📘 ইসলামে নারী বনাম ইহুদী ও খৃষ্ট্রান ধর্মে নারী > 📄 তালাক

📄 তালাক


তালাক নিয়ে তিনটি ধর্মে ব্যাপক মতানৈক্য রয়েছে। খৃষ্টান ধর্মে তালাককে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটা বাইবেলের নতুন নিয়মের (New Testament) বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বোধগম্য হয়। ঈসা আলাইহিস সালামের নামে প্রচার করা হয় যে, তিনি বলেছেন: “আমি বলছি যে তার স্ত্রীকে তালাক দেবে সে যেন তার স্ত্রীর জন্য ব্যভিচারের দরজা উন্মুক্ত করে দিল। আর যে তালাকপ্রাপ্তাকে বিবাহ করল সে যেন ব্যভিচারে জড়িয়ে পড়ল”। (ম্যাথিউ: ৫/৩২)
কিন্তু, এগুলো বাস্তবে বাস্তবায়ন করা হয় না। এগুলো ধার্মিকতার দাবি হওয়া সত্বেও কখনও সম্ভব নয়। বৈবাহিক জীবনের ব্যর্থতার কারণে যদি স্বামী-স্ত্রীর জীবনযাপন অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হয়, তাহলে তালাক নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান তাদের কোনো উপকারে আসবে না। স্বামী স্ত্রীর জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে গেলে তাদেরকে জোর করে একত্র রাখার কোনো অর্থ হয় না। তবে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই যে, খৃষ্টান সমাজ আজ তালাককে বৈধতা প্রদান করতে বাধ্য হয়েছে।
পক্ষান্তরে ইয়াহূদীরা কোনো কারণ ছাড়াই তালাককে বৈধতা দিয়েছে। পুরাতন নিয়ম (Old Testament) পুরুষকে অধিকার দিয়েছে যে, নিছক পছন্দ-অপছন্দের কারণেই সে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে। বলা হয়েছে: “কোনো পুরুষ কোনো নারীকে বিবাহ করার পর কোনো ত্রুটির কারণে তাকে পছন্দ না হয়। এরপর সে তালাক লিখে স্ত্রীকে দিয়ে দিল। স্ত্রী তার বাড়ী থেকে বের হয়ে গিয়ে আবার আরেকজনকে বিবাহ করল। সেও স্ত্রী পছন্দসই না হওয়ার কারণে তালাক লিখে স্ত্রীর হাতে দিয়ে দিল। এমতাবস্থায় প্রথম স্বামীর জন্য এ স্ত্রী পুনরায় বৈধ হবে না। কেননা স্রষ্টার দৃষ্টিতে সে তখন নাপাক। তোমাকে আল্লাহ তা'আলা যে অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন তার অতিরিক্ত গ্রহণ করতে পদক্ষেপন করো না"। (ডিউটারনমী: ২৪/১-৪)
ইয়াহুদী পণ্ডিতরা 'অপছন্দ ও দোষ' শব্দ দু'টির ব্যাখ্যায় মতবিরোধ করেছেন। ইয়াহূদী ধর্ম শাস্ত্র 'তালমুদে' তাদের এ সমস্ত মতবিরোধের বর্ণনা এসেছে। 'শামাঈ' গোত্রের মতে স্ত্রী পাপাচারে লিপ্ত না হলে তাকে তালাক দেওয়া যাবে না। 'হালীল' গোত্রের মতে- যে কোনো কারণে এবং যখন খুশি স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যাবে। এমনকি নিছক খাদ্য নষ্ট করে ফেললেও। ইয়াহূদী পণ্ডিত ‘আকীবা’ বলেন, স্বামীর অধিকার আছে সে বর্তমান স্ত্রীর চেয়ে বেশি সুন্দরী স্ত্রী পেলেও আগের স্ত্রীকে তালাক দিতে পারবে। (গিট্রিন ৯০ A-B)
নতুন নিয়ম (New testament) শামাঈদের মতকে গ্রহণ করেছে। অপর দিকে ইয়াহুদী আইনে 'হালীল ও আকীবার' মতামতকে গ্রহণ করেছে। আর এ মতই বহুল প্রচলিত।³⁴
এ আইন স্বামীকে অধিকার দেয় কোনো কারণ ছাড়াই স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার; পক্ষান্তরে পুরাতন নিয়ম (Old Testament) পুরুষকে অপছন্দ হলে তালাক দেওয়ার শুধু বৈধতাই দেয় না; বরং তাকে নির্দেশও দেয়। বলা হয়েছে "খারাপ স্ত্রী তার স্বামীর জন্য অপমান বয়ে আনে এবং সে অপরের ঠাট্টা বিদ্রুপের পাত্র হয়। তার এ স্ত্রী তাকে সৌভাগ্যবান বানাতে পারে না। নারীরা পাপাচারের কেন্দ্র বিন্দু; তাদের পাপাচারের কারণেই আমাদের সবাইকে মরতে হবে। খারাপ স্ত্রীকে যা খুশি তা বলতে দিও না। যদি সে তা মেনে না নেয় তাহলে তালাক দিয়ে তার থেকে মুক্ত হও”। (এক্সিলেসিয়াসটিকাস: ২৫/২৫)
ইয়াহুদী ধর্ম গ্রন্থ তালমুদে তালাক বৈধ হওয়ার কিছু কারণ বর্ণনা করা হয়েছে যার কারণে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে “যদি সে রাস্তায় খাওয়া দাওয়া করে। ইয়াহুদী পণ্ডিত ‘মায়ার’ বলেন উক্ত স্ত্রীকে তালাক দেওয়া আবশ্যক”। (তালমুদ: গিট্রিন ৮৯ A)
যে বন্ধ্যা স্ত্রীর দশ বছর যাবত কোনো সন্তান হয় না তাকে বাধ্যতামূলক তালাক দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে তালমুদ। ইয়াহুদী পণ্ডিত বলেন, “কোনো নারীর বিবাহের পর দশ বছর পর্যন্ত কোনো সন্তান না হলে তাকে যেন স্বামী তালাক দিয়ে দেয়”। (Yeb 64 A)
কিন্তু, ইয়াহূদী আইনে মহিলার কোনো অধিকার নেই তালাক চাওয়ার, তবে আদালতে শক্তিশালী কোনো কারণ দেখাতে পারলেই (যা দ্বারা তালাক পাওয়ার দাবিদার সাব্যস্ত হয়) শুধুমাত্র ইয়াহুদী নারীরা তালাক পেতে পারে। যে সমস্ত কারণে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে সেগুলো হচ্ছে-
১. স্বামী যদি শারীরিক কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বা ত্বকের কোনো রোগে ভুগতে থাকে।
২. স্বামী যদি পরিবারের খাদ্যের বন্দোবস্ত না করতে পারে ইত্যাদি।
