📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 বিয়ে, পরিবার ও ইসলামি আদব

📄 বিয়ে, পরিবার ও ইসলামি আদব


পরিবার এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে যা থেকে নতুন বংশধরদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বিকশিত এবং বিস্তৃত হয়। পারিবারিক ইউনিট ছাড়া এসব মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অস্তিত্ব থাকেনা। পারিবারিক ব্যবস্থা এবং নারী-পুরুষের সম্পর্ক একটি সমাজের সার্বিক চরিত্র এবং তা সভ্য না অনগ্রসর- সেটা নির্ধারণ করে।
বিয়ে এবং পরিবারের গুরুত্ব এত বেশি বলে, কুরআনের বহু আয়াতে এবং বিভিন্ন হাদিসে এ দুটো বিষয়ের ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে। এসবের মধ্যে সফল বিয়ে এবং নৈতিকভাবে দৃঢ় ও স্থিতিশীল একটি সমাজ গঠনে প্রয়োজনীয় ভিত্তিও বিস্তারিতভাবে পেশ করা হয়েছে।
১. মুসলমানদের যুবক বয়সে বিয়ে করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিয়ের মাধ্যমে নতুন নতুন আত্মীয় সৃষ্টির মাধ্যমে আত্মীয় পরিজনের পরিধি বাড়ানো হয়। শিশুকে দুধমাতার মাধ্যমে স্তন্যদানেরও অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কারণ এর ফলে নতুন আত্মীয়ের মাধ্যমেও পরিবারের পরিধি বৃদ্ধি পায়। এদের বলা হয় 'দুধমাতার আত্মীয়।'
২. সহজসাধ্য কর্তব্য হিসেবে মুসলমানদের বিবাহকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলামي বিধান মতে সবচেয়ে আদর্শ বিবাহে বর-কনের ওপর বোঝা কম পড়ে।
৩. ইসলামে বিবাহ উৎসব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; কারণ বিয়ে একটি সামাজিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৪. সাধারণভাবে ইসলামে গান গাওয়া নিষেধ হলেও বিয়ের সময় তার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
৫. বিয়েতে ভোজের মজলিশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ উপলক্ষে দাওয়াত গ্রহণ সম্ভব হলে, তা প্রত্যাখ্যান না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামে বিবাহ বন্ধন সাফল্যমণ্ডিত করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মজবুত বন্ধনের ওপর স্থাপিত না হলে বিয়ে সফল হয়না। বিয়ের সাফল্যের জন্য নিম্নোক্ত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে :
১. বিয়ে করার ব্যাপারে নারী ও পুরুষের পূর্ণ পারস্পরিক সম্মতি।
২. নারী ও পুরুষের একই ধরনের সামাজিক পটভূমি ও সমতা প্রয়োজন। জীবন সম্পর্কে, জীবন পদ্ধতি সম্পর্কে অভিন্ন ধারণা এবং মতপার্থক্য উত্তরণের ব্যাপারে একই ধরনের কর্মপন্থা গ্রহণ প্রয়োজন। ইসলামي আকিদা ও শরিয়তে এগুলোর বিধান রাখা হয়েছে। সুতরাং আদর্শ স্বামী-স্ত্রী হচ্ছে তারা যারা ইসলামের প্রতি সর্বাধিক অনুগত।
৩. বিয়ের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে ইসলামের পরামর্শ, ইসলাম সম্পর্কে একে অপরের জ্ঞান ও আমলের ব্যাপারে নারী পুরুষকে পর্যাপ্ত জানতে হবে। তাছাড়া একে অপরকে দেখেও নিতে হবে।
৪. ইসলামে অস্থায়ী বা মুতা বিয়ের ধারনার কোন স্থান নেই। ইসলামে শুধু স্থায়ী বিয়ের ধারনাই স্বীকৃত।
