📄 বৈশিষ্ট্য : বোধগম্যতা ও নৈতিকতা
ইসলাম প্রত্যেক মুসলমানের জীবনের প্রতিটি দিক নির্ধারণ করে দিয়েছে। অমুসলমানদের পক্ষে এই অপরিহার্য বিষয়টি অনুধাবন করা খুবই জটিল ব্যাপার। বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে ইসলাম তার সকল আচরণ ও ব্যবহার যাচাই করার মানদণ্ড দিয়েছে। ইসলাম অন্যান্য ব্যক্তির সাথে, সার্বিকভাবে সমাজের সাথে, প্রাকৃতিক জগতের সাথে তার সম্পর্ক এবং খোদ নিজের ব্যাপারেও তার সম্পর্ক নির্ধারণ করে দিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তির যথেচ্ছাচার অথবা সমাজের পারিপার্শ্বিক অবস্থার বল্গাহীন দাবির বিপরীতে বহু দৃষ্টান্ত পেশ করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, শুধু ইসলাম- অনুমোদিত পন্থায় খাদ্য প্রস্তুতির বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে। বলা যায়, কোন মুসলমান শূকরের গোস্ত খেতে পারেনা। একজন মুসলিম মহিলার প্রকাশ্যে হাঁটুর নিম্নভাগের পা উন্মুক্ত রাখা উচিত নয়, কারণ ইসলামে তার অনুমতি নেই। মদের ন্যায় যে সব পণ্য মুসলমানদের জন্য নিষেধ; সেগুলো উপহার হিসেবেও বিনিময় করা যাবেনা। কোন মুসলমান বিবাহ উৎসবে আমন্ত্রিত হলে, তাকে সে দাওয়াত কবুল করতে হবে (অবশ্য যদি সে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে), কেননা তার জন্য এরূপ করা বাধ্যতামূলক। মৃত্যুশয্যায় পোষিত (উল্লিখিত) ইচ্ছা ইসলামি শিক্ষার বিরোধী হলে তা পূরণ করা যাবে না। যেমন মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের মধ্যে অতিরিক্ত সম্পদ বরাদ্দ অথবা তার দেহ পুড়িয়ে ফেলার অনুরোধ পুরণ করা যাবে না।
ইসলামের আদব হচ্ছে: একটি সমন্বিত বিধান। সামাজিক আচরণের প্রতিটি দিক এর অন্তর্ভুক্ত। এটা পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা তথা ইসলামের অংশ। ইসলামের বিভিন্ন অংশ যেমন একটি অখণ্ড সত্তা গড়ে তোলে, তেমনি বাদবাকী অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ইসলামি আদবের প্রয়োগ তার সর্বাত্মক রূপায়ণ ঘটাবে না; এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে তা অর্থহীন হয়ে পড়বে। এই গ্রন্থালোচিত আচরণ ও প্রথাসমূহকে মুসলমানদের জন্য উপযোগী বিবেচনা করা হয়েছে। যাদের সত্যিকার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামে অনুমোদিত শুদ্ধ আচরণের নীতি অবলম্বন করবে। ইসলামের বিভিন্ন দিক যেমন আদর্শিক, আধ্যাত্মিক, আইনগত, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক- প্রভৃতি পরস্পর সমন্বিত এবং একে অপরের পরিপূরক। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, মুসলমানদের ঈমান এবং অপরিহার্য বিষয় যে, ঈমানি চেতনায় বাইরের চাপ ছাড়াই ইসলামের নৈতিক, আইনগত ও অন্যান্য বিধান মেনে চলার অনুপ্রেরণা যোগায়। একইভাবে এসব বিধিবিধান স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে পালনের মাধ্যমে তার ঈমান বৃদ্ধি পায়; অধ্যাত্মচেতনা থেকে সামাজিক কর্মকাণ্ডের পথ উন্মুক্ত করে দেয় এবং দু'টিকে একটি শক্তিশালী স্থিতিশীল সম্পর্কের বাঁধনে সংযুক্ত করে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে ইসলামের একক শক্তির বিকাশ দেখা যাবে, মহিলাদের ক্ষেত্রে আচরণের ব্যাপারে। ইসলামি সমাজে মুসলিম মহিলাদের ব্যাপারে ইসলামি ধারণার অনুসরণে এই আচরণবিধি প্রণীত।
