📄 চুরিকৃত বস্তু সংরক্ষণযোগ্য হওয়া
চুরিকৃত মাল যদি অসংরক্ষণযোগ্য দ্রুত পচনশীল দ্রব্য হয়, তা হলেও হদ্দ কার্যকর হবে না; বরং তা'যীরের আওতায় শাস্তি দেয়া হবে। তবে মালিকীগণ এবং হানাফীগণের মধ্যে ইমাম আবূ ইউসূফ (রহ)-এর মতে, দ্রুত পচনশীল দ্রব্যও যদি নিসাব পরিমাণে চুরি করা হয়, তাতেও হাত কাটার বিধান প্রযোজ্য হবে। অনুরূপভাবে গাছে ঝুলন্ত ফল চুরির জন্যও হাত কাটার বিধান প্রযোজ্য হবে না। এমন কি যদিও হিফাযত করার উদ্দেশ্যে তাকে মাচায় বেঁধে রাখা হোক কিংবা ঘেরা দেয়া হোক। কেননা ফল যে যাবত গাছে থাকে, ততক্ষণ নষ্ট হবার আশঙ্কা লেগেই থাকে। তবে আড়তে সংরক্ষিত ফল চুরি করা হলে তাতে হাত কাটার বিধান প্রযোজ্য হবে, যদি তা ভালভাবে শুকিয়ে যায়। কেননা এমতাবস্থায় তা সংরক্ষণের উপযোগিতা লাভ করেছে এবং তা সহজেই নষ্ট হবে না। যদি তা ভালভাবে না শুকায়, তাহলে যেহেতু এমতাবস্থায় তা সংরক্ষণ করে রাখার পূর্ণ উপযোগিতা অর্জন করে নি, তাই তা চুরি করা হলেও হাত কাটা যাবে না।
টিকাঃ
৩০. আল-হাদ্দাদী, আল-জাওহারাহ, খ.২, পৃ. ১৬৬; হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ৯, পৃ.১৩১; দাসুকী, আলহাশিয়াতু 'আলাশ শারহিল কাবীর, খ.৪, পৃ. ২৩৪
📄 চুরিকৃত বস্তু সাধারণভবে সকলের জন্য বৈধ না হওয়া
চুরিকৃত মাল যদি এমন কোন বস্তু হয় যা ব্যবহার করা সকলের জন্য সাধারণভাবে বৈধ (যেমন- পানি, আগুন বা ঘাস প্রভৃতি), তাহলেও হদ্দ কার্যকর করা হবে না। এমন কি তা যদি কারো অধীনে সংরক্ষিত থাকা অবস্থায় চুরি করে, তাহলেও হাত কাটার বিধান প্রযোজ্য হবে না। তবে মালিকী ও শাফি'ঈ ইমামগণ এবং হানাফীগণের মধ্যে ইমাম আবূ ইউসূফ (রহ)-এর মতে, এ ধরনের মাল যদি সংরক্ষিত অবস্থায় থাকে এবং মূল্যবান হয়, তাহলে চুরির জন্য হাত কাটা হবে, যদি তার মূল্য নিসাব পরিমাণে পৌঁছে।
টিকাঃ
৩১. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ১৫৩, ১৮১; আল-কাসানী, বদাই, খ. ৭, পৃ. ৭০; সাভী, বুলগাতুল সালিক, খ.৪, পৃ. ৪৭২; ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূ', খ.৬, পৃ.১২৪; আল- মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০, পৃ. ২৫৬
📄 চুরিকৃত মাল অপরের দখলভুক্ত হওয়া
হস্তগতকৃত মাল অপরের দখলভুক্ত অর্থাৎ মালিকানাভুক্ত কিংবা আমানত বা দায়িত্বাধীন থাকতে হবে। দখলবিহীন বা মালিকানাহীন কোন মাল কেউ হস্তগত করলে তার এ কাজ চুরি বলে গণ্য হবে না। কারণ এতে কারো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা নেই।
টিকাঃ
৩২. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ১৫৪; হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ৯, পৃ.১২৮; রামালী, নিহায়াতুল মুহতাজ, খ.৭, পৃ. ৪৪৩
📄 চুরিকৃত মাল নিরাপদ সংরক্ষিত স্থান থেকে করায়ত্ত করা
করায়ত্তকৃত মাল সযত্নে বা পাহারা বা কারো তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। অযত্নে কিংবা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকা মাল কেউ হস্তগত করলে তাকে চুরির শাস্তি প্রদান করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ﻻ قطـع في تمر معلق ، و لا في حريسة جبل ، فإذا أواه المراح و الجرين .فالقطع فيما يبلغ ثمن المجن - “প্রাচীরের বাইরে ঝুলন্ত ফল কিংবা রাতের বেলা পাহাড় থেকে ধরে নেয়া কোন মেষের জন্য হাত কাটার শাস্তি দেয়া যাবে না। তবে মেষ খোঁয়াড়ে আবদ্ধ থাকলে এবং ফল শুকাবার খোলায় বা গোলায় থাকাবস্থায় হস্তগত করলে হাত কাটা হবে, যদি তার মূল্য একটি বর্মের সমান হয়।
উল্লেখ্য যে, সংরক্ষণ দুভাবে হতে পারে। ক. কোন নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করা ও খ. সংরক্ষণকারী কর্তৃক সংরক্ষণ করা। স্থানের সংরক্ষণ হলঃ সম্পদ এমন স্থানে সংরক্ষণ করা, যা সম্পদের হিফাযতের জন্য তৈরি করা হয়েছে। মালিকের নির্দেশ ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা নিষেধ। যেমন- গুদাম, দোকান, ঘর, তাবু, পশুর আস্তাবল, গোশালা ইত্যাদি। তাতে হিফাযতকারী থাকা জরুরী নয়। চাই ঘরের দরজা খোলা থাকুক কিংবা বন্ধ। ময়দানে হোক কিংবা জনপদে। সংরক্ষণকারী কর্তৃক সংরক্ষণ এমন স্থানে হয়ে থাকে, যে স্থান কোন কিছু সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়নি এবং সর্বসাধারণ সেখানে অবাধে