এ সময় আদালত তার তালাকের আবেদন গ্রহণ করবে। মহিলা কখনও তালাকের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না; বরং শুধুমাত্র স্বামীই তার স্ত্রীকে তালাকের কাগজপত্র দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। এ অবস্থায় আদালত স্বামীকে তালাকে বাধ্য করতে কিছু শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে। যেমন-জরিমানা করা, জেলে আটক রাখা, গীর্জায় প্রবেশে বাধা দেওয়া ইত্যাদি। যাতে সে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য হয়। এমতাবস্থায় স্বামী তাকে তালাক দিকে অস্বীকৃতি জানালে স্ত্রী সারাজীবন ঝুলন্ত অবস্থায় থাকবে। স্ত্রীকে সারা জীবন না বিবাহিত না তালাকপ্রাপ্তা অবস্থায় থাকতে হতে পারে। তাদের নিয়ম অনুযায়ী এ অবস্থায় স্বামী অন্য কাউকে বিবাহ করে বা অন্য কোনো মহিলার সাথে অবৈধভাবে ঘর সংসার করতে পারে। কেননা, এ অবস্থায় সন্তান হলে তাদের দেশীয় আইনানুযায়ী তা বৈধ হিসেবে গণ্য হয়। স্ত্রী পড়ে থাকবে বিবাহবিহীন অবস্থায়। কারণ, সে এখনও পূর্ব স্বামীর সথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিবাহ বসলে সে ব্যভিচারী হিসেবে গণ্য হবে এবং সন্তান হলে তাদের পরবর্তী দশম প্রজন্ম পর্যন্ত সমস্ত সন্তান অবৈধ ঘোষিত হবে। এ স্ত্রীকে বলা হবে মুকাইইয়াদাহ বা আবদ্ধ।³⁵
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে এরুপ ১০০০ থেকে ১৫০০ পর্যন্ত ইয়াহুদী মহিলা রয়েছে, যারা এভাবে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। ইসরাঈলে আছে এ রকম ১৬০০০ মহিলা। স্বামীরা তাদেরকে তালাক দেওয়ার নাম করে হাজার হাজার ডলার হাতিয়ে নেয়।³⁶
ইসলাম উভয় ধর্মের সমস্যাগুলোর সমাপ্তি ঘোষণা করতে এগিয়ে আসল। ইসলামে বৈবাহিক বন্ধন একটি অত্যন্ত পবিত্র বন্ধন। শক্তিশালী কোনো কারণ ছাড়া যা ছিন্ন হবার নয়। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসেও ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মাঝে সুষ্ঠু ফয়সালায় বিশ্বাসী। সুষ্ঠু ফয়সালার সমস্ত পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে শুধুমাত্র তখনই ইসলাম সর্বশেষ অবলম্বন হিসেবে তালাকের বৈধতা দেয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে ইসলাম তালাকের বৈধতা দেয়; কিন্তু তালাকের পথ রুদ্ধ করতে যা করা দরকার সবকিছু করে। ইসলাম নারী পুরুষ উভয়কেই তালাকের ক্ষমতা দিয়েছে। যা ইয়াহূদীদের সম্পূর্ণ বিপরীত। আর নারীদের তালাকের সে অধিকার হলো-'খোলা' করা।³⁷
তালাক দেওয়ার পর স্বামীর কোনো অধিকার নেই স্ত্রীকে প্রদত্ত সম্পদ (উপহার ইত্যাদি) ফেরত নেওয়ার। তালাকের পর নারীকে প্রদত্ত সম্পদ ফেরত নেওয়া সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
"আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর স্থানে অন্য স্ত্রীকে পরিবর্তন করতে চাও এবং তাদের একজনকে প্রচুর পরিমাণ সম্পদ দিয়ে থাক, তবে তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না। তোমরা কি তা অন্যায়ভাবে ও প্রকাশ্য গুনাহর মাধ্যমে গ্রহণ করতে চাও”? [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২০]
আর যদি স্ত্রী তার বিবাহকে ছিন্ন করতে চায়, তাহলে সে তার গৃহীত উপহার সামগ্রী স্বামীকে ফিরিয়ে দেবে। সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়াটা ন্যায় সংগত বিনিময় হিসেবে বিবেচিত হবে; কেননা স্বামী চায় তাদের বিবাহ বন্ধন টিকে থাকুক অপরদিকে স্ত্রী তা ছিন্ন করতে চায়। আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, স্ত্রী যদি বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করতে চায়, তখন ছাড়া অন্য কোনো সময় স্বামীর জন্য বৈধ হবে না তাকে প্রদত্ত সম্পদ ফিরিয়ে নেয়া।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
"তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে যা কিছু প্রদান করেছ তা থেকে কিছু ফিরিয়ে নেওয়া তোমাদের জন্য বৈধ নয়। কিন্তু, যে ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী উভয়েই ভয় করে যে তারা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখা বজায় রাখতে পারবে না, সেক্ষেত্রে স্ত্রী যদি বিনিময় দিয়ে অব্যাহতি নেয় তবে উভয়ের মধ্যে কারোরই কোনো পাপ নেই। এটা হলো আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখা। কাজেই এ সীমা অতিক্রম করো না। বস্তুতঃ যারা আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করবে তারাই যালিম।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২২৯]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট একজন মহিলা আসলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন: আমি আমার বিবাহ বিচ্ছেদ চাই; কিন্তু, তিনি বর্ণনা করেন নি, কী কারণে তিনি তার বিবাহ বিচ্ছেদ চান। তার সমস্যা একটাই যে, তিনি তার সাথে জীবনযাপন করতে ভালোবাসেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
