📄 কথা বলা ও শোনা
কথা বলা যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এবং তা ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশও বটে।
১. প্রত্যেক মুসলমানের মিতভাষী হওয়া উচিত এবং এটি একটি উত্তম গুণ। হাদিসে বলা হয়েছে, কেউ হয় ভাল কথা বলবে অথবা নীরব থাকবে।
২. নীরব থাকাকে দোষ হিসেবে বিবেচনা করে কোন মুসলমানের শুধু কথা বলার খাতিরেই কথা বলা উচিত নয়। দোষটা হচ্ছে: খারাপ কথা বলা এবং বেশি কথা বলা। যা ভাল তা বলা তার কর্তব্য, নতুবা চুপ থাকা দরকার। চুপচাপ থাকা নিঃসন্দেহে ভাল গুণ, কিন্তু এমনটি করা যাবেনা যাতে মানুষ বিরক্ত হয়।
৩. মুসলমানদের অবশ্যই সত্যনিষ্ঠ হতে হবে এবং কেউ খুশি হোক বা বেজার হোক সত্য কথা বলতে হবে। তিক্ত হলেও তাকে সত্য কথা বলতে হবে।
৪. মুসলমানদের কথা বলার আগে সতর্ক চিন্তা করতে হবে এবং এমন কথা বলা উচিত নয়, যাতে তাকে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাইতে হয়।
৫. বক্তৃতায় অনাড়ম্বর ও স্বচ্ছ ভাষা ব্যবহার করা উচিত। বক্তৃতায় অতিরিক্ত সতর্ক ভাব এবং কৃত্রিমতা পরিহার করতে হবে। ভাষাগত দক্ষতা প্রদর্শন অথবা বক্তা অন্যদের চাইতে বেশি জ্ঞানের অধিকারী এটা প্রদর্শনের জন্য অদ্ভূত অলংকারযুক্ত শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয়।
৬. যাদের সাথে কথা বলা হচ্ছে, তাদের প্রতি হৃদ্যতাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকানো সৌজন্যের নিদর্শন।
৭. প্রতিটি ঘটনার সাথে একটি নির্দিষ্ট বিষয় সম্পৃক্ত থাকে। এজন্যে আলোচিত বিষয় ও ঘটনার মধ্যে শিষ্টতা ও যথার্থতা থাকতে হবে।
৮. প্রত্যেক মুসলমান যা বলছে তার সত্যতা ও নির্ভুলতার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে।
৯. বক্তৃতা শ্রবণরত লোকেরা যদি বক্তার বক্তব্য অনুধাবন করতে না পারে এবং বক্তৃতার পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন হয়, তাহলে বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করা ভদ্রতার নির্দশন।
১০. দ্রুত কথা বলা উচিত নয়। অতি ধীরে বা অতি দ্রুত কথা বলা, অতি উচ্চ বা অত্যন্ত মৃদুস্বরে কথা বলা উচিত নয়। এর ফলে শ্রোতারা বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ে।
📄 বক্তৃতার গ্রহণযোগ্য ভাষা
১. কথ্য ও অশালীন শব্দ যতদূর সম্ভব পরিহার করতে হবে।
২. বিদেশী শব্দ ও পরিভাষা পরিহার করা উচিত।
৩. প্রত্যেকের উচিত শ্রুতিমধুর, গ্রহণযোগ্য এবং নৈতিক প্রকাশভঙ্গি অর্জন করা।
৪. মুসলমানের পক্ষে কারো প্রতি অভিশাপ দেওয়া শোভন নয়।
৫. প্রত্যেক মুসলমানের অপশব্দ বা আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করা অনুচিত। তাকে গালিগালাজপূর্ণ ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। কটুবাক্য বা অশালীন প্রকাশভঙ্গির জন্য যদি কেউ কারো থেকে দূরে থাকে, সেটা সেই ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের প্রতি কালিমাস্বরূপ।
৬. মৃত ব্যক্তিদের গালিগালাজ করা অন্যায় এবং জীবিতদের প্রতি গালিগালাজের ন্যায় তা একইভাবে নিষিদ্ধ।
৭. নিজের ভাগ্যের প্রতি দোষারোপ করা এবং খোদার প্রতি অবিচার করার অভিযোগ مسلمانوں জন্য দূষণীয় এবং তা পরিহার করতে হবে।
৮. বিশেষভাবে মুসলমানকে অথবা সাধারণভাবে সকলকে নীচু চোখে দেখা খারাপ বিষয়।
৯. নিজের প্রতি, নিজের সন্তানদের প্রতি, গৃহ ভৃত্যদের প্রতি অভিসম্পাত দেওয়া নিষিদ্ধ।
