📄 হাত ও পা কাটার নিয়ম
চোরের ডান হাতের কব্জি থেকে কাটতে হবে। পবিত্র কুর'আনে বলা হয়েছে فاقطعوا أيديهما (অর্থাৎ তাদের হাত কেটে দাও।) এখানে কোন হাত কাটতে হবে- তা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয় নি। তবে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা)-এর فاقطعوا أيديهما এর পরিবর্তে فاقطعوا أيمانهما (তাদের ডান হাত কেটে দাও।) প্রসিদ্ধ কিরা'আত দ্বারা জানা যায় যে, চোরের ডান হাতই কাটতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও ডান হাত কাটার নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া খুলাফা রাশিদূনের আমল ও বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, কব্জি থেকে হাত কাটতে হবে। পরবর্তীকালের মুসলিম শাসকগণও কব্জি থেকে কেটেছেন। দ্বিতীয়বার চুরির ক্ষেত্রে বাম পা গোড়ালি থেকে কাটা হবে। তবে কারো কারো মতে, পায়ের গোড়ালি বরাবর ঠিক রেখে বাকী অংশ কেটে ফেলতে হবে, যাতে সে পায়ের ওপর ভর করে চলাফেরা করতে পারে।
হাত-পা কাটার পর সাথে সাথে বেন্ডিজ করে দিতে হবে, যাতে রক্ত ঝরা বন্ধ হয়ে যায়। প্রচণ্ড শীত বা গরমের সময় কর্তন করা সমীচীন নয়। তদুপরি যতটুকু সম্ভব অতি দ্রুত ও সহজভাবে কাটার কাজ সেরে ফেলতে হবে।
চোরের হাত কাটার পর হাতকে তার গলায় লটকিয়ে রাস্তায় কিংবা বাজারে প্রচারের উদ্দেশ্যে ঘুরাতে হবে কি না- তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। শাফি'ঈ ও হাম্বলী ইমামগণের মতে, এটা সুন্নাত। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরূপ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। হানাফীগণের মতে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকল চুরির ঘটনায় এ রূপ করেছেন- তা প্রমাণিত নয়। ব্যাপারটি প্রশাসক কিংবা বিচারকের সুবিবেচনার ওপর ন্যস্ত থাকবে। তাঁরা প্রয়োজন কিংবা কল্যাণকর মনে করলে তা করতে পারেন।
টিকাঃ
৬৮. আত্ তাবারী, আত-তাফসীর, খ.৬, পৃ.২২৮; জাসসাস, আহকামুল কুর'আন, খ.৪, পৃ. ৬৪
৬৯. কারো কারো মতে, শুধু আঙ্গুলগুলোই কাটতে হবে। কেননা ধরা, নেওয়া ইত্যাদি কাজ আঙ্গুল দ্বারাই সম্পন্ন হয়। এতে হাত কাটার উদ্দেশ্যও অর্জিত হয়। খারিজীদের মতে, ডান হাতের কাধের জোড়া থেকে কাটা হবে। কেননা হাত বলতে সবটারই নাম। আবার কারো মতে, হাতের মধ্যখান থেকে কাটতে হবে। তবে এ মতগুলোর পক্ষে কোন দলীল নেই। অধিকন্তু, সাহাবা কিরামের আমল দ্বারাও তা প্রমাণিত নয়। (যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ২২৪-২২৫; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, ১০৬)
৭০. যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ. ২২৪-২২৫; আল-হাদ্দাদী, আল-জাওহারাহ, খ.৩, পৃ. ১৭০; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, ১০৬
৭১. হানাফীগণের নিকট এটা ওয়াজিব। তাঁদের বক্তব্য হলঃ যদি রক্ত বন্ধ করা না হয়, তাহলে এতে অন্য অঙ্গহানির সম্ভাবনা থাকে। শাফি'ঈ ও হাম্বলীগণের নিকট বেন্ডিজ করা ওয়াজিব নয়; তবে মুস্তাহাব। (আল-হাদ্দাদী, আল-জাওহারাহ, খ.৩, পৃ. ১৭০; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, ১০৬)
৭২. শাফি'ঈগণের মতে, এক ঘন্টার জন্য লটকানো যাবে। তবে হাম্বলীগণ এজন্য কোন সময় নির্ধারণ করে দেন নি।
৭৩. ফাদালা ইবন 'উবায়দ (রা) থেকে বর্ণিত, "একবার এক চোরকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত করা হল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথমে তার হাত কাটার নির্দেশ দেন। এরপর তাঁর নির্দেশে চোরের কর্তিত হাতটি তার গলায় লটকিয়ে দেয়া হল।" (আবু দাউদ, (কিতাবুল হুদুদ), হা.নং: ৪৪১১ ও তিরমিযী, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৪৪৭)
