📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 ইসলামি আদবের মনস্তাত্ত্বিক দিক

📄 ইসলামি আদবের মনস্তাত্ত্বিক দিক


ইসলামي আদবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনস্তাত্ত্বিক দিকের প্রতি পুরোপুরি লক্ষ্য রাখা বিধেয়। এক্ষেত্রে কয়েকটি দৃষ্টান্ত:
১. মহিলাদের মাসিকের সময় তালাক দান করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, কারণ এ সময় মহিলারা মনস্তাত্ত্বিক চাপে দিন কাটায়।
২. স্বাস্থ্যগত সুবিধা ছাড়াও ইসলামে পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতার ফলে শরীর ও মন সতেজ থাকে। নামাজের আগে অজু করা, যৌনসঙ্গমের পর গোসল করা, সন্তান প্রসব ও মাসিকের পর গোসল করার ক্ষেত্রেও একথা সত্য। যারা লাশের গোসল করান তাদেরকেও গোসল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই পরামর্শের তাৎপর্য হচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে গোসল করার ফলে জনগণ মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া থেকে মুক্ত থাকে।

📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 ইসলামি আদবের মেডিক্যাল ও স্বাস্থ্যগত দিক

📄 ইসলামি আদবের মেডিক্যাল ও স্বাস্থ্যগত দিক


ইসলাম মুসলমানদের সর্বদা পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র থাকার শিক্ষা দিয়ে থাকে। বিশ্বস্ত মেডিক্যাল সূত্রে প্রমাণিত হয় যে, শরীর, স্থান ও পোশাক পরিচ্ছদের প্রাত্যহিক পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা শরীরের সুস্থতা রক্ষায় ব্যাপক অবদান রাখে। পরিচ্ছন্ন থাকার ফলে রোগ- জীবাণুর সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
মুসলমানদের নামাজের পূর্বে প্রয়োজনীয় শর্ত হিসেবে প্রত্যহ কয়েকবার অজু করতে হয়। শরীরের যে অংশ ধূলাবালির উন্মুক্ত থাকে জন্য তা-ই প্রধানত ধৌত করতে হয়।
ইসলাম নখ কাটার বিধান এজন্য করেছে যে, হাতের যে অংশের সাহায্যে প্রতিনিয়ত খাবার খাওয়া হয় ও পানি পান করা হয়- এবং করমর্দন করতে হয়- সেগুলোকে ময়লা ও অশুচি থেকে রক্ষা করার জন্যে। বগলের চুল ও গোপনাঙ্গের চুল কাটার বিধান করেছে ইসলাম। এটি সোয়েট গ্লাণ্ডস (Sweat Glands) কে কাজ করতে সহায়তা করে এবং সুইট গ্লাণ্ডসের ক্ষতি করতে পারে, এমন সব জীবাণুর বংশবৃদ্ধিতে তা বাধা দেয়। মুসলমানকে তার কাপড় চোপড় ও নিজেকে মল ও পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে। পেশাবে ইউরিয়া এবং অন্যান্য নাইট্রোজেনের যৌগ বিদ্যমান। এগুলো জীবাণুর তৎপরতায় এ্যামোনিয়ায় রূপান্তরিত হয় এবং দুর্গন্ধের সৃষ্টি করে। মলমূত্র থেকে সংক্রমণের মাধ্যমে Pinworm (oxy uriasis), Viral hepatitis, Scabies এবং Taniasisi - প্রভৃতি রোগ বিস্তার লাভ করে।
