📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 লক্ষ্য

📄 লক্ষ্য


ইসলামে যেটা কেন্দ্রীয় ও অপরিহার্য, তা নির্ধারিত হয় ইসলামের লক্ষ্যের সাথে তার বিস্তৃত সম্পর্কের দ্বারা। এর মধ্যে রয়েছে মানব সমাজের উৎকর্ষ বা সভ্যতা, সুখ ও সমৃদ্ধির বিকাশ, বস্তুগত ও নৈতিক উন্নতি ইত্যাদি। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা যাবে যে, ইসলামে যে হালাল ও হারামের বিধান রাখা হয়েছে তা কোন স্বেচ্ছাচারী ফরমান নয়, বরং তা হচ্ছে এক সুশৃংখল আদেশ নির্দেশের সমাহার যার উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ (খোদার প্রতি মানুষের বাধ্যতা ও আনুগত্য পরীক্ষা ছাড়াও) ব্যক্তিক, পারিবারিক অথবা সামাজিক পর্যায়ে সুষ্ঠু, নিরাপদ ও পূর্ণাঙ্গ পন্থায় মানুষের অগ্রগতি সাধন। ইসলামি আদবের বিস্তারিত বিষয়গুলো অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতা, ব্যক্তির প্রতি বৈরীভাবাপন্ন কিংবা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রকৃত প্রয়োজনের প্রতি অসম্পৃক্ত নয়। বরং এসব বিষয় সমাজের সকল স্তরেও প্রাত্যহিক জীবনে বিভিন্ন মৌলিক কর্মকাণ্ডে সমাধান যুগিয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে কেন্দ্রীয় এবং অপরিহার্য বিষয়ে মনোনিবেশ করা এবং বিভ্রান্ত মানুষকে উদ্ধার করা। এগুলো উদ্দেশ্য থেকে উপায়কে পৃথক করে এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পদ কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ব্যাপারে ব্যক্তি ও সমাজকে সহায়তা করে। ইসলামি আদবের পরিপ্রেক্ষিতে মৌলিক মানবীয় প্রয়োজন ও কার্যক্রমের তালিকা তৈরি করে সাধারণ বিষয়টির ব্যাখ্যার সহায়ক হতে পারে নিম্নোক্ত বিষয়াবলি:
১. পোশাক পরিধানকারীকে প্রাথমিকভাবে আবহাওয়ার দৌরাত্ম্য থেকে তা রক্ষা করে এবং তার শরীরের গোপন অঙ্গ ঢেকে রাখে।
২. গৃহায়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে আবহাওয়ার দৌরাত্ম্য থেকে আশ্রয়লাভ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও নিরূপদ্রব জীবন যাপন।
৩. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং রোগ-বালাই থেকে মানুষকে রক্ষা করা।
৪. স্বামীর সামনে মহিলাদের আকর্ষণীয় ও প্রিয় হওয়ার মাধ্যম হল প্রসাধনী ও মেক-আপ।
৫. বক্তৃতা হচ্ছে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা বিনিময়ের অপরিহার্য কাজ সম্পন্ন করে।
৬. হাস্যরস উত্তেজনা হ্রাস করে এবং বিভিন্ন সমাবেশে জনগণের চিত্ত বিনোদনে সহায়তা করে।
৭. উপহার হচ্ছে শুভেচ্ছার বহিঃপ্রকাশ এবং এর ফলে অপরের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠে।
৮. বিভিন্ন লোককে ভোজে দাওয়াত দান, তাদের সাথে ভাগাভাগি করে খাওয়ার ফলে সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি হয় ও তা জোরদার করে।
৯. সামাজিক সম্পর্কেও এর বেশ মূল্য রয়েছে। কারণ এই সম্পর্কের ফলে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা রোধ হয় বা তা সীমিত করে। সামাজিক আচারের প্রয়োজন, কারণ সমাজের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থাগুলো সুন্দর সমন্বয় সাধন করে থাকে।
১০. কবরস্থান মূলত: মৃতদের সম্মানে নির্মিত। তবে তা জীবিতদেরকে পচনশীল মৃতদেহ থেকে রক্ষা করে।
১১. মানুষের পাশাপাশি জীবজন্তুকে প্রধানত: খাদ্য, শ্রম ও পরিবহনের কাজে লাগানো হয়। তাদেরকে মানুষের চিত্তবিনোদনের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়; যেমন- বিভিন্ন পশুর মধ্যে লড়াই বাধিয়ে উপভোগ করা।
এটি সততই প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামের আদবের বাধাবিপত্তি ছাড়া এসব মাধ্যম পরিণতিতে পর্যবসিত হত, যা উপরোক্ত মূল্যবোধ ও ধ্যান ধারণাকে নস্যাৎ করে দিত। পোশাক, ঘরবাড়ি, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, উপঢৌকন ইত্যাদি ব্যক্তির বা সমাজের সম্পদের অপচয় ঘটায়; কেননা জনগণ (এসবের প্রকৃত কাজের ক্ষেত্র ভুলে গিয়ে) অন্যদের সামনে তাদের ব্যাপক ক্রয়ক্ষমতার প্রমাণ করার অর্থহীন প্রচেষ্টায় টাকা পয়সা খরচে লিপ্ত। বিশ্বে পণ্যের অপচয় করার লক্ষ্য হচ্ছে ব্যক্তির এবং তাদের সমাজের সাফল্য- যে সমাজে তাদের অধিবাস। ব্যক্তির চিত্তবিনোদন বা আনন্দের প্রতি গুরুত্বদানের ফলে তা কি রকম লক্ষ্যে পরিণত হয়- পাশ্চাত্য দেশসমূহের বিরাট জনগোষ্ঠী এবং মুসলিম দেশসমূহের ক্রমবর্ধমান গোষ্ঠী যে হারে সম্পদ ব্যয় করছে, তা থেকেই সেটা প্রতীয়মান হবে। কিন্তু খোদায়ী আইনে মানুষের প্রতি মানুষের যে দায়িত্ব তা এড়িয়ে যাবার মূল্য দিতে হচ্ছে প্রতিটি ব্যক্তির আত্মা (রূহ্) হারানোর মাধ্যমে; তারা আত্মা হারাচ্ছে অস্থিরচিত্তে এক পলায়নবাদ থেকে অন্য পরায়নবাদের আশ্রয় নিতে গিয়ে। তারা সর্বদাই চাচ্ছে উত্তেজনাকর সুখ অর্জন বা বিক্ষুব্ধচিত্তের অধিকারী হতে। যখনই তারা একাকীত্বের শিকার হচ্ছে, তখনই তাদের মন যাচ্ছে গভীর শূন্যতায় ভরে এবং তারা হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে।
ইসলামি আদবের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের প্রতিভার এ ধরনের অপ্রীতিকর অপচয় পরিহার করা এবং মানুষকে তার জীবনের প্রকৃত উদ্দশ্য ও বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বিত করে তার সেই প্রতিভাকে কাজে লাগাতে উৎসাহিত করা। সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক এমনকি চিকিৎসার পরিভাষার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানের জীবনাচরণে থাকবে ব্যাপক প্রজ্ঞা-সেটি ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থা থেকেও। এর তাৎপর্য হচ্ছে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপনের জন্য, ব্যক্তি এবং সমাজকে অত্যন্ত সচেতন ও বিবেচনার সাথে এসব বিধির প্রয়োগ করতে হবে। যে কোন প্রয়োগের বেলায়, সদয় ও সুবিবেচনা, এই দুটো বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। ইসলামের মূল অর্থ হচ্ছে- (আত্মসমর্পণ বা আনুগত্য) শান্তি; মুসলমান হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে খোদার ফরমানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, যে খোদা ও তাঁর সৃষ্টিকুলের সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তদুপরি মহানবী (সাঃ) তাঁকেই প্রকৃত মুসলমান বলেছেন, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্যরা নিরাপদ থাকে।

টিকাঃ
৭. Amy Vanderbilt, The World Book Encyclopaedia, Chicago; Field Enterprises Educational Corporation, 1972. Vol. L. p-297.

📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 দয়া ও ভদ্রতা

📄 দয়া ও ভদ্রতা


রাসূল (সা.)-এর একটি হাদিসে বলা হয়েছে, মুসলমানদের ব্যবহারের প্রতিটি ক্ষেত্রে দয়া প্রদর্শন প্রয়োজন। ইসলামি আদবের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিটি বিষয়ে সদয় ও সহানুভূতিশীল হতে লোকদের প্রশিক্ষণ দান। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত উদাহরণগুলো উল্লেখযোগ্য:
১. কথা বলার সময় স্পষ্ট করে বলতে হবে, যাতে করে সংশ্লিষ্ট লোকজন শুনতে পায়, তবে উচ্চকণ্ঠে নয়।
২. খারাপ অথবা আপত্তিকর ভাষা পরিহার করতে হবে।
৩. অট্টহাসি অথবা অপ্রীতিকর শব্দ কাম্য নয়। নির্মল হাসি হাসতে হবে।
৪. কাঁদার সময় সংযম পালন করতে হবে; হৈ চৈ করে বা বুক চাপড়ে কাঁদা উচিত নয়।
৫. পানাহারের বেলায় ভদ্র পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
৬. মুসলমানকে অবশ্যই তার ক্রোধ সংবরণ করতে হবে, সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করা চলবে না।
৭. পিতামাতা তাদের সন্তানদের চমৎকার অর্থপূর্ণ নাম রাখবেন এবং জটিল ও অর্থ নেই এমন নাম রাখা থেকে বিরত থাকবেন।

📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 অন্যদের প্রতি বিবেচ্য বিষয়

📄 অন্যদের প্রতি বিবেচ্য বিষয়


কারো ক্ষতি করা বা তার উদ্দেশ্যে শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক অথবা নৈতিক নির্যাতন পরিত্যাগ করতে হবে। মহানবীর (সা.) ভাষায়, কারো ক্ষতি করা অথবা কারো ওপর প্রতিশোধ নেয়া উচিত নয়।
কারো সাথে ঘৃণাচ্ছলে কথা বলা সত্যিকার মুসলমানদের আচরণ নয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে সদাচরণ অনেকখানি নির্ভর করে অন্যের প্রতি সুবিবেচনা প্রসূত ব্যবহারের ওপর। এক্ষেত্রে ইসলামি আদবের অবদান অনেক। এ ব্যাপারে কয়েকটি উদারহণ দ্রষ্টব্য:
১. প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কারো বিশ্বাসের নিন্দা বা গালাগাল দেওয়া নিষিদ্ধ।
২. রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে ব্যবহারের নীতি হবে থুথু না ফেলা, চেঁচাচেঁচি না করা। অপরের ক্ষতি করা, বাধাদান অথবা বিরক্ত করা চলবেনা।
৩. কোন মুসলমানকে কেউ গালিগালাজ করলে এবং তার দোষত্রুটি প্রকাশ করলেও তাকে গালি দেওয়া অথবা তার ভুলত্রুটির কথা বলা ঠিক নয়।
৪. অন্যের সাথে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা, অভদ্র বা তির্যক কথা বলা নিষিদ্ধ। কটাক্ষ করা, চোগলখুরি করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত আন্দাজ, অনুমানের মাধ্যমে চরিত্র হনন ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৫. খাবার গ্রহণকালে অপ্রীতিকর ভাবভঙ্গি দেখানো উচিত নয়, কারণ এতে অন্যরা বিরক্ত হতে পারে।
৬. তিনজন এক সাথে থাকলে দু'জন একান্তে আলোচনা করা উচিত নয়; কারণ এতে তৃতীয় ব্যক্তি আহত হতে পারে।
৭. মৃতদেরকে গালিগালাজ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ এতে তাদের জীবিত আত্মীয়রা মনে আঘাত পায়।
৮. অন্যদের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে তাদের আরাম, আয়েশ ও কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোন ব্যক্তিকে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন তার কাপড় ও মুখে দুর্গন্ধ না থাকে। পিঁয়াজ বা রসুন খাওয়ার পর কারো সাথে দেখা সাক্ষাৎ না করাই শ্রেয়।
৯. মসজিদে দু'জনের মধ্যে জোর করে স্থান করে নেওয়া অথবা কোথাও যাবার কালে অন্যের চেয়ে এগিয়ে যাওয়াকে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ এর ফলে তারা বিরক্ত হবে।
১০. স্থির পানিতে, গাছের ছায়ায়, রাস্তায় বা কোন সরকারি স্থানে পেশাব, পায়খানা করা নিষেধ, কারণ এর ফলে অন্যেরা এগুলো র সাধারণ ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে অথবা এর ফলে স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।
১১. পায়ের জুতো ও মোজা খুলে এমনস্থানে রাখা উচিত, যাতে তার গন্ধে অন্যকে বিব্রত না হতে হয়।
১২. হাঁচি দেবার সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখতে হবে। হাই তোলার সময় হাত দিয়ে মুখ ঢাকতে হবে। কথা বলার সময় বড় আওয়াজে কথা বলা উচিত নয়, হয়তো অনেকে এজন্য বিরক্ত হতে পারে। এমনকি বসার সময়ও খেয়াল রাখতে হবে, যাতে অন্যরা বিরক্ত না হয়। কখনও অন্যের প্রতি শরীরের পিছনের অংশ ঘুরিয়ে বসা হয়, এটাও ঠিক নয়।

টিকাঃ
৮. Al-Nawawi's Forty Hadith Translated by Ezzeddin Ibrahim, Damascus, Al-Duram Publishing House. 1979 P. 106.

📘 ইসলামে নৈতিকতা ও আচরণ > 📄 সামাজিক সম্পর্ক রক্ষায় ইসলামি আদবের ভূমিকা

📄 সামাজিক সম্পর্ক রক্ষায় ইসলামি আদবের ভূমিকা


ইসলামি আদবের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে : সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখা। আদর্শ মুসলিম ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রয়োজনীয় গুণাবলী হচ্ছে সততা, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা, ওয়াদা রক্ষা করা, ক্রোধ সংবরণ করা, ধৈর্য, ভদ্রতা, মমত্ববোধ ইত্যাদি। এসব গুণ মানুষের মধ্যে অনাস্থার ভাব দূর করে আস্থা সৃষ্টি করে- যা সুষ্ঠু সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় ভিত্তি যুগিয়ে থাকে।
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা উচিত অথবা নিজের জন্য যতখানি ভাবা হয় অন্যের জন্যেও তা ভাবা আবশ্যক। মুসলমানদেরকে পারস্পরিক দায়িত্বশীল হতে হবে এবং একজনকে অপরের বাস্তব সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে।
ইসলামি আদব লেহাজে আনুষ্ঠানিকতার স্থান সামান্যই। এর ফলে অবাধ সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, সমাজ প্রশাসন আরো গতিশীল হয়, বৈঠকাদি ও যাতায়াতের পথ সুগম হয়। কারণ ইসলামে বিচ্ছিন্নতা নেই। মুসলমানদের পারস্পরিক দেখা সাক্ষাতের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে এজন্যে যে, এর ফলে সামাজিক সম্পর্ক জোরদার হয় এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মনস্তাত্ত্বিক কুফল থেকে ব্যক্তি রক্ষা পায়। তদুপরি মুসলমানদেরকে অবাধে দেখা সাক্ষাতের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। মেহমানদারির ব্যাপারে কর্তব্য হচ্ছে মেহমানের প্রতি অতিথিপরায়ণ ও উদার হওয়া। খাবারের দাওয়াত গ্রহণ করাকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে এবং বিয়ের ওয়ালিমায় যাওয়াকে অবশ্য কর্তব্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোগীদের দেখতে যাওয়া, জানাযায় শরীক হওয়া, শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া, আশ্বস্ত করা, তাদের খাদ্য সরবরাহ করা, সমাজের অন্যান্য লোকদের সাথে উপহার বিনিময় করা, সাক্ষাতে বা বিদায় নেবার সময় মোসাফাহা করা, বিয়ে বা জন্মের ন্যায় খুশির দিনে শরীক হওয়া- এগুলো সামাজিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের মধ্যে এ ধরনের বিনিময়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মুসলমানদের বলা হয়েছে, সময়ে সময়ে ভোজের আয়োজন করতে এবং এ উপলক্ষে লোকদের দাওয়াত দিতে। বিয়ে, জন্ম এবং কুরবানীর দিনের ন্যায় দিনগুলোতে ভোজনের আয়োজন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক মর্যাদার পার্থক্য সত্ত্বেও একত্রে ভোজনের ফলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে সৌহার্দ্য বাড়ে। এজন্য যেসব ভোজের মজলিশে শুধু ধনীদের দাওয়াত দেওয়া হয় এবং গরিবদের বাদ রাখা হয়- এ ধরনের ভোজকে ইসলাম নিকৃষ্টতম ভোজ হিসেবে গণ্য করে। ব্যক্তিগত স্বার্থমুক্ত সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। এ হবে মূলতঃ খোদার সন্তুষ্টির জন্য। অনুরূপভাবে, প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে কারো দেওয়া উপহার মুসলমানদের গ্রহণ করা উচিত নয়। ব্যক্তিগত স্বার্থে অর্থাৎ ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা অথবা কোন কিছুর প্রত্যাশার বিনিময়ে দাওয়াত দেওয়া হলে তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সাথে ব্যাপক মেলামেশার জন্য সামাজিক জীবন যাপনের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সমাজের বহু মানুষ এবং নানা বর্ণের মানুষ দিনে একাধিকবার মেলামেশার সুযোগ পায়। শুক্রবার জু'মার নামাজ আদায় করার জন্য মুসলমানরা মসজিদে সমবেত হয় এবং দু'একটি ব্যতিক্রম ছাড়া মুসলমানদের ওপর এটা ফরজ। এছাড়া বছরে দু'টি আরো উৎসব রয়েছেঃ একটি হচ্ছে ঈদুল ফিতর এবং অপরটি ঈদুল আযহা। তাছাড়া বিশ্বের সকল স্থান থেকে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মুসলমান মক্কা শরীফে পবিত্র হজ্ব পালনের জন্য সমবেত হয়।
মসজিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। মুসলমানরা মসজিদে সমাজ ও দেশের সাথে সম্পর্কিত ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারে। মসজিদ জনগণের মিলন কেন্দ্র হিসেবে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং এরকম রাখা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। মসজিদের পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলার উপর সেখানকার সামাজিক বৈঠকের সাফল্য নির্ভর করে।
অপরের সঙ্গে আলোচনা করার সময় ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুসলমানদের প্রত্যহ গোসল করতে হয়। তাছাড়া যখনি সম্ভব, প্রকাশ্য সমাবেশে (যে কোন শুক্রবার জুমার জামায়াত, দু'টি ঈদ উৎসব) যোগ দেওয়ার আগে পরিচ্ছন্ন কাপড়, আতর ইত্যাদি ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে যোগাযোগের ক্ষেত্রে যেগুলোর ব্যবহার সর্বাধিক যেমন হাত ও মুখমণ্ডল সর্বোপরি মুখ ও দাঁত পরিষ্কার রাখতে হয়। কারণ মত বিনিময় ও অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যা এ সময়ে নজরে পড়ে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00