"তুমি কি তাকে বাগান (বিবাহের সময় উপহার স্বরুপ প্রদত্ত) ফেরত দেবে? মহিলা বলল, হ্যা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বামীকে বললেন: বাগান নিয়ে নাও এবং তাকে একটি তালাক (শুধুমাত্র এক তালাক দিলে আবার ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না।) দিয়ে দাও।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫২৭৩)
এছাড়াও কোনো শক্তিশালী কারণে মহিলা তালাক দাবী করতে পারে। যেমন, স্বামীর কঠোরতা, বিনা কারণে স্ত্রীকে ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করা বা পারিবারিক খরচ না চালানো ইত্যাদি। এ অবস্থায় ইসলামী আদালত মহিলাকে তালাকের ব্যাপারে ফয়সালা দেবে।³⁸
সংক্ষেপে: ইসলাম নারীকে যে অধিকার দিয়েছে তার কোনো তুলনা হয় না। সে বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করতে পারে 'খোলা' বিধানের মাধ্যমে বা আদালতে অভিযোগ উত্থাপনের মাধ্যমে। মুসলিম মহিলাকে কখনো আটকিয়ে রাখা (তালাক না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় রাখা) যায় না।
ইসলাম আসার পর এ সকল অধিকার বলে ইয়াহুদী নারীরা ইসলামী আদালতে তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে তালাক দাবী করত। কিন্তু ইয়াহুদীরা তাদের তালাককে প্রত্যাখ্যান করে কিছু অধিকার দিয়ে কৌশলে ইসলামী আদালতে যাওয়া থেকে তাদেরকে বিরত রাখল। খৃষ্টান সমাজের ইয়াহুদী মহিলারা এ অধিকারগুলো পেত না। কেননা ওখানকার রোমানীয় আইন ইয়াহুদী আইন থেকে উত্তম ছিল না।³⁹
এখন আমরা দেখব ইসলাম তালাককে কীভাবে গ্রহণ করে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলার কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় বৈধকাজ হচ্ছে তালাক। (আবু দাউদ)
নিছক অপছন্দের কারণে স্বামীর অধিকার নেই স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার। অপছন্দ হলেও ইসলাম স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে।
আল্লাহ তা'য়ালা বলেন,
"স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপন কর। অতঃপর যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা এমন জিনিসকে অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ তা'আলা অনেক কল্যাণ রেখে দিয়েছেন।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৯]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
"কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে উপহাস না করে। যদি তার একটি আচরণ পছন্দ না হয়, তাহলে আরেকটি আচরণে হয়ত সে সন্তুষ্ট হবে।” (সহীহ মুসলিম)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাগিদ দিয়ে বলেছেন: স্ত্রীর কাছে যার আচরণ উত্তম সেই পূর্ণ ঈমানদার। তিনি বলেন,
“ঐ ব্যক্তি পূর্ণাংগ ঈমানদার যার আচার ব্যবহার উত্তম। আর যার আচার আচরণ স্ত্রীদের কাছে উত্তম সেই উত্তম ব্যক্তি।” (সহীহ তিরমিযী)
ইসলাম প্রাক্টিক্যাল ধর্ম তাই সে খেয়াল রাখে যে, কিছু কিছু পরিস্থিতিতে স্বামী স্ত্রীর মাঝে মীমাংসা করা সম্ভব হয় না এবং স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার করেও লাভ হয় না; বরং একে অপরের সাথে খারাপ ব্যবহার করে সে সময়ের জন্য স্বামীকে চারটি নসীহত পেশ করেছে। এ সময়কার করণীয় সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
"পুরুষেরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ তা'আলা একের ওপর অন্যকে বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হিফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন, লোকচক্ষুর অন্তরালেও তার হিফাযত করে। আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশংকা কর তাদেরকে সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং তাদেরকে প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোনো পথ অনুসন্ধান করতে যেওনা। নিশ্চয় আল্লাহ সবার ওপর শ্রেষ্ঠ। যদি তোমরা তাদের মধ্যে সম্পর্কছেদ হওয়ার মতো পরিস্থিতির আশংকা কর, তবে তারা উভয়ে মীমাংসা চাইলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন ও স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত কর। আল্লাহ তা'আলা সর্বজ্ঞ, সবকিছু অবহিত।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৪-৩৫]
