📄 শূল বিদ্ধ করা
যে ডাকাত বা ডাকাতদল নিরাপরাধ ও নিরীহ লোকদের ওপর হামলা করে হত্যা করে এবং তাদের ধন-মাল ছিনিয়ে নেয়, তাদের জন্য কঠোরতম শাস্তি হল হত্যা ও প্রকাশ্যে শূলবিদ্ধকরণ, যাতে তা দেখে অন্যান্য ডাকাত ও বিপর্যয়সৃষ্টিকারীরা সমাজে কোন রূপ ফাসাদ ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে সাহস না পায়। তবে অধিকাংশের মতে, শূলবিদ্ধকরণ হদ্দের অর্ন্তভুক্ত, যা অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। তবে ইমাম আবূ হানীফা (রহ)-এর মতে, হত্যা কিংবা শূলবিদ্ধকরণ দণ্ড থেকে বিচারক তাঁর সুবিবেচনা অনুযায়ী যে কোনটিই বেঁচে নিতে পারবেন অথবা দুটিই কার্যকর করতে পারবেন।
হানাফী ও মালিকীগণের মতে, জীবিত অবস্থায় শূলে চড়ানো হবে এবং শূলবিদ্ধ অবস্থায় বর্শা দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হবে। তাঁদের কথা হলঃ শূলবিদ্ধকরণও একটি শাস্তি, যা জীবিতদের জন্য প্রযোজ্য; মৃতদের জন্য নয়। উপরন্তু, তা লুণ্ঠন ও বিপর্যয়সৃষ্টির বদলা। তাই অন্যান্য অপরাধের শাস্তি কার্যকর করার ক্ষেত্রে যেমন জীবনের শর্ত রয়েছে, তেমনি শূলবিদ্ধকরণের ক্ষেত্রেও জীবনের শর্ত প্রযোজ্য হবে। শাফি'ঈগণের কারো কারো মতে, জীবিত অবস্থায় শূলে চড়ানো হবে। তারপর নামিয়ে হত্যা করা হবে। হাম্বলী ও শাফি'ঈগণের মতে, প্রথমে হত্যা করা হবে। তারপর শূলবিদ্ধ করা হবে। তাঁদের বক্তব্য হল, আল্লাহ তা'আলা যেহেতু আয়াতের মধ্যে হত্যার কথা আগে বলেছেন, তারপর শূলবিদ্ধ করার কথা বলেছেন, তাই আয়াতের ইঙ্গিত অনুসারে প্রথমে হত্যা করেই তারপর শূলে চড়ানো হবে। তদুপরি জীবিত অবস্থায় শূলে চড়ানো হলে তাকে অতিরিক্ত কষ্ট দান করা হবে। তাঁদের মতানুযায়ী, তাকে প্রথমে হত্যা করা হবে, তারপর গোসল দেয়া হবে, কাফন পরানো হবে, জানাযা পড়া হবে। তারপর শূলে চড়ানো হবে।
হানাফীগণের মতে, মৃত্যুর পর তাকে শূলবিদ্ধ অবস্থায় তিনদিন রেখে দিতে হবে। এর বেশি সময় ধরে রেখে দেয়া সমীচীন নয়। হাম্বলীগণের মতে, কোন সময় নির্ধারিত নয়; শাসক তার সুবিবেচনা অনুযায়ী প্রচারের জন্য যে কয়দিন প্রয়োজন মনে করবেন, ততদিন রাখতে পারবেন। মালিকীগণের মতে, দেহ পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়ানোর আশঙ্কা দেখা দিলে তাকে নামিয়ে ফেলবে।
টিকাঃ
৩৯. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ১৩৪; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭,পৃ. ৯৩; ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৬, পৃ.১৪১; আল-বহুতী, কাশশাফ, খ.৬, পৃ.১৫১; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৪, পৃ.৩১০
৪০. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ১৩৫; আল-কাসানী, বদাই, খ.৭, পৃ. ৯৪; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ. ১২৫; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৮, পৃ.৩৭২
৪১. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ৯৪; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ. ১২৭, ১৩১
৪২. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭,পৃ. ৯৫; মুল্লা খসরু, দুরারুল হক্কাম, খ.২, পৃ.৮৫; আল-জসসাস, আহকামুল কুর'আন, খ.২, পৃ. ৫৭৮; ইবনুল 'আরবী, আহকামুল কুর'আন, খ.২, পৃ. ১০০; আল-জুমল, ফুতুহাতুল ওয়াহহাব, খ.৫, পৃ.১৫৫; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ.১৭২
📄 হাত-পা কেটে ফেলা
