📄 সুষ্ঠু সামাজিক সম্পর্ক
ইসলামি সমাজের কতিপয় বিধিবিধান মানা হলে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক সমন্বিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে- প্রথমতঃ অন্যের প্রতি কর্তব্য, দ্বিতীয়তঃ অপরিহার্য ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য অর্জন করা এবং তৃতীয়তঃ ব্যক্তিগত খারাপ দিকগুলো পরিহার করা।
📄 অন্যদের প্রতি কর্তব্য
১. কথা বলা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ এবং সামাজিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সুতরাং কি বলা হচ্ছে এবং কিভাবে বলা হচ্ছে তা খুব বিজ্ঞতার সাথে বিবেচনা করে বলতে হবে।
২. সততা ব্যক্তিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে এবং সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলতেও সহায়তা করে। এটা একজন ভাল মুসলমানের অপরিহার্য গুণ।
৩. কথাবার্তার সময় অমায়িক মৌখিক অভিব্যক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা অন্যের প্রতি ব্যক্তির কর্তব্যের অংশ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
৪. লোকদের কর্মের ভিত্তিতেই মুসলমানকে তাদের বিবেচনা করতে হবে। যারা তার সাথে সদ্ব্যবহার করে তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করতে হবে। কোন মানুষ অন্যের গোপন ইচ্ছা ও চেতনা জানতে পারেনা- এটা বিচারের ভার আল্লাহর। কিন্তু যার অসততা ধরা পড়ে, সে সদিচ্ছা প্রকাশ করলেও তাকে বিশ্বাস করা যায়না।
৫. সম্মান ও সহৃদয়তার সাথে অন্যের সহিত সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
৬. ওয়াদা করার আগে মুসলমানকে নিশ্চিত হতে হবে যে, তিনি এ ওয়াদা রক্ষা করতে পারবেন। অজুহাত দিয়ে এই ওয়াদা খেলাপ করা যাবেনা। ভাবলে চলবেনা যে, এই অজুহাতই যথেষ্ট। এ অজুহাত অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে গেল, একথা ভাবলে তার ব্যাপারে খারাপ ধারণার সৃষ্টি হবে।
৭. একই সঙ্গে বহু প্রতিশ্রুতি দেয়া অথবা বহু লোকের প্রতিশ্রুতি দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ হয়তো তিনি এতগুলো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবেন না।
৮. অন্যান্যের প্রতি সামাজিক কর্তব্যের মধ্যে রয়েছে: তারা পীড়িত হলে তাদের দেখতে যাওয়া এবং মৃত্যুবরণ করলে তাদের দাফন কাফনে অংশ নেয়া।
৯. যে জনসাধারণকে ধন্যবাদ দেয়না সে খোদার শুকরিয়া আদায় করেনা (হাদিস)। কারো প্রতি কৃত উপকারের জন্য তাকে ধন্যবাদ দেয়ার উত্তম উপায় হচ্ছে তাকে বলাঃ 'জাযাকাআল্লাহ্ খায়রান' (আল্লাহ তোমাকে পুরস্কৃত করুন)।
১০. কোন ব্যক্তি হারাম বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোন বিষয় ছাড়া সাহায্য চাইলে মুসলমানের উচিত তাকে সাহায্য করা। কেউ সহযোগিতা চাইলে তাকে দ্বিধাহীন চিত্তে সাহায্য করতে হবে।
১১. দাওয়াত গ্রহণ করা উচিত। কোন বিয়ের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়।
১২. কোন মুসলমানের পোশাক, শরীর বা মুখ থেকে পিঁয়াজ বা রসুনের ন্যায় বস্তুর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে অন্যদের অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলা উচিত নয়।
টিকাঃ
১. আবু দাউদ, তিরমিজি।
📄 অপরিহার্য ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য
সাধারণভাবে বলতে গেলে সচ্চরিত্রের মত কোন ভাল গুণ নেই। সর্বোত্তম লোকেরাই সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। আর খারাপ লোকেরা মন্দ চরিত্রের অধিকারী। সচ্চরিত্রের কয়েকটি দিক তুলে ধরছি, যা সকলের কাঙ্ক্ষিত। একজন মুসলমানের জিন্দেগি হবে নিম্নরূপঃ
১. বিনয়ী হতে হবে এবং কোনরূপ গর্ব করলে চলবে না।
২. কোন আস্থার আসনে বসানো হলে, সেই আস্থা অক্ষুন্ন রাখা দরকার।
৩. সর্বদা সত্য কথা বলবে এবং নির্দেশ মত কাজ করতে হবে।
৪. মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের প্রতি স্নেহদৃষ্টি, দয়া ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে।
৫. যার সহায়তা প্রয়োজন তাকে সাহায্য করা এবং সাহায্য না চাইলেও দুঃস্থকে সহায়তা দেয়া প্রয়োজন।
৬. ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের আসনে থেকে ক্ষমা করা উচিত।
৭. অপরের সৎ চিন্তাকে মূল্য দেয়া উচিত।
৮. অন্যের প্রতি বন্ধুসুলভ হওয়া এবং তাদের সাথে বন্ধুর মত ব্যবহার করা কর্তব্য।
৯. অপরে পরামর্শ চাইলে আন্তরিকভাবে পরামর্শ দেয়া প্রয়োজন।
১০. যে যার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, তার সাথে সে ব্যাপারে কথা বলবে না।
১১. জরুরি বা প্রয়োজন নাহলে অন্যের কাছ থেকে কোন কিছু কখনও চাইবে না।
১২. ওয়াদা অক্ষুন্ন রাখা।
১৩. কর্তার রাগ প্রশমিত করা এবং নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত হওয়া।
১৪. যারা ইসলামের চর্চা করে, তাদের প্রতি তার সম্পর্কের বিশেষ গুরুত্ব দেয়া।
১৫. সর্বদা ধৈর্যশীল হওয়া।
১৬. আগে যার সাথে ঝগড়া হয়েছে, তাকে সম্ভাষণ জানিয়ে আন্তরিকতা প্রদর্শন করা।
১৭. দায়িত্বদানকারী অথবা নিয়োগকারীর পরিবার ও আত্মীয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
১৮. মিতাচারী হওয়া।
১৯. খোদা যা দিয়েছেন, তা নিয়েই সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত হওয়া।
২০. তুচ্ছ বিষয় ছেড়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোনিবেশ করা।
২১. দুষ্ট লোকদের মোকাবেলায় দূরদর্শীতার পরিচয় দিতে হবে।
২২. অন্যের সাথে উপহার বিনিময় করা।
২৩. যে ভাল কাজ করতে চায় তাকে ভাল কাজের দিকে পরিচালিত করা।
২৪. বিবাদমান পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করা।
২৫. কাজ সম্পাদনের আগে সে সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করে নেয়া।
২৬. অন্যের প্রতি সদয় হওয়া।
২৭. অন্যান্যরা তাকে যা গোপন করতে বলে সেটা এবং অন্যদের ব্যাপারে সে যা জানতে পেরেছে তা গোপন করা।
২৮. কোন মুসলমান মনক্ষুন্ন হয়েছে, এমন কাজ করলে সেজন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।
২৯. যে দুর্ব্যবহার করেছে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া, যেন সে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে পড়ে।
৩০. প্রফুল্লচিত্তে আরেকজনের সাথে সাক্ষাৎ করা।
৩১. ভাল লোক হলে তাদের সাথে মেলামেশা করা। অন্যথা নির্জনতা অবলম্বন করাই শ্রেয়।
৩২. কারো অনুপস্থিতিতে সমালোচনা করা হলে তার পক্ষে কথা বলা।
৩৩. যে পথ হারিয়েছে তাকে পথ দেখানো বিশেষতঃ ক্ষীণ দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদেরকে পথ দেখানো।
৩৪. সহজ হতে হবে; তবে বুদ্ধি বিবেচনাহীন হওয়া চলবে না।
৩৫. দানশীল হতে হবে, তবে অমিতব্যয়ী হওয়া যাবে না।
