📄 কারো মৃত্যু হলে করণীয়
১. কোন ব্যক্তির মৃত্যু হলে এ খবর স্থানীয় সংবাদপত্রের মাধ্যমে বন্ধুবান্ধব ও জনগণের মধ্যে প্রচার করতে হবে। তবে এ ধরনের ঘোষণায় মৃত ব্যক্তির প্রশংসা বা সাফল্য বর্ণনা করা উচিত নয়। বরং ঘোষণায় মৃত ব্যক্তির জন্য সকলকে দোয়া করার আহ্বান জানাতে হবে।
২. গোসল এবং কাফনের কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়ার পর লাশ দাফনের প্রস্তুতি নিতে হবে। মিতব্যয়িতার সাথে একাজ সম্পাদন করতে হবে।
৩. পুরুষের মৃত দেহ পুরুষ এবং নারীর মৃত দেহ নারী গোসল করাবে। স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে জীবিত জন মৃতের গোসল করাবে।
৪. মৃত ব্যক্তিকে পানি দিয়ে এবং সম্ভব হলে জলপদ্ম (Lotus leave) দিয়ে বেজোড় সংখ্যাং ২, ৫ বা আরো বেশিবার গোসল করাবে এবং ডান দিক থেকে গোসল শুরু করাবে। সর্বশেষ গোসলের সময় কপূর দেয়া যেতে পারে। মৃত ব্যক্তি নারী হলে তার চুল তিনটি বিনুনি করে মাথার পিছনে রেখে দিতে হবে।
৫. মৃতের কাফনের কাপড় সাধারণ মানের হওয়া উচিত এবং বাহুল্য ব্যয় এক্ষেত্রে সমর্থনযোগ্য নয়। স্বাস্থ্যগত কারণ ছাড়া 'কফিন' ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।
৬. শহীদের মর্যাদাসম্পন্ন লাশের ক্ষেত্রে তাদের শরীর থেকে অলংকার খুলে ফেলতে হবে এবং রক্ত সম্বলিত কাপড় চোপড়েই (না ধুয়ে) দাফন করতে হবে।
৭. পবিত্র হজ্ব বা উমরাহ পালনকালে কোন মুসলমানের মৃত্যু হলে তার দেহ সম্ভব হলে পানি ও জলপদ্ম দিয়ে গোসল করাতে হবে এবং যে দু'খণ্ড কাপড় পরে তিনি হজ্ব বা উমরাহ পালন করছিলেন তা দিয়েই দাফন করাতে হবে। এক্ষেত্রে কোন প্রকার সুগন্ধী বা আতর মৃতদেহে লাগানোর প্রয়োজন নেই বা মাথাও ঢাকতে হবেনা।
৮. যে ব্যক্তি মৃতদেহ গোসল করিয়েছে তার গোসল করা উচিত এবং যারা লাশ বহন করবে তাদের অজু করা উচিত।
৯. যারা মৃতদেহ গোসল করাবে তারা মৃত ব্যক্তির কোন প্রকার শারীরিক অসম্পূর্ণতা লক্ষ্য করে থাকলে তা অন্যদের কাছে বলবে না। ভাল দিকের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
১০. মৃতদেহ গোসল ও কাফনের কাপড় পরানোর পর বিলম্ব না করে জানাজার নামাজ পড়ে কবর দেয়ার তাগিদ করা হয়েছে।
টিকাঃ
* এদেশে ছোট শহর ও পল্লী এলাকায় সংবাদপত্র না থাকায় সাধারণতঃ মাইকের সাহায্যে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা যায়- অনুবাদক।
১. 'কফিন' অর্থ আরবি নয় বরং শব্দটি ইংরেজি অর্থ প্রকাশ করেছে অর্থাৎ দাফনের আগে লাশ রাখার জন্য বাক্স বা খাঁচার ব্যবহার প্রসঙ্গ।
📄 দাফন কাজে অনুগমন
১. কোন মুসলমানের দাফনে অবশ্যই অন্যান্য মুসলমানের যোগ দেয়া উচিত। সুতরাং মৃত ব্যক্তি বা তার আত্মীয়-স্বজন সরাসরি পরিচিত হোক বা না হোক দাফন কাফনের মিছিলে যোগ দিতে কোন মুসলমানের বিলম্ব করা উচিত নয়।
