📄 একই সাথে হদ্দ ও তা‘যীর প্রয়োগের বিধান
ইসলামী আইনের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী হদ্দের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধীকে একই সাথে তা'যীরের আওতায়ও শাস্তি দেয়া সমীচীন নয়। কিন্তু জনস্বার্থ ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে একই সাথে উভয় ধরনের শাস্তি দেয়া যেতে পারে। এ বিষয়ে চারি মাযহাবের ইমামগণের মত রয়েছে।
হানাফীগণের দৃষ্টিতে, অবিবাহিত ব্যভিচারীকে যিনার নির্ধারিত শাস্তি (হদ্দ) বেত্রাঘাত প্রদানের অতিরিক্ত এক বছরের জন্য নির্বাসন দণ্ড প্রদান করা হলে তা তা'যীর হিসেবে গণ্য হবে। তাঁর মতানুযায়ী হদ্দের সাথে নির্বাসন দণ্ডও যুক্ত হতে পারে।৪৯
ইমাম মালিক (রহ)-এর মতে, মৃত্যুদণ্ড ব্যতীত হদ্দ ও কিসাসের আওতাভুক্ত অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীকে একই সাথে হদ্দ ও তা'যীরের শাস্তি প্রদান করা যায়। ইমাম শাফি'ঈ (রহ)-এর মতেও উভয় ধরনের শাস্তি একত্রে প্রদান করা যেতে পারে। মালিকী ও শাফি'ঈ ইমামগণের মতে, যখমকারী থেকে কিসাস গ্রহণ করার পর তা'যীর হিসেবে যদি অন্য কোন সাধারণ দণ্ড দেয়া হয়, তাতে কোন অসুবিধা নেই। মালিকী ইমামগণ আরো বলেন, নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা যদি হত্যাকারীর কিসাস মাফ করে দেয় কিংবা যে ক্ষেত্রে আইনত হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা যায় না (যেমন পিতা পুত্রকে হত্যা করলে হত্যাকারী পিতাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে না), সে সব অবস্থায় হত্যাকারীকে অবশ্যই রক্তপণ দিতে হবে।৫০ অধিকন্তু তাকে তা'যীর হিসেবে একশটি বেত্রাঘাত করতে হবে এবং এক বছর বন্দী করে রাখতে হবে। ইমাম শাফি'ঈ (রহ)-এর মতে, মদ্যপানের শাস্তি চল্লিশ বেত্রাঘাত, এর অতিরিক্ত বেত্রাঘাত করা হলে তা তা'যীর হিসেবে গণ্য হবে।৫১
টিকাঃ
৪৯. আল-কাসানী, বদা'ই, খ.৭, পৃ.৩৯; ইবনুল হুমام, ফাতহুল কাদীর, খ.৪,পৃ. ১৩৬
৫০. আল-হত্তাব, মাওয়াহিবুল জলীল, দারুল ফিকর, খ.৬, পৃ. ২৪৭, ২৬৮; শারহুদ দুরায়দীর, খ.৪, পৃ.২২৪
৫১. আল-আনসারী, আসনাল মাতালিব, দারুল কিতাবিল ইসলামী, খ.৪,পৃ. ১৬২; আর-রামলী, শামসুদ্দীন, নিহায়াতুল মুহতাজ, দারুল ফিকর, খ.৮, পৃ. ১৮
📄 অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে হদ্দের কার্যকারিতা
কেউ যদি একটা অপরাধ (যেমন যিনা বা ব্যভিচারের অপবাদ বা মদ্যপান বা চুরি) বারংবার করল, এমতাবস্থায় তার জন্য এক জাতীয় সব অপরাধের জন্য একটি মাত্র হদ্দ কার্যকর করা যাবে। কেননা যে সব শাস্তিতে আল্লাহর হকের প্রাবল্য রয়েছে, তাতে হদ্দের উদ্দেশ্য হল দুনিয়াকে বিপর্যয় থেকে মুক্ত করা এবং ভবিষ্যতে অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিকে অপরাধ থেকে বাঁচিয়ে রাখা। আর এ উদ্দেশ্য একটি মাত্র হদ্দ প্রয়োগ দ্বারা অর্জিত হতে পারে। তাই একটি অপরাধ বারংবার করলেও সবগুলোর জন্য একটি হদ্দই যথেষ্ট হবে। তবে একটা অপরাধের শাস্তির হবার পর ফিরে যদি আবার সে একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে দ্বিতীয়বারের অপরাধের জন্য নতুনভাবে হদ্দ প্রয়োগ করতে হবে।৫২
টিকাঃ
৫২. আস-সারাখসী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ১০১
📄 এক সাথে কয়েকটি অপরাধের শাস্তি