মুসলমানদের অতিরিক্ত আহার করা উচিত নয় বরং উদরপূর্তির আগেই আহার বন্ধ করা উচিত- এ ধারণা চিকিৎসাগত, সামাজিক ও নৈতিক কল্যাণ থেকে উৎসারিত। পাকস্থলীতে রয়েছে সম্প্রসারণশীল receptors, এটি স্ফীত হলে ব্যথা ও অস্বস্তি ও অন্যান্য রোগের সৃষ্টি হতে পারে। পানি পানকালে মুসলমানদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে পাত্রে (বা গ্লাসে) নিঃশ্বাস না ফেলতে; কারণ আভ্যন্তরীণ বাতাসের চাইতে পানিতে বিদ্যমান বাতাসে কার্বন-ডাই- অক্সাইডের পরিমাণ অনেক কম এবং দেহের সঞ্চালন তন্ত্রগুলোতে অধিকহারে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি শরীরে নেতিকবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
মুসলমানরা দুধ পানের ফলে যে কল্যাণকর সুবিধা পেয়ে থাকে, তার জন্যে খোদার শুকরিয়া প্রকাশ করে থাকে। দুধ আদর্শ পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে পরিচিত। এতে প্রধানতঃ ভিটামিন-ডি, ক্যালসিয়াম, ফসফেটসহ অনেক ভিটামিন ও খনিজ ছাড়াও পুষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেট, চর্বি ও প্রোটিন বিদ্যমান। এগুলোর অভাবে শিশুদের শরীর গঠনে অসুবিধা ও বড়দের রক্তশূন্যতা (Oesteomalacis) দেখা যায়।
ইসলামের বিধান অনুসারে পশু জবাই করার ফলে রক্তমুক্ত গোশত পাওয়া যায়। রক্তে বহু সূক্ষ্ম জীবাণু বাস করে, যা বহু রোগের উৎস হতে পারে। স্বাস্থ্যগত দিক ছাড়াও বহু লোক রক্ত মিশ্রিত গোশত দেখে অথবা গোশতের মধ্যে রক্ত নিঃসৃত হতে দেখে বিরক্ত বা পীড়িত হয়ে পড়ে।
ইসলামে শূকরের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। শূকর আবর্জনা ও উচ্ছিষ্টসহ যে কোনো খাদ্য খেয়ে থাকে। এ ব্যাপারে স্যাকর (Sakr) বলেন, শূকরের দেহে বহু সংখ্যক জীবাণু, পরজীবী ও ব্যাকটেরিয়া থাকে এবং এই মাংস খাওয়ার পর এসব রোগ মানবদেহে সংক্রমিত হয়। এসব জীবাণুর মধ্যে রয়েছেঃ ফিতা ক্রিমি, বক্র ক্রিমি, Hookworm, Faciolopsis, Paragonimus, Clonorchis Senesis ও Erysipelothrix Rhusphathiae." তিনি আরো বলেন, সর্বাধিক জীবাণুবাহক শূকর হচ্ছে বহু মারাত্মক ও জটিল রোগের উৎস। এর মধ্যে রয়েছে আমাশয়, Trichinosos, ফিতা ক্রিমি, বক্র ক্রিমি, হুকওয়ার্ম, জন্ডিস, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, আন্ত্রিক প্রতিবন্ধক (Intestinal Obstruction), মারাত্মক প্যানক্রিয়াটিটিস (Acute Pancreatitis), যকৃতের প্রসারণ (Enlargement), ডায়রিয়া, শারীরিক দুর্বলতা, মারাত্মক জ্বর- যদ্দরুণ শিশুদের বিকাশ ব্যাহত হয়, টাইফয়েড, অঙ্গহানি, হৃদরোগ, গর্ভপাত, বন্ধ্যাত্ব এবং আকস্মিক মৃত্যু ইত্যাদি।
ইসলামে মদ্যপান নিষিদ্ধ। এর কিছুটা উপকারী দিক থাকলেও এর ফলে যে মাদকাসক্তির সৃষ্টি হয়, তাতে নৈতিক ও শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। তদুপরি অধিক মদ্যপানের ফলে পাকস্থলীতে জ্বালা এবং পেপটিক আলসার হয়। এর ফলে যকৃতের প্রদাহ, লিভার সিরোসিস এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে যকৃত বিকল হয়ে যায়।
মুসলমানদের হাঁচি আটকে রাখা ঠিক নয়, বরং এ জন্য খোদার শোকর করা উচিত। উপরের শ্বাস-প্রশ্বাসের অঞ্চল থেকে শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির জ্বালা হতে এর উৎপত্তি এবং এর ফলে জ্বালাতনকারী পদার্থ বের হয়ে যায়। হাঁচি ঠেকিয়ে রাখলে জ্বালাতনকারী পদার্থ রয়ে যায় এবং প্রদাহের সৃষ্টি করে। হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে করে কোন ব্যক্তির উপরের শ্বাস প্রশ্বাস অঞ্চলে বিদ্যমান জীবাণুর সঞ্চালন রোধ করা যায়।