পুরুষের উচিৎ উপরোক্ত তিনটি নসীহত মেনে চলা। যদি তাতে কোনো কাজ না হয়, তখন এতে তার পরিবারকে জড়াবে। এ আয়াত দ্বারা জানা যায় যে, স্ত্রী অবাধ্য না হলে স্বামীর জন্য কোনোভাবে উচিৎ হবে না তাকে প্রহার করা, তবে তাকে সংশোধন করতে গিয়ে জরুরি অবস্থায় প্রহার করা বৈধ। যদি এতে স্ত্রী সংশোধিত হয়ে যায়, তাহলে তাকে পূর্বেকার কাজের জন্য তিরস্কার করা উচিৎ নয়। আর যদি সংশোধন না হয় তাহলে, দ্বিতীয়বার তাকে প্রহার করবে না; বরং উভয়ের পরিবার থেকে সদস্য নিয়ে সালিস বসবে। (প্রহার করলে তা হবে মৃদু আকারে অমানুষিকভাবে যেন না হয় যাতে ব্যাথা হয় এবং তা চেহারাসহ স্পর্শকাতর স্থানে হতে পারবে না।)
বিদায় হজের ভাষণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম পুরুষদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন অত্যন্ত জরুরী অবস্থা (অশ্লীল কাজকর্ম বা কথায় জড়িত হওয়া ইত্যাদি) ছাড়া এ পর্যায়ে না আসে। এ অবস্থায়ও শাস্তিটা হবে খুবই সামান্য। নারী যদি এ কাজ থেকে বিরত হয় স্বামীর জন্য তার বিরুদ্ধে পুনরায় একশনে যাওয়া উচিৎ হবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
"তোমরা স্ত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহার কর। কেননা তারা তোমাদের কাছে বন্দী রয়েছে। এটা ব্যতিত তোমাদের আর কোনো কিছু করার অধিকার নেই তবে, যদি তারা অশ্লীল কাজে জড়িয়ে পড়ে তাহলে, ভিন্ন কথা। যদি তারা এরুপ করে তাহলে, তাদেরকে বিছানা ত্যাগ কর, আর তাদেরকে মৃদু প্রহার কর যেন তাদের শরীরে কোনো ব্যথা (অমানুষিক) না হয়। যদি তারা তোমাদের অনুগত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো পন্থা অবলম্বন করতে যেও না। (তিরমিযী)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কারণ ছাড়া স্ত্রীকে প্রহার করতে নিষেধ করেছেন। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে একদল মহিলা এসে অভিযোগ করলেন যে, তাদের স্বামীরা তাদেরকে প্রহার করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা দিলেন: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবার পরিজনের কাছে অনেক নারী এসে তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। ঐ সমস্ত পুরুষেরা উত্তম নহে (যারা তাদের স্ত্রীদেরকে প্রহার করে)। (আবু দাউদ)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে তার পরিবারের নিকট উত্তম। (তিরমিযী)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) নাম্নী মহিলাকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন যে লোক স্ত্রীকে প্রহার করে বলে সমাজে পরিচিতি লাভ করেছে, তাদেরকে যেন বিবাহ না করে। উক্ত মহিলা নিজেই বর্ণনা করেন: মুয়াবিয়া ও আবু জাহাম আমাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আবু জাহাম! সে তো তার কাধ থেকে লাঠি নামায় না; আর মুয়াবিয়া দরিদ্র যার কোনো সম্পদ নেই......(সহীহ মুসলিম)
তালমুদ স্ত্রীকে শিষ্টাচার শিক্ষাদান করতে প্রহার করার অনুমতি দিয়েছে।⁴⁰
বলা হয়েছে তাকে প্রহার করতে হলে পাপাচারী হওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং শুধুমাত্র গৃহাস্থলীর কাজকর্ম করতে অনীহা প্রকাশ করলেও তাকে প্রহার করা যাবে। তাকে মৃদু নয় বরং তাকে বেত্রাঘাত করা ও খানাপিনা থেকে বিরত রাখারও অনুমতি দিয়েছে।⁴¹
কিন্তু স্বামীর আচরণ খারাপ হওয়ার আশংকা দেখা দিলে আল-কুরআনে বলা হয়েছে:
অর্থাৎ কোনো মহিলা যদি তার স্বামীর পক্ষ থেকে অসদাচরণ বা এড়িয়ে চলা নীতি অবলম্বনের আশংকা করে। তাহলে তাদের পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা করে নেয়াতে কোনো দোষ নেই। আর মীমাংসাই উত্তম কাজ। মানুষের আত্মার সামনে লোভ বিদ্যমান রয়েছে। যদি তোমরা উত্তম কাজ কর এবং খোদাভীরু হও, তবে জেনে রাখ আল্লাহ তা'আলা তোমাদের সব কাজের খোজ খবর রাখেন। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১২৮]
এ অবস্থায় নারীকে উপদেশ দেওয়া হয়েছে পরস্পরের মাঝে মীমাংসা করে নিতে। (উভয় পরিবারের মধ্যস্থতায় বা তাদের মধ্যস্থতা ব্যতিত) নারীকে স্বামীর বিছানা থেকে পৃথক থাকা বা স্বামীকে প্রহার করার উপদেশ দেয় নি, যাতে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি এড়ানো যায়। কেননা তা তাদের মধ্যকার বৈবাহিক সম্পর্ককে আরো বেশি ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে। কোনো কোনো আলিম মত প্রকাশ করেছেন যে, এ অবস্থায় স্ত্রীর পক্ষ থেকে মীমাংসার জন্য আদালত এগিয়ে আসবে। প্রথমে আদালত স্বামীকে সতর্ক করে দেবে অতঃপর স্বামী থেকে স্ত্রীকে দূরে রাখবে এবং সর্বশেষে আদালত স্বামীকে প্রহার করার হুকুম দেবে।⁴²
সংক্ষেপে এভাবে বলা যায় যে, বৈবাহিক সম্পর্ককে অটুট রাখতে স্বামী স্ত্রীকে বিভিন্ন উপদেশ প্রদান করবে। তাদের কোনো একজন অপরের প্রতি খারাপ আচরণ করে থাকলে অন্যজন এ উপদেশগুলো কাজে লাগিয়ে তাদের এ পবিত্র বন্ধন অটুট রাখার চেষ্টা করে যাবে। এ চেষ্টাগুলো ব্যর্থ হলে ইসলাম শেষ চিকিৎসা হিসেবে হৃদ্যতার সাথে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক ছিন্ন করতে অনুমতি দেয়।