৫. বিয়েতে সকল শর্ত পূরণের জন্য চুক্তি সম্পাদনকে ইসলাম সর্বোত্তম কাজ এবং নৈতিকতার সর্বোচ্চ বিকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, মুসলমানদের যেসব উল্লেখযোগ্য শর্ত পূরণ করতে হয়, সেগুলো বিয়ের চুক্তির (কাবিননামা) অন্তর্ভুক্ত।
৬. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হলে তা কারো হস্তক্ষেপ ছাড়াই সমাধানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৭. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে সফল করে তুলতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমঝোতা, সহযোগিতা, প্রেম ও ভালবাসার মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
ইসলামي আদবের পর্যালোচনা করলে ইসলামে বিবাহের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। নিম্নোক্ত পন্থায় ইসলামي আদবে স্বামী-স্ত্রীর বিশেষ সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে :
১. পরস্পরের বিয়ে না হলে পুরুষকে মৃত নারীর লাশ ধৌত করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। মৃত পুরুষের ক্ষেত্রেও এ বিধান প্রযোজ্য। মৃত স্ত্রীকে স্বামী কবরে স্থাপন করার অধিকার রাখেন।
২. স্বামী-স্ত্রী ছাড়া রক্তের সম্পর্ক ভাই বোন অথবা পিতামাতা, পুত্র-কন্যা হলেও নারী ও পুরুষকে একে অন্যের গোপনাঙ্গ দেখার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
৩. মহিলাদের ভাই বা পিতাসহ কোন আত্মীয়ের জন্য তিন দিনের বেশি শোক প্রকাশ নিষিদ্ধ। তবে কোন বিধবা তার মৃত স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক প্রকাশ করতে পারে।
ইসলামي আদবে পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, "নিশ্চয়ই বেহেশত মাতার পদতলে।" অপরের প্রতি সদাচারণ যদি শিষ্টাচারের প্রতীক হয়, তাহলে পিতামাতার ক্ষেত্রে তা করা ফরজ। সপ্তম অধ্যায়ে আলোচিত 'পিতামাতার প্রতি ছেলেমেয়ের কর্তব্য' শিরোনামে ছেলেমেয়েদের প্রতি বিরাট দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু পিতামাতা ও ছেলেমেয়ের মধ্যেই মজবুত আত্মীয়তা, স্নেহ- ভালবাসা ও দায়িত্ব সীমিত থাকা উচিত নয়, তা সকল আত্মীয়ের বেলায় ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রথমতঃ আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে মাঝে মাঝে যেতে হবে; যাতে করে তাদের অবহেলা করা হচ্ছে বলে তারা অনুভব করতে না পারে। দ্বিতীয়তঃ আর্থিকভাবে যারা অধিকতর স্বচ্ছল, তাদের উচিত দুঃস্থ আত্মীয়দের সাহায্য করা। কোন মুসলমান ঋণী অবস্থায় মারা গেলে আত্মীয়-স্বজনদের যত তাড়াতাড়ি হোক সে ঋণ পরিশোধ করা উচিত।
মা ছাড়া দাই এর সাহায্যে শিশুর দুধ পানের ব্যবস্থা করা হলে, আত্মীয়তার পরিধি বেড়ে যায়। এটাকে পারস্পরিক দায়িত্ব হিসেবে স্বাগত ও স্বীকৃতি জানানো উচিত।
ইসলামي আদবে পারিবারিক চেতনা ও দায়িত্বের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে; কারণ পরিবার হচ্ছে সার্বিক মানবিক অনুভূতির প্রাথমিক ভিত। সুতরাং সুস্থ ও সুস্থিত সমাজের উত্তম ভিত হচ্ছে সুস্থ ও স্থিতিশীল পরিবারিক জীবন।

