📄 ইসলামি আচরণের প্রধান প্রধান বিধির পর্যালোচনা
ইসলামি দিবসের এমন একটি প্রকৃতি রয়েছে, যা অমুসলিম দেশসমূহের দিবসে যেভাবে দেখা হয় ও পালন করা হয়, তা থেকে আশ্চর্যজনকরূপে পৃথক। দিবসের সূচনা হয় খুব ভোরে (ফজরের নামাজের পর) এবং শেষ হয় রাতের এশার নামাজের পর। ইসলামি পঞ্জিকাবর্ষ চান্দ্র মাস নির্ধারিত চাঁদ অনুসারে হওয়ার ফলে, মাসগুলো বছরের পর বছর চক্রাকারে ঘোরে। مسلمانوں কাছে সময় অত্যন্ত মূল্যবান এবং তাদেরকে দূরদর্শিতার সঙ্গে প্রতিদিন ছক কেটে চলতে হয়। দৈনন্দিন সমস্যা ও অসুবিধা এক পাশে রেখে পাঁচবার নির্ধারিত সময়ে নামায পড়তে হয়। নামায পড়ার মাধ্যমে এসব সমস্যার জটিলতা হ্রাস পায় ও তা যথাযথ পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাপিত হয়। তবে যেহেতু এর প্রেক্ষিত হচ্ছেঃ ইসলাম, সেজন্য দিবস জুড়ে তার বাস্তবায়ন হয়। ঘুম থেকে জাগার পর থেকেই ইসলাম মুসলমানদের আচরণে প্রভাব বিস্তার করে এবং তা অব্যাহত থাকে রাতে অবসর নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত। অবশ্য এই প্রভাব বলয়ের মাত্রার কমবেশি হয়ে থাকে। এই বিভিন্নতাকে পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়:
১. কোন্ কোন্ বিষয়ের অনুমতি রয়েছে- অধিকাংশ কাজ এই শ্রেণীতে পড়ে।
২. কোন্ বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।
৩. কোন্ বিষয়ে অনুমোদন নেই বা বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
৪. কোন্টি বাধ্যতামূলক।
৫. কোন্টি নিষিদ্ধ।
মজার কথা এই যে, মানুষের কর্মকাণ্ডের অত্যন্ত ক্ষুদ্রাংশ বাধ্যতামূলক ও নিষিদ্ধের শ্রেণীতে পড়ে। এই পাঁচ শ্রেণীর বিভক্তি রেখা নমনীয়। এক ধরনের শর্তে যা নিষিদ্ধ, তা অন্য ব্যতিক্রমী শর্তাধীনে অনুমোদিত, এমনকি বাধ্যতামূলক। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মুসলমানদের শূকর খাওয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু যদি কোন মুসলিম অনাহারের সম্মুখীন হয় এবং শূকরের মাংস ছাড়া জীবন বাঁচানোর কোন পথ না থাকে, তাহলে তার জন্য এই মাংস খাওয়া বৈধ।
মুসলমানদের আচরণ যেসব সাধারণ বিধি দিয়ে পরিচালিত, সেগুলো নিছক স্বেচ্ছাচারী নির্দেশে তাড়িত নয়। সেগুলো পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উৎসারিত। এগুলো মানুষের প্রতি আল্লাহর রহমতস্বরূপ এসেছে। কোন মুসলিম তার নিজস্ব অবস্থান অথবা বাইরের চাপে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে, অনিবার্য ও বাধ্য হয়ে, যদি ইসলামি বিধান লংঘন করে, তাহলে তাকে পাকড়াও করা হবেনা।
বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত ইসলামি বিধি বিধান পালন সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক নয়। তার পরেও ইসলামি পরিবেশে শিশুদের গড়ে ওঠার এবং পরে যাতে ইসলামি বিধান পালন করতে পারে, তার সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ইসলামি আচার আচরণ যেসব বিধি ও বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পরিচালিত তার সংক্ষিপ্তসার নিম্নরূপ:
১. প্রত্যেক ব্যাপারে বিচার বিবেচনা করা (তাড়াহুড়া না করা) প্রয়োজন।
২. অন্যের সাথে আচার ব্যবহারে প্রত্যেক মুসলমানকে ভদ্র ও সহৃদয় হতে হবে।
৩. মুসলিম জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হবেঃ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা; শরীর, স্থান ও পোশাকের পবিত্রতা।
৪. সৌন্দর্যশীলতা, রুচিশীলতা এবং শৃংখলা মুসলিম জীবনের জন্য মূল্যবান এবং যতদূর সম্ভব এসব গুণ অর্জন করতে হবে।