কেউ যদি এক সাথে যিনাও করল, অপরকে যিনার অপবাদও দিল, চুরিও করল এবং মদও সেবন করল, এমতাবস্থায় তাকে প্রত্যেকটি অপরাধের জন্য পৃথক পৃথক হদ্দ প্রয়োগ করতে হবে।৫০ কেননা প্রত্যেক অপরাধের শাস্তির পেছনে শরী'আতের ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। যেমন যিনার হদ্দের উদ্দেশ্য হল বংশের পবিত্রতা রক্ষা করা, অপবাদের হদ্দের উদ্দেশ্য হল মানুষের মান-মর্যাদা রক্ষা করা আর মদ্যপানের শাস্তির উদ্দেশ্য হল বিবেকের সুস্থতা রক্ষা করা, চুরির হদ্দের উদ্দেশ্য সমাজের সম্পদ রক্ষা করা। তদুপরি কোন কোন অপরাধের শাস্তির প্রকৃতিও ভিন্ন ভিন্ন। সুতরাং কোন একটি অপরাধের হদ্দ কায়িম করা হলে অপর অপরাধের শাস্তির উদ্দেশ্য অর্জিত হবে না।৫৪
উল্লেখ্য যে, কারো ওপর একটা অপরাধের শাস্তি আংশিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে, এমতাবস্থায় সে যদি পুনরায় ভিন্ন জায়গায় আবার সে অপরাধে লিপ্ত হয়, তাহলে তার ওপর দ্বিতীয় অপরাধের জন্য নতুনভাবে হদ্দ কার্যকর করা হবে। যেমন কোন ব্যভিচারী কিংবা মদ্যপায়ীকে আংশিকভাবে হদ্দ কার্যকর করার পর পালিয়ে গিয়ে সে যদি আবার ব্যভিচারে লিপ্ত হয় কিংবা মদ পান করে, তাহলে দ্বিতীয়বারের অপরাধের জন্য তাকে নতুনভাবে হদ্দ প্রয়োগ করা হবে। কিন্তু অপবাদের হদ্দ কার্যকর করার সময় যদি সে অপর কাউকে অপবাদ দেয় এবং তার শাস্তি থেকে এক ঘা ছাড়া সবকটি বেত্রাঘাত করা হয়, তাহলে তার প্রথম অপবাদের শাস্তিই পূর্ণ করা হবে। দ্বিতীয় অপবাদের জন্য নতুন কোন হদ্দ প্রয়োগ করা হবে না।৫৫
টিকাঃ
৫০. মালিকীগণের মতে, যেহেতু অপবাদ ও মদ্যপানের শাস্তির পরিমাণ একই, তাই কেউ এ দুটি অপরাধে এক সাথে লিপ্ত হলে তার জন্য একটি হন্দই যথেষ্ট হবে। অর্থাৎ যদি একটির শাস্তি দেয়া হয়, অন্যটির শাস্তি দেয়া লাগবে না।
৫৪. আল-বাবরতী, মুহাম্মাদ, আল-ইনায়াহ শারহুল হিদায়াহ, দারুল ফিকর, খ.৫, পৃ. ৩৪১-২; ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪.পৃ.৫২
৫৫. এটা হানাফীগণের অভিমত (ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.৫২)
📄 শাস্তি দেয়ার বৈধ অধিকারী কে
হদ্দ কার্যকর করার জন্য একমাত্র দায়িত্বশীল হচ্ছেন সরকার প্রধান। তবে সরকার প্রধানের পক্ষে যেহেতু সব সময় সর্বত্র ব্যক্তিগতভাবে ও নিজ হাতে এ কাজ সম্পন করা সম্ভব নয়; তাই তিনি তাঁর প্রতিনিধির মাধ্যমে এ কাজ আঞ্জাম দেবেন।৫৬ সরকারপ্রধান কিংবা তাঁর প্রতিনিধি ছাড়া কারো হদ্দ কার্যকর করার অধিকার নেই। বর্তমানে প্রশাসন ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাগণ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবেই এ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কেউ যদি সরকার প্রধানের অনুমতি ছাড়াই কারো ওপর হদ্দ কায়িম করে, তাকে তার এ উদ্ধত আচরণের জন্য দণ্ডিত করা যাবে।৫৭ কিসাসের বিধানও হদ্দের অনুরূপ।
তবে সাধারণ শাস্তি (তা'যীরাত) সমূহের কোন কোনটি সরকার প্রধানের অনুমতি ছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক প্রধান, সমাজপতি এবং আলিমগণও কার্যকর করতে পারেন। যেমন শিক্ষকগণ ছাত্রদেরকে পড়ালেখায় অবহেলা এবং অশিষ্ট আচরণের জন্য শাস্তি দিতে পারবেন। অনুরূপভাবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানগণ তাদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অশুভ আচরণের জন্য শাস্তিমূলক বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।
টিকাঃ
৫৬. আল-কাসানী, বদাই, খ.৯, পৃ. ৮৭
৫৭. আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যা, খ.৪, পৃ. ১৪৬