**টিকাঃ**
³⁴ Epstein, op. cit., p. 196.
³⁵ Swidler, op. cit., pp. 162-163.
³⁶ The Toronto Star, Apr. 8, 1995.
³⁷ Sabiq, op. cit., pp. 318-329. See also Muhammad al Ghazali, Qadaya al Mar'aa bin al Taqaleed al Rakida wal Wafida (Cairo: Dar al Shorooq, 4th edition, 1992) pp. 178-180.
³⁸ Ibid., pp. 313-318.
³⁹ David W. Amram, The Jewish Law of Divorce According to Bible and Talmud (Philadelphia: Edward Stern & CO., Inc,. 1896) pp. 125-126.
⁴⁰ David W. Amram, The Jewish Law of Divorce According to Bible and Talmud (Philadelphia: Edward Stern & CO., Inc,. 1896) pp. 125-126.
⁴¹ Epstein, op. cit., p. 219.
⁴² Ibid, pp 156-157.

📘 ইসলামে নারী বনাম ইহুদী ও খৃষ্ট্রান ধর্মে নারী > 📄 মা

📄 মা


বাইবেলের পুরাতন নিয়মের (Old Testament) অনেক স্থানে পিতামাতার সাথে সৎব্যবহারের নির্দেশ এবং অসৎব্যবহার সম্বন্ধে সতর্কবাণী এসেছে। বলা হয়েছে- "কোন মানুষ তার পিতামাতাকে গালি দিলে তাকে হত্যা করা হবে"। (লেভিটিকাস: ২০/৯)
জ্ঞানী পুত্র তার পিতাকে উৎফুল্ল করে আর মুর্খ ব্যক্তি মাতাকে অপমানিত করে"। (প্রভার্বস: ১৫/২০)
কিছু কিছু অধ্যায়ে বলা হয়েছে শুধুমাত্র পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করতে।
“জ্ঞানী পুত্র পিতার শাসনকে মেনে নেবে আর উপহাসকারী কারো ধমকের উপেক্ষা করে না”। (প্রভার্বস: ১৩/১)
কিন্তু, কোথাও আলাদাভাবে মাতাকে সদ্ব্যবহার পাওয়ার দাবিদার হিসেবে উপস্থাপন করা হয় নি। এমনকি যে মাতা তার সন্তানকে গর্ভে ধারণ, প্রসব ও দুধ খাইয়ে লালন পালন করেছেন কোথাও সে মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারের জন্য গুরুত্বারোপ করা হয় নি। মাতা তার সন্তানদের থেকে উত্তরাধিকার পায় না অথচ পিতা তার উত্তরাধিকার হয়।⁴³
অন্যদিকে বাইবেলের নতুন নিয়মে (New Testament) মাকে কোনো মর্যাদা দেওয়া হয় নি। বরং মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারকে স্রষ্টার পথে অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নতুন নিয়ম অনুযাযী কোনো খৃষ্টান যীশুর অনুসারী বলে গণ্য হবে না যতক্ষণ না সে তার জন্মদাত্রী মাকে অপছন্দ করে। যীশুর নামে প্রচারিত আরেকটি কথা পাওয়া যায় "কোনো মানুষ যতক্ষন না তার পিতা, মাতা, স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও ভাইবোনদেরকে অপছন্দ করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে আমার ছাত্র বলে গণ্য হবে না"। (লুক: ১৪/২৬)
নতুন নিয়মের আরেকটি অধ্যায় রয়েছে সেখানে বলা হয়েছে যে, যীশু তার মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন। উদাহরণ স্বরুপ যখন তিনি তার ছাত্রদেরকে শিক্ষা দিতেন তখন তার মা তাকে খোজ করলে তিনি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না। "তখন তার ভাতৃবর্গ ও মা ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকত। একদল ছাত্র যারা তার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছিলেন তারা বললেন: বাইরে আপনার মা ও ভাইয়েরা দাঁড়িয়ে আছে তারা আপনাকে ডাকছে। তিনি তাদেরকে বলতেন কে আমার মা বা ভাই? তারপর উপবিষ্টদেরকে বলতেন: আমার মা ও ভ্রাতৃবর্গ! যারা আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী কাজ করবে তারাই আমার ভাই, বোন বা মা”।⁴⁴ (মার্কস: ৩/৩১-৩৫)
