📄 ‘হিরাবাহ’-এর সংজ্ঞা
সশস্ত্র ডাকাতি ও লুণ্ঠনকে আরবীতে حرابة বলা হয়। এর আভিধানিক অর্থ হল যুদ্ধ কিংবা লুণ্ঠন ও অপহরণ'। শরী'আতের পরিভাষায় এর অর্থ হল, কারো সম্পদ অর্জন করা, কিংবা কাউকে হত্যা করা বা কারো ইজ্জত-আব্রু নষ্ট করা অথবা ত্রাস সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র অবস্থায় প্রকাশ্যে দাপটের সাথে কারো ওপর চড়াও হওয়া। অধিকাংশ ইমামের মতে, এ রূপ আক্রমণ যেখানেই হোক- চাই তা শহর-নগর-গ্রাম-জনপদে হোক কিংবা নির্জন পথে-ঘাটে কিংবা মাঠে-ময়দানে হোক- তা 'হিরাবাহ' (ডাকাতি) হিসেবে ধর্তব্য হবে। উপর্যুক্ত সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায় যে, নিম্নে বর্ণিত যে কোন অপরাধ (حرابة) ডাকাতি ও লুণ্ঠন) রূপে গণ্য হবে।
ক. কারো সম্পদ ছিনতাই, কিংবা কাউকে হত্যা বা কারো ইজ্জত-আব্রু নষ্ট করার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র অবস্থায় দাপটের সাথে বের হওয়া। যদিও কারো সম্পদ ছিনিয়ে নিতে বা ইজ্জত-আব্রু নষ্ট করতে কিংবা কাউকে হত্যা করতে সমর্থ হয় নি।
খ. কারো সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র অবস্থায় দাপটের সাথে বের হয়ে কাউকে হত্যা করেছে কিংবা মারধর করেছে; কিন্তু সম্পদ ছিনিয়ে নেয় নি।
গ. কারো সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র অবস্থায় দাপটের সাথে বের হয়ে কাউকে হত্যাও করে নি কিংবা মারধরও করে নি; তবে সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছে।
ঘ. সশস্ত্র অবস্থায় দাপটের সাথে বের হয়ে কারো সম্পদও ছিনিয়ে নিয়েছে এবং কাউকে হত্যাও করেছে কিংবা মারধর করেছে।
'হিরাবাহ'কে বড় চুরিও বলা হয়। চুরি এ জন্য বলা হয় যে, দেশের সর্বত্র নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু ডাকাত ও অপহরণকারীরা সরকারের অগোচরেই মানুষের সম্পদ নষ্ট করে। বড় চুরি বলার কারণ হল, এর অপকারিতা ব্যক্তিবিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সর্বসাধারণ তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
টিকাঃ
১. আল বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, (বাব: তাহরীমুল কাতল...), হা.নং: ১৫৬৩৩
২. আরবীতে غصب )লুটতরাজ) ও قطع الطريق )ডাকাতি) প্রভৃতি শব্দও এর সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৩. এটি حربশব্দ থেকে উদ্ভূত। এর 'রা' বর্ণ সাকিন হলে শাস্তির বিপরীত অর্থাৎ যুদ্ধ অর্থে এবং 'রা' বর্ণ যবরযুক্ত হলে লুন্ঠন ও অপহরণ অর্থে ব্যবহার করা হয়। (ইবনু মানযুর, লিসানুল আরব, খ.১, পৃ. ৩০৪)
৪. হাম্বলীগণের মতে, কেবল সম্পদ হরণের উদ্দেশ্যে কারো ওপর সশস্ত্র চড়াও হওয়াকে 'হিরাবাহ' বলা হয়। তবে শাফি'ঈ ও মালিকী ইমামগণ সম্পদ হরণের উদ্দেশ্যকে শর্তারোপ করেন নি; বরং কাউকে হত্যা করা কিংবা কারো ইজ্জত আব্রু নষ্ট করা অথবা পথ-ঘাট বন্ধ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ত্রাস সৃষ্টি করা প্রভৃতি অপরাধও 'হিরাবাহ'-এর পর্যায়ভুক্ত। পরবর্তী কালের হানাফীগণও সম্পদ হরণের উদ্দেশ্যকে শর্তারোপ করেননি।