প্রত্যেক মুসলমানের জন্য খতনা করা ফরজ এবং পাশ্চাত্য বিশ্বের কোন কোন দেশে মেডিক্যাল গ্রাউণ্ডেই বর্ধিত হারে খতনা করা হচ্ছে। লিঙ্গের অগ্রত্বক কেটে না ফেলা হলে ময়লা ও জীবাণু জমতে পারে, ফলে ব্যাক্টিরিয়ার বিকাশ হতে পারে। একারণে নারীদের যৌনাঙ্গে ক্যান্সার সদৃশ পরিবর্তন হতে পারে।
মহিলাদের মাসিকের সময় যৌনসঙ্গম ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে দুটো কারণে :
১. মাসিকের সময় গর্ভাশয়ের সংকীর্ণ অংশ উন্মুক্ত হয়ে যায়; ফলে সঙ্গমের দরুণ জরায়ু ও ডিম্বনালীতে ব্যাক্টেরিয়া প্রবেশের পথ সুগম হয়। পরিণামে প্রদাহ ও আঠালো অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। ফলে বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি হতে পারে।
২. পুরুষ তার যৌনাঙ্গে রক্ত দেখার পর তারও শরীরে নেতিবাচক দৈহিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এর ফলে তার স্ত্রীর সঙ্গে যথানিয়মে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে তার মনে বিতৃষ্ণার সৃষ্টি হতে পারে।
পায়ুপথে সঙ্গমের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার কারণ হচ্ছে : এটা এক যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়া এবং এর ফলে মলত্যাগে ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তাছাড়া পুরুষের যৌনাঙ্গ মলসিক্ত হতে পারে, আর এই মলে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণু থাকতে পারে, যার ফলে পুরুষের যৌনাঙ্গ সংক্রমিত হতে পারে।
মাসিকের সময় মহিলাদের যৌন হরমোনসমূহ বিঘ্নিত হয়- পরিণামে মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় দেখা যায় এবং তা প্রতিভাত হয় স্নায়ুবিক উত্তেজনা ও দৌর্বল্যে। মাসিকের সময় মহিলাদের আচরণে যে পরিবর্তন দেখা যায়, তার কারণ এখানেই নিহিত। এজন্য এসময় মেয়েদের নামাজ ও রোজা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে আংশিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
ইসলামি বিধান মোতাবেক মৃতদেহকে শিগগিরই কবর দিতে হয়। এর ফলে যে পচনের ক্ষতির ব্যাপারে মুসলমানরা সজাগ, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ায় এই বিপদের আশঙ্কা আরো বেশি। কারণ সেখানে লাশ শীতল রাখার সুযোগ সুবিধা নেই।
প্রহরী ও শিকারী কুকুর ছাড়া কুকুর প্রতিপালনের অধিকার মুসলমানদের দেওয়া হয়নি। তবে এসব কুকুরকেও বাড়ির বাইরে রাখতে হবে। কুকুরের মুখের লালায় জলাতঙ্ক রোগের জীবাণু রয়েছে, যা কুকুরের কামড় অথবা চামড়ায় কোন ঘায়ের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে। কুকুরের অন্ত্রে এক প্রকার কৃমি (Echinococcus) থাকে, যা কুকুরের মল দ্বারা দূষিত খাদ্যের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। এর ফলে যকৃত এবং ফুসফুসে প্রাথমিকভাবে মলকোষ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে।

টিকাঃ
১০. মিশকাত ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৬৫।
১১. A. H. Sakr Possible Reasons for its Prohibition, Published by the Author, 1975, P-15.
১২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৮।

📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 জাতীয় অর্থনীতিতে ইসলামি আদবের ভূমিকা

📄 জাতীয় অর্থনীতিতে ইসলামি আদবের ভূমিকা


সুস্থ অর্থনীতির বিকাশে ইসলামي আদব মেনে চলা অপরিহার্য। বাহুল্য ব্যয় করা ইসলামে নিষিদ্ধ, মিতব্যয়িতা অবলম্বন করা প্রয়োজন; এমনকি সেটিকে উৎসাহিত করা হয়েছে। শান্তি ও যুদ্ধ- এই উভয়কালেই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূল্যের ধারক হিসেবে অর্থ-তাৎক্ষণিক ক্রয়ক্ষমতা এবং বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। সার্বিকভাবে জাতির অর্থনৈতিক শক্তি থাকা অপরিহার্য। কোন ব্যক্তি তার ইচ্ছেমত যাচ্ছে তাই ভাবে যেকোন পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার অধিকারী নয়। কেননা এর ফলে জাতীয় শক্তির ধ্বংস নেমে আসে। ইসলামي আদব মিতব্যয়িতার জন্য মুসলমানদেরকে ধর্মীয়ভাবে উদ্দীপ্ত করে। অন্য কথায় বলা যায়, অমিতব্যয়িতা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলমানের ধর্মীয় কর্তব্য। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, "অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই; আর শয়তান হচ্ছে আল্লাহর কাছে চির অকৃতজ্ঞ।” এখানে ইসলামي জীবনধারার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলো। এতে সুস্থ অর্থনীতি গড়ে তোলার ব্যাপারে ইসলাম কতখানি গুরুত্ব দেয়, তা অনুধাবন করা যাবে।
১. পানাহারে মিতব্যয়িতা অবলম্বন করতে হবে। সামান্য পরিমাণ খাদ্যও অপচয় করা যাবে না। অপচয়ের প্রতি নিষেধাজ্ঞার ফলে বিপুল পরিমাণ জাতীয় সম্পদ সাশ্রয় হবে এবং অধিকতর প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের দিকে তা পরিচালনা করা যায়।
২. পোশাক পরিচ্ছদেও মিতাচার প্রয়োজন। পোশাকই যেন উদ্দেশ্যে পরিণত না হয়। সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে। পোশাকের ব্যাপারে বিপুল অর্থ ব্যয় করা চলবে না।
৩. আসবাবপত্র ও অন্যান্য গৃহস্থালী সামগ্রী মধ্যম মানের মূল্যে কেনা উচিত। বাড়ীর আসবাবপত্র, তৈজসপত্র বা অন্য কোন সামগ্রীর ক্ষেত্রে স্বর্ণের বা রৌপ্যের ব্যবহার চলবে না। তাছাড়া রেশম বা রেশমি কারুকার্য খচিত পোশাক বা আসবাবপত্র ব্যবহার করা যাবে না।
৪. জমকালো ভবন নির্মাণে অর্থের ব্যয় করা চলবেনা। এমনকি মসজিদ নির্মাণেও অমিতব্যয়ী হওয়া চলবেনা। উভয় ক্ষেত্রে অলংকরণও পরিহার করতে হবে।
৫. ইসলামي বিধানে আদর্শ বিয়ে হয় সবচেয়ে কম খরচে এবং এক্ষেত্রে বাহুল্য ব্যয় হয় না।
৬. দাফন কাজে মিতব্যয়ী হতে হবে। এক্ষেত্রেও অমিতব্যয়িতা নিষিদ্ধ। বিশেষ বাধ্যবাধকতা বা স্বাস্থ্যগত কারণ ছাড়া কফিন বাক্স ব্যবহার করা চলবেনা।
৭. ইসলামে অতিথি আপ্যায়ণের প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাহুল্য ব্যয় করতে নিষেধ করা হয়েছে।
৮. শুক্রবার জুমার নামাজ আদায়ের জন্য একঘন্টা ছাড়া শুক্রবারে কাজ বন্ধ করার কথা ইসলামে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়নি। প্রয়োজনীয় কাজ অব্যাহত রাখতে হবে; কেননা এক দিনের জন্যও কাজ বন্ধ রাখা হলে সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হতে পারে। শুক্রবার কাজ পরিত্যাগ করার জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়নি; ইসলামে সাবাথ-এর ধারণা অনুপস্থিত। তবে মুসলমানদের কোন ছুটির দিন হলে তা শনিবার বা রোববার হওয়া উচিত, নয় শুক্রবার হতে হবে।
৯. মুসলমানের ওপর অর্পিত কোন কাজের দক্ষতা ও সম্পূর্ণতা দান তার কর্তব্য বলে ইসলাম বিবেচনা করে। হাদিসে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের ব্যবস্থা রেখেছেন।" কর্মোদ্যোগ ও গুণগত মানের সমন্বয়ে একটি সফল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।

টিকাঃ
১৩. Encyclopaedia Britannica, London: William Bentow: Vol. 15. 1971, P-701.
১৪. The Holy Quran, M. M. Pickthall অনুদিত [NewYork: Muslim World League], সূরাহ মায়িদা: আয়াত ৩।
১৫. আল নববীর ৪০ হাদিস, ৬৪ পৃঃ

📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 বিয়ে, পরিবার ও ইসলামি আদব

📄 বিয়ে, পরিবার ও ইসলামি আদব


পরিবার এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে যা থেকে নতুন বংশধরদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বিকশিত এবং বিস্তৃত হয়। পারিবারিক ইউনিট ছাড়া এসব মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অস্তিত্ব থাকেনা। পারিবারিক ব্যবস্থা এবং নারী-পুরুষের সম্পর্ক একটি সমাজের সার্বিক চরিত্র এবং তা সভ্য না অনগ্রসর- সেটা নির্ধারণ করে।
বিয়ে এবং পরিবারের গুরুত্ব এত বেশি বলে, কুরআনের বহু আয়াতে এবং বিভিন্ন হাদিসে এ দুটো বিষয়ের ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে। এসবের মধ্যে সফল বিয়ে এবং নৈতিকভাবে দৃঢ় ও স্থিতিশীল একটি সমাজ গঠনে প্রয়োজনীয় ভিত্তিও বিস্তারিতভাবে পেশ করা হয়েছে।
১. মুসলমানদের যুবক বয়সে বিয়ে করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিয়ের মাধ্যমে নতুন নতুন আত্মীয় সৃষ্টির মাধ্যমে আত্মীয় পরিজনের পরিধি বাড়ানো হয়। শিশুকে দুধমাতার মাধ্যমে স্তন্যদানেরও অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কারণ এর ফলে নতুন আত্মীয়ের মাধ্যমেও পরিবারের পরিধি বৃদ্ধি পায়। এদের বলা হয় 'দুধমাতার আত্মীয়।'
২. সহজসাধ্য কর্তব্য হিসেবে মুসলমানদের বিবাহকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলামي বিধান মতে সবচেয়ে আদর্শ বিবাহে বর-কনের ওপর বোঝা কম পড়ে।
৩. ইসলামে বিবাহ উৎসব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; কারণ বিয়ে একটি সামাজিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৪. সাধারণভাবে ইসলামে গান গাওয়া নিষেধ হলেও বিয়ের সময় তার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
৫. বিয়েতে ভোজের মজলিশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ উপলক্ষে দাওয়াত গ্রহণ সম্ভব হলে, তা প্রত্যাখ্যান না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামে বিবাহ বন্ধন সাফল্যমণ্ডিত করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মজবুত বন্ধনের ওপর স্থাপিত না হলে বিয়ে সফল হয়না। বিয়ের সাফল্যের জন্য নিম্নোক্ত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে :
১. বিয়ে করার ব্যাপারে নারী ও পুরুষের পূর্ণ পারস্পরিক সম্মতি।
২. নারী ও পুরুষের একই ধরনের সামাজিক পটভূমি ও সমতা প্রয়োজন। জীবন সম্পর্কে, জীবন পদ্ধতি সম্পর্কে অভিন্ন ধারণা এবং মতপার্থক্য উত্তরণের ব্যাপারে একই ধরনের কর্মপন্থা গ্রহণ প্রয়োজন। ইসলামي আকিদা ও শরিয়তে এগুলোর বিধান রাখা হয়েছে। সুতরাং আদর্শ স্বামী-স্ত্রী হচ্ছে তারা যারা ইসলামের প্রতি সর্বাধিক অনুগত।
৩. বিয়ের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে ইসলামের পরামর্শ, ইসলাম সম্পর্কে একে অপরের জ্ঞান ও আমলের ব্যাপারে নারী পুরুষকে পর্যাপ্ত জানতে হবে। তাছাড়া একে অপরকে দেখেও নিতে হবে।
৪. ইসলামে অস্থায়ী বা মুতা বিয়ের ধারনার কোন স্থান নেই। ইসলামে শুধু স্থায়ী বিয়ের ধারনাই স্বীকৃত।
৫. বিয়েতে সকল শর্ত পূরণের জন্য চুক্তি সম্পাদনকে ইসলাম সর্বোত্তম কাজ এবং নৈতিকতার সর্বোচ্চ বিকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, মুসলমানদের যেসব উল্লেখযোগ্য শর্ত পূরণ করতে হয়, সেগুলো বিয়ের চুক্তির (কাবিননামা) অন্তর্ভুক্ত।
৬. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হলে তা কারো হস্তক্ষেপ ছাড়াই সমাধানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৭. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে সফল করে তুলতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমঝোতা, সহযোগিতা, প্রেম ও ভালবাসার মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
ইসলামي আদবের পর্যালোচনা করলে ইসলামে বিবাহের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। নিম্নোক্ত পন্থায় ইসলামي আদবে স্বামী-স্ত্রীর বিশেষ সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে :
১. পরস্পরের বিয়ে না হলে পুরুষকে মৃত নারীর লাশ ধৌত করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। মৃত পুরুষের ক্ষেত্রেও এ বিধান প্রযোজ্য। মৃত স্ত্রীকে স্বামী কবরে স্থাপন করার অধিকার রাখেন।
২. স্বামী-স্ত্রী ছাড়া রক্তের সম্পর্ক ভাই বোন অথবা পিতামাতা, পুত্র-কন্যা হলেও নারী ও পুরুষকে একে অন্যের গোপনাঙ্গ দেখার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
৩. মহিলাদের ভাই বা পিতাসহ কোন আত্মীয়ের জন্য তিন দিনের বেশি শোক প্রকাশ নিষিদ্ধ। তবে কোন বিধবা তার মৃত স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক প্রকাশ করতে পারে।
ইসলামي আদবে পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, "নিশ্চয়ই বেহেশত মাতার পদতলে।" অপরের প্রতি সদাচারণ যদি শিষ্টাচারের প্রতীক হয়, তাহলে পিতামাতার ক্ষেত্রে তা করা ফরজ। সপ্তম অধ্যায়ে আলোচিত 'পিতামাতার প্রতি ছেলেমেয়ের কর্তব্য' শিরোনামে ছেলেমেয়েদের প্রতি বিরাট দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু পিতামাতা ও ছেলেমেয়ের মধ্যেই মজবুত আত্মীয়তা, স্নেহ- ভালবাসা ও দায়িত্ব সীমিত থাকা উচিত নয়, তা সকল আত্মীয়ের বেলায় ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রথমতঃ আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে মাঝে মাঝে যেতে হবে; যাতে করে তাদের অবহেলা করা হচ্ছে বলে তারা অনুভব করতে না পারে। দ্বিতীয়তঃ আর্থিকভাবে যারা অধিকতর স্বচ্ছল, তাদের উচিত দুঃস্থ আত্মীয়দের সাহায্য করা। কোন মুসলমান ঋণী অবস্থায় মারা গেলে আত্মীয়-স্বজনদের যত তাড়াতাড়ি হোক সে ঋণ পরিশোধ করা উচিত।
মা ছাড়া দাই এর সাহায্যে শিশুর দুধ পানের ব্যবস্থা করা হলে, আত্মীয়তার পরিধি বেড়ে যায়। এটাকে পারস্পরিক দায়িত্ব হিসেবে স্বাগত ও স্বীকৃতি জানানো উচিত।
ইসলামي আদবে পারিবারিক চেতনা ও দায়িত্বের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে; কারণ পরিবার হচ্ছে সার্বিক মানবিক অনুভূতির প্রাথমিক ভিত। সুতরাং সুস্থ ও সুস্থিত সমাজের উত্তম ভিত হচ্ছে সুস্থ ও স্থিতিশীল পরিবারিক জীবন।

টিকাঃ
১৬. Sayyid Qutb. Milestones, I. I. F. So. 1977 pp. 183-4.
১৭. মিশকাত, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৭১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00