📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 কিসাস (সদৃশ শাস্তি)

📄 কিসাস (সদৃশ শাস্তি)


কিসাস শব্দের অর্থ একই রূপ কাজ করা, পদচিহ্ন অনুসরণ করে চলা। শরী'আতের পরিভাষায় কিসাস হল অপরাধীর সাথে তার বাড়াবাড়ির অনুরূপ আচরণ করা। ৯ অর্থাৎ অপরাধী কোন ব্যক্তির যেই পরিমাণ দৈহিক ক্ষতি সাধন করবে তারও সে-ই পরিমাণ দৈহিক ক্ষতি সাধন করাই হচ্ছে কিসাস। অপরাধী তাকে হত্যা করলে প্রতিশোধ স্বরূপ সেও মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হবে এবং যখম করে থাকলে প্রতিশোধ স্বরূপ তাকেও যখম করা হবে।
উল্লেখ্য যে, কিসাসের শাস্তিও হুদূদের মতোই কুর'আন মজীদে নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু পার্থক্য এই যে, হুদূদকে আল্লাহর অধিকার বা জনস্বার্থ হিসেবে বাস্তবায়ন করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ক্ষমা করলেও তা ক্ষমা হবে না এবং হদ্দ অকার্যকর হবে না। কিন্তু কিসাসের ব্যাপারটা এর ব্যতিক্রম। কিসাসে বান্দাহর অধিকার প্রবল হওয়ার কারণে হত্যা প্রমাণিত হওয়ার পর হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের ইখতিয়ারে ছেড়ে দেয়া হয়। সে ইচ্ছে করলে কিসাস হিসেবে তার মৃত্যুদণ্ডও দাবী করাতে পারে। ক্ষমাও করে দিতে পারে। নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা হত্যাকারীদেরকে ক্ষমা করে ছেড়ে দিলে হত্যাকারীদের সাহস বেড়ে যাবে কিংবা ব্যাপক হারে হত্যাকাণ্ডও শুরু হয়ে যাবে- এ রূপ আশঙ্কা করা ঠিক নয়। কেননা, হত্যাকারীর প্রাণ সংহার করা ছিল নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অধিকার। তারা তা ক্ষমা করে দিয়েছে। কিন্তু অপরাপর লোকদের প্রাণরক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। তাই ইসলামী আইন মতে, সরকার এ দায়িত্ব পালনের জন্য হত্যাকারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা কোন শাস্তি দিয়ে এ বিপদাশঙ্কা রোধ করতে পারে। জখমের ব্যাপারটাও তদ্রূপ।

টিকাঃ
৯. ইবনু মানযুর, লিসানুল আরব, খ.৮, পৃ. ৩৪১; আল-রুকবান, 'আবদুল্লাহ, আল-কিসাস ফিন নাফস, বৈরূতঃ মু'আস্সাতুর রিসালাহ, ১৪০০হি, পৃ.১৩; আল-জাযীরী বলেন, أما القصاص فهو - أن يعاقب الجاني بمثل جنايته على أرواح الناس أو عضو من أعضائهم . “অর্থাৎ মানুষের প্রাণ কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর অপরাধী যেরূপ অপরাধ করেছে, তাকে ঠিক সেরূপ বদলা দেয়াকে কিসাস বলা হয়।” (আল-জাযীরী, আবদুর রহমান, কিতাবুল ফিকহ 'আলাল মাযাহিবিল 'আরবা 'আহ, খ.৫, পৃ. ২৪৪)
১০. এ ছাড়া কিসাস ও হুদূদের মধ্যে আরো কয়েকটি পার্থক্য রয়েছে। যেমন- ১. হদ্দের বেলায় কোন রূপ সুপারিশ করা জায়িয নয়। কিন্তু কিসাসের বেলায় সুপারিশ করা জায়িয। ২. হদ্দসমূহ (যিনার অপবাদের হদ্দ ছাড়া) দাবীর ওপর নির্ভরশীল নয়। দাবী থাকুক আর না-ই থাকুক হদ্দ অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। কিন্তু কিসাসের ব্যাপারটি পুরো দাবীর ওপর ভিত্তিশীল। কিসাসের দাবী না থাকলে তা কার্যকর করা যাবে না। ৩. হুদূদের বেলায় স্বীকারোক্তি ফিরিয়ে নেয়া বিধিসম্মত। কিন্তু কিসাসের বেলায় তা বিধিসম্মত নয়। ৪. হানাফীদের মতে, কোন কোন হদ্দের বেলায় অপরাধ করার পর দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলে সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হয় না। কিন্তু কিসাসের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন পরেও সাক্ষ্য গ্রহণ করতে বাধা নেই। ৫. অধিকাংশ ইমামের মতে, হুদূদের ক্ষেত্রে বিচারক নিজের দেখা ও জানা মতে ফায়সালা করতে পারবে না। কিন্তু কিসাসের বেলায় পারবে। ৬. সাধারণত হুদূদের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীদের দাবী কার্যকর হয় না; কিন্তু কিসাসের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীদের দাবী কার্যকর হয়। (আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়‍্যা, খ.১৭,পৃ. ১৩৪;খ.১২, পৃ. ২৫৪-২৫৭)

📘 ইসলামের শাস্তি আইন > 📄 তা‘যীর (সাধারণ দণ্ড)

📄 তা‘যীর (সাধারণ দণ্ড)