ইসলামি আদবের ব্যাপকতার পাশাপাশি সৌজন্যের (Etiquette) সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তুলনীয়। ইসলামের আচরণ বিভিন্ন উপলক্ষে শুধু সৌজন্যের বিধিমালা নয়, বরং সাধারণ কর্মকাণ্ড থেকে ব্যাপক সামাজিক উৎসবের সার্বিক মানবিক সম্পর্কের আওতাভুক্ত। পশ্চিমা 'etiquette' এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ (রাজকীয় পরিষদবর্গ ছাড়িয়ে তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছলেও) উচ্চ শ্রেণীর লোকদের সুরক্ষা করা।" এর বিপরীতে ইসলামি আদবের সত্যিকার উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ তার ধর্মীয় চরিত্র ও প্রকৃতি অনুধাবন। মানুষের দৈনন্দিন কর্মপদ্ধতিতে খোদার স্মরণ থেকেই এর উৎপত্তি; এর উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ খোদার স্মরণ (যিকির) অব্যাহত রাখা এবং সঠিক পথে চলতে সহায়তা করা। ইসলামের আচরণের সকল ঘটনায় খোদার রহমত তালাশ করা এটা থেকে সুস্পষ্ট হয়। ঘুম থেকে জেগে ওঠে শোওয়ার সময় পর্যন্ত মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনের সবক করতে হয় খোদার নাম নিয়ে। খাবার গ্রহণ, পানি পান, নতুন কাপড় চোপড় ক্রয় অথবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনার সময় খোদার প্রতি শুকরিয়া ও তার প্রশংসা করতে হয়। এমনকি এস্তেঞ্জা করার আগেও তাকে খোদার নাম নেয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পায়খানায় প্রবেশের সময় এই দোয়া পড়ার কথা বলা হয়েছে : “হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে শয়তান ও অশ্লীলতা থেকে আশ্রয় চাই।” পায়খানা ছেড়ে আসার সময়ও তাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। সফরকালে খোদার যিকর করা এবং পূর্ণতা ও নির্দেশনার জন্য খোদার রহমত কামনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, ইসলামের দু'টি বড় উৎসব হচ্ছে (দু'টি প্রধান ফরজ কাজ) রমজান মাসে রোজা রাখা এবং মক্কা শরীফে গিয়ে হজ্ব সমাপনান্তে সামাজিক উৎসব পালন।
জাতির আত্মবিশ্বাস ও শক্তির স্তম্ভ হচ্ছে নৈতিকতা, যা ইসলামি আদবের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এর পাশাপাশি কোন জাতির পতন ও ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে দুর্নীতি ও নৈতিকতা বিরোধী কাজ। নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব আরোপের ফলে প্রায়ই ইসলামি জীবনব্যবস্থাকে আপাতঃদৃষ্টিতে কঠোর অথবা মৌলবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। একজন লেখক বলেছেন, নৈতিকতার কোন কোন ব্যাপারে ইসলাম আমাদের কালের বিশেষ কতিপয় জীবনব্যবস্থার চাইতে অধিকতর কঠোর ও অধিকতর বিশুদ্ধ। তবে কোন জাতির সুস্থতার ক্ষেত্রে নৈতিকতাকে গুরুত্ব দিয়ে অবৈধ যৌন সম্পর্ক এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য দুর্নীতির সকল পথ রুদ্ধ করে দিয়ে মান নির্ধারক ইসলাম সঠিক দায়িত্ব পালন করেছে। ব্যক্তিগত এবং সামষ্টিক মানবিক পুণ্যের বিনিময়ে বস্তুগত আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করা যাবে না। তাছাড়া রাজনীতিকেও (অনৈসলামিক চিন্তাধারায় এটা অনৈতিক এমনকি নৈতিকতার সাথে সম্পর্কহীন গণ্য করা হয়) ইসলামের লক্ষ্য তথা মানবিক চরিত্র ও মানবতার বিকাশের উপযোগী হতে হবে।