প্রবেশ করতে পারে। যেমন- মসজিদ, সাধারণ জনপথ, খোলা ময়দান প্রভৃতি স্থান। এ সব স্থানে সংরক্ষণের অর্থ হল : মালের পার্শ্বে ব্যক্তি এমনভাবে বিদ্যমান থাকবে, যেখান থেকে সে তার মাল দেখতে পায়। চাই সে ঘুমন্ত কিংবা জাগ্রত অবস্থায় থাকুক আর সম্পদ তার শরীর কিংবা মাথার নিচে কিংবা পার্শ্বে থাকুক। মালটি চাই তার পরিধেয় বস্ত্র হোক কিংবা নগদ অর্থ হোক বা অন্য কোন বস্তু। অতএব কারো পকেট থেকে কিংবা কারো কাপড় কেটে গোপনভাবে টাকা- পয়সা কিংবা কোন মূল্যবান বস্তু নিয়ে যাওয়া হলে এবং তার মূল্য যদি চুরির নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে তা চুরি হিসেবে ধর্তব্য হবে।
মেহমান যদি মেজবানের বাড়ী থেকে কোন মাল চুরি করে তা হলে চুরির শাস্তি কার্যকর হবে না। কেননা মেহমানের ঘরে প্রবেশের অনুমতি থাকার কারণে চুরির ধারণায় সন্দেহ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। অনুরূপভাবে কোন চাকর বা কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তি যদি তার মনিবের বা নিয়োগকর্তার মাল নিরাপদে সংরক্ষিত স্থান থেকে চুরি করে, যেখানে তাকে প্রবেশ করার অধিকার দেয়া হয়েছে, তা হলেও হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। কেননা তার এ অশুভ আচরণকে বিশ্বাসঘাতকতা বলা যায়; চুরি নয়। আর শরী'আতে বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি হাত কর্তন নয়। এ জন্য তাকে তা'যীরের আওতায় অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী যে কোন শাস্তি দেয়া যাবে। অনুরূপভাবে দোকানে যে সময় সর্বসাধারণের প্রবেশের অনুমতি থাকে তখন কেউ দোকানে ঢুকে কিছু চুরি করলে তার ওপরও হদ্দ প্রয়োগ করা যাবে না। তবে যে সময় সর্বসাধারণের প্রবেশানুমতি নেই, সে সময় ঢুকে চুরি করলে তার ওপর হদ্দ কার্যকর করা হবে।
কোন ব্যক্তি চারণভূমি থেকে পশু চুরি করলে তার ওপরও হদ্দ কার্যকর করা যাবে না; বরং সে তা'যীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হবে। চারণভূমিতে রাখাল থাকুক বা না থাকুক- তাতে হুকুমে কোন পার্থক্য হবে না। এটা হানাফী ও মালিকীগণের অভিমত। তবে শাফি'ঈ ও হাম্বলীগণের মতে, রাখালের দৃষ্টিসীমাতে অবস্থিত চারণভূমি থেকে বিচরণরত পশু চুরি করা হলে তাতে হদ্দ কার্যকর করা হবে।
কোন ব্যক্তি কবর থেকে কাফন চুরি করলে তাকেও চুরির শাস্তি দেয়া যাবে না। কেননা সংরক্ষিত মাল চুরি না করলে তা চুরি বলে গণ্য হবে না। কাফন নিরাপদে হিফাযতে রাখা মাল নয়। এটা ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম শাফি'ঈ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ) প্রমুখের মত। মালিকী ও হাম্বলী এবং হানাফীগণের মধ্যে ইমাম আবূ ইউসূফ (রহ) প্রমুখ ইমামগণের মতে, কাফন চোরদের হাত কাটা হবে, যদি তার মূল্য নিসাব পরিমাণ হয়।
টিকাঃ
৩৩. মালিক, ইমাম, আল-মু'আত্তা, (কিতাবুল হুদুদ), হা. নং: ১৫১৭; বায়হাকী, আস-সুনান আল- কুবরা, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৭০০১;
৩৪. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ৭৫; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫. পৃ.৩৮৪; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ. ৯৮-৯৯; যাকারিয়া আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১৪০; মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ. ৫৩২
৩৫. মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ. ৫৩২; আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.১৪১; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ ৩৮৭
৩৬. ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ ৩৮৭
৩৭. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যা, খ.৩১, পৃ. ৩০০; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩,পৃ. ২১৭-৮; ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫. পৃ.৩৯১-২
৩৮. আস-সারাঙ্গী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ১৬১; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন, খ.৩,পৃ. ২১৭-৮; বহুতী, দকাইক.., খ.৩, পৃ. ৩৭৪; রুহায়বানী, মাতলিব.., খ.৬, পৃ. ২৩৯; মালিক, আল- মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ. ৫৩৭