৫. ইবনু 'আরাফাহ, মুহাম্মাদ, আল-হুদূদ, পৃ. ৫০৮; যাকারিয়া আল-আনসারী, আল-গুরর আল- বহিয়্যা, খ. ৫, পৃ. ১০১; আল-মারদাভী, আল-ইনসাফ, খ. ১০, পৃ. ২৯১; আল-বাজী, আল- মুস্তকা, খ.৭, পৃ. ১৬৯
৬. ইমাম আবূ হানীফা (রহ)-এর মতে, কেবল জনপদের বাইরে সংঘটিত সশস্ত্র ডাকাতিই কেবল হদ্দযোগ্য অপরাধ। (আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ২০১-২; ইবনু কুদামা, আল- মুগনী, খ.৯, পৃ. ১২৪)
৭. আল-বাবরতী, আল-'ইনায়াহ, খ. ৫, পৃ. ৪২৪-৬; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, খ. ৪২৩-৪
৮. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ২৩৫
📄 ডাকাতির মূল উপাদান
ডাকাতির মূল উপাদান হল: প্রকাশ্যে অস্ত্র বা শক্তি প্রদর্শন করে কারো ওপর চড়াও হয়ে তার সম্পদ হরণ করা। এ অস্ত্র ও শক্তি প্রদর্শনকারী চাই এক ব্যক্তি হোক কিংবা একদল। অতএব, প্রকাশ্য অস্ত্র বা শক্তি প্রদর্শন করে সম্পদ লুণ্ঠন করা না হলে তা ডাকাতি হবে না; চুরি হবে। আর যদি সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়, তাহলে তাদেরকে ছিনতাইকারী বলা হবে। তাদের অপরাধ ডাকাতির আওতায় আসবে না।
টিকাঃ
৯. আল-কাসানী, বাদাই, খ.৭, পৃ. ৯০-১; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৯, পৃ. ১২৪; আল-বহুতী, কাশাফ, খ.৬, পৃ. ১৫০
📄 ডাকাতির শর্তাবলী
ডাকাতির হদ্দ প্রয়োগ করার জন্য বেশ কিছু শর্ত রয়েছে। তন্মধ্যে কিছু ডাকাতের সাথে, আর কিছু যাদের ওপর হানা দেয়া হয় তাদের সাথে, আর কিছু উভয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। তাছাড়া ডাকাতিকৃত সম্পদ এবং যে স্থানে ডাকাতি করা হয় তার সাথে সংশ্লিষ্ট কতিপয় শর্তও রয়েছে।
📄 লুণ্ঠকৃত সম্পদের সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলী
ইতঃপূর্বে চুরির হদ্দ কার্যকর করার জন্য চুরিকৃত সম্পদের জন্য যে সব শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে সব শর্ত ডাকাতির মালের জন্যও প্রযোজ্য হবে। এ শর্তগুলোর মধ্যে প্রধান প্রধান শর্ত হল:
১. আর্থিক মূল্যসম্পন্ন হওয়া
২. কারো মালিকানা বা বৈধ দখলভুক্ত হওয়া
৩. সংরক্ষিত থাকা
৪. নিসাব পরিমাণ হওয়া অর্থাৎ দশ দিরহামের সমপরিমাণ কিংবা ততোধিক হওয়া। যদি ডাকাতরা ভাগে প্রত্যেকেই ন্যূনতম দশ দিরহামের সমপরিমাণ সম্পদ না পায়, তা হলে সম্পদ লুঠের জন্য তাদের কারো ওপর ডাকাতির হদ্দ প্রয়োগ করা যাবে না।
টিকাঃ
২১. আল-কাসানী, বদা'ই, খ. ৭, পৃ-৯২ (বিস্তারিত জানার জন্য চুরির অধ্যায় দ্রষ্টব্য)
২২. ইমাম হাসান ইবন যিয়াদ আল-হানাফী (রহ)-এর মতে ডাকাতির নিসাব চুরির দ্বিগুণ অর্থাৎ বিশ দিরহাম। তাঁর বক্তব্য হল: চুরিতে যেহেতু একটা হাত বা পা কর্তন করা হয় আর ডাকাতিতে দুটি অঙ্গই কর্তন করা হয়, তাই এর জন্য বিশ দিরহামের নিসাব নির্ধারণ করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। (আল-কাসানী, বদাই, খ. ৭, পৃ. ৯২)
২৩. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ২৩৬; আল-হাদ্দাদী, আল-জাওহারাহ, খ.২,পৃ. ১৭২