মানবতার আদর্শ 'আমলে সালেহ' বা পুণ্যকর্মের উপর স্থাপিত। এই পরিভাষাটি ধর্মীয় চিন্তার ক্ষেত্রে যে অর্থের ধারক, তার বাইরেও তা বিস্তৃত। ইসলামি আকিদা ও আইনের অনুমোদিত মানবিক কার্যক্রমের (অপরের সঙ্গে সম্পর্কের, সজীব ও নির্জীব পরিবেশের ক্ষেত্রে) বহুদিক এর আওতাভুক্ত। এক্ষেত্রে মহানবীর (সা.) জীবন থেকে বহু বাস্তব উদাহরণ পাওয়া গেছে; যেমন- দু'জনের মধ্যে ন্যায়বিচার করা, কাউকে ঘোড়া চড়তে (বা গাড়িতে উঠতে) সাহায্য করা, উত্তম বাক্য বিনিময় করা, পথ কন্টকমুক্ত করা, বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়ালকে পানি পান করানো, অন্যকে স্বাগত সম্ভাষণ জানাতে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করা, আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করা ইত্যাদি। এমনকি স্ত্রীর সাথে প্রেমপূর্ণ ভাষায় কথা বলাও উত্তম কাজ হিসেবে বিবেচিত। আদর্শ মুসলিম ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিনয়, সৌজন্য এবং সহজ সরল আচরণ। আচার ব্যবহারে কোন প্রকার গৌরব ও ঔদ্ধত্য মেনে নেয়া যায়না। কারণ তাকওয়া এবং সৎকর্ম ছাড়া কোন মানুষের ওপর অন্য মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।
একইভাবে যে পোশাক পরলে অহংকার প্রদর্শিত হয়, সামাজিক মর্যাদার ভড়ং ধরা পড়ে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। খাদ্য গ্রহণে নম্র ও ভদ্র পরিবেশ বজায় রাখা আবশ্যক। খাবার গ্রহণকালে সোফায় হেলান দেওয়া নিষিদ্ধ। খাবার গ্রহণকালে বসে খাওয়া বিনম্রতার লক্ষণ। গৃহের আসবাবপত্র সাজানোর মধ্যেও ভদ্রতা ও সংযমের বহিঃপ্রকাশ থাকতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মেঝে থেকে অনেক উঁচুতে বিছানা পাতা যাবেনা। হাঁটার সময় প্রফুল্ল থাকা, স্বাগত সম্ভাষণ ও বক্তৃতাকালে কোন প্রকার বড়ত্বের বহিঃপ্রকাশ থাকা উচিত নয়।
ইসলাম বৈষয়িক ও ধর্মীয় জীবনের সকল পর্যায়ে পরিমিত ও স্বাভাবিক আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। উগ্রপন্থা, বাড়াবাড়ি, খামখেয়ালিপনা, অস্বাভাবিক আচরণ, অস্থিরচিত্ততা এবং জটিলতাকে পরিহার করতে হবে। ইসলামি আদবে কোন কোন অনানুষ্ঠানিকতার ওপর গুরুত্ব দানের উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলিম সমাজের বিরাট জনগোষ্ঠীর কাছে তার ব্যবহার সহজতর করে তোলা। আচার আচরণের স্বাভাবিকতাকে সামাজিক উত্তেজনা হ্রাস এবং সামাজিক সম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়।
টিকাঃ
৪. ফরাসি শব্দ Une etiuette থেকে etiquette এর উৎপত্তি। এর অর্থ হচ্ছেঃ নতুন নতুন পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য আচরণের একটি ব্যাপক বিধিমালা, আদালতে যার মোকাবেলা করা যেতে পারে। Academic American Encyclopedia, Dunbury: Grolier Inc. 1942, Vol. 7, P-258.
