📄 চুরির নিসাবের বিবরণ
কি পরিমাণ সম্পদ চুরি করলে চুরির হদ্দ কার্যকর করা ওয়াজিব হবে- তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। মালিকীগণের মতে, চুরির নিসাব তিন দিরহাম। তাঁদের দলীল হল, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং হযরত 'উছমান (রা) দুজনেই তিন দিরহাম মূল্যের বর্ম চুরিতে হাত কেটেছেন। শাফি'ঈগণের মতে, এক দীনারের এক চতুর্থাংশ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, تقطع اليد في ربع دينار فصاعدا - "এক দীনারের এক চতুর্থাংশ বা তার বেশি পরিমাণ মূল্যের সম্পদ চুরি করলে তার শাস্তিস্বরূপ হাত কাটা যাবে।" অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, لا تقطع يد السارق فيما دون ثمن المجن - "বর্মের মূল্যের চাইতে কম মূল্যের বস্তুর চুরিতে হাত কাটা যাবে না।" রাবী বলেন, হযরত 'আয়িশা (রা) কে জিজ্ঞেস করা হলো, বর্মের মূল্য কত? তিনি বললেন, এক দীনারের এক চতুর্থাংশ। তবে এক দীনারের এক চতুর্থাংশের পরিমাণ নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম শাফি'ঈ (রহ)-এর মতে তিন দিরহাম, ইবনু আবী লায়লা (রহ)-এর মতে পাঁচ দিরহাম।
হানাফীগণের মতে, ন্যূনতম দশ দিরহাম বা তার সমমূল্যের কোন বস্তু চুরি করা হলে তবেই চুরির হদ্দ কার্যকর করা হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, لا قطع إلا في دينار أو عشرة دراهم - "এক দীনার বা দশ দিরহামের কমে হাত কাটা যাবে না।" তাঁদের বক্তব্য হল: মালিকী ও শাফি'ঈগণের বর্ণিত হাদীসসমূহে সুনির্দিষ্ট পরিমাণের কথা উল্লেখ নেই। এগুলোতে বিভিন্ন ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে। হযরত ইবনু 'আব্বাস (রা)-এর মতে বর্মটির দাম দশ দিরহাম, আবার ইবনু উমার (রা) থেকে তিন দিরহাম বর্ণিত রয়েছে। কেউ কেউ আবার চার দিরহাম এবং পাঁচ দিরহামের কথাও উল্লেখ করেছেন। অপর দিকে হযরত 'আয়িশা (রা)-এর মতে, এক দীনারের এক চতুর্থাংশ সমান দশ দিরহাম। হানাফীগণের মতে, যেহেতু বর্মটির মূল্য কত- তা নিয়ে সাহাবীগণের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে, তাই এ ক্ষেত্রে অধিক পরিমাণের বর্ণনা সম্বলিত রিওয়ায়াতটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য। কারণ তার চাইতে কম পরিমাণের মধ্যে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। আর সন্দেহযুক্ত অবস্থায় হদ্দ কার্যকর না করাই হল ইসলামী শাস্তি আইনের একটি বৈশিষ্ট্য।
বর্তমানে দশ দিরহামের সমপরিমাণ প্রায় ২৯.৭৫ গ্রাম রৌপ্য বা তার সমমূল্যের কোন মাল চুরির নিসাব হিসেবে গণ্য হবে। এর কম মূল্যের কোন বস্তু চুরি করলে তা হদ্দের আওতায় পড়বে না; তবে তা'যীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হবে।
যদি একসাথে একাধিক ব্যক্তি চুরি করে এবং চুরিকৃত মাল চুরিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সমানভাবে বন্টন করে দিলে প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ চুরির নিসাব পরিমাণ বা তার অধিক হয়, তা হলেই সকলের ওপর হদ্দ কার্যকর হবে। অন্যথায় তা'যীরের আওতায় সাধারণ শাস্তি কার্যকর করা হবে।
টিকাঃ
৪০. ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লা, খ.১২, পৃ. ৩৪৪-৫; আস-সারাঙ্গী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ১৩৬- ৯; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ৭৭-৯
৪১. মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ.৫২৬ (হযরত 'ইবনু 'উমার (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন (إِنَّ رَسُولُ اللَّهِ قَطَعَ فِي مِجَنَّ ثَمَنُهُ ثَلَثَةُ دَرَاهِمَ : "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিন দিরহাম মূল্যের বর্মের চুরিতে হাত কেটেছেন।" (বুখারী, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ৬৪১১, ৬৪১২, ৬৪১৩)
৪২. দীনার: ২০ কীরাত ওযনের স্বর্ণের তৈরি মুদ্রা বিশেষ। বর্তমানে তা ৪.২৫ গ্রামের সমান।
৪৩. শাফি'ঈ, আল-উম্ম, খ.৬,পৃ. ১৪০
৪৪. সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৮৪
৪৫. আল বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৯৪৯; নাসাঈ, আস- সুনান আল-কুবরা, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ৭৪২২
৪৬. এ ভিত্তিতে তাঁর মতের সাথে ইমাম মালিক (রহ)-এর মতের মিল রয়েছে।
৪৭. দাউদ আয-যাহিরীর মতে, কম-বেশি যা চুরি করুক তার জন্য হাত কাটার শাস্তি প্রযোজ্য হবে। তাঁর বক্তব্য হল جزاء بما كسبا (অর্থাৎ যা তারা রোজগার করেছে তারই শান্তি স্বরূপ)-এ আয়াতে যা শব্দটি কম-বেশি সব পরিমাণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। (ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ. ৯, পৃ. ৯৪-৫)
৪৮. দিরহাম: রৌপ্যের তৈরি মুদ্রা বিশেষ। বর্তমানে তা ২.৯৭৫ গ্রামের সমান।
৪৯. আত্ তিরমিযী (কিতাবুল হুদূদ), হা. নং: ১৪৪৬
৫০. আস-সারাসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ১৩৬-৯; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ৭৭-৯
৫১. এটা হানাফী ইমামগণের মতানুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁরা মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে রৌপ্যকে প্রাধান্য দেন। পক্ষান্তরে শাফি'ঈগণ মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বর্ণকে প্রাধান্য দেন। তাই তাঁদের মতানুযায়ী ২৫ দীনারের সমপরিমাণ প্রায় ১.০৬২৫ গ্রাম স্বর্ণ বা তার সমমূল্যের কোন মাল চুরির নিসাব হিসেবে গণ্য হবে। তদুপরি চুরি করার সময় চুরিকৃত বস্তুর যা দাম ছিল মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে তা-ই বিবেচ্য হবে। তবে হানাফীগণের মতে, হাত কাটার সময় চুরিকৃত বস্তুর মূল্য হ্রাস পেয়ে নিসাবের চাইতে কমে গেলে হদ্দ প্রয়োগ করা যাবে না। (ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ৪০৭; শায়খী যাদাহ, মাজমা'উল আনহুর.., খ.১, পৃ. ৬২৬)
৫২. আস-সারাসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ১৪৩; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ. ১২০