২. দাফন কাজে যোগদানের বিষয়টি দু'টি পর্যায়ে বিভক্তঃ প্রথম পর্যায় জানাজার নামাজ পড়া পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় পর্যায় মৃত ব্যক্তির দাফন পর্যন্ত। যারা প্রথম পর্যায়ে যোগ দেবেন তাদের দ্বিতীয় পর্যায় সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উত্তম।
৩. শিশুসহ মৃত্যুবরণকারী প্রত্যেক মুসলমানের জানাজা পড়তে হবে। জানাজার জন্য লাশ মসজিদে নিয়ে যাবার প্রয়োজন নেই। মসজিদের বাইরে অথবা মসজিদের প্রাঙ্গণে জানাজার নামাজ পড়তে হবে।
৪. জানাজায় কেউ কেউ বিশেষতঃ মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনরা অন্যদের আসার জন্য প্রতীক্ষা না করে জানাজায় অংশ নেয়া উচিত।
৫. দাফন যাত্রার গতি খুব দ্রুত হওয়া উচিত নয়।
৬. দাফন কাজে যারা পদব্রজে অনুগমন করবে তারা কফিনের সামনে বা পিছনে অথবা ডানে বা বামে থেকে হাঁটবে। যারা ঘোড়ায় চড়ে বা গাড়িতে যাবে তারা পিছনে চলবে।
৭. লাশের অনুগমনকালে ধূপ-ধুন বা মোমবাতি নেয়া, জোরে বা উচ্চস্বরে 'আল্লাহ' বলা, সশব্দে কাঁদা বা জোরে শোরে কোরআন পড়া নিষিদ্ধ।
৮. দাফনের মিছিলের বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত হওয়া উচিত।
৯. লাশের কোন মিছিল দেখলে مسلمانوں উচিত দাঁড়িয়ে যাওয়া।
১০. কবরস্থান দূরে না হলে লাশের কফিন গাড়ি বা অন্যান্য যানবাহনে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
১১. যারা লাশ বহন করবে তাদের অজু করা উচিত। এর ফলে তারা শারীরিকভাবে এবং আবেগপ্রবণতার দিক থেকে সতেজ থাকবে।
১২. দাফন মিছিলে অনুগমনকালে কবরস্থান দূরে না হলে গাড়িতে যাওয়ার চাইতে হেঁটে যাওয়াই ভাল। দাফনের পর ফিরে আসার সময় গাড়িতে আসা যেতে পারে।
টিকাঃ
* মালিকি ও হানাফি মতে ইহরাম অবস্থায় মৃত ব্যক্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা সমর্থন করেনা।
📄 দাফন
১. مسلمانوں একান্তভাবে ব্যবহারের জন্য একটি বিশেষ কবরস্থান সংরক্ষিত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অমুসলমানদের কবরস্থানে مسلمانوں দাফন না করা এবং মুসলিম কবরস্থানেও অনুরূপ বিধান করা অতীব জরুরি।
২. কোন ব্যক্তির মৃত্যুর পর বিশেষভাবে অনুরোধ করে হলেও তার লাশ পুড়িয়ে ফেলা যাবে না। এ ধরনের অনুরোধ কখনই পূরণ করা চলবে না।
৩. শহীদান (যারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে বা অন্যান্য কারণে নিহত হয়ে শহীদের মর্যাদাপ্রাপ্ত) ছাড়া অন্যান্যদেরকে কবরস্থানে দাফন করতে হবে। শহীদদেরকে তাদের শাহাদাতস্থলে দাফন করতে হবে।
৪. যে পাড়ায় বা মহল্লায় ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে সেখানেই তাকে দাফন করা উচিত। মৃত ব্যক্তির নিজ দেশে নিয়ে যাওয়া অথবা অন্য শহরে স্থানান্তরিত করা বাঞ্ছিত নয়।
৫. নিম্নোক্ত ব্যতিক্রম ছাড়া মৃত্যুর পরপরই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দাফন সম্পন্ন করতে হবে:
