📄 অপরের মাল জেনে শুনে হস্তগত করা
অপরের মাল জেনে-শুনে তার কোন রূপ অবগতি কিংবা সম্মতি ছাড়া হস্তগত করলেই তা চুরি হিসেবে ধর্তব্য হবে। তাই কেউ যদি কোন মালকে মুবাহ (বৈধ) বা পরিত্যক্ত মনে করে হস্তগত করে, তা হলে তার ওপর হদ্দ প্রয়োগ করা যাবে না।
টিকাঃ
৮. তদেব
📄 স্বেচ্ছায় ও প্রলোভনবশত চুরি করা
কোন চোর যদি একেবারে অনন্যোপায় হয়ে চুরি করতে বাধ্য হয় যেমন দুর্ভিক্ষের সময় ক্ষুধার তাড়নায় চুরি করল, তার ওপর হদ্দ প্রয়োগ করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لا قطع في مجاعة - مُضطَرّ - “ক্ষুধায় বাধ্য হয়ে চুরি করলে হাত কাটা যাবে না।” ইমামগণের সর্বসম্মত হল, দুর্ভিক্ষের সময়ের চুরির অপরাধের কারণে হাত কাটা যাবে না। অনুরূপভাবে কারো একান্ত চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে চুরি করলেও হদ্দ কার্যকর করা হবে না, যদি কোন ধরনের চাপ প্রয়োগ প্রমাণিত হয়।
টিকাঃ
৯. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ,৯, পৃ.১৪০; ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.৫৮
১০. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ,৯, পৃ.১৪০-১
১১. হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯, পৃ.১৫০; 'উলায়স, মুহাম্মদ, মিনহুল জলীল, দারুল ফিকর, খ.৯, পৃ.৩২৯
📄 চোর ও মালিক পরস্পর রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় না হওয়া
চোর ও মালিক যদি পরস্পর রক্ত সম্পর্কীয় ঊর্ধ্ব বা অধঃস্তন জাতীয় আত্মীয় হয় (যেমন- পিতামাতা ও পুত্রকন্যা এবং তাদের ঊর্ধ্ব ও অধঃস্তন পুরুষগণ), তা হলেও চোরের ওপর হদ্দ কার্যকর হবে না। উপর্যুক্ত আত্মীয়-স্বজন ছাড়া অপরাপর আত্মীয়-স্বজন (যেমন ভাইবোন, চাচা-চাচী, ফুফা-ফুফী, মামা-মামী, খালা-খালু বা তাদের ছেলেমেয়ে, দুধ মা ও ভাইবোন, সৎ পিতামাতা, শ্বাশুড়-শ্বাশুড়ি ও স্ত্রীর অপর ঘরের ছেলেমেয়ে প্রভৃতি) একে অপরের মাল চুরি করলে অধিকাংশ ইমামের মতে হাত কাটা হবে। তবে হানাফীগণের মতে, রক্তসম্পর্কীয় মুহরাম আত্মীয়-স্বজনরা (যেমন ভাইবোন, চাচা, মামা, ফুফী, খালা প্রভৃতি) একে অপর থেকে চুরি করলে হাত কাটা যাবে না। তাদের বক্তব্য হল- তারা প্রায়শ একে অপরের কাছে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে। এর ফলে তাদের চুরির ক্ষেত্রে একটি সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। অধিকন্তু চুরির কারণে তাদের হাত কাটা হলে তাতে তাদের আত্মীয়তার সম্পর্কও নষ্ট হয়ে যাবে। তবে রক্তসম্পর্কীয় অমুহরাম আত্মীয়-স্বজনরা (যেমন- চাচাতো ভাইবোন, ফুফাতো ভাইবোন, মামাতো ভাইবোন প্রভৃতি) একে অপর থেকে চুরি করলে হাত কাটা যাবে। কেননা তাদের সচরাচর একে অপরের কাছে বিনা অনুমতি প্রবেশ করার রেওয়াজ ও বিধান নেই। রক্তসম্পর্কীয় নয় এমন মুহরাম আত্মীয়স্বজন (যেমন- দুধ মা ও বোন) একে অপরের মাল চুরি করলে হাত কাটা হবে কি না- তা নিয়ে হানাফীগণের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ) প্রমুখের মতে, হাত কাটতে হবে। তবে ইমাম আবূ ইউসূফ (রহ)-এর মতে দুধ মা থেকে চুরি করলে হাত কাটা যাবে না।
স্বামী-স্ত্রী একে অপরের মাল চুরি করলেও হদ্দ কার্যকর হবে না, যদি তারা এক সাথে থাকে। যদি তারা এক সাথে না থাকে কিংবা একসাথে থাকলেও তারা নিজেদের মাল যদি একে অপর থেকে দূরে সরিয়ে নিজেদের একান্ত হিফাযতে রাখে, তাহলেও অধিকাংশ ইমামের মতে হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। তবে কারো কারো মতে, এমতাবস্থায় হদ্দ কার্যকর করতে হবে। এটা মালিকী স্কুলের ইমামগণের অভিমত এবং শাফি'ঈগণের নিকট অধিকতর গ্রহণযোগ্য অভিমত।
টিকাঃ
১২. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ. ৯৭; আল-হাদ্দাদী, আল-জাওহারাহ..., খ.২,পৃ. ১৬৭; শাফি'ঈ, ইমাম, আল-উম্ম, খ.৬, পৃ.১৬৩; হায়তমী, তুহফাতুল মুহতাজ, খ.৯.পৃ.২১০
