📄 অপরাধের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়া
অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে শাস্তি ছাড়াই দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলে তা শাস্তি প্রদানে কোন ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করবে কি না- তা নিয়ে ফকীহগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। অধিকাংশ আইনতত্ত্ববিদের মতে যিনা, যিনার অপবাদ ও মদ্যপান প্রভৃতি অপরাধে যখনই উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তখনি তা আমলে নিয়ে শাস্তি কার্যকর করা যাবে। কিন্তু হানাফীগণের মতে, আল্লাহর হক প্রবলভাবে জড়িত- এ জাতীয় হদ্দসমূহে (যেমন যিনা ও মদ্যপান) কোন গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া (যেমন সাক্ষীদের দূর দেশে চলে যাওয়া বা দীর্ঘ দিন অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা প্রভৃতি) অপরাধ করার পর দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলে হদ্দ অকার্যকর হয়ে পড়বে।৩০ সুতরাং দীর্ঘ দিন পর এ সব ক্ষেত্রে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে যিনার অপবাদের বেলায় যেহেতু আল্লাহর হকের সাথে মানুষের হকের বিষয়টিও জড়িত রয়েছে, তাই এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন পর সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করতে কোন অসুবিধা নেই।৩১
টিকাঃ
৩০. দীর্ঘসময় বলতে কতদিনকে বোঝানো হয়েছে তা নিয়ে হানাফীগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম মুহাম্মদ (রা)-এর মতে, তা হল সর্বোচ্চ ছয় মাস। ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর জন্য কোন সময় নির্ধারণ করে দেন নি; বরং তা বিচারক হাতে ন্যস্ত করেছেন। বিচারক সময় ও স্থান বিবেচনা করে তা নির্ধারন করবেন। (ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, দারুল ফিকর, খ.৫, পৃ. ২৮২-২৮৩)
৩১. যায়ল'ঈ, তাবয়ীনুল হাকা'ইক শারহু কানযিদ দাকা'ইক, দারুল কিতাবিল ইসলামী, খ.৩; ১৮৭-৮; আল-মাওসু'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ. ১৩, পৃ. ১২২
📄 সমঝোতা
হদ্দ যেমন ক্ষমা করে দেয়া জায়িয নয়, তেমনি হদ্দের ব্যাপারে সমঝোতা করা বা হদ্দের বিনিময় গ্রহণ করাও জায়িয নয়।৩২ এ কারণে কোন চোর, মদ্যপায়ী কিংবা ব্যভিচারীর সাথে কোন বিনিময় নিয়ে কিংবা কোন শর্তে সমঝোতা করে তাকে ছেড়ে দেয়া, বিচারকের কাছে নালিশ পেশ না করাও বিধিসম্মত নয়।৩৩ কেননা হুদূদের বিষয়টি একান্তভাবে আল্লাহর হকের সাথে জড়িত। তাই এ ক্ষেত্রে বান্দাহর সমঝোতা করার কোনই অধিকার নেই। কেউ যদি এসব ক্ষেত্রে কোন বিনিময় নিয়েও থাকে, তা তাকে অবশ্যই ফিরিয়ে দিতে হবে। কেননা সে তা বিনা অধিকারেই গ্রহণ করেছে।
টিকাঃ
৩২. ইবনু তাইমিয়্যা, আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, খ.২৮,প. ২৯৮-৩০৪
৩৩. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.১৭
📄 সন্দেহ