৭৪. ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, ১০৭; হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯,পৃ. ১৫৬-৭; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩, পৃ.২২৫; সাবিক, সাইয়িদ, ফিকহুস সুন্নাহ, খ.২, পৃ. ৪২৬
📄 চুরির তা‘যীরী শাস্তি
চুরি প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও কোন শর্তে ত্রুটি দেখা দেবার কারণে বা অন্য কোন কারণে যদি চোরের ওপর হদ্দ কার্যকর করা সম্ভব না হয়, তা হলে সে আদালতের সুবিবেচনা অনুযায়ী তা'যীরী শাস্তি ভোগ করবে।
📄 চুরিকৃত মাল কিংবা তার মূল্য ফেরত দান
চুরিকৃত মাল যদি মজুদ থাকে, তা হলে চোর অবস্থাসম্পন্ন হোক কিংবা দারিদ্রক্লিষ্ট, চাই চোরের হাত কাটা হোক বা না হোক, চাই চুরিকৃত মাল চোরের কাছে থাকুক বা অন্যের কাছে - সর্বাবস্থায় মাল মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। এ বিষয়ে ইমামগণ সকলেই একমত। বর্ণিত রয়েছে, হযরত সাফওয়ান (রা)-এর চাদর চুরির ঘটনায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চোরের হাত কাটার পর চাদর তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তদুপরি চুরি প্রমাণিত হবার পর কোন কারণে যদি চোরের হাত কাটা সম্ভব না হয় এবং চুরিকৃত মাল নষ্ট বা খরচ হয়ে যায়, তাহলে চুরিকৃত মালের মূল্য কিংবা তার সমতুল্য মাল মালিককে পরিশোধ করে দিতে হবে। তবে চুরির শাস্তি হিসেবে যদি চোরের হাত কাটা হয়, তাহলে চুরিকৃত মাল নষ্ট হয়ে গেলে কিংবা খরচ হয়ে গেলে তার মূল্য কিংবা তার সমতুল্য মাল পরিশোধ করতে হবে না। আল কুর'আনের আয়াতে শুধু হাত কাটার শাস্তির কথাই উল্লেখ করা হয়েছে অর্থাৎ সে যে অপরাধ করেছে তার সবটুকুর শাস্তি হল হাত কাটা। অতএব, এর সাথে আর কোন শাস্তি যুক্ত করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, إذا قطع السارق فلا غرم عليه - "চোরের হাত কাটা হলে তাকে কোন প্রকার আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।” এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, চোরের হাত কাটা ও চুরিকৃত মালের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শাস্তি একসাথে দেওয়া যাবে না। এটা হানাফীগণের প্রসিদ্ধ অভিমত। মালিকীগণের মতে, চোর যদি চুরি করার সময় থেকে হাত কাটা পর্যন্ত সময় অবস্থাসম্পন্ন ছিল, তাহলে নষ্ট বা ব্যয় হয়ে যাওয়া মালের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। শাফি'ঈ ও হাম্বলীগণের মতে চুরি প্রমাণিত হলে চোরকে সর্বাবস্থায় চুরিকৃত মাল কিংবা তার মূল্য মালিকের নিকট ফেরত দিতে হবে এবং চোরের হাতও কাটতে হবে। তাঁদের যুক্তি হল, হাত কাটার বিধান প্রযোজ্য হবে আল্লাহর হুকম লঙ্ঘন করার কারণে আর ক্ষতিপূরণ বান্দাহর হক নষ্ট করার কারণে।
টিকাঃ
৭৫. ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৭১; খ.৯, ১১৩-৪; আল-কাসানী, বদাই, খ.৭, পৃ.৮৯-৯০; গানিম, মাজমা'উদ দিয়ানাত, পৃ. ২০০
৭৬. আন্ নাসাঈ, (কিতাবু কাত'ইস সারিক), হা.নং: ৭৩৬৯
৭৭. ইবন 'আবদিল বারর, আত-তামহীদ, খ.১৪, পৃ.৩৮৩; জসসাস, আহকামুল কুর'আন, খ.৪, পৃ.৮৪
৭৮. মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ. ৫৩৯; শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৬, পৃ. ১৬৪; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৫, পৃ. ১৭১; খ.৯, ১১৩-৪; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৮৯-৯০; গানিম, মাজমা'উদ দিয়ানাত, পৃ. ২০৩; আল-মারদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ.২৮৯ আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৮১; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ. ৮৬-৮৭; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ. ১১৮