৩৬. দুর্বলের প্রতি সদয় এবং পিতামাতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
৩৭. কারো সম্পর্কে তথ্যাদি জানার জন্য সে গালিগালাজ বা গালমন্দ করলে প্রতিশোধ না নেয়া অথবা তার সম্পর্কে কিছু জানার জন্য গালিগালাজ না করা।
📄 ব্যক্তিগত খারাপ বৈশিষ্ট্য
সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে সাফল্য অর্জন করতে চাইলে ব্যক্তিগত চরিত্রের কতিপয় নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য পরিহার এবং একই সঙ্গে কতিপয় ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যের চর্চা করতে হবে। নিম্নে নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের একটি তালিকা দেয়া হলো যা মুসলমানকে পরিহার করতে হবে:
১. অত্যন্ত ভয় পাওয়া, উত্তেজিত বা আকস্মিকভাবে ক্ষুব্ধ হওয়া।
২. অন্যদের সাথে খারাপ সম্পর্ক রাখা।
৩. সংশ্লিষ্ট নয় এমন বিষয়ে কথা বলা।
৪. ক্ষুব্ধতা বা ক্রোধ প্রকাশ করা (বিশেষত সেটা যদি কোন গরিব মানুষের পক্ষ হতে হয়; তবে ঐব্যক্তি হয়তো নিজেকে বড় ভাবতে পারে, অন্যদের চোখে সে কার্যতঃ তা নয়)।
৫. কাউকে অপবাদ দেয়া।
৬. অন্য লোকের আলোচনা শুনতে যাওয়া যারা চায়না যে সে এই আলোচনায় অংশ নিক অথবা তারা তাকে এড়াতে চায়।
৭. দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করা।
৮. ভিন্ন লোকের বংশধরদের গালি দেওয়া।
৯. সহযোগী কোন মুসলমানের দুর্ভাগ্যে সন্তুষ্টি প্রকাশ করা।
১০. বংশের মৃত পূর্বপুরুষ অথবা পদস্থ আত্মীয়-স্বজনের ব্যাপারে গর্ব করা।
১১. অন্যদের দোষত্রুটি বের করার জন্য প্রচেষ্টা চালানো।
১২. কোন মুসলমানের সাথে বিরোধ থাকলে, তিন দিনের বেশি কথা না বলা ও এড়িয়ে যাওয়া।
১৩. নিজে দুষ্টের শিরোমণি হয়ে অন্যের প্রতি অপবাদ দেওয়া।
১৪. কোন মুসলমানের ব্যাপারে এমন কিছু বলা, যা তিনি (স্ত্রী বা পুরুষ) পছন্দ করেন না, যদিও তা সত্য হয়।
১৫. অন্যের প্রতি সন্দেহপ্রবণ হওয়া।
১৬. অন্যের ব্যাপারে অনুসন্ধিৎসু হওয়া।
১৭. গোয়েন্দাগিরি করা।
১৮. কোন পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির জন্য অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া।
১৯. অন্যদের হিংসা করা।
২০. অন্যান্য মুসলমানদের ঘৃণা করা।
২১. কারো অগোচরে নিন্দা করা।
২২. অন্যদেরকে হাস্যাস্পদ করা, তাদের প্রতি উপহাস করা।
২৩. অন্যদের প্রতি অসততার কাজ করা, প্রতারণা বা বিভ্রান্ত করা।
২৪. আত্মপ্রবঞ্চনা বা আত্মপ্রতারণা করা।
২৫. ধন-লোলুপ এবং কৃপণ হওয়া।
২৬. কাপুরুষ হয়ে নিজের ভয়ভীতি দূর করতে না পারা এবং বিপদ থেকে পালিয়ে যাওয়া।
২৭. সব সময় অসন্তুষ্ট থাকা ও অভিযোগ করা এবং কোন ব্যাপারে সন্তুষ্ট না হওয়া।
২৮. নিজের সাহায্য সহায়তা, দান-দক্ষিণা ও উদারতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
২৯. নিজে স্বার্থপর হয়ে অন্যের কথা না ভেবে নিজস্ব প্রয়োজন ও কল্যাণের প্রতি প্রধানতঃ চিন্তাভাবনা করা ও আগ্রহী হওয়া।
৩০. অন্যকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে থাকা।
৩১. কোন ব্যক্তির উপস্থিতিতে তার প্রশংসা ও স্তুতিবাদ করা।
৩২. পাপিষ্ঠ প্রকৃতির অথবা বিত্তবান বা উচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিদের প্রতি অনাহুত সম্মান প্রদর্শন।
৩৩. উচ্চস্বরে কথা বলা।
৩৪. অন্যের প্রতি কঠোর বা রূঢ় ব্যবহার করা।
৩৫. নিজের প্রশংসা করা অথবা নিজেকে অযাচিতভাবে বড় করে তুলে ধরা।
৩৬. মিথ্যা বলা।