📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 পিতামাতার প্রতি সন্তানের আচরণ

📄 পিতামাতার প্রতি সন্তানের আচরণ


পিতামাতার সঙ্গে ছেলেমেয়ে বিশেষতঃ সাবালক ছেলেমেয়ের সম্পর্কের ব্যাপারে নিম্নোক্ত নির্দেশাবলীর প্রতি খেয়াল রাখতে হবেঃ
১. পিতামাতা ও ছেলেমেয়েদের মধ্যকার বিশেষ সম্পর্কের দরুণ পিতামাতার প্রতি সন্তানদের গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। পিতামাতার চাইতে সন্তানদের সহৃদয়তা, ধৈর্য ও উত্তম আচরণের হকদার আর কেউ হতে পারেনা।
২. অন্য কারো চাইতে সন্তানদের পক্ষ থেকে কোন প্রকার বেয়াদবি বা অসৌজন্যমূলক কার্যক্রমের ব্যাপারে পিতামাতা অত্যন্ত বেশি স্পর্শকাতর হন। এজন্য পিতামাতার সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সন্তানদের খুবই সুবিবেচক হতে হবে।
৩. পিতামাতা সাধারণতঃ মনে করেন যে, তারা অনেক অভিজ্ঞ, জ্ঞানী ও সঠিক; হয়তো এটা তাদের ভুলও হতে পারে। শিশু বয়ঃপ্রাপ্ত হবার পরেও পিতামাতার এ ধারণা থাকে যে, তারা ছেলেমেয়ের অভিভাবক। অত্যন্ত সহমর্মিতা ও ছবরের সাথে এই দৃষ্টিভঙ্গির মোকাবেলা করতে হবে।
৪. যদিও পিতামাতা উভয়েই ছেলেমেয়েদের সহৃদয় ব্যবহারের হকদার, তথাপি এক্ষেত্রে বেশি হকদার হচ্ছে তার মা, তারপর পিতা। মহানবী (সা.) বলেছেন, 'বেহেশত মায়ের পদতলে'।
৫. পিতার নাম ধরে ডাকা সন্তানদের জন্য অত্যন্ত অসৌজন্যমূলক কাজ।
৬. পিতার বন্ধুদের প্রতি সদয় আচরণ এবং তার মৃত্যুর পরেও তার বন্ধুর প্রতি সৌজন্য দেখানো অত্যন্ত উত্তম কাজ।
৭. ছেলেমেয়েরা তাদের পিতামাতার ভরণপোষণের জন্য দায়ী। প্রয়োজন হলে পিতামাতার ভরণপোষণ এবং তাদের জীবন আরামদায়ক করা ধর্মীয় দায়িত্ব।
৮. পিতামাতাকে বিরক্ত করতে পারে এমন বিষয় এড়িয়ে যেতে হবে। পিতামাতার প্রতি ছেলেমেয়ের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে ধৈর্য ও সমবেদনা। এমনকি পিতামাতা ছেলেমেয়ের কাছে যদি এমন কিছু দাবি করে, যা তার আয়ত্তের বাইরে, তাহলে ইচ্ছা পূরণে অপারগতার জন্য তার বিনীতভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
৯. পিতামাতা ও স্ত্রীর সঙ্গে কোন ব্যক্তির সম্পর্ক কারো বিনিময়ে হতে পারেনা। অথবা একজনকে অপরজনের বিনিময়ে ত্যাগ করা যায়না। এক্ষেত্রে সমঝোতা ও সমন্বয়ের পরিবেশ রচনা করতে হবে।
১০. পিতামাতার সাথে কথা বলার সময় ছেলেকে বিনীত ও ভদ্রভাবে কথা বলতে হবে।
১১. পিতামাতার প্রতি আনুগত্যের দরুণ যদি কোন ব্যক্তিকে খোদা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হয়, তাহলে খোদার পক্ষেই তাকে কাজ করতে হবে। এটা সত্য যে, পিতামাতা তাদের সন্তানের কাছ থেকে আনুগত্যের প্রত্যাশী হবেন; কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড যদি খোদার অধিকারে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে পার্থক্য রেখা টানতে হবে এবং তা বজায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে বিনীত ও ভদ্রভাবে তাদের আদেশ বাস্তবায়নে অসম্মতি জানানো অপরিহার্য।
১২. পিতামাতা মূর্তিপূজক এবং ইসলাম সম্পর্কে খারাপ ধারণার পোষক হলেও তাদের প্রতি ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, সমবেদনা, শ্রদ্ধাপূর্ণ ও স্নেহশীল হওয়া প্রয়োজন।