৫. Esther & Aresty, Encyclopedia American, Danbury: American Corporation, 1979, Vol.10, P-635
৬. Mohommad Hamidullah, Introduction to Islam, the Holy Quran Publishing House, 1977, p-155.
📄 লক্ষ্য
ইসলামে যেটা কেন্দ্রীয় ও অপরিহার্য, তা নির্ধারিত হয় ইসলামের লক্ষ্যের সাথে তার বিস্তৃত সম্পর্কের দ্বারা। এর মধ্যে রয়েছে মানব সমাজের উৎকর্ষ বা সভ্যতা, সুখ ও সমৃদ্ধির বিকাশ, বস্তুগত ও নৈতিক উন্নতি ইত্যাদি। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা যাবে যে, ইসলামে যে হালাল ও হারামের বিধান রাখা হয়েছে তা কোন স্বেচ্ছাচারী ফরমান নয়, বরং তা হচ্ছে এক সুশৃংখল আদেশ নির্দেশের সমাহার যার উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ (খোদার প্রতি মানুষের বাধ্যতা ও আনুগত্য পরীক্ষা ছাড়াও) ব্যক্তিক, পারিবারিক অথবা সামাজিক পর্যায়ে সুষ্ঠু, নিরাপদ ও পূর্ণাঙ্গ পন্থায় মানুষের অগ্রগতি সাধন। ইসলামি আদবের বিস্তারিত বিষয়গুলো অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতা, ব্যক্তির প্রতি বৈরীভাবাপন্ন কিংবা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রকৃত প্রয়োজনের প্রতি অসম্পৃক্ত নয়। বরং এসব বিষয় সমাজের সকল স্তরেও প্রাত্যহিক জীবনে বিভিন্ন মৌলিক কর্মকাণ্ডে সমাধান যুগিয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে কেন্দ্রীয় এবং অপরিহার্য বিষয়ে মনোনিবেশ করা এবং বিভ্রান্ত মানুষকে উদ্ধার করা। এগুলো উদ্দেশ্য থেকে উপায়কে পৃথক করে এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পদ কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ব্যাপারে ব্যক্তি ও সমাজকে সহায়তা করে। ইসলামি আদবের পরিপ্রেক্ষিতে মৌলিক মানবীয় প্রয়োজন ও কার্যক্রমের তালিকা তৈরি করে সাধারণ বিষয়টির ব্যাখ্যার সহায়ক হতে পারে নিম্নোক্ত বিষয়াবলি:
১. পোশাক পরিধানকারীকে প্রাথমিকভাবে আবহাওয়ার দৌরাত্ম্য থেকে তা রক্ষা করে এবং তার শরীরের গোপন অঙ্গ ঢেকে রাখে।
২. গৃহায়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে আবহাওয়ার দৌরাত্ম্য থেকে আশ্রয়লাভ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও নিরূপদ্রব জীবন যাপন।
৩. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং রোগ-বালাই থেকে মানুষকে রক্ষা করা।
৪. স্বামীর সামনে মহিলাদের আকর্ষণীয় ও প্রিয় হওয়ার মাধ্যম হল প্রসাধনী ও মেক-আপ।
৫. বক্তৃতা হচ্ছে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা বিনিময়ের অপরিহার্য কাজ সম্পন্ন করে।
৬. হাস্যরস উত্তেজনা হ্রাস করে এবং বিভিন্ন সমাবেশে জনগণের চিত্ত বিনোদনে সহায়তা করে।
৭. উপহার হচ্ছে শুভেচ্ছার বহিঃপ্রকাশ এবং এর ফলে অপরের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠে।
৮. বিভিন্ন লোককে ভোজে দাওয়াত দান, তাদের সাথে ভাগাভাগি করে খাওয়ার ফলে সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি হয় ও তা জোরদার করে।
৯. সামাজিক সম্পর্কেও এর বেশ মূল্য রয়েছে। কারণ এই সম্পর্কের ফলে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা রোধ হয় বা তা সীমিত করে। সামাজিক আচারের প্রয়োজন, কারণ সমাজের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থাগুলো সুন্দর সমন্বয় সাধন করে থাকে।