অথবা কেউ বলল: ধর্মীয় শিক্ষা পরিবার পরিজন থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যীশু তার মায়ের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তার শিক্ষাদান কার্য অব্যাহত রাখলেন। অপর একটি অধ্যায়ে বলা হয়েছে- মায়ের মর্যাদা অনেক। তিনি সন্তানকে প্রসব করেছেন, তাকে লালন-পালন করেছেন মর্মে একজনের কথায় যীশু একমত পোষণ করেন নি। 'যখন তিনি কথা বলছিলেন তখন সমবেত জনতার মধ্য থেকে একজন মহিলা উচ্চস্বরে বলে উঠলেন যে, কতইনা সৌভাগ্য সে পেটের যে পেট আপনাকে ধারণ করেছে। কতই না সৌভাগ্য ঐ স্তনদ্বয়ের যার থেকে আপনি দুগ্ধ পান করেছেন। কিন্তু, তিনি বললেন: কতই না সৌভাগ্য তাদের যারা আল্লাহর কালাম শুনেছে ও তা আত্মস্থ করেছে'। (লুক: ১১/২৭-২৮)
কুমারী মারইয়াম আলাইহাস সালামের মত সন্মানিতা নারীর সাথে যদি সন্মানিত ব্যক্তি যীশু এ রকম ব্যবহার করেন তাহলে, সাধারণ মা ও সাধারণ পুত্রের অবস্থা কী হতে পারে?
কিন্তু ইসলামে মায়েদেরকে যে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হয়েছে তার কোনো তুলনা হয় না। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন আল্লাহ তা'আলার পরেই পিতামাতার সাথে সৎ ব্যবহার করার নির্দেশ প্রদান করেছে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতামাতার সাথে সৎ ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে 'উফ' শব্দটিও বলো না, তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদের সাথে শিষ্টাচারমূলক কথা বল। তাদের সামনে মাথা অবনমিত হও এবং বল- হে আমার রব, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন, তারা আমাকে শৈশব কালে লালন-পালন করেছেন”। [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩-২৪]
এ ছাড়াও কুরআনের বিভিন্ন অংশে মায়েদের সুউচ্চ মর্যাদার কথা আলোচনা করা হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
আর আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তাদের পিতামাতার সাথে ভালো ব্যবহার করতে। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দুই বছরে হয়। আমি নির্দেশ প্রদান করেছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে। [সূরা লোকমান, আয়াত: ১৪]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ইসলামে মায়ের মর্যাদাকে তুলে ধরেছেন।
হাদীসে এসেছে:
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক ব্যক্তি এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমার ভাল আচরণ পাওয়ার সর্বাপেক্ষা বেশি হকদার কে? তিনি বললেন: তোমার মা। তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন তারপর কে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন: তোমার মা। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন: তারপর কে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন: তোমার মা। আগন্তুক চতুর্থবার জিজ্ঞাসা করলেন: তারপর কে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমার পিতা। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
মুসলিমরা তাদের মায়েদের সাথে ভালো ব্যবহার করার জন্য সর্বদা উদগ্রীব থাকে। সব সময়ই মুসলিম ছেলে-মেয়ে ও মায়েদের মধ্যকার মধুর সম্পর্ক এবং পিতামাতার প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা দেখে পশ্চিমারা রীতিমত অবাক হয়ে যায়।