হদ্দ কার্যকর হবার জন্য অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে। যদি অপরাধ প্রমাণে কোন সন্দেহ দেখা দেয়, তাহলে হদ্দ অকার্যকর হয়ে যাবে। যেমন- যদি কেউ বিয়ের প্রথম রাত নিজের বিছানায় শায়িত কোন মেয়ে লোককে দেখে তাকে স্ত্রী মনে করেই তার সাথে সহবাস করে ফেলে এবং পরে জানতে পারে যে, শায়িত মেয়েটি তার স্ত্রী নয়, এমতাবস্থায় তার ওপর হদ্দ জারী করা যাবে না। এ ব্যাপারে ইসলামী আইনের স্বীকৃত বিধান হচ্ছে الحدود تندرئ بالشبهات - "হুদূদ সামান্যতম সন্দেহের কারণেই অকেজো হয়ে পড়ে।"৩৪
টিকাঃ
৩৪. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ادرءوا الحدود بالشبهات - "সন্দেহের কারণে হদ্দ রহিত কর।" (আল- কুরতুবী, আল-জামি' লি আহকামিল কুর'আন, খ.১৩,পৃ.২৯৮)
📄 স্বীকারোক্তি ফিরিয়ে নেয়া
যে সব হদ্দে আল্লাহর হকের প্রাবল্য রয়েছে (যেমন যিনা, চুরি ও মদ্যপানের শাস্তি) তা যদি অপরাধীর স্বীকারোক্তির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, সে সব ক্ষেত্রে অপরাধী যদি পরবর্তীতে নিজের স্বীকারোক্তি ফিরিয়ে নেয়, তাহলেও হদ্দ কার্যকর করা যাবে না। বর্ণিত রয়েছে, হযরত মা'ইয (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট যিনার কথা স্বীকার করেছিলেন, তখন তিনি তাকে স্বীকারোক্তি থেকে ফিরে আসার জন্য বারংবার উৎসাহিত করেছিলেন।৩৫ এ থেকে জানা যায়, যদি স্বীকারোক্তি থেকে ফিরে আসার কারণে হদ্দ রহিত হয়ে না যায়, তাহলে তাঁর বারংবার উৎসাহ দেবার পেছনে কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে! তদুপরি স্বীকারোক্তি থেকে ফিরে আসার কারণে অপরাধে লিপ্ত হবার ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি হয়ে থাকে।
তবে যিনার অপবাদে যেহেতু আল্লাহর হকের সাথে বান্দাহর হকও জড়িত রয়েছে, তাই কিসাসের মত এ ক্ষেত্রেও স্বীকারোক্তি ফিরিয়ে নিলে হদ্দের বিধান কার্যকর হবে। অনুরূপভাবে যে সব তা'যীরাতের সাথে বান্দাহর হক জড়িত, তাতে স্বীকারোক্তি ফিরিয়ে নিলেও তা'যীরের বিধান কার্যকর হবে।৩৬
উল্লেখ্য যে, স্বীকারোক্তি থেকে প্রত্যাবর্তন স্পষ্ট ভাষায়ও হতে পারে, ইঙ্গিতাকারেও হতে পারে। এ কারণেই স্বেচ্ছায় স্বীকৃতিদানকারী ব্যভিচারীকে লোকেরা যদি প্রস্তর নিক্ষেপ করতে শুরু করে আর সে যদি পালিয়ে যায় এবং ফিরে না আসে, তা হলে তার পিছু গমন করা যাবে না। অনুরূপভাবে স্বেচ্ছায় স্বীকৃতিদানকারী অপরাধীকে বেত্রাঘাত শুরু করার পর পালিয়ে গেলে তারও পিছু গমন করা যাবেনা। কেননা এমতাবস্থায় পালিয়ে যাওয়ার একটি অর্থ এ হতে পারে যে, সে তার স্বীকারোক্তি থেকে ফিরে এসেছে।৩৭
টিকাঃ
৩৫. সহীহ আল বুখারী, (কিতাবুল মুহারিবীন), হা.নং: ৬৪৩৮; মুসলিম, (কিতাবুল হুদূদ), হা.নং: ১৬৯২, ১৬৯৩
৩৬. আস-সারাঙ্গী, আল-মাবসূত, খ.৯, পৃ. ৯২-৩; আল-বাজী, আল-মুস্তকা, খ.৭, পৃ. ১৪৩; আল- মাওসু'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ. ১৭, পৃ. ১৩৪-১৩৫
৩৭. আল-মাওসু'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ. ১৭, পৃ. ১৩৪-১৩৫