(ক) রাতে (খ) সূর্যোদয় থেকে সূর্য-দিগন্তে ৪.৫ ডিগ্রি না উঠা পর্যন্ত (পুরোপুরি সূর্য উঠা পর্যন্ত)। (গ) মধ্যাহ্নগগনে সূর্যের অবস্থান কালে (সূর্য যখন মধ্য রেখায় অবস্থান করে) তার মধ্যরেখা অতিক্রম করা পর্যন্ত (ঘ) সূর্যাস্তের আগে যে সময় সূর্যের রশ্মি নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে পুরোপুরি সূর্যাস্ত পর্যন্ত। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এ সময়ের মধ্যে মৃত ব্যক্তির দাফন করা নিষিদ্ধ।
৬. রাষ্ট্রীয় নেতৃবৃন্দ অথবা ধনীদের জন্য বিশেষ কবরস্থান নির্বাচন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ইসলাম জীবনে ও মরণে শ্রেণীভেদ প্রত্যাখ্যান করেছে।
৭. যুদ্ধকালে বা মহামারীর সময় একই কবরে একাধিক ব্যক্তিকে দাফন করতে হলে জীবিতকালে যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করেছে, তাকেই আগে দাফন করতে হবে।
৮. শুধু পুরুষ লোকেরাই মৃত ব্যক্তিকে কবরে স্থাপন করবে। মৃতের পুরুষ আত্মীয়রাই সত্যিকার অর্থে তাকে (নারী হোক বা পুরুষ হোক) কবরে নামানোর হকদার।
৯. মৃতের গোসল, কাফন পরানো বা কবরে নামানোর কাজে ভাড়াটে লোক নিয়োগ করা অনুচিত। মৃত ব্যক্তির আত্মীয় ও পরিবারকে এসব কাজ সম্পাদন করতে হবে। জীবনে ও মরণে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্কের উপর ইসলাম গুরুত্ব আরোপ করেছে।
১০. মৃতকে কিবলামুখী করে ডানদিকে কবরে শুইয়ে দিতে হবে।
১১. মৃত ব্যক্তিকে কবরে স্থাপনকারীরা বলবে : “বিসমিল্লাহি ওয়াআলা মিল্লাতে রাসূলিল্লাহি” (আল্লাহর নামে এবং তার রহমতে ও রাসূলুল্লাহর (সা.) সুন্নাহর অনুসরণে); কবরের পিছন দিক হতে লাশ কবরে স্থাপন করতে হবে।
১২. কবরস্থানে লাশ স্থাপন করা পর্যন্ত কবরে দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। যারা কবরে লাশ স্থাপন করবে তারা ছাড়া আত্মীয়-স্বজনরা বসে থাকতে পারবে।
১৩. কবরে লাশ নামানোর পর এবং তার উপর ঢাকনা দেওয়ার পর কবরের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন তিন মুঠি মাটি কবরে স্থাপন করবে।
১৪. মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির তওবা করানো একটি নব্য রেওয়াজ। ব্যক্তির মৃত্যুর আগে তওবা করাতে হবে।
১৫. মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা সুন্নত।
📄 কবর দেওয়ার পর
১. মৃত ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মারা গেলে আত্মীয়-স্বজনের উচিত তার ঋণ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিশোধ করা, অবশ্য যদি তা তাদের সামর্থ্যে কুলায়।
২. ইসলামি শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক না হলে মৃত ব্যক্তির সর্বশেষ ইচ্ছা পূরণ করতে হবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, ইসলাম যেহেতু নির্দিষ্ট লোকদের জন্য উত্তরাধিকার আইন কার্যকর করেছে, সেহেতু মৃত ব্যক্তি তার কোন উত্তরাধিকারীকে অতিরিক্ত অর্থ দেয়ার ওছিয়ত করলে তা পূরণ করা ঠিক হবেনা।