ হানীফা (রহ) ও আবূ ইউসূফ (রহ) প্রমুখের মতে, কারো সম্পদ অপহরণকারীর ছিনিয়ে নেবার পর যদি মালিকের দখলস্বত্বও চলে যায়, তাহলেই 'غصب' সাব্যস্ত হবে।
এ মতবিরোধের প্রেক্ষিতে অপহৃত সম্পদ থেকে উৎপন্ন বস্তু (যেমন- বাগানের ফল) ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেলে তার ক্ষতিপূরণ অপহরণকারীকে আদায় করতে হবে কি না- তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়। হানাফীগণের মতে অপহরণের ফলে যেহেতু মালিকের দখলস্বত্ব চলে যায়, তাই অপহরণকারীকে উক্ত বস্তুর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। পক্ষান্তরে অন্য ইমামগণের দৃষ্টিতে অপহরণের জন্য যেহেতু মালিকের দখলস্বত্ব চলে যায় না, তাই অপহরণকারীকে উক্ত বস্তুর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
টিকাঃ
৫. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.১৪৩; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৬, পৃ.১৮৭; মুল্লা খসরু, দুরারুল হুক্কام, খ.২, পৃ.২৬৩
📄 অপহরণকারীর শাস্তি
অপরাধের প্রকৃতি ও মাত্রা বিবেচনা করে বিচারক অপহরণকারীকে কারাদণ্ড কিংবা বেত্রাঘাত অথবা উভয়বিধ শাস্তি দিতে পারবে। উল্লেখ্য যে, অপহরণের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির অধিকার যেমন খর্ব হয়, তেমনি জনস্বার্থও বিঘ্নিত হয়। তাই অপহরণের মামলা আদালতে উপস্থাপিত হবার পর সম্পদের মালিক যদি তাকে ক্ষমাও করে দেয়, তা হলেও বিচারক জনস্বার্থ বিবেচনা করে এবং সমাজে সার্বিক ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার খাতিরে শাস্তি কার্যকর করবে; তাকে ক্ষমা করে দেবে না।
উপরন্তু, অপহৃত বস্তু যদি অপহরণকারীর দখলে থাকে, তাহলে তাও মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ১ يأخذن أحدكم متاع أخيه لاعبا و لا جادا و من أخذ عصا أخيه فليردها. - "তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের কোন বস্তু গ্রহণ না করে, খেলাচ্ছলেও নয় এবং বাস্তবিকভাবে তো নয়ই। যদি কেউ তার ভাইয়ের ছড়িও নেয়, সে যেন তা ফিরিয়ে দেয়।"
অপহৃত বস্তু যদি নষ্ট হয়ে যায় কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা হারিয়ে যায়, তাহলে অপহৃত বস্তুর হুবহু সমজাতীয় ও সমমানের বস্তু পাওয়া গেলে মালিককে ক্ষতিপূরণ হিসেবে তা-ই দিতে হবে। আর যদি অপহৃত বস্তুর হুবহু সমজাতীয় ও সমমানের বস্তু পাওয়া না যায়, তাহলে মালিককে অপহৃত বস্তুর মূল্য ফেরত দিতে হবে। মূল্য ফেরত দেবার ক্ষেত্রে অপহরণের দিনে বস্তুর যে মূল্য ছিল তা-ই বিবেচনায় নিতে হবে। এটা হানাফী ও মালিকীগণের অভিমত। শাফি'ঈগণের মতে, সম্পদ অপহরণের দিন থেকে ধ্বংস হবার সময় পর্যন্ত যে চড়া দামটি ছিল, তা-ই পরিশোধ করতে হবে। হাম্বলীগণের মতে, সম্পদ নষ্ট হবার দিনের মূল্যকে বিবেচনায় নিতে হবে।
