📄 সাক্ষ্যদানের অধিকার
আরেকটি বিষয় নারীদের সাক্ষ্যদানের অধিকার। কুরআন ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের মধ্যে এটা নিয়ে বেশ মতবিরোধ রয়েছে। আর-কুরআন মুমিনদেরকে কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদনের সময় দুইজন পুরুষ বা একজন পুরুষ ও দুইজন নারীকে সাক্ষী রাখার বিধান রেখেছে।
আল্লাহ বলেন,
“তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্যে দুইজনকে সাক্ষী রাখ। যদি দুই জন পুরুষ না থাকে তাহলে একজন পুরুষ ও দুইজন নারীকে সাক্ষী রাখ যাদের সাক্ষ্য তোমরা পছন্দ কর তাদের মধ্য থেকে; একজন যদি ভুলে যায়, তাহলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৮২]
কুরআনের অন্য স্থানে নারীর সাক্ষ্যকে পুরুষের সমান বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীর সাক্ষ্য পুরুষের সাক্ষ্যকে বাতিল করে দেয়। যদি কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয় আর-কুরআন তাকে নির্দেশ দেয় তার অভিযোগের স্বপক্ষে পাঁচবার কসম করতে। অনুরুপ স্ত্রী যদি তা অস্বীকার করে এবং নিজের মতের স্বপক্ষে পাচবার কসম করে তাহলে সে অপরাধী সাব্যস্ত হবে না। উপরোক্ত উভয় অবস্থায় তাদের বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
“এবং যারা তাদের স্ত্রীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে এবং তারা নিজেরা ছাড়া তাদের কোনো সাক্ষী না থাকে, এরূপ ব্যক্তির সাক্ষ্য হবে- সে আল্লাহর কসম খেয়ে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে অবশ্যই সত্যবাদী। এবং পঞ্চমবার বলবে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তার ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত। এবং স্ত্রীর শাস্তি রহিত হয়ে যাবে যদি সে আল্লাহর কসম খেয়ে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, তার স্বামী অবশ্যই মিথ্যাবাদী। এবং পঞ্চমবার বলে যে, যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয় তবে তার (নিজের) ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসবে। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে এবং আল্লাহ তওবা কবুলকারী, প্রজ্ঞাময় না হলে কত কিছুই যে হয়ে যেত। যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে নিজেদের জন্য খারাপ মনে করো না; বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের প্রত্যেকের জন্য ততটুকু আছে যতটুকু সে গোনাহ করেছে এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে তার জন্য রয়েছে বিরাট শাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৬-১]
আগে ইয়াহুদী সমাজে নারীদেরকে সাক্ষ্যদানের অধিকার দেওয়া হত না।¹³
ইয়াহুদী পণ্ডিতের মতে- জান্নাত থেকে বের হওয়ার পর নারীদের প্রতি যে সমস্ত অভিশাপ এসেছে তন্মধ্যে একটি হচ্ছে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য না হওয়া। বর্তমানেও ইসরাঈলে ইয়াহূদীদের ধর্মীয় কোর্টে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না।¹⁴
এর কারণ হিসেবে ইয়াহুদী পণ্ডিতদের ভাষ্য হচ্ছে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের স্ত্রী সারাহ মিথ্যা বলেছিলেন। (জেনেসিস: ১৬/৯-১৮) অথচ এ ঘটনাটি আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হওয়া সত্বেও কোথাও বলা হয় নি যে, সারাহ মিথ্যা বলেছিলেন।” [সূরা হুদ, আয়াত: ৬৯-৭৪, সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ২৪-৩০ দ্রষ্টব্য]