৫. ইসলামের মতে, সৌজন্যের সাথে কোন সৎ কাজ করলে সেটা আরো সৌন্দর্যময় হয়। অপরদিকে ধৃষ্টতা কোন কাজের ভাল দিক ধ্বংস করে।
৬. প্রত্যেক মুসলমানের কাজে বিনয়ের দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে, ঔদ্ধত্যের নয়।
৭. কোন মুসলমানের এমন কাজ করা উচিত নয়, যার ফলে তার নিজের অথবা অন্যের শারীরিক, মানসিক বা নৈতিক ক্ষতি হয়।
৮. মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে অহেতুক কথা বলার চেয়ে নীরবতা অবলম্বন করাই শ্রেয়।
৯. অপরের কাছ থেকে যেরূপ আচরণ প্রত্যাশা করা হয়, অন্যদের সাথে সেরূপ ব্যবহার করতে হবে। নিজের জন্য যা পছন্দ করা হয়, পরের জন্য তাই করতে হবে। অন্যের সঙ্গে বিচার বিবেচনা ছাড়া সদাচরণ সম্ভব নয়।
১০. কোন মুসলমান নিজে যা করতে পছন্দ করে না, তা করতে অন্যকে আদেশ বা নির্দেশ দিতে পারেনা।
১১. কোনকিছু গ্রহণ, দান, করমর্দন, খাবার, পানি পান ও হাঁটা প্রভৃতি কাজে ডান হাত এবং পায়খানায় গিয়ে বাম হাত ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
১২. খাবার গ্রহণ, পানি পান এবং পোশাক পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে অহংকার বা ঔদ্ধত্য না থাকলে তা অনুমোদিত। বাহুল্য ব্যয়কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
১৩. অমিতব্যয়িতাকে ঘৃণা করা হলেও এর অর্থ এ নয় যে, কোন মুসলমান জীবন উপভোগ করতে পারবে না অথবা তার অর্থ বা সম্পত্তি থাকবে না। তার ওপর আল্লাহর রহমতের নিশানা থাকা প্রয়োজন।
১৪. উদার হওয়া এবং কৃপণ না হওয়া একটি গুণ।
১৫. মুসলমানদের জীবন খোদার প্রতি কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ, তার কোনরূপ কষ্ট থাকুক বা না থাকুক। ধৈর্য ও স্থৈর্যের সাথে কৃতজ্ঞ হতে হবে।
১৬. প্রত্যেক মুসলমানকে সব সময় আস্তিক হতে হবে।
১৭. জীবনের সকল ক্ষেত্রে মুসলমানকে হতে হবে সংযমী ও স্বাভাবিক। ইসলামে অস্বাভাবিক ও অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কোন স্থান নেই।
১৮. মুসলমানকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে এবং শুধু জরুরি প্রয়োজনের সময়েই অন্য মুসলমানের সাহায্য নেয়া যেতে পারে।
১৯. ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুকরণ বা নকল করা নিষিদ্ধ।
২০. আনুগত্য এবং অপরের আদেশ বা ইচ্ছার বাস্তবায়ন ইসলামি শিক্ষার বিরোধী নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে ইসলামি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
২১. পোশাক-পরিচ্ছদ, হাঁটা-চলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী কর্তৃক পুরুষ অথবা পুরুষ কর্তৃক নারীর বেশ ধরা নিষিদ্ধ। লিঙ্গগত চিহ্ন বজায় রাখা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
২২. ইসলামি আচরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে : শৃঙ্খলার মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের ভারসাম্য ও সমন্বয় করা।
২৩. ইসলামি আদবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে : নমনীয়তা ও সহিষ্ণুতা। ব্যাপক অর্থে বলতে গেলে, কোন বিশেষ ধরনের আচরণ সহনীয় বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যদি তা মার্জিত (অন্যের প্রতি বিবেচনা প্রসূত) এবং শ্রদ্ধাপূর্ণ (ব্যক্তি ও সমাজের প্রতি নির্বিরোধ) হয়। এক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছেঃ এই আচরণ হারাম বা নিষিদ্ধ শ্রেণীতে পড়বে না।