**টিকাঃ**
⁴³ Muhammad Abu Zahra, Usbu al Fiqh al Islami (Cairo: al Majlis al A'la li Ri'ayat al Funun, 1963) р. 66.
⁴⁴ Epstein, op. cit., p. 122.

📘 ইসলামে নারী বনাম ইহুদী ও খৃষ্ট্রান ধর্মে নারী > 📄 উত্তরাধিকার সম্পদে নারী

📄 উত্তরাধিকার সম্পদে নারী


নিকটাত্মীয়দের মৃত্যুর পর তাদের সম্পদে নারীদের পাপ্য সম্পর্কে কুরআন ও বাইবেলে মতবিরোধ রয়েছে। ইয়াহুদী পণ্ডিত এপস্টাইন নারীদের উত্তরাধিকার বিষয়ে বলেন, "বাইবেল নাযিল হওয়ার পর থেকেই নিকটাত্মীয়দের সম্পদে মহিলা তথা স্ত্রী ও কন্যার কোনো অধিকার ছিল না। মহিলা নিজেও উত্তরাধিকারী সম্পদের অংশ বলে বিবেচিত হত, তবে তার কোনো অধিকার ছিল না ঐ সম্পদে। অপরদিকে মূছা আলাইহিস সালাম এর শরী'আতে অন্য কোনো সন্তান না থাকলে কন্যাদেরকে ওয়ারিস গণ্য করা হত। কিন্তু স্ত্রী এ সম্পদ থেকে কিছুই পেত না"।⁴⁵
কেন মহিলা উত্তরাধিকারী সম্পদের অন্তর্ভুক্ত হবে? এর জবাবে এপস্টাইন বলেন, সে উত্তরাধিকার সম্পদের অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা সে বিবাহের পূর্বে পিতার ও বিবাহের পরে স্বামীর মালিকানাধীন সম্পদ (পণ্য) হিসেবে গণ্য হয়"।⁴⁶
বাইবেলে উত্তরাধিকারের আইন লিপিবদ্ধ আছে। (নং ২৭/১-১১) স্বামীর সম্পদে স্ত্রীর কোনো অধিকার দেওয়া হয় নি। অথচ স্ত্রী মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে তার সম্পদে সর্বাগ্রে অধিকার রয়েছে স্বামীর। এমনকি পুত্রদের আগেই স্বামীর অধিকার দেওয়া হয়েছে। অন্য কোনো সন্তান না থাকলে কন্যাগণ ওয়ারিস হবে। মায়েরও কোনো অধিকার দেওয়া হয় নি উত্তরাধিকারী সম্পদে। মৃত ব্যক্তির যদি কোনো সন্তান থাকে তাহলে বিধবা ও তার কন্যাগণ তাদের দয়ার মুখাপেক্ষী থাকবে।
এজন্য ইয়াহুদী সমাজে দেখা যায়- কন্যা সন্তান ও বিধবাগণ হয় সমাজের দরিদ্র শ্রেণী। খৃষ্টান সমাজ বহুকাল যাবত উপরের বিধানই পালন করে এসেছে। রাষ্ট্রীয় আইন ও গীর্জার ধর্মীয় আইন নারীদেরকে তাদের পিতার সম্পদে ওয়ারিস হওয়া থেকে বঞ্চিত করেছিল। স্ত্রীর ও কোনো অধিকার ছিল না স্বামীর সম্পদে। বিগত শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত এ ধরণের কঠোর আইন প্রচলিত ছিল।⁴⁷
প্রাক-ইসলামী যুগে আরবরা নারীদেরকে তাদের প্রাপ্য সম্পদ থেকে বঞ্চিত করত। ইসলাম এ ধরণের সমস্ত অত্যাচারী আইন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নারীদেরকে তাদের নিকটাত্মীয়ের পরিত্যক্ত সম্পদে অংশ নিশ্চিত করেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
“পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনের রেখে যাওয়া সম্পদে পুরুষের অংশ আছে এবং পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; অল্প হোক বা বেশি। এ অংশ নির্ধারিত”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৭]
ইউরোপীয়রা এগুলো শেখার কয়েকশত বছর আগে থেকেই মুসলিম মা, স্ত্রী, কন্যা ও বোনেরা তাদের আত্মীয় স্বজনের সম্পত্তিতে অধিকার ভোগ করে আসছে।⁴⁸
আল-কুরআনে ওয়ারিসদের অংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে বিস্তারিত ভাবে। (দেখুন: সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৭, ১১, ১২ ও ১৭৬) কয়েকটা অবস্থা ব্যতিত নারীর সে অংশ হচ্ছে পুরুষের অর্ধেক। ব্যতিক্রম অবস্থার মধ্যে একটি হচ্ছে পিতা। সে মাতার সমান অংশ পাবে। আমরা এ কথাটি বললে মনে হবে যেন ইসলাম এটা যুলুম করেছে। অথচ, আমরা যদি তার কারণ খুঁজতে যাই তাহলে আমাদের প্রথমেই জানতে হবে পুরুষের অর্থনৈতিক দায়িত্ব সম্বন্ধে। (দেখুন: স্ত্রীর অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্ব অধ্যায়)
স্বামী তার স্ত্রীকে যে উপহার দিবে তালাক দিলেও সে উপহারের একচ্ছত্র অধিকার থাকবে স্ত্রীর। স্ত্রীর জন্য স্বামীকে উপহার দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ইসলামে সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীর খরচ বহন করা স্বামীর জন্য অবশ্য কর্তব্য। স্ত্রীর ওপর এ সমস্ত খরচের কোনো দায়-দায়িত্ব নেয়, তবে নিজে করতে চাইলে আলাদা কথা। তার মালিকানাধীন সমস্ত সম্পদে রয়েছে তার একচ্ছত্র মালিকানা। ইসলাম বিবাহকে পবিত্র বন্ধন হিসেবে আখ্যা দিয়ে যুবকদেরকে বিবাহের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে এবং তালাকের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে দিয়েছে। বৈরাগ্যকে ইসলামে উৎসাহ প্রদান করা হয় নি। ফলে মুসলিম সমাজে বিবাহকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে এবং সে সমাজে বৈরাগী খুব কমই দেখা যায়। নারীদের চেয়ে পুরুষের অর্থনৈতিক দায়িত্ব অনেক বেশি। তাই সমস্ত মতবিরোধ থেকে বেরিয়ে এসে উত্তরাধিকারী সম্পদের বিধানে সমতা স্থাপন করা হয়েছে। এক ইংরেজ মুসলিম মহিলা বলেছিলেন: ইসলাম শুধু নারীর প্রতি ইনসাফ করেই ক্ষান্ত হয় নি বরং তাকে সন্মানের আসনে বসিয়েছে।⁴⁹

**টিকাঃ**
⁴⁵ Armstrong, op. cit., p. 8.
⁴⁶ Epstein, op. cit., p. 175.
⁴⁷ Ibid., p. 121.
⁴⁸ Gage, op. cit., p. 142.
⁴⁹ B. Aisha Lemu and Fatima Heeren, Woman in Islam (London: Islamic Foundation, 1978) p. 23.

