📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 চুরির সংজ্ঞা

📄 চুরির সংজ্ঞা


চুরি বলতে সাধারণত অপরের মাল গোপনে করায়ত্ত করাকে বোঝানো হয়।

টিকাঃ
১. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ১৩৩

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 চুরির মৌলিক উপাদান

📄 চুরির মৌলিক উপাদান


শরী'আতের পরিভাষায় কোন মুকাল্লাফ (বালিগ ও সুস্থ বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তি) কর্তৃক অপরের মালিকানা বা দখলভুক্ত নিসাব পরিমাণ বা তার সমমূল্যের সম্পদ সংরক্ষিত স্থান থেকে গোপনে করায়ত্ত করাকে 'চুরি' বলে।
চুরির চারটি মৌলিক উপাদান রয়েছে। এগুলো হল : চোর, মালের মালিক অর্থাৎ যার সম্পদ চুরি করা হয়েছে, চুরিকৃত সম্পদ ও গোপনে সম্পদ হস্তগত করা। এ উপাদানসমূহের প্রত্যেকটির সাথে সংশ্লিষ্ট কতিপয় শর্ত রয়েছে, যেগুলো পাওয়া গেলেই হদ্দের বিধান প্রযোজ্য হবে।

টিকাঃ
২. ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ৩৫৫; আল-মাওসৃ'আতুল ফিকহিয়‍্যা, খ.২৪, পৃ.২৯৩ السرقة هي أخذ العاقل البالغ نصابا محرزا ملكا للغير " أو ما : (আরবী ভাষা হল ) قيمته " لا شبهة فيه " على وجه الخفية.

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 গোপনে মাল সম্পূর্ণরূপে হস্তগত করা

📄 গোপনে মাল সম্পূর্ণরূপে হস্তগত করা


চুরির চতুর্থ উপাদান হল গোপনে মাল হস্তগত করা অর্থাৎ মালিকের সম্মতি বা অবগতি ছাড়া কিংবা তার অনুপস্থিতিতে অথবা নিদ্রিতাবস্থায় তার দখলভুক্ত কোন মাল হস্তগত করে নেয়া। এ ক্ষেত্রে মাল সম্পূর্ণরূপে হস্তগত হতে হবে। সম্পূর্ণরূপে হস্তগতকরণ বোঝাতে নিম্নের তিনটি শর্ত পূর্ণ হতে হবে। ক. চোর চুরিকৃত বস্তু নিরাপদ সংরক্ষিত স্থান থেকে বের করে আনবে। খ. চুরিকৃত মাল মালিকের দখলভুক্ত হতে হবে। গ. তা সম্পূর্ণরূপে চোরের নিজের দখলে আসতে হবে। এ তিনটি শর্তের কোন একটি পূর্ণ না হলে হস্তগতকরণ পূর্ণাঙ্গ বলে পরিগণিত হবে না এবং সে ক্ষেত্রে চুরির হদ্দও প্রযোজ্য হবে না। হস্তগত হবার ব্যাপারটি যদি অপূর্ণ থাকে তাহলে চুরি সম্পূণ হয়েছে বলে বিবেচিত হবে না; বরং চুরি শুরু হয়েছে বলে ধরা হবে। এ অবস্থায় হদ্দের পরিবর্তে তা'যীরের শাস্তি প্রযোজ্য হবে।
কেউ জোরপূর্বক কিংবা প্রকাশ্যে দ্রুতবেগে কারো থেকে কোন বস্তু ছিনিয়ে নিলে বা বিশ্বাসঘাতকতা করে কারো কোন মাল নিয়ে নিলে তাও চুরি বলে ধর্তব্য হবে না। এর জন্য হাত কাটার পরিবর্তে তা'যীরের শাস্তি প্রযোজ্য হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লালল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ليس على خائن و لا منتهب ولا مختلس قطع - "কোন বিশ্বাসঘাতক, জোরপূর্বক অপহরণকারী ও প্রকাশ্যে ছিনতাইকারীর হাত কাটা যাবে না।"
যদি একসাথে একাধিক ব্যক্তি চুরি করতে যায় এবং তাদের মধ্যে কেউ সরাসরি চুরিকর্মে অংশগ্রহণ করে (যেমন- ঘরের সিদ কেটে মাল বের করে নিয়ে আসা কিংবা মালিকের হিফাযত থেকে মাল নিজের করায়ত্তে নিয়ে আসা প্রভৃতি) আর কেউ চুরিকর্মে সহায়তা করে (যেমন চুরিকৃত মালের স্থান দেখিয়ে দেয়া, মালিকের সাহায্যে এগিয়ে আসা লোকদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য বাইরে দাঁড়ানো, ভেতর থেকে বেরকৃত মাল অন্যত্র সরিয়ে ফেলা প্রভৃতি), তাহলে সরাসরি চুরিকর্মে অংশগ্রহণকারীদের জন্য হদ্দের বিধান প্রযোজ্য হবে এবং সাহায্যকারীদেরকে তা'যীরের আওতায় শাস্তি দেয়া হবে।

টিকাঃ
৫৪. আস-সারান্সী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ১৩৯, ১৪৭-৮; আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ৬৫- ৬; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ. ৯৮-১০০
৫৫. অধিকাংশ হানাফীর মতে, হদ্দযোগ্য চুরির জন্য চোরের সংরক্ষিত স্থানে প্রবেশ করতে হবে, যদি সেখানে প্রবেশ করা সম্ভব হয় যেমন-ঘর ও দোকান। অতএব, কোন ব্যক্তি যদি কারো সংরক্ষিত স্থানে প্রবেশ না করেই গোপনে কারো মাল হস্তগত করে তা চুরি বলে ধর্তব্য হবে না। এ অবস্থায় হদ্দের পরিবর্তে তা'যীরের শাস্তি প্রযোজ্য হবে। তাঁদের দলীল হল: হযরত 'আলী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ "চোর যদি বিচক্ষণ হয়, তা হলে তার হাত কাটা যাবে না।" এ কথা বলার পর তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, তা কি করে হয়? তিনি উত্তর দিলেন : চোর ঘরে সিদ কাটবে; কিন্তু তাতে প্রবেশ না করেই আসবাবপত্র বের করে নিয়ে আসবে।" (আস- সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ.১৪৭-৮) তবে অন্যান্য অধিকাংশ ইমামের মতে, সংরক্ষিত স্থানে প্রবেশ করেই মাল হস্তগত করতে হবে- তা চুরির জন্য শর্ত নয়। যদি সংরক্ষিত স্থান থেকে হাত কিংবা কোন কিছুর সাহায্যে মাল বের করে নিয়ে আসে তা চুরি হবার জন্য যথেষ্ট। (মালিক, মুদাওয়ানাহ, খ. ৪, ৫৩; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ. ৯৮-১০০) বর্ণিত রয়েছে, জনৈক ব্যক্তি তার বাঁকানো লাঠির সাহায্যে হাজীদের আসবাবপত্র চুরি করত। তাকে বলা হল- তুমি কি হাজীদের আসবাবপত্র চুরি করছ? সে বলল : আমি তো না; লাঠিই চুরি করছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার খবর জানতে পেরে বলেছেন: رأيته .يجر قصبه في النار - "আমি তাকে জাহান্নামে তার নাড়িভূড়ি টানতে দেখেছি।” (সহীহ মুসলিম, (কিতাবুল কসূফ), হা.নং: ৯০৪)
৫৬. যেমন- কেউ তালা ভেঙ্গে বা খুলে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল কিংবা দরজা বা জানালা ভাঙ্গল অথবা ছাঁদে বা দেয়ালে সিদ কাটল কিংবা কারো পকেটে হাত ঢুকাল; কিন্তু কোন কিছু হস্তগত করার আগেই মালিকের গতিবিধি আঁচ করতে পেরে পালিয়ে গেল অথবা ধরা পড়ল।
৫৭. এর দলীল হল: হযরত 'আমর ইবন শু'আয়ব (রা) থেকে বর্ণিত, একবার এক চোর মুত্তালিব ইবন আবি ওয়াদা'আর গুদামে সিদ কেটে ঢুকে মাল জমা করল; কিন্তু মাল বের করে নেয়ার আগেই ধরা পড়ে গেল। তাকে লোকেরা 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা)-এর নিকট নিয়ে আসল। তিনি তাকে বেত্রাঘাত করলেন এবং হাত কাটার নির্দেশ দিলেন। ইত্যবসরে ঘটনাটি জানতে পেরে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা)-এর নিকট আসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি তার হাত কাটার নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বললেন, তাহলে তাকে বেত্রাঘাত করা হল কেন? তিনি উত্তর দিলেন, রাগের বশে। এরপর আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বললেন, তার হাত কাটা যাবে না, যে যাবত না সে ঘর থেকে মাল বের করে নিয়ে আসে। আপনার কি অভিমত, যদি আপনি কোন পুরুষকে কোন মহিলার দুপায়ের মাঝখানে দেখতে পান; কিন্তু সে আজো যৌনসঙ্গম করে নি, এমতাবস্থায় তার ওপর কি আপান হদ্দ প্রয়োগ করবেন? তিনি বললেন, না। (আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়‍্যাহ, খ.২৪, পৃ. ৩২৯)
৫৮. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ. ৬৫-৬; বাবরতী, আল-ইনায়াহ, খ.৫, পৃ. ৩৮৯-৯০; যাকারিয়া আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, খ.৪, পৃ. ১৪৭ ও আল-গুরারুল বহিয়‍্যা, খ. ৫, খ.৮৯-৯০
৫৯. আত্ তিরমিযী, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৪৪৮
৬০. ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৫, পৃ. ৩৮৯-৯০; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯, পৃ. ১২২; আল-মরদাভী, আল-ইনসাফ, খ.১০,পৃ. ২৬৭-৬৯

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 চুরির শাস্তি

📄 চুরির শাস্তি


চুরির শাস্তি হল হাত কাটা। পবিত্র কুর'আনে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা এসেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, والسارق و السارقة فاقطعوا أيديهما جزاء بما كسبا نكالا من الله و الله عزيز حكيم. "পুরুষ চোর ও নারী চোরের উভয়ের হাত কেটে দাও। এটা তারা যা উপার্জন করেছে তার প্রতিফল এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্ত। আর আল্লাহ তা'আলা মহাপরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানী।" এ আয়াত থেকে জানা যায়, এ শাস্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। এ বিষয়ে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ সম্পূর্ণ একমত। তবে হাত কতটুকুন কাটতে হবে, কিভাবে কাটতে হবে এবং কোন হাত কাটতে হবে- এ সকল বিষয়ে ইমামগণের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। চার মাযহাবের ইমামগণের মতে প্রথমবারের চুরিতে ডান হাত কবজি থেকে কাটতে হবে। কেননা, এ ডান হাত দিয়ে সাধারণত চুরির কাজ সম্পন্ন হয় এবং ধরা-ছোঁয়ার কাজেও ডান হাতের ব্যবহার হয় বেশি। তাই চুরির অপরাধে ডান হাত কর্তন করাটাই অধিকতর যথার্থ শাস্তি।

টিকাঃ
৬১. আল-কুর'আন, ৫:৩৮
৬২. ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.১, পৃ. ১০৫-৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00