যে পরিমাণ সম্পদ চুরি করলে হাত কাটা যায় (অর্থাৎ দশ দিরহাম), সে পরিমাণ সম্পদ কেউ ডাকাতি করে নিলে তার শাস্তি হল ডান হাত ও বাম পা কেটে ফেলা। চোরের হাত-পা কাটার নিয়ম ডাকাতের ক্ষেত্রেও অনুসৃত হবে। অর্থাৎ ডান হাত কব্জি থেকে আর বাম পা গোড়ালী থেকে কাটতে হবে।
টিকাঃ
৪৩. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.১৩২; আল-জসসাস, আহকামুল কুর'আন, খ.২, পৃ. ৫৮১; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ. ১২৮-৯
৪৪. হযরত 'উমার (রা) এই রূপ করতেন বলে বর্ণিত রয়েছে। তবে কারো কারো মতে, গোড়ালি বরাবর ছেড়ে রেখে পায়ের পাতার অর্ধেকাংশ থেকে কেটে ফেলতে হবে, যাতে সে গোড়ালি ওপর ভর করে চলাফেরা করতে পারে। হযরত 'আলী (রা) এই রূপ করতেন বলে বর্ণিত আছে।
📄 নির্বাসিত করা
হানাফী ও মালিকী ইমামগণের মতে, এ আয়াতে نفي (নির্বাসন) দ্বারা বন্দী করে রাখাকে বোঝানো হয়েছে। কেননা কাউকে তো আর সমগ্র পৃথিবী থেকে বের করে দেয়া যাবে না। তদুপরি অন্য কোন দেশে নির্বাসনে পাঠানো হলে তা হবে সে দেশের অধিবাসীদেরকে অযাচিত কষ্টদান করার নামান্তর। অতএব, এখানে নির্বাসন দ্বারা কারাগারে বন্দী করে রাখাকেই সুনির্দিষ্ট করে বোঝানো হয়েছে। কেননা কারারুদ্ধ ব্যক্তি বলতে গেলে প্রকারান্তে নির্বাসিত ব্যক্তি। সে পারে না দুনিয়ার কোন সুখ সম্ভোগ করতে, পারে না আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করতে। ইমাম শাফি'ঈ বলেন, যদি কোন ডাকাত হত্যাকাণ্ডও ঘটাল না এবং ধন-মালও অপহরণ করল না, তাহলে তাকে তা'যীরের আওতায় কারাগারে আটকও রাখা যাবে এবং নির্বাসন দণ্ডও দেয়া যাবে।
টিকাঃ
৪৫. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭,পৃ. ৯৫; আল-জসসাস, আহকামুল কুর'আন, খ.২, পৃ. ৫৭৮; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ. ১২৯; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৬, পৃ.১৬৪
📄 ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক ও সহযোগীদের শাস্তি
ডাকাতি ও সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক ও সহযোগীদের শাস্তিও ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের শাস্তির অনুরূপ হবে। অর্থাৎ ডাকাত ও সন্ত্রাসীরা যদি তাদের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের সম্মুখীন হয়, তাদের পৃষ্ঠপোষক ও সহযোগীরাও সে একই ধরনের শাস্তি ভোগ করবে। যদিও তারা সরাসরি ডাকাতি ও সন্ত্রাসে লিপ্ত হয়নি। কেননা ডাকাতি ও সন্ত্রাসের ঘটনাগুলো প্রায়শ দলবদ্ধ প্রচেষ্টায় সংঘটিত হয়ে থাকে। কেউ সরাসরি অপরাধকর্মে লিপ্ত হয়, আবার কেউ তাদেরকে রক্ষা করার কাজে রত হয়। ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক ও সহযোগীদেরকে যদি তাদের মত একই রূপ হদ্দের শাস্তি দেয়া না হয়, তাহলে দেশে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার পথ দিন দিন বেড়েই চলবে। এটাই হানাফী, মালিকী ও হাম্বলী ইমামগণ সহ অধিকাংশ ইমামের অভিমত। তবে শাফি'ঈগণের মতে, যারা ডাকাত কিংবা সন্ত্রাসীদের সাহায্য-সহযোগিতা করে কিংবা তাদের সাথে অবস্থান করে তাদের দল ভারী করে কিংবা তাদের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করে তাদের ওপর হদ্দ প্রয়োগ করা যাবে না; তবে তা'যীরের আওতায় তাদেরকে কারাগারে বন্দী করে রাখা যেতে পারে বা তাদেরকে নির্বাসন দণ্ডও দেয়া যেতে পারে।
টিকাঃ
৪৬. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.১৩২; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খ.৯,পৃ.১৩১; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৬, পৃ.১৬৪