ধর্মীয় বা আধুনিক আইন বিশারদ পশ্চিমা খৃষ্টানগণের কেউ গত শতাব্দীর আগ পর্যন্ত কখনো নারীকে সাক্ষ্যদানের অধিকার দেয় নি।¹⁵
কোনো পুরুষ তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ দিলে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না। বাইবেলের নির্দেশনানুযায়ী অভিযুক্ত মহিলা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে গিয়ে অপমানজনকভাবে কোর্টে হাযির হবে। (নং ৫/১১-৩১) কোর্টে যদি সে দোষী সাব্যস্ত হয় তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আর যদি মহিলা নির্দোষ প্রমাণিত হয় তথাপিও অপবাদের কারণে স্বামীর কোনো শাস্তি হবে না। যদি কোনো পুরুষ কোনো মহিলাকে বিবাহ করে দাবী করে যে, সে কুমারী নয়; এ ক্ষেত্রেও নারীর সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয় বরং মহিলার পরিবারের ওপর দায়িত্ব এসে যাবে শহরের বয়স্ক লোকদের সামনে তাকে কুমারী হিসেবে প্রমাণ করা। যদি তারা তাকে কুমারী প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে মহিলাকে পিত্রালয়ের সামনে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। আর যদি তারা তাকে কুমারী প্রমাণ করতে পারে, তাহলে তার স্বামীর ওপর ১০০ রৌপ্যমুদ্রা জরিমানা করা হবে এবং আজীবনের জন্য তাকে তালাক দেওয়ার অধিকার খর্ব করা হবে।
বলা হয়েছে "যদি কোনো পুরুষ কোনো মহিলাকে বিবাহ করার পর তার নিকটবর্তী হয়ে তাকে অপছন্দ করে এবং সমাজে তার দুর্নাম করে বলে: আমি একে বিবাহ করে কুমারী হিসেবে পাই নি। তখন তার পিতামাতা তাকে নিয়ে যাবে এবং তাদের বাড়ীর সামনে অবস্থানরত সমাজের বয়স্কদের সামনে তার কুমারিত্বের প্রমাণ হাযির করে বলবে: আমি আমার কন্যাকে এই লোকের সাথে বিবাহ দিয়েছি। সে তাকে অপছন্দ করে কুমারী পায় নি বলে সমাজে দুর্নাম ছড়াচ্ছে। এই দেখুন! এটা তার কুমারিত্বের প্রমাণ বলে বয়স্কদেরকে তার কাপড় দেখাবে। তখন সমাজের বয়স্ক ব্যক্তিরা ঐ ছেলেকে ধরে নিয়ে শাসন করবে এবং ১০০ রৌপ্যমুদ্রা জরিমানা করে অপবাদের বিনিময় হিসেবে মেয়ের পিতাকে দেবে। আর ঐ মেয়ে হবে তার আজীবনের জন্য স্ত্রী। তালাক দেওয়ার কোনো অধিকার তার অবশিষ্ট থাকবে না; পক্ষান্তরে যদি কন্যার কুমারিত্ব না পাওয়া যায় তাহলে মেয়েকে পিত্রালয়ের সামনে নিয়ে এসে পুরুষেরা তাকে পাথর মেরে হত্যা করবে। কেননা সে ব্যভিচার করে তার পিত্রালয়কে কলঙ্কিত করেছে। তাই এ পাপিষ্টকে ওদের থেকে দূর করে ফেলতে হবে। (ডিউটারনমী: ২২/১৩-২১)
**টিকাঃ**
¹³ Swidler, op. cit., p. 115
¹⁴ Lesley Hazleton, Israeli Women The Reality Behind the Myths (New York: Simon and Schuster, 1977) p. 41.
¹⁵ Gage, op. cit. p. 142.
📄 ব্যভিচার
প্রত্যেক ধর্মে ব্যভিচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। বাইবেল ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিনী উভয়কে মৃত্যুদণ্ডের বিধান দিয়েছে। বলা হয়েছে যে, "যদি কোনো পুরুষ কোনো মহিলার সাথে ব্যভিচার করে, আর ব্যভিচারিণী তার নিকটাত্মীয় হয় তাহলে তাদের উভয়কেই মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে"। (লেভিটিকাস: ২০/১০)
ইসলামও ব্যভিচারীদের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করেছে। আল্লাহ বলেন,
“ব্যভিচারিনী নারী, ব্যভিচারী পুরুষ-তাদের প্রত্যেককে একশ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করতে গিয়ে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তার রাসুলের প্রতি প্রকৃতপক্ষেই বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর মুসলিমদের মধ্যকার একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২]