'তা'যীর' শব্দের আভিধানিক অর্থ হল বারণ করা ও ফিরিয়ে রাখা।১১ তবে শব্দটি সম্মান ও সাহায্য করা অর্থেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শরী'আতের পরিভাষায়
هو عقوبة غير مقدرة شرعا تجب حقا الله تعالى أو لأدمي في : كل معصية ليس فيها حد و لا كفارة غالبا.
সংশ্লিষ্ট যে সব অপরাধের জন্য শরী'আত নির্দিষ্ট কোন শাস্তি কিংবা কাফ্ফ্ফারা নির্ধারণ করে দেয়নি সে সব অপরাধের শাস্তিকে তা'যীর বলে।১২ স্থান, কাল-অবস্থার নিরিখে কল্যাণের দাবি অনুপাতে এ ধরনের অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত হবে। সুতরাং অপরাধ, অপরাধী, সময় ও পরিবেশের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিচারক যতটুকু ও যেরূপ শাস্তি দান করা যৌক্তিক মনে করবেন, ততটুকুই দেবেন। ইসলামী সরকার যদি 'আলিম ও মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শক্রমে শরী'আতের রীতি-নীতি বিবেচনা করে এ সব অপরাধের শাস্তির কোন পরিমাণ নির্ধারণ করে বিচারকদেরকে তা মেনে চলতে বাধ্য করে, তবে তাও জায়িয। যেমন আজকাল এসেম্বলীর মাধ্যমে দণ্ডবিধি নির্ধারণ করা হয় এবং বিচারক ও জজগণ নির্ধারিত দণ্ডবিধির অধীনে মামলা-মোকদ্দমায় রায় দেন। হুদূদ ও কিসাস জাতীয় কয়েকটি অপরাধ ছাড়া অবশিষ্ট সব অপরাধই তা'যীরী অপরাধ।১৩ যেমন- বেগানা মহিলাকে চুমো দেয়া, যিনা ব্যতিরেকে কাউকে অন্য কোন অপরাধের অপবাদ দেয়া, বিনা হেফাযতের মাল চুরি করা, খাদ্যে ভেজাল দেয়া, মাপে কম দেয়া, প্রতারণা করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া ও ঘুষ খাওয়া প্রভৃতি। এ সব অপরাধের শাস্তির মধ্যে কোনটাতে আল্লাহর অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্য প্রবল থাকে, আবার কোনটাতে বান্দাহর অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্য প্রবল থাকে।

টিকাঃ
১১. যেহেতু শাস্তি অপরাধীকে অপরাধে লিপ্ত হওয়া থেকে এবং পুনঃপুনঃ অপরাধ করা থেকে বারণ করে, ফিরিয়ে রাখে, তাই শাস্তিকেও তা'যীর বলা হয়।
১২. ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কদীর, খ. ৪, পৃ. ৪১২; আল-মাওসু'আতুল ফিকহিয়‍্যাহ, খ.১২,পৃ. ২৫৪ মাওয়ার্দী বলেন, .تأديب على ذنوب لم تشرع فيها الحدود - "হদ্দ নির্ধারণ করা হয়নি- এ ধরনের অপরাধসমূহের শাস্তিকে তা'যীর বলে। (আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়‍্যা, পৃ.২৯৩)
১৩. হুদূদ ও তা'যীরাতের মধ্যে আরো বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন- ১. অপরাধ প্রমাণে কিংবা অপরাধের শর্তাবলীর মধ্য থেকে কোন একটিতে সামান্যটুকু সন্দেহ দেখা দিলে হদ্দ অকার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু সন্দেহ দেখা দিলে তা'যীর কার্যকর করা যায়। ২. হুদূদের বেলায় স্বীকারোক্তি ফিরিয়ে নেয়া বিধিসম্মত। কিন্তু তা'যীরের ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তি ফিরিয়ে নিলে তা'যীর মাফ হবে না। ৩. হুদুদ অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য প্রযোজ্য হয় না। কিন্তু তা'যীর অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্যও প্রযোজ্য হয়। ৪. কারো কারো মতে, অপরাধে লিপ্ত হবার পর দীর্ঘ সময় ধরে নালিশ পেশ না হওয়ার কারণে বা সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে শাস্তি না হবার কারণে কোন কোন হদ্দ রহিত হয়ে যায়; কিন্তু তা'যীর রহিত হয় না। ৫. হুদূদ ও কিসাস নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে কেবল উপযুক্ত সাক্ষ্য-দলীল ও স্বীকারোক্তি দ্বারা প্রমাণ করা যায়। কিন্তু তা'যীর সাক্ষ্য-দলীল ও স্বীকারোক্তি ছাড়া অন্যভাবেও যেমন শপথ, গণসাক্ষ্য ও বদনাম দ্বারাও প্রমাণ করা যায়। ৫. হুদূদ সকলের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ও যথাযথ কার্যকর করা কর্তব্য। কিন্তু তা'যীর লোকদের পার্থক্যানুপাতে বিভিন্ন হয়ে থাকে। (ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খ.৪, পৃ.৬১; আল-মাওসূ'আতুল ফিকহিয়্যা, খ.১২, পৃ. ২৫৭; আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলতানিয়‍্যা, পৃ.২৯৩; আবদুর রহীম, মুহাম্মাদ, অপরাধ প্রতিরোধে ইসলাম, ঢাকাঃ ইফাবা, ২০০৭, পৃ-২০৩-২০৪)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00