📘 ইসলামে নারী বনাম ইহুদী ও খৃষ্ট্রান ধর্মে নারী > 📄 বিধবার সমস্যাসংকুল জীবন

📄 বিধবার সমস্যাসংকুল জীবন


বাইবেলের পুরাতন নিয়ম (Old Testament) অনুযায়ী মহিলাকে উত্তরাধিকারী সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার কারণে ইয়াহূদী সমাজে বিধবারা থাকে অত্যন্ত দরিদ্র ও অসহায়। স্বামীর আত্মীয় স্বজন তার খরচাদির ব্যবস্থা করলেও তার নিজের হাতে কোনো শক্তি নেই তাদেরকে খরচে বাধ্য করার, বরং তাদের অনুগ্রহের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই। এজন্য ইসরাইলে বিধবাগণ সমাজে সবচেয়ে নিম্ন শ্রেণির হয়ে থাকে। (ইশইয়া: ৫৪/৪)
কিন্তু বিধবাদের সমস্যার এখানেই শেষ নয়; বরং বাইবেলে (জেনেসিস: ৩৮) এসেছে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী সন্তানহীনা হলে স্বামীর ভাইয়ের সাথে বিবাহ বসবে যদিও সে বিবাহিত হয়। উদ্দেশ্য হলো তার ভাইয়ের যেন সন্তান হয় এবং তার নাম মরার পরেও সমাজে বেঁচে থাকে।
ইয়াহুযা আওনানকে বললেন: 'তোমার ভাইয়ের স্ত্রীর কাছে যাও, তাকে বিবাহ কর এবং তোমার ভাইয়ের বংশকে রক্ষা কর'। (জেনেসিস: ৩৮/৮)
বিধবা নারীকে এ বিবাহে দ্বিমত করার কোনো অধিকার দেওয়া হয় নি। তাকে শুধুমাত্র মৃত স্বামীর উত্তরাধিকারী সম্পদের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়। তার দায়িত্ব শুধু তার মৃত স্বামীর বংশ রক্ষা করা। আজও ইসরাইলে এ প্রথাই চালু রয়েছে।
বিধবা মহিলা তার স্বামীর ভাইয়ের অংশের উত্তরাধিকারী সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়। স্বামীর ভাই যদি ছোট হয় তাহলে তার বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী অপেক্ষা করবে। ভাই যদি তাকে প্রত্যাখ্যান করে শুধু তখনই সে স্বাধীন বলে গণ্য হবে এবং যাকে খুশি বিবাহ করতে পারবে। এ জন্যই স্বামীর ভাই কর্তৃক বিধবার স্বাধীনতা খর্ব করার রীতি ব্যাপকতা লাভ করেছে।
ইসলাম পুর্ব যুগে প্রায় এ ধরণেরই প্রথা চালু ছিল। তখন বিধবারা স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত হত এবং তার পুরুষ আত্মীয় স্বজন তাতে অংশীদার হত। তখন আরো একটি প্রচলন ছিল, মৃত ব্যক্তির জেষ্ঠপুত্র তার সৎ মাকে বিবাহ করত। আর-কুরআনে এ সকল প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
"তোমাদের পিতাগণ যে মহিলাদেরকে বিবাহ করেছেন, তোমরা তাদেরকে বিবাহ করো না। তবে যা বিগত হয়ে গেছে তা আলাদা। নিশ্চয় এটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২২]
বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তা মহিলাগণ ইয়াহুদী ধর্মে ঘৃণার পাত্র। গীর্জার ধর্মীয় পন্ডিতের জন্য বৈধ নয় কোনো বিধবা, তালাক প্রাপ্তা বা ব্যভিচারী নারীকে বিবাহ করা। ‘ধর্মীয় পণ্ডিত কুমারী নারীকে বিবাহ করবে। বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা বা ব্যভিচারী নারীকে বিবাহ করবে না; বরং নিজের জাতির কুমারীকে বিবাহ করবে। তার বংশকে কালিমালিপ্ত করবে না কেননা আমি পালনকর্তা পবিত্রকারী। (লেভিটিকাস: ২১/১৩-১৫)
বর্তমানে ইসরাঈলে পৌত্তলিক আমলের বড় বড় যাদুকরদের বংশ বর্তমান রয়েছে। তাদেরও অনুমতি নেই কোনো বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা বা ব্যভিচারী নারীকে বিবাহ করার।⁵⁰
ইয়াহুদী ধর্মে কোনো মহিলা তিনবার বিবাহ করার পর আবার বিধবা হলে (তিনজন স্বামীই যদি মারা যায়) তাকে “হত্যাকারীনী” হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়। তাকে আবার পুনরায় বিবাহ করার অধিকার দেওয়া হয় না।⁵¹
কিন্তু আর-কুরআনে এগুলোর কিছুই নেই। বরং মুসলিম বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা নারী যাকে খুশি তাকেই বিবাহ করতে পারে। বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তাকে কোরআনের কোথাও ঘৃণার চোখে দেখা হয় নি।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে এসেছে:
“আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দাও (এক বা দুই তালাক), অতঃপর তারা নির্ধারিত ইদ্দত সমাপ্ত করে নেয়, তখন তোমরা নিয়মানুযায়ী তাদেরকে রেখে দাও অথবা সহানুভূতির সাথে মুক্ত করে দাও। তোমরা তাদেরকে জ্বালাতন ও বাড়াবাড়ি করার উদ্দেশ্যে আটকে রেখো না। যারা এমন করবে, নিশ্চয়ই তারা নিজেদেরই ক্ষতি করবে। আর আল্লাহর নির্দেশকে হাস্যকর বিষয়ে পরিণত করো না। আল্লাহর সে অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যা তোমাদের ওপর রয়েছে এবং তাও স্মরণ কর, যে কিতাব ও জ্ঞানের কথা তোমাদের ওপর নাযিল করা হয়েছে; যার দ্বারা তোমাদেরকে উপদেশ দান করা হয়। আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ তা'আলা সর্ব বিষয়েই জ্ঞানময়।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৩১]
অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন,
"আর তোমাদের মধ্যে যারা মারা যাবে এবং তাদের নিজেদের স্ত্রীদেরকে রেখে যাবে, সে স্ত্রীদের কর্তব্য হলো নিজেরা চারমাস দশদিন পর্যন্ত অপেক্ষা (ঈদ্দত পালন) করবে। তারপর যখন ইদ্দত পূর্ণ করে নেবে, তখন নিজের ব্যাপারে নীতিসংগত ব্যবস্থা নিলে কোনো পাপ নেই। আর তোমাদের যাবতীয় কাজের ব্যাপারেই আল্লাহর অবগতি রয়েছে।" [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৩৪]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন,
“আর যখন তোমাদের মধ্যে কেউ মারা যাবে, তখন তাদের স্ত্রীদের ঘর থেকে বের না করে এক বছর পর্যন্ত তাদের খরচের ব্যাপারে ওসিয়ত করে যাবে। অতঃপর, যদি স্ত্রীরা নিজে থেকেই বের হয়ে যায়, তাহলে সে যদি নিজের ব্যাপারে কোনো উত্তম ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে তাতে তোমাদের কোনো পাপ নেই। আর আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৪০]

**টিকাঃ**
⁵⁰ Hazleton, op. cit., pp. 45-46.
⁵¹ Ibid., p. 47.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00