উল্লেখ্য যে, সম্পদ যে জায়গা থেকে অপহরণ করা হয়েছে, তা ঠিক সে জায়গায় পৌঁছিয়ে দিতে হবে। কেননা অনেক সময় স্থানভেদে জিনিসের মূল্যের মধ্যে তফাত হয়ে থাকে। আর পৌঁছানোর যাবতীয় ব্যয়ভার অপহরণকারীকেই বহন করতে হবে।
টিকাঃ
৬. মুল্লা খসরু, দুরারুল হুক্কام, খ.২, পৃ.২৬৩
৭. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যা, খ.৩১, পৃ.২৩৫; ইবনু 'আবিদীন, আল-'উকুদ.., খ.২, পৃ.১৬১; ইবনু ফারহুন, তাবছিরাহ.., খ.২, পৃ.২০৯
৮. আবূ দাউদ, হা.নংঃ ৫০০৩; বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, হা.নং: ১১২৭৯, ১১৩২৪
৯. আল-কাসানী, বদাই, খ.৭, পৃ. ১৪৮-১৫১; আল-বাবরতী, আল-'ইনায়াহ, খ.৯, পৃ.৩২২-৩;
১০. আস-সারাঙ্গী, আল-মাবসূত, খ.১১, পৃ.৪৯; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ১৫০-১; আল- বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৫, পৃ.২৭৪; আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.২, পৃ. ৩৪৭; আল- মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.৬, পৃ.১৯১-২
১১. আস-সারাঙ্গী, আল-মাবসূত, খ.১১,পৃ.৫৩; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৮, পৃ.১২৪
📄 একটি আপত্তির জবাব
চুরির মত অপহরণও একটি গুরুতর সামাজিক অপরাধ। চুরির জন্য ইসলামে সুনির্দিষ্ট শাস্তির বর্ণনা রয়েছে। অথচ অপহরণের কোন সুনির্দিষ্ট শাস্তির উল্লেখ নেই। এটা অবশ্যই একটা দুর্বোধ্য বিষয়। এর উত্তর হল, চুরি ও অপহরণের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। অপহরণের ব্যাপারটি প্রায়ই প্রকাশ্যে সংঘটিত হয়। তাই সাবধান হলে এ ধরনের অবস্থা থেকে নিজেকে রক্ষা করা অনেকটা সহজ হয় এবং তার প্রমাণ উপস্থিত করাও তেমন কঠিন ব্যাপার হয় না।
পক্ষান্তরে চুরির ঘটনা ঘটে গোপনে, লোক চক্ষুর আড়ালে। ফলে তা প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অধিকন্তু, চোর থেকে বেঁচে থাকা অসম্ভব। সে ঘরে সিঁদ কাটে, তালা ভাঙ্গে, গ্রিল কাটে। এ রূপ অপরাধে কঠোরতর শাস্তি দেয়া না হলে সমাজে চুরির মাত্রা দিন দিন বেড়ে যাবে এবং এর ফলে লোকেরা কঠিন বিপদে পড়ে যেতে পারে। তাই গোপনে সংঘটিত অপরাধটি যদি অকাট্যভাবে প্রমাণ করা যায়, তা হলে তার শাস্তি কঠোরতর হওয়া বাঞ্ছনীয়, যাতে তা অন্যরা দেখে শিক্ষা অর্জন করতে পারে, সতর্ক হবার প্রয়োজন অনুভব করে। অপরদিকে অপহরণ প্রায়শ জনগণের চোখের সামনে প্রকাশ্যে সংঘটিত হয়। জনগণ সতর্ক হলে অপহরণকারীকে হাতে-নাতে ধরা সম্ভব এবং অপহৃত বস্তুটি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়া যায়। তদুপরি লুটকারীর বিরুদ্ধে সরকারের নিকট মামলাও দায়ের করা যায়; কিন্তু চোরের ব্যাপারটি সে ধরনের নয়।
টিকাঃ
১২. ইবনুল কাইয়িম, ই'লামুল মুআক্কি 'ঈন, খ.২, পৃ.৪৭; আবদুর রহীম, অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম, পৃ. ২৪৭