১০. কবরস্থান মূলত: মৃতদের সম্মানে নির্মিত। তবে তা জীবিতদেরকে পচনশীল মৃতদেহ থেকে রক্ষা করে।
১১. মানুষের পাশাপাশি জীবজন্তুকে প্রধানত: খাদ্য, শ্রম ও পরিবহনের কাজে লাগানো হয়। তাদেরকে মানুষের চিত্তবিনোদনের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়; যেমন- বিভিন্ন পশুর মধ্যে লড়াই বাধিয়ে উপভোগ করা।
এটি সততই প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামের আদবের বাধাবিপত্তি ছাড়া এসব মাধ্যম পরিণতিতে পর্যবসিত হত, যা উপরোক্ত মূল্যবোধ ও ধ্যান ধারণাকে নস্যাৎ করে দিত। পোশাক, ঘরবাড়ি, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, উপঢৌকন ইত্যাদি ব্যক্তির বা সমাজের সম্পদের অপচয় ঘটায়; কেননা জনগণ (এসবের প্রকৃত কাজের ক্ষেত্র ভুলে গিয়ে) অন্যদের সামনে তাদের ব্যাপক ক্রয়ক্ষমতার প্রমাণ করার অর্থহীন প্রচেষ্টায় টাকা পয়সা খরচে লিপ্ত। বিশ্বে পণ্যের অপচয় করার লক্ষ্য হচ্ছে ব্যক্তির এবং তাদের সমাজের সাফল্য- যে সমাজে তাদের অধিবাস। ব্যক্তির চিত্তবিনোদন বা আনন্দের প্রতি গুরুত্বদানের ফলে তা কি রকম লক্ষ্যে পরিণত হয়- পাশ্চাত্য দেশসমূহের বিরাট জনগোষ্ঠী এবং মুসলিম দেশসমূহের ক্রমবর্ধমান গোষ্ঠী যে হারে সম্পদ ব্যয় করছে, তা থেকেই সেটা প্রতীয়মান হবে। কিন্তু খোদায়ী আইনে মানুষের প্রতি মানুষের যে দায়িত্ব তা এড়িয়ে যাবার মূল্য দিতে হচ্ছে প্রতিটি ব্যক্তির আত্মা (রূহ্) হারানোর মাধ্যমে; তারা আত্মা হারাচ্ছে অস্থিরচিত্তে এক পলায়নবাদ থেকে অন্য পরায়নবাদের আশ্রয় নিতে গিয়ে। তারা সর্বদাই চাচ্ছে উত্তেজনাকর সুখ অর্জন বা বিক্ষুব্ধচিত্তের অধিকারী হতে। যখনই তারা একাকীত্বের শিকার হচ্ছে, তখনই তাদের মন যাচ্ছে গভীর শূন্যতায় ভরে এবং তারা হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে।
ইসলামি আদবের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের প্রতিভার এ ধরনের অপ্রীতিকর অপচয় পরিহার করা এবং মানুষকে তার জীবনের প্রকৃত উদ্দশ্য ও বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বিত করে তার সেই প্রতিভাকে কাজে লাগাতে উৎসাহিত করা। সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক এমনকি চিকিৎসার পরিভাষার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানের জীবনাচরণে থাকবে ব্যাপক প্রজ্ঞা-সেটি ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থা থেকেও। এর তাৎপর্য হচ্ছে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপনের জন্য, ব্যক্তি এবং সমাজকে অত্যন্ত সচেতন ও বিবেচনার সাথে এসব বিধির প্রয়োগ করতে হবে। যে কোন প্রয়োগের বেলায়, সদয় ও সুবিবেচনা, এই দুটো বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। ইসলামের মূল অর্থ হচ্ছে- (আত্মসমর্পণ বা আনুগত্য) শান্তি; মুসলমান হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে খোদার ফরমানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, যে খোদা ও তাঁর সৃষ্টিকুলের সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তদুপরি মহানবী (সাঃ) তাঁকেই প্রকৃত মুসলমান বলেছেন, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্যরা নিরাপদ থাকে।
টিকাঃ
৭. Amy Vanderbilt, The World Book Encyclopaedia, Chicago; Field Enterprises Educational Corporation, 1972. Vol. L. p-297.
📄 দয়া ও ভদ্রতা
রাসূল (সা.)-এর একটি হাদিসে বলা হয়েছে, মুসলমানদের ব্যবহারের প্রতিটি ক্ষেত্রে দয়া প্রদর্শন প্রয়োজন। ইসলামি আদবের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিটি বিষয়ে সদয় ও সহানুভূতিশীল হতে লোকদের প্রশিক্ষণ দান। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত উদাহরণগুলো উল্লেখযোগ্য:
১. কথা বলার সময় স্পষ্ট করে বলতে হবে, যাতে করে সংশ্লিষ্ট লোকজন শুনতে পায়, তবে উচ্চকণ্ঠে নয়।
২. খারাপ অথবা আপত্তিকর ভাষা পরিহার করতে হবে।
৩. অট্টহাসি অথবা অপ্রীতিকর শব্দ কাম্য নয়। নির্মল হাসি হাসতে হবে।
৪. কাঁদার সময় সংযম পালন করতে হবে; হৈ চৈ করে বা বুক চাপড়ে কাঁদা উচিত নয়।
৫. পানাহারের বেলায় ভদ্র পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
৬. মুসলমানকে অবশ্যই তার ক্রোধ সংবরণ করতে হবে, সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করা চলবে না।
৭. পিতামাতা তাদের সন্তানদের চমৎকার অর্থপূর্ণ নাম রাখবেন এবং জটিল ও অর্থ নেই এমন নাম রাখা থেকে বিরত থাকবেন।
📄 অন্যদের প্রতি বিবেচ্য বিষয়
কারো ক্ষতি করা বা তার উদ্দেশ্যে শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক অথবা নৈতিক নির্যাতন পরিত্যাগ করতে হবে। মহানবীর (সা.) ভাষায়, কারো ক্ষতি করা অথবা কারো ওপর প্রতিশোধ নেয়া উচিত নয়।
কারো সাথে ঘৃণাচ্ছলে কথা বলা সত্যিকার মুসলমানদের আচরণ নয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে সদাচরণ অনেকখানি নির্ভর করে অন্যের প্রতি সুবিবেচনা প্রসূত ব্যবহারের ওপর। এক্ষেত্রে ইসলামি আদবের অবদান অনেক। এ ব্যাপারে কয়েকটি উদারহণ দ্রষ্টব্য:
১. প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কারো বিশ্বাসের নিন্দা বা গালাগাল দেওয়া নিষিদ্ধ।
২. রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে ব্যবহারের নীতি হবে থুথু না ফেলা, চেঁচাচেঁচি না করা। অপরের ক্ষতি করা, বাধাদান অথবা বিরক্ত করা চলবেনা।
৩. কোন মুসলমানকে কেউ গালিগালাজ করলে এবং তার দোষত্রুটি প্রকাশ করলেও তাকে গালি দেওয়া অথবা তার ভুলত্রুটির কথা বলা ঠিক নয়।
৪. অন্যের সাথে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা, অভদ্র বা তির্যক কথা বলা নিষিদ্ধ। কটাক্ষ করা, চোগলখুরি করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত আন্দাজ, অনুমানের মাধ্যমে চরিত্র হনন ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৫. খাবার গ্রহণকালে অপ্রীতিকর ভাবভঙ্গি দেখানো উচিত নয়, কারণ এতে অন্যরা বিরক্ত হতে পারে।
৬. তিনজন এক সাথে থাকলে দু'জন একান্তে আলোচনা করা উচিত নয়; কারণ এতে তৃতীয় ব্যক্তি আহত হতে পারে।
৭. মৃতদেরকে গালিগালাজ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ এতে তাদের জীবিত আত্মীয়রা মনে আঘাত পায়।
৮. অন্যদের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে তাদের আরাম, আয়েশ ও কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোন ব্যক্তিকে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন তার কাপড় ও মুখে দুর্গন্ধ না থাকে। পিঁয়াজ বা রসুন খাওয়ার পর কারো সাথে দেখা সাক্ষাৎ না করাই শ্রেয়।
৯. মসজিদে দু'জনের মধ্যে জোর করে স্থান করে নেওয়া অথবা কোথাও যাবার কালে অন্যের চেয়ে এগিয়ে যাওয়াকে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ এর ফলে তারা বিরক্ত হবে।
১০. স্থির পানিতে, গাছের ছায়ায়, রাস্তায় বা কোন সরকারি স্থানে পেশাব, পায়খানা করা নিষেধ, কারণ এর ফলে অন্যেরা এগুলো র সাধারণ ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে অথবা এর ফলে স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।
১১. পায়ের জুতো ও মোজা খুলে এমনস্থানে রাখা উচিত, যাতে তার গন্ধে অন্যকে বিব্রত না হতে হয়।
১২. হাঁচি দেবার সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখতে হবে। হাই তোলার সময় হাত দিয়ে মুখ ঢাকতে হবে। কথা বলার সময় বড় আওয়াজে কথা বলা উচিত নয়, হয়তো অনেকে এজন্য বিরক্ত হতে পারে। এমনকি বসার সময়ও খেয়াল রাখতে হবে, যাতে অন্যরা বিরক্ত না হয়। কখনও অন্যের প্রতি শরীরের পিছনের অংশ ঘুরিয়ে বসা হয়, এটাও ঠিক নয়।
টিকাঃ
৮. Al-Nawawi's Forty Hadith Translated by Ezzeddin Ibrahim, Damascus, Al-Duram Publishing House. 1979 P. 106.