১০. এমন কতিপয় বক্তব্য যা ইসলামের মৌলিক নীতির পরিপন্থী, যেমন, এমন কিছু বলা যাতে খোদার শরিকানা প্রকাশ করে- সেগুলো পরিহার করতে হবে। কোন মুসলমান কখনও বলবেনাঃ "খোদার ইচ্ছা এবং অমুক অমুকের ইচ্ছা হলে।" বরং তার বলা উচিত "একমাত্র খোদা যদি ইচ্ছা করেন অথবা খোদা যদি ইচ্ছা করেন, তাহলে অমুকের মাধ্যমে এটা পারে।" সে কখনো বলবেনা: "খোদা ও তুমি ছাড়া আমার কোন ভরসা নেই" বরং বলবে : "খোদা ছাড়া আমার কোন ভরসা নেই; তারপর আল্লাহ চাইলে, তোমরা রয়েছো।" সে কখনো বলবেনা: "আমি অমুকের শপথ করে বলছি।"
১১. বায়ু, বৃষ্টি বা অন্যান্য প্রাকৃতিক ঘটনার প্রতি দোষারোপ করা নিষেধ; কারণ এগুলো খোদার নির্দেশে সম্পাদিত হয়। বৃষ্টি বা বায়ুকে গালিগালাজের পরিবর্তে বলা যায় : "হে খোদা এগুলোকে রহমত হিসেবে দাও, শান্তি হিসেবে নয়"। তাছাড়া পোষা মোরগকে গালি দেয়া উচিত নয়, কারণ এরা লোকজনকে ফজরের নামাজের জন্য জাগিয়ে দেয়।
১২. কোন মহিলার উচিত নয় অন্য মহিলার সঙ্গে খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে অন্তরঙ্গ হওয়া এবং তারপর তার নিজ স্বামীর কাছে অথবা কারো কাছে প্রকাশ করা।
১৩. কোন মুসলমান কোন আলোচ্য বিষয়ে তার জ্ঞানের প্রাধান্য প্রদর্শনের চেষ্টা করবে না, সে বরং বারংবার 'আমি' শব্দ উচ্চারণ পরিহার করবে।
১৪. কোন কাজের জন্য কাউকে দোষারোপ করার ব্যাপারে নমনীয় হতে হবে এবং অন্য লোকের সামনে তা না করাই ভাল।
১৫. কোন মুসলমান, যত ভাল হোকনা কেন, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে অন্যের ঈমান আকিদা বা চরিত্রের প্রতি কালিমা লেপন বা গালিগালাজ করবে না।
১৬. কোন মুসলমানের এমন কিছু বলা উচিত নয়, যাতে কারো মনোকষ্ট বা কারো ব্যাপারে ভুল রায় হতে পারে অথবা ভুল উদ্ধৃতি দেয়া হয়ে যেতে পারে। এমন বিষয় যাতে অন্যেরা বিব্রত হয়, তা না করা ও না বলাই ভাল।
১৭. কোন মুসলমান যেমন তার বক্তৃতায় অন্যের প্রতি দোষারোপ বা গালিগারাজ করবে না, তেমনি সে নিজের প্রতিও দোষারোপ বা গালিগালাজ করবে না।
১৮. কোন মুসলমান অন্য কোন ব্যক্তিকে তার উপস্থিতিতে কখনো প্রশংসা করবে না। যদি সে এটা না পারে, তাহলে তার প্রকাশভঙ্গিতে মধ্যম পন্থার অনুসারী হবে। কারণ শুধু খোদাই কাউকে নিষ্কলুষ আখ্যায়িত করতে পারে।
১৯. مسلمانوں কাজ হচ্ছে: যারা অহরহ অন্যের সমালোচনা করে তাদের থামিয়ে দেওয়া।
২০. অন্যদের সাথে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গোপনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা উচিত নয়। এটা একজনের মধ্যে সীমিত রাখাই শ্রেয়।
২১. কোন মুসলমান তৃতীয় কোন ব্যক্তির খারাপ দিক বলতে চাইলে তার অনুমতি দেবেনা। তার চাইতে বরং সদিচ্ছা নিয়ে অন্যদের সাথে মেলামেশা ও সাক্ষাৎ করা উচিত। যদি সে অন্য লোকদের সম্পর্কে উল্টাপাল্টা বক্তব্য শুনতে পায়, তাহলে তার দায়িত্ব হচ্ছে: কথিত ব্যক্তির স্বপক্ষে বক্তব্য রাখা।
২২. কোন কাজ করার পর মুসলমানের এটা প্রকাশ করা উচিত নয় যে, সেই এটা সম্পাদন করেছে অথবা অন্যভাবে বলার চেষ্টা করা যে, সে এটা সম্পাদন করেছে।
২৩. অনেকক্ষণ ধরে বক্তৃতা করা বদঅভ্যাস। বক্তৃতাকালে মধ্যমপন্থা অনুসরণ করা শ্রেয়।
২৪. কোন মুসলমান যে জিনিসের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, সে ব্যাপারে কথা না বলাই ভাল।
২৫. অন্যদের একান্ত আলোচনার সময় আড়িপাতা নিষেধ।
২৬. সহযোগী مسلمانوں মধ্যেই 'ভাই' শব্দের ব্যবহার সীমিত রাখতে হবে।
২৭. কোন মুসলমানকে কাফের বলা বা তার ঈমান নাই বলা- সম্পূর্ণ নিষেধ।
২৮. কোন ব্যক্তি থেকে যদি কেউ কিছু জানতে চায়, তাহলে প্রথমে তাকে সালাম সম্ভাষণ জানাবে, ঐ সময় কি ধরনের কাজে ব্যস্ত- তা বিবেচনা করবে, তারপর প্রয়োজনীয় বিষয়ে কথা বলবে।
২৯. কোন মুসলমান যখন নবী করিম (সা.) সম্পর্কে কথা বলবে অথবা তার সাক্ষাতে নবী (সা.) এর কথা বলা হয়, তখনই সে বলবে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক)- এটা বলা সুন্নত।
৩০. কোন মুসলমান খোদার ইচ্ছার উল্লেখ ছাড়া ভবিষ্যতের ঘটনা সম্পর্কে নির্দেশাত্মক পরিভাষা ব্যবহার করবেনা, বলবেঃ ইনশাআল্লাহ (খোদা যদি ইচ্ছা করেন)।
৩১. কোন মুসলমান অন্য কোন ব্যক্তির সমালোচনা বা গালিগালাজ বা তার দোষ ত্রুটি বলবেনা, যদিও ঐ ব্যক্তি তাকে সমালোচনা বা গালিগালাজ করে এবং তার দোষত্রুটি ধরিয়ে দেয়।
📄 শ্রবণ
মুসলমানদেরকেঃ
১. যতদূর সম্ভব ভদ্রতার সঙ্গে অন্যের কথা শুনতে হবে।
২. অন্যেরা যখন কথা বলবে, তখন তাদের বাধা না দেওয়া উচিত।
৩. যে ব্যক্তির সাথে কথা বলা হচ্ছে, তার মুখোমুখি হয়ে কথা বলা উচিত এবং তার বক্তব্য আগ্রহের সাথে শোনা উচিত। আলোচিত বিষয়ে আগ্রহ না থাকলেও নিজেকে ধৈর্য ধরতে হবে যদি বিষয়টি ইসলাম, তার নীতি অথবা নবী করিম (সা.) এর বিরোধী না হয়। এক্ষেত্রে হয় কথা বলা বন্ধ করবে অথবা সঙ্গ ত্যাগ করবে।
৪. যে ব্যক্তির সাথে সে একমত নয়, এমন ব্যক্তির সাথে যুক্তিহীন কথাবার্তায় জড়িয়ে পড়া উচিত নয়।
📄 শপথ করা
১. যতদূর সম্ভব শপথ করা এবং শপথ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
২. মুসলমানরা শুধু আল্লাহ, তার কোন সিফাতের নামে শপথ নেবে। নবী, নামাজ, কাবা অথবা কুরআনের ন্যায় কোন কিছুর নামে শপথ নিতে পারেনা।
৩. খারাপ কাজে আল্লাহর নামে শপথ করা মহাপাপ।
৪. কথায় কথায় খোদার নামে কসম করা উচিত নয়।
৫. যদি কোন মুসলমান কোন কিছু সম্পাদনের বা কোন কিছু থেকে বিরত থাকার শপথ নেয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে দেখে যে, কিছু কাজ করাই উত্তম, তাহলে তার শপথ পূরণ না করা উচিত এবং সেজন্যে কাফফারা আদায় করা উচিত।
৬. মুসলমানদের কর্তব্য হচ্ছে: শপথ পূরণ করা। সুতরাং শপথ নেয়ার আগে তাকে নিশ্চিত হতে হবে যে, অঙ্গীকার পূরণের সামর্থ্য তার আছে।
৭. 'তুমি যদি এটা না কর বা ওটা না কর, তাহলে বউ তালাক দেব'- এ ধরনের হুমকি দেওয়া অরুচিকর এবং مسلمانوں জন্য অশোভনও বটে। এ ধরনের তুচ্ছ ও শিশুসুলভ প্রসঙ্গে বিয়ের প্রসঙ্গ টেনে আনা উচিত নয়।
৮. কোন কোন ক্ষেত্রে, যেমন ব্যবসা বা আর্থিক লেনদেন, শপথ করা উচিত নয়।
৯. ওয়াদাভঙ্গ করা চলবেনা। কোন মুসলমান যদি ওয়াদাভঙ্গ করে, তাহলে ১০জন দুঃস্থ ব্যক্তিকে খাওয়াতে হবে অথবা এদের প্রত্যেককে এক প্রস্থ কাপড় দিয়ে কাফফারা আদায় করতে হবে। যদি সে আর্থিকভাবে এ কাফফারা আদায়ে সমর্থ না হয়, তাহলে তাকে উপর্যুপরি তিনদিন রোজা রাখতে হবে।
১০. কোন মুসলমান যদি ইসলামের নিষিদ্ধ কাজ করার শপথ নেয়- যেমন যে বস্তুর মালিক সে নয়, তা নিয়ে নেয়া- তাহলে তার উচিত শপথ ভঙ্গ করা।
১১. কোন মুসলমান যদি ইসলাম বিরোধী কোন কাজ সম্পাদন করতে শপথ নেয়, তাহলে তার শপথ পূরণ না করা এবং কাফফারা আদায় করা কর্তব্য।