১৩. মালিক, আল-মুদাওয়ানাহ, খ.৪, পৃ. ৫৩৫; শাফি'ঈ, ইমাম, আল-উম্ম, খ.৬, পৃ.১৬৩; আল- হাদ্দাদী, আল-জাওহারাহ..., খ.২,পৃ. ১৬৮
📄 হস্তগত মালের মধ্যে চোরের কোনরূপ মালিকানা বা অধিকার না থাকা
চোর যদি চুরিকৃত মালের অংশীদার হয় এবং তার নিজের অংশ বাদ দেবার পর চুরিকৃত অবশিষ্ট মালের মূল্য নিসাব পরিমাণ হয়, তা হলেও অপরাধীর ওপর হদ্দ কার্যকর করা যাবে না; বরং তা'যীরের আওতায় শাস্তি দেয়া হবে। ঋণদাতা যদি ঋণগ্রহীতার মাল থেকে চুরি করে এবং চুরিকৃত মাল থেকে প্রাপ্তব্য পরিমাণ বাদ দেয়ার পর 'নিসাব' পরিমাণ অবশিষ্ট না থাকে, তা হলেও হদ্দ কার্যকর করা যাবে না।
অনুরূপভাবে কোন আমানতদাতা যদি আমানতগ্রহীতা থেকে তার অনুমতি ছাড়া গচ্ছিত মালটি চুরি করে, তা হলেও হদ্দ কার্যকর করা হবে না।
যদি কেউ বায়তুল মাল বা গনীমতের মাল থেকে চুরি করে, তবে তার ওপরও হদ্দ প্রযোজ্য হবে না। অনুরূপভাবে ওয়াকফকৃত মাল থেকে যদি কেউ চুরি করে, তাহলেও তার ওপর হদ্দ কার্যকর করা যাবে না।
টিকাঃ
১৪. হানাফী ও শাফি'ঈ ইমামগণের মতে, চোর চুরিকৃত মালের অংশীদার হলে তার ওপর হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। (ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ.৩৭৭; আল-হাদ্দাদী, আল- জাওহারাহ..., খ.২,পৃ. ১৬৮; যাকারিয়া আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ.১৪০-১; রামালী, নিহায়াতুল মুহতাজ, খ,৭, পৃ. ৪৪৫) তবে মালিকীগণের মতে, দুটি শর্তে তার হাত কাটা যাবে না। শর্তদুটি হল: ক. চুরিকৃত মালটি যদি তার অপর অংশীদার থেকে চুরি করে। যদি মাল অংশীদার ছাড়া বাইরের কারো দায়িত্বে সংরক্ষিত অবস্থায় থাকে, তা হলে হাত কাটতে হবে। খ. তার অংশটি তার শরীকদারের অংশের চাইতে বেশি হতে হবে। (আল- খারশী, শারহু মুখতাছারি খলীল, খ.৮, পৃ.৯৭)
১৫. হানাফী ইমামগণের মতে চুরিকৃত মাল যদি তার পাওনার আন্দাজ মত টাকাকড়ি হয়, তবে হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। কেননা ঋণগ্রহীতা থেকে টাকাকড়ি গ্রহণের অধিকার তো তার রয়েছে। তবে চুরিকৃত মাল যদি টাকাকড়ি না হয়ে আসবাব পত্র হয়, তাহলে হদ্দ কার্যকর করতে হবে। যেহেতু আসবাবপত্রের মূল্যের মধ্যে তফাৎ হয়ে থাকে, তাই বিনিময় নেয়ার ক্ষেত্রে দুজনেরই পারস্পরিক সম্মতি থাকা আবশ্যক। তবে সে যদি দাবী করে যে, সে তা বন্ধক হিসেবে তার পাওনার আন্দাজ মত নিয়েছে, তাহলে হাত কাটা যাবে না। (আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ,৯, পৃ.১৭৮; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ,৫, পৃ. ৩৭৭; যায়ল'ঈ, তাবয়ীন.., খ.৩, পৃ. ২১৮)
১৬. আল-কাসানী, বদা'ই, খ,৭, পৃ.৮০
১৭. এটা হানাফী ও হাম্বলীগণের অভিমত। তাদের বক্তব্য হল : যেহেতু বায়তুল মালে প্রত্যেক মুসলমানের অধিকার রয়েছে, তাই বায়তুল মাল থেকে কেউ কিছু চুরি করলে হদ্দযোগ্য হবে না। তবে মালিকীগণের মতে, সে হদ্দযোগ্য হবে। (ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ.৩৭৭; আল-হাদ্দাদী, আল-জাওহারাহ..., খ.২,পৃ. ১৬৮; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ. ১০, খ.২৭৯; রুহায়বানী, মাতালিবু উলিন নুহা, খ. ৬,পৃ.২৪৩)
১৮. কেননা তা যদি সর্বসাধারণের কল্যাণের জন্য ওয়াকফকৃত হয়, তাহলে তার হুকম বায়তুল মালের মতোই। আর যদি তা বিশেষ কোন কাওমের জন্যও ওয়াকফকৃত হয়, চাই চোর ওয়াকফকৃত কাওমের মধ্যে শামিল থাকুক আর না থাকুক, তাহলেও হদ্দ কার্যকর হবে না। কেননা তার সুনির্দিষ্ট কোন মালিক নেই। এটা হানাফীগণের অভিমত। তবে তাঁদের কারো কারো মতে, চোর যদি ওয়াকফকৃত কাওমের অন্তর্ভুক্ত না হয়, তা হলে মুতাওয়াল্লীর দাবীর প্রেক্ষিতে তার হাত কাটতে হবে। এটা শাফি'ঈগণেরও অভিমত। তবে মালিকীগণের মতে, ওয়াকফকৃত মাল চুরি করলে যে কোন অবস্থায় চোরের হাত কাটতে হবে। (ইবনু নুজায়ম, আল-বাহরুর রা'ইক, খ.৫, পৃ.৬০-১)