১৩. পিতামাতাকে আন্তরিক পরামর্শদান করা প্রয়োজন।
১৪. পিতামাতা সন্তানকে কোন কিছু বলতে চাইলে তা আগ্রহের সাথে শুনতে হবে। কথা বলার সময় তাদের বাধা দেওয়া উচিত নয় এবং তাদের সাথে বাদানুবাদ করা অনুচিত।
১৫. গৃহের বাইরে পিতামাতার সাথে বেড়াতে গেলে সন্তান তাদের আগে হাঁটবেনা এবং তাদের আগে কোন আসনে বসবেনা।
১৬. পিতামাতার ক্ষতির কারণ হওয়া উচিত নয়।
১৭. পিতার নিকট অর্থ নাই অথবা তিনি সহজে দিতে পারবেন না- এ ধরনের অতিরিক্ত অর্থ না চাওয়ারই অভ্যাস করতে হবে।
১৮. পিতামাতার ভরণপোষণ বাবদ অর্থ ব্যয়ের ব্যাপারে সন্তানের উদারতা জাহির করা নিষিদ্ধ।
১৯. সন্তানের অবস্থান যাই হোক না কেন ঘরে এবং বাইরে পিতামাতার অনুগত হওয়া ও তাঁদের সেবা করা সম্মানের কাজ।
২০. পিতামাতা বৃদ্ধ হয়ে পড়লে তাদেরকে নিজের বাড়িতে রেখে পরিচর্যা করা সন্তানের কর্তব্য। পিতামাতার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তাদেরকে বৃদ্ধ নিবাসে প্রেরণ শুধু অসৌজন্যই নয় বরং আপত্তিকর।
২১. অপরের সঙ্গে হাসিমুখে দেখা করা যদি সদ্‌গুণের কাজ হয়, তাহলে পিতামাতার সাথে এরূপ করা অপরিহার্য।
২২. পিতামাতার সঙ্গে সাক্ষাতে সন্তানকেই উদ্যোগী হয়ে সম্ভাষণ জানাতে হবে। পিতামাতা তাঁকে সম্ভাষণ জানাবেন সন্তানের এরূপ আশা করা উচিত নয়।
২৩. পিতামাতা সন্তানের সাথে দুর্ব্যবহার করলেও সন্তানের উচিত তাদেরকে শ্রদ্ধা ও সদ্ব্যবহার করা।
২৪. পিতামাতাকে গালি-গালাজ করা মারাত্মক গুণাহ। কোন সন্তানের উচিত নয় অন্যের পিতামাতাকে গালিগালাজ করা; কারণ তাহলে তাঁরাও তার বাপ-মাকে গালি দেবে।
২৫. পিতামাতার সঙ্গে পুত্রের যতই মতভেদ হোকনা কেন সে তাদেরকে বাঁকা কথা বলবেনা অথবা এমন ভাব দেখাবেনা যাতে তাঁরা ব্যথিত হয়।
২৬. সৎ মাতাও পুত্রের অন্যতম আত্মীয়। সুতরাং তাঁর প্রতি পুত্রের অবহেলা করা চলবেনা।
২৭. পিতামাতার মৃত্যুর পরও তাঁদের প্রতি কর্তব্য শেষ হয়ে যায়না; তাঁদের জন্য দোয়া করা, রুহের মাগফিরাত কামনা করা, তাঁদের ন্যায়সঙ্গত প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং তাঁদের বন্ধু-বান্ধবদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাও অন্যতম কর্তব্য।
২৮. বৃদ্ধ বয়সে পিতামাতা শারীরিকভাবে দুর্বল ও মানসিকভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এর ফলে তাদের মধ্যে অধৈর্য, কর্মক্ষমতায় শৈথিল্য, রুক্ষ মেজাজ এবং সম্ভবতঃ তারা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে পড়েন। সুতরাং পুত্র-সন্তানকে এসব বিষয়ের প্রতি নজর রাখতে হবে এবং বৃদ্ধ পিতামাতার প্রতি সহনশীল হতে হবে।
২৯. সন্তানদের কর্তব্য হচ্ছে কোন প্রকার আদেশ নিষেধ ছাড়াই পিতামাতার গৃহস্থালী কাজে সহায়তা করা।
৩০. পিতামাতার প্রতি অবহেলা, অবাধ্যতা, কঠোর আচরণ করা পাপ। সারা জীবনের সব রকম ভুলের ব্যাখ্যা অনুধাবন করা যেতে পারে; কিন্তু পিতামাতা কর্তৃক কৃত ভুলের ব্যাখ্যা দেওয়ার কোন সুযোগ নেই।

টিকাঃ
* আল হাদিস।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00