টিকাঃ
১৬. Sayyid Qutb. Milestones, I. I. F. So. 1977 pp. 183-4.
১৭. মিশকাত, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৭১।

📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 ইসলামে যৌনাচরণ বিধি

📄 ইসলামে যৌনাচরণ বিধি


আল্লাহর সৃষ্ট প্রকৃতির অংশ হিসেবে ইসলাম যৌনতার স্বীকৃতি দেয়। তার সৃষ্ট সব কিছুই তার বিধান মোতাবেক আচরণ করলে খারাপ বা ভুল হতে পারে না।
সন্দেহ নেই, ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিকাশ এবং সার্বিকভাবে সমাজের এক অপরিহার্য বিষয় যৌনজীবন। ব্যক্তিগত স্বার্থ-চেতনা এবং ভালবাসার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে যৌনতার বিকাশ নিবিড়ভাবে গড়ে উঠে। যৌনজীবনে বঞ্চনার ফলে অপরিচ্ছন্ন থাকলে মানসিক স্বাস্থ্য বিপন্ন হয়, সুসম্পর্ক ব্যাহত হয় এবং সমাজে দক্ষতার অভাব ঘটে। বিবাহের মাধ্যমে যৌন জীবনকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত না করলে যৌনপ্রবৃত্তি ধ্বংসাত্মক হতে পারে। এটা তখন ব্যক্তি, বিয়ে ও পারিবারিক প্রথা এবং সার্বিকভাবে সমাজের বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে কাজ করবে। মূলতঃ যৌনতা ব্যক্তিকে তার বেপরোয়া পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারে; অপরদিকে এর বেপরোয়া গতি সমাজ জীবন যে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল তা বিপন্ন করতে পারে।
সুতরাং যৌনাচারকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটা অবশ্য কঠিন বলে প্রতীয়মান হয়; সমাজে যে সব উপায়-উপকরণের সাহায্যে ব্যক্তির যৌন আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব তাদের সহযোগিতা ছাড়া এটা অসম্ভব মনে হতে পারে। নিম্নোক্ত আচরণবিধি অনুসরণের মাধ্যমে ইসলাম এই সমস্যার সমাধান পেশ করেছে:
১. সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য বিবাহকে সহজ করতে হবে এবং বিবাহের সময় হওয়ার সাথে সাথেই বিয়ে করার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।
২. বিবাহ-বহির্ভূত যৌন আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার ব্যাপারে যে সকল কারণ উত্তেজনা সৃষ্টি করে তা বন্ধ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ইসলামি আদব গুরুত্বপূর্ণ:
ক) মহিলাদের শরীর এমন যে, তা দৃষ্টে পুরুষদের মধ্যে যৌন উত্তেজনার সৃষ্টি করে। এজন্য ইসলাম সবরকম নগ্নতা এবং নারীর সম্ভ্রমহানির সব রকম পথ নিষিদ্ধ করেছে। পুরুষদের দৃষ্টি থেকে নারীদের রক্ষা এবং তাদের সৌন্দর্যকে পুরুষদের সামনে প্রকাশ না করার জন্য মুখমণ্ডল ও হাত ছাড়া সমগ্র দেহ ঢেকে রাখার লক্ষ্যে ইসলাম এক ধরনের পোশাক নির্ধারণ করে দিয়েছে। সন্দেহ নেই, পোশাক আন্তঃব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি জানিয়ে দেয়, এর মধ্যে যৌন আকর্ষণ অন্যতম।
খ) নারী-পুরুষের কর্মক্ষেত্র ভিন্ন করে দিতে চায়, যেন যৌন উত্তেজনা হ্রাস পায়।
গ) মুসলিম মহিলাদের গৃহের বাইরে প্রসাধনী সামগ্রী দিয়ে মুখমণ্ডল সুশোভিত করা অথবা সুগন্ধী ব্যবহার করে ভিন্ন পুরুষের সংযম বিপন্ন করা উচিত নয়। এ ধরনের প্রসাধনীর ব্যবহার বাড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং তা স্বামীর সামনেই করা যাবে।
ঘ) পুরুষদের ব্যবহৃত প্রকাশ্য গোসলখানায় মহিলাদের গোসল করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ঙ) স্বামী অথবা মহরম পুরুষ (যার সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ) ছাড়া অন্য কোন লোকের সাথে কোন নারী কথা বলার সময় বলার ভঙ্গি আকর্ষণীয় হবেনা বরং তা বস্তুনিষ্ঠ ও সংক্ষিপ্ত হবে।
চ) পুরুষদের পোশাক ও ব্যক্তিগত আচরণ শোভন হওয়া প্রয়োজন। তবে কোন মুসলমান যদি কোন মহিলার প্রতি তাকিয়ে ফেলে, তাহলে সে তার চক্ষু ফিরিয়ে নেবে, দ্বিতীয়বার তাকানো নিষিদ্ধ।
ছ) ইসলামি আদবে যৌন সম্পর্কে গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। স্বামী-স্ত্রী উভয়কে একে অপরের রহমতস্বরূপ ও পরস্পরের ভূষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের যৌন জীবন নিয়ে অন্যদের তামাশা করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
যৌন আচরণ সম্পর্কিত উল্লিখিত বিধিসমূহ এবং অন্যান্য বিষয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে: বিবাহের আওতায় নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক থেকে সুবিধা লাভ এবং বিবাহের উপযোগিতা থেকে সমাজের ফায়দা লাভ ও পারিবারিক সম্পর্ক নিশ্চিত করা।

টিকাঃ
১৮. G. P. Murdock. Social Structure (New York: Macmillan & Co. 1949), P. 260.

📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 ইসলামি আদব এবং নারীর মর্যাদা

📄 ইসলামি আদব এবং নারীর মর্যাদা


ইউরোপ যখন তমসাচ্ছন্ন যুগে নিমজ্জিত ছিল, তখন নারীর আত্মার প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক হোত তাদের আত্মা মানবিক কি-না। ইসলাম তার পূর্বেই নারী ও পুরুষকে একই উৎস থেকে আসার কথা জানিয়েছে এবং খোদা ও সমাজের কাছে তারা উভয়ে সমানাধিকারসম্পন্ন এবং ভাল ও মন্দ কাজের জন্য পুরষ্কার ও শাস্তির ঘোষণা শুনেছে। ইসলামি আইন নারী ও পুরুষের জন্য সমান। ইসলামে নারীর অধিকার রয়েছে সম্পত্তি সংরক্ষণের এবং তা আবাদ করার। তার নিজ স্বার্থে তার সম্পত্তির ইজারা দান, হেবা করে দেওয়া অথবা আবাদ করার অধিকার রয়েছে। যদিও নারীর প্রকৃত ক্ষেত্র হচ্ছে মাতৃত্ব, মানব বংশের লালন-পালন এবং নিজ বাড়ির হেফাজত, তথাপি ক্রয়-বিক্রয়, ধার দেওয়া ও নেওয়া, বিনিয়োগ করা- ইত্যাদি আর্থিক লেনদেন করা থেকে তাকে বিরত রাখা হয়নি। ইসলামের বিভিন্ন মাজহাবে নারীদেরকে এ ধরনের কর্ম সম্পাদনে পুরোপুরি ক্ষমতাসম্পন্ন এবং আইনানুগভাবে উপযুক্ত বলে গণ্য করা হয়েছে।
মদ্যপান, ব্যভিচারি, খোদাদ্রোহীতা অথবা হত্যার মত যে কোনো অপরাধের জন্য ইসলামি আইনে শাস্তির ব্যাপারে নারী ও পুরুষের কোন পার্থক্য করা হয়নি।
ইসলামে মহিলাদের তাদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার এবং বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার অধিকার দিয়েছে। ইসলামি বিশ্বের কোন কোন অঞ্চলে মুসলিম নারীদের সমকালীন অবস্থা থেকে ইসলামে নারীর ধারণা ও অবস্থানকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা অথবা যুক্তিতর্ক পেশ করা সঠিক হবেনা। এ ব্যাপারে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ভুল ধারণা দূর করবে :
১. পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণের সুসংবাদের মতই কন্যা সন্তানের জন্মকে স্বাগত জানাতে হবে। পুত্র সন্তানের জন্ম হলে শুভেচ্ছা জানানো এবং কন্যা সন্তানের জন্ম হলে মুখ গোমরা করে থাকা ইসলামি শিক্ষার বিরোধী। ইসলাম কন্যা সন্তানদের বিশেষ যত্ন নেয়ার তাগিদ দিয়েছে।
২. নবী করিম (সা.) নারীদের সহিত ভদ্রতা ও শ্রদ্ধার সাথে ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদেরকে নিকৃষ্ট না ভেবে সমানরূপে গণ্য করতে হবে।
৩. মহিলাদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
ইসলামের বিবাহ প্রথায় একজন অভিভাবক থাকার অর্থ এ নয় যে, বিবাহের ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার আছে। নারীর এককভাবে অধিকার রয়েছে কোন প্রকার চাপমুক্ত থেকে বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার। যদি কোন মেয়েকে তার সম্মতি ছাড়া বাগদান করা হয়, তাহলে এই বাগদান সে অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাখে।
৪. মা হিসেবে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত সম্মানজনক। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, মহানবীর (সা.) উক্তি, 'বেহেস্ত মাতাদের পদতলে।' কোনো মুসলমান সর্বাধিক শ্রদ্ধা করবে তার মাকে। পিতার চাইতে মাতার মর্যাদা সন্তানের কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি।
৫. একজন বিবাহিত মহিলা তার পারিবারিক নাম বহাল রাখতে পারে এবং তার স্বামীর পক্ষে তা পরিত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। এটাও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের শামিল।
৬. যৌনতার নিদর্শনগুলো আড়াল করার জন্য ইসলাম কতিপয় আদব লেহাজ প্রবর্তন করেছে: পুরুষ কর্তৃক মহিলাদের পোশাক ও চলাফেরার ঢং নকল করা নিষিদ্ধ।
৭. মহিলাদের কর্মকাণ্ড ইসলামি শিক্ষার বিরোধী না হওয়া পর্যন্ত ইসলামে মহিলাদের ব্যক্তিত্ব সংরক্ষণ এবং বিকাশের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। স্বামীকে অনুমতি দেওয়া হয়নি স্ত্রীর ব্যক্তিত্ব বিনাশ করে তার সাথে মিশিয়ে ফেলার।
৮. মহিলাদের মাসিকের সময় সহৃদয় ও নম্র আচরণ করতে হবে। স্বামী যদি স্ত্রীকে কোনক্রমে ভালবাসতে না পারে, তাহলে ঐ স্ত্রী তাকে তালাক দিতে পারে।
৯. উত্তম স্ত্রীকে বিশ্বে সর্বোত্তম সম্পদ হিসেবে ইসলাম গণ্য করেছে। বিবাহিত জীবনে স্ত্রীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসার পরিচালনা এবং টাকা কড়ির নিয়ন্ত্রণ করা তার দায়িত্ব।
১০. ইসলাম চায় মুসলিম মহিলারা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় মেনে চলুক এবং পোশাক পরিচ্ছদ, জুতা পরিধান, ইত্যাদি ক্ষেত্রে অমুসলিম মহিলাদের অনুকরণ না করুক। এ ধরনের অনুকরণ দুর্বলতার প্রতীক।
১১. ইসলামি সমাজে মহিলাদের পোশাকের কতিপয় উদ্দেশ্য রয়েছে। এর মধ্যে তার সম্মান ও মর্যাদার সংরক্ষণ অন্যতম। নারী ও পুরুষের পোশাকের পার্থক্যের কারণ হচ্ছে পুরুষ ও নারীর আকৃতির ভিন্নতা। একই কারণে কোন মহিলার উচিত নয় তার স্বামী বা কোন মহরম (যার সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ) পুরুষ ছাড়া ভ্রমণ করা।

টিকাঃ
১৯. Qutb. Islam The Misunderstood Religion. Damascus : The Holy Quran Publishing House. 1977. P-97.

📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 ইসলামি আদব ও শৃঙ্খলা

📄 ইসলামি আদব ও শৃঙ্খলা


ব্যক্তির আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তির প্রতি সাড়া দেওয়ার লক্ষ্যে ইসলামি আদব কায়দা মানুষকে সুসভ্য ও শিক্ষিত করে তোলে। এর ফলে ধৈর্যধারণ, আত্মসন্তুষ্টি ও স্বনির্ভর হওয়া বাঞ্ছনীয়; অপরিহার্য না হলে অন্যের সহযোগিতা না চাওয়ার ব্যাপারে ইসলাম শিক্ষা দিয়ে থাকে।
ইসলামের অন্যতম প্রশংসিত গুণ হচ্ছে মানুষের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ এবং তীব্রতার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করা। মহানবীর (সা.) ভাষায়, সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি সেই, যে ক্রোধ সংবরণ করতে পারে। উত্তম মুসলমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিয়মানুবর্তিতা ও আত্ম-শৃঙ্খলা। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মানুবর্তিতা শিক্ষা দেয় এবং রমযান মাস আত্মসংযম শিক্ষা দেয়।
শৃংখলার সুফল হচ্ছেঃ (ক) মিতাচার ও (খ) সময়ের সদ্ব্যবহার। মিতাচার বা সংযম ইসলামি আদবের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এর ফলে একটি সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের সৃষ্টি হয়। মানুষের সেবার জন্য এটা প্রয়োজন (কারণ যে ব্যক্তি অতিরঞ্জন দোষে দুষ্ট অথবা মেকি আচরণে অভ্যস্ত সে কেমন করে এর প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে অন্যের সেবা করবে?) এবং আল্লাহর আদেশ মেনে চলতেও এটা প্রয়োজন। সময় হচ্ছে জীবনের মূল্য মূল্যায়নের একটি মানবিক মাপকাঠি। কেয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি করা হবে তা হচ্ছে : সময়কে সে কিভাবে কাজে লাগিয়েছে। সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছেঃ প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করা এবং প্রতিটি শস্যকণার হিসাব রাখা। এটা করতে হবে তার নিজের স্বার্থে এবং সমগ্র জাতির স্বার্থে।
উল্লিখিত নীতির সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্য রেখে ইসলামি আদব প্রণীত হয়েছে। নিচে এর ব্যাখ্যা দেওয়া হলো :
১. মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবন শুরু হয় সূর্যোদয়ের আগে সুবহে সাদেক থেকে এবং শেষ হয় এশার নামাজের পরপরই অর্থাৎ সূর্যাস্তের প্রায় দেড় ঘন্টা পর।
২. নিছক সময় ক্ষেপণের জন্য মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে; অবশ্য মুসলমানদেরকে একে অন্যের সঙ্গে অহরহ দেখা সাক্ষাৎ করার তাগিদ দেওয়া হলেও তাদেরকে প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলাপ করার মাধ্যমেই দেখা সাক্ষাৎকে ফলপ্রসূ করতে হবে।
৩. খাওয়ার সময় অহেতুক দীর্ঘ সময় ব্যয় করা অনুচিত।
৪. কথাবার্তার সংযম প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলা অথবা বলার খাতিরেই কথা বলার বদ অভ্যাস সময়ের অপচয় মাত্র। চুপ থাকাই বাঞ্ছনীয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00