তবে ব্যভিচারের সংজ্ঞায় কুরআন ও বাইবেলে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে- ব্যভিচার হচ্ছে পুরুষ ও নারীর মধ্যকার অবৈধ দৈহিক সম্পর্ক। পক্ষান্তরে, বাইবেলে ব্যভিচারকে শুধুমাত্র বিবাহিতদের মাঝে আবদ্ধ করা হয়েছে। যখন বিবাহিত পুরুষ ও বিবাহিতা নারীর মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক পাওয়া যাবে তখনই তাদেরকে ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিনী হিসেবে গণ্য করা হবে। যখন কোনো বিবাহিত পুরুষকে অপরের স্ত্রীর সাথে পাওয়া যাবে তখন তাদের উভয়কেই হত্যা করা হবে। এবং বনী ইসরাইল থেকে এসব আপদ দূর করতে হবে। (ডিউটারনমী: ২২/২২) "আর কোনো পুরুষ যদি তার নিকটাত্মীয় মহিলার সাথে ব্যভিচার করে তাদের উভয়কেই হত্যা করা হবে"। (লেভিটিকাস: ২০/১০)
বাইবেলের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো বিবাহিত পুরুষ কোনো অবিবাহিত মহিলার সাথে অবৈধ দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ব্যভিচার বলে ধর্তব্য হবে না। এমতাবস্থায় উক্ত পুরুষ ও নারী ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিনী হিসেবে গণ্য হবে না, বরং ব্যভিচারী হিসেবে গণ্য হবে যখন কোনো পুরুষ বিবাহিত হোক বা না হোক নারী বিবাহিতা হয়।
সংক্ষেপে ব্যভিচার হলো বিবাহিতা নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক। বিবাহিত পুরুষ ব্যভিচারী হিসেবে পরিগণিত হবে না।
এখানে নারী ও পুরুষের মধ্যে দু'রকম বিধান কেন? ইয়াহুদী বিশ্বকোষের মতে নারীরা পুরুষের মালিকানাধীর পণ্যের মত। পুরুষের অধিকার নষ্ট করলে তা ব্যভিচার বলে গণ্য হবে; পক্ষান্তরে নারীরা পুরুষের মালিকানাধীন পণ্য হওয়ার কারণে তার এ ধরণের কোনো অধিকার নেই।¹⁶
কোনো পুরুষ অপরের স্ত্রীর সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে তা আরেক জনের (মহিলার স্বামীর) অধিকারে হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয়। তাই তাকে এ জন্য শাস্তি পেতে হবে। বর্তমানে ইসরাঈলে যদি কোনো পুরুষ অবিবাহিতা মহিলার সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার ফলে সন্তান হয় তারা বৈধ সন্তান হিসেবে গণ্য হয়। আর যদি বিবাহিতা মহিলার সাথে কোনো পুরুষ (বিবাহিত হোক বা না হোক) অবৈধ দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করার ফলে সন্তান হয়, তাদের সন্তানরা শুধু অবৈধই নয় বরং তারা সমাজ থেকে বিতাড়িত হয় এবং তাদেরকে অনুরূপ বিতাড়িত বা ধর্ম ত্যাগকারী ছাড়া অন্য কেউ বিবাহ করতে পারে না। এ শাস্তি পরবর্তী দশটি প্রজন্ম পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে যাতে তাদের অপমান কিছুটা হলেও কমে যায়।¹⁷
কিন্তু ইসলাম নারীকে এরূপ মনে করে না বরং আল-কুরআন বলে:
“আর আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনসমূহের মধ্যে এটাও একটা নিদর্শন যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য সঙ্গীনীদের সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ২১]
এটা হচ্ছে কুরআনে বর্ণিত বিবাহের চিত্র, যা হবে ভালোবাসা, দয়া, সম্প্রীতি ও শান্তির ঠিকানা। এখানে কেউ কারো পণ্য বা দাসী নয়। নারী পুরুষ উভয়ের জন্য এখানে নেই কোনো দ্বিমুখী বিধান।
**টিকাঃ**
¹⁶ Jeffrey H. Togay, "Adultery," Encyclopaedia Judaica, Vol. II, col. 313. Also, see Judith Plaskow, Standing Again at Sinai : Judaism from a Feminist Perspective (New York: Harper & Row Publishers, 1990) pp. 170-177.
¹⁷ Hazleton, op. cit., pp. 41-42.
📄 মানত করা
বাইবেল অনুযায়ী আল্লাহর পথে যে কোনো মান্নত পুরণ করা আবশ্যক। মান্নত করার পর তা আদায় করতে টালবাহানা করা বাঞ্চনীয় নয়। কিন্তু নারীদের নিজ ইচ্ছায় মান্নত করা বৈধ নয়; বরং অবিবাহিতা হলে পিতা আর বিবাহিতা হলে স্বামীর অনুমোদন লাগবে। তারা যদি অনুমোদন না দেয়, তাহলে তারা মান্নতই করে নাই বলে গণ্য হবে। বাইবেলের ভাষ্য অনুযায়ী "কোনো পুরুষ যদি আল্লাহর নামে মান্নত করে বা কসম করে তাহলে তার মুখের কথা অনুযায়ী তা পূর্ণ করা আবশ্যক। কিন্তু মহিলারা যদি আল্লাহর নামে মান্নত করে এবং তার পিতা (পিত্রালয়ে থাকার সময়) তা শুনে চুপ করে থাকে তাহলে, সে মান্নত পূর্ণ করা আবশ্যক হবে। মান্নতের কথা শ্রবণের দিন পিতা যদি নিষেধ করে তাহলে, তার মান্নতসমূহ পুরণ করার কোনো অধিকার থাকবে না; বরং তা প্রত্যাখ্যাত হবে। যদি সে তার স্বামীর জন্য বা অন্য কোনো কারণে মান্নত করে থাকে, স্বামী তা শুনে চুপ থাকলেই তা অনুমোদিত হবে; অন্যথায় তা প্রত্যাখ্যাত হবে"। (নং ৩০/২-১৫)
কেন মান্নত করার সময় নারীর কথা গৃহীত হবে না? উত্তর খুবই সংক্ষেপ: সে বিবাহের পূর্বে পিতার মালিকানাধীন আর বিবাহের পরে স্বামীর। এ মালিকানা পিতাকে নিজ কন্যাকে বিক্রি করার অধিকার পর্যন্ত দিয়ে দেয়। পিতা চাইলে কন্যাকে বিক্রি করতে পারে এ অধিকার তার আছে। আর ইয়াহূদী পণ্ডিতরা বলে থাকে, পিতা তার কন্যাকে বিক্রি করতে পারে, কিন্তু মা তার কন্যাকে বিক্রি করতে পারবে না। পিতা তার কন্যাকে বিবাহ দেওয়ার জন্য কাউকে প্রস্তাব দিতে পারে, কিন্তু মা সেটা পারে না"।¹⁸
ইয়াহুদী পণ্ডিতরা আরও পরিস্কার করে বলেছেন যে, কোনো মহিলা বিবাহ করার পর তার স্বামীর পূর্ণ মালিকানায় স্থানান্তরিত হয়। তাদের মতে "বিবাহ মহিলাকে তার স্বামীর মালিকানাধীন বানিয়ে দেয় যা কখনো নষ্ট হবার নয়"। তাই কোনো মহিলার উচিৎ নয় তার মালিকের বিনা অনুমতিতে কোনো কিছুর প্রতিশ্রুতি বা প্রতিজ্ঞা করা।
ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্ম বিশ্বাসের এ অবস্থান নারীদের ওপর বিরুপ প্রভাব ফেলেছে, বর্তমান শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত। পশ্চিমা বিশ্বে বিবাহিতা মহিলারা যাই করতে চেয়েছে তার কোনো বৈধতা ছিল না। তাদের স্বামীদের অধিকার ছিল স্ত্রী যে কোনো চুক্তি করলে তারা তা বাতিল করতে পারবে। ইয়াহুদী ও খৃষ্টান সমাজে স্ত্রী কোনো কিছু করার ব্যাপারে স্বাধীন নয়। কেননা তারা অন্যের মালিকানাধিন পণ্যের মত। পশ্চিমা মহিলারা প্রায় দুই হাজার বছর পর্যন্ত পিতা ও স্বামীর অধিকারে থাকার কারণে পরাধীনতার দুঃসহ যন্ত্রণায় ভূগেছে।¹⁹
ইসলামে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবার অধিকার আছে স্বেচ্ছায় মান্নত করার। তার ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করার নৈতিক অধিকার কারো নেই। পুরুষ বা নারী যদি কোনো কারণে ওয়াদা পুরণে ব্যর্থ হয় তাহলে, তার জন্য কাফফারা বা প্রায়শ্চিত্য প্রদান করা আবশ্যক।
আল-কুরআনে এসেছে:
"আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক শপথের জন্যে; বরং পাকড়াও করেন ঐ শপথের জন্য যা তোমরা মজবুত করে রাখ। অতএব, এর কাফফারা হচ্ছে: দশজন দরিদ্রকে খাদ্য দান করবে মধ্যম শ্রেণির খাদ্য যা তোমরা তোমাদের পরিবারকে দিয়ে থাক অথবা তাদেরকে বস্ত্র প্রদান করবে কিংবা একজন ক্রীতদাস মুক্ত করবে। যে ব্যক্তি সামর্থ রাখে না সে তিনদিন সাওম পালন করবে। এটা তোমাদের শপথের কাফফারা যখন তোমরা শপথ কর। তোমরা তোমাদের কৃত শপথসমূহকে রক্ষা কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নির্দেশ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।" [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৮৯]
স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে মুমিন পুরুষ ও নারীরা আনুগত্য ও আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে বায়আত বা অঙ্গীকার করত। নারীরা ও ছিল পুরুষের সমানে সমান। (সূরা মুমতাহিনা, ১২ দেখুন) এমনকি কোনো পুরুষের অধিকার নেই স্ত্রী বা কন্যার পক্ষ থেকে নিজে শপথ করবে বা তারা শপথ করলে তা প্রত্যাখ্যান করবে।
**টিকাঃ**
¹⁸ Swidler, op. cit., p. 141.
¹⁹ Matilda J. Gage, Woman, Church, and State (New York : Truth Seeker Company, 1893) p. 141.
📄 স্ত্রীর অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্ব
ইসলাম, ইয়াহুদী ও খৃষ্টান তিনটি ধর্মই বিবাহ ও পরিবার গঠনকে গুরুত্ব দিয়েছে। স্বামী পরিবারের অভিভাবক, এতে সবাই একমত। তবে, মতভেদ রয়েছে স্বামীর ক্ষমতার গন্ডিতে। ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্ম পুরোপুরি ইসলামের বিপরীত। তারা স্বামীকে স্ত্রীর ওপর একচ্ছত্র মালিকানার অধিকার দিয়েছে। ইয়াহুদী ধর্মে স্ত্রী যেন স্বামীর কাছে দাসীর সমতুল্য গণ্য হয়।²⁰
এ কারণে ব্যভিচারের বিধানে পুরুষ ও নারীর জন্য দু'রকম আইন রয়েছে। স্বামীকে অধিকার দেওয়া হয়েছে স্ত্রীর মান্নতের ওপর প্রভাব খাটানোর। এ বিধান নারীকে সম্পদ ও মালিকানাধীন সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ইয়াহুদী নারী শুধুমাত্র বিবাহের কারণে স্বামীর মালিকানায় চলে আসে এবং স্বামী তার স্ত্রীর সম্পদ ও সম্পত্তিতে প্রভাব খাটায়। ইয়াহুদী পন্ডিতেরা বলে থাকে যে, বিবাহের কারণে স্ত্রী ও তার ধন সম্পদ স্বামীর অধিকারে চলে আসে।²¹
এ ছাড়াও এ বিধানের কারণে বিবাহের পরে ধনী স্ত্রী সম্পদহীনা হয়ে পড়ে। ইয়াহুদী ধর্মশাস্ত্রে (তালমুদে) বলা হয়েছে “নারীর কোনো সম্পদের মালিক হওয়ার অধিকার নেই। তার মালিকানাধীন সমস্ত সম্পদ স্বামীর বলে গণ্য হবে। স্বামীর মালিকানাধীন সম্পদ তো আছেই এমনকি স্ত্রীর সম্পদও স্বামীর মালিকানায় চলে আসবে। স্ত্রী যা অর্জন করবে বা রাস্তায় কুড়িয়ে পাবে এবং বাড়ীর সমস্ত কিছু এমনকি রুটির টুকরাও স্বামীর অধিকারে। মহিলা কোনো লোককে ডেকে মেহমানদারী করলে তা স্বামীর মাল থেকে চুরি হিসেবে গণ্য হবে"। (তালমুদ san 71a, git 62a)
ইয়াহুদী মহিলারা নিজ সম্পদ দিয়ে প্রস্তাবদানকারীকে আকৃষ্ট করে। ইয়াহূদী পরিবারে পিতা তার সম্পদের কিছু অংশ তার মের জন্য রেখে দেয় যা যৌতুক হিসেবে স্বামীকে দিতে হয়। এ যৌতুকের কারণে ইয়াহূদী পিতার নিকট কন্যা সন্তানের জন্মটা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কন্যাকে ছোটকাল থেকে মানুষ করার দ্বারা তার দায়িত্ব আদায় হয় না; বরং নিজের সম্পদ থেকে কিছু অংশ তার বিবাহের জন্য রেখে দিতে হয়। ফলে ইয়াহুদী সমাজে কন্যা সন্তান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।²²
প্রাচীন ইয়াহূদী সমাজে কন্যা সন্তান জন্মের সময়ে পরিবারের সদস্যদের খুশি না হওয়ার কারণ এখান থেকেই স্পষ্ট বুঝা যায়। (দেখুন: কