📄 তা‘যীর (সাধারণ দণ্ড)
'তা'যীর' শব্দের আভিধানিক অর্থ হল বারণ করা ও ফিরিয়ে রাখা।১১ তবে শব্দটি সম্মান ও সাহায্য করা অর্থেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শরী'আতের পরিভাষায়
هو عقوبة غير مقدرة شرعا تجب حقا الله تعالى أو لأدمي في : كل معصية ليس فيها حد و لا كفارة غالبا.
সংশ্লিষ্ট যে সব অপরাধের জন্য শরী'আত নির্দিষ্ট কোন শাস্তি কিংবা কাফ্ফ্ফারা নির্ধারণ করে দেয়নি সে সব অপরাধের শাস্তিকে তা'যীর বলে।১২ স্থান, কাল-অবস্থার নিরিখে কল্যাণের দাবি অনুপাতে এ ধরনের অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত হবে। সুতরাং অপরাধ, অপরাধী, সময় ও পরিবেশের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিচারক যতটুকু ও যেরূপ শাস্তি দান করা যৌক্তিক মনে করবেন, ততটুকুই দেবেন। ইসলামী সরকার যদি 'আলিম ও মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শক্রমে শরী'আতের রীতি-নীতি বিবেচনা করে এ সব অপরাধের শাস্তির কোন পরিমাণ নির্ধারণ করে বিচারকদেরকে তা মেনে চলতে বাধ্য করে, তবে তাও জায়িয। যেমন আজকাল এসেম্বলীর মাধ্যমে দণ্ডবিধি নির্ধারণ করা হয় এবং বিচারক ও জজগণ নির্ধারিত দণ্ডবিধির অধীনে মামলা-মোকদ্দমায় রায় দেন। হুদূদ ও কিসাস জাতীয় কয়েকটি অপরাধ ছাড়া অবশিষ্ট সব অপরাধই তা'যীরী অপরাধ।১৩ যেমন- বেগানা মহিলাকে চুমো দেয়া, যিনা ব্যতিরেকে কাউকে অন্য কোন অপরাধের অপবাদ দেয়া, বিনা হেফাযতের মাল চুরি করা, খাদ্যে ভেজাল দেয়া, মাপে কম দেয়া, প্রতারণা করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া ও ঘুষ খাওয়া প্রভৃতি। এ সব অপরাধের শাস্তির মধ্যে কোনটাতে আল্লাহর অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্য প্রবল থাকে, আবার কোনটাতে বান্দাহর অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্য প্রবল থাকে।
টিকাঃ
১১. যেহেতু শাস্তি অপরাধীকে অপরাধে লিপ্ত হওয়া থেকে এবং পুনঃপুনঃ অপরাধ করা থেকে বারণ করে, ফিরিয়ে রাখে, তাই শাস্তিকেও তা'যীর বলা হয়।
১২. ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কদীর, খ. ৪, পৃ. ৪১২; আল-মাওসু'আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১২,পৃ. ২৫৪ মাওয়ার্দী বলেন, .تأديب على ذنوب لم تشرع فيها الحدود - "হদ্দ নির্ধারণ করা হয়নি- এ ধরনের অপরাধসমূহের শাস্তিকে তা'যীর বলে। (আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ.২৯৩)
১৩. হুদূদ ও তা'যীরাতের মধ্যে আরো বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন- ১. অপরাধ প্রমাণে কিংবা অপরাধের শর্তাবলীর মধ্য থেকে কোন একটিতে সামান্যটুকু সন্দেহ দেখা দিলে হদ্দ অকার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু সন্দেহ দেখা দিলে তা'যীর কার্যকর করা যায়। ২. হুদূদের বেলায় স্বীকারোক্তি ফিরিয়ে নেয়া বিধিসম্মত। কিন্তু তা'যীরের ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তি ফিরিয়ে নিলে তা'যীর মাফ হবে না। ৩. হুদুদ অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য প্রযোজ্য হয় না। কিন্তু তা'যীর অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্যও প্রযোজ্য হয়। ৪. কারো কারো মতে, অপরাধে লিপ্ত হবার পর দীর্ঘ সময় ধরে নালিশ পেশ না হওয়ার কারণে বা সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে শাস্তি না হবার কারণে কোন কোন হদ্দ রহিত হয়ে যায়; কিন্তু তা'যীর রহিত হয় না। ৫. হুদূদ ও কিসাস নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে কেবল উপযুক্ত সাক্ষ্য-দলীল ও স্বীকারোক্তি দ্বারা প্রমাণ করা যায়। কিন্তু তা'যীর সাক্ষ্য-দলীল ও স্বীকারোক্তি ছাড়া অন্যভাবেও যেমন শপথ, গণসাক্ষ্য ও বদনাম দ্বারাও প্রমাণ করা যায়। ৫. হুদূদ সকলের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ও যথাযথ কার্যকর করা কর্তব্য। কিন্তু তা'যীর লোকদের পার্থক্যানুপাতে বিভিন্ন হয়ে থাকে। (ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.৬১; আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যা, খ.১২, পৃ. ২৫৭; আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃ.২৯৩; আবদুর রহীম, মুহাম্মাদ, অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম, ঢাকাঃ ইফাবা, ২০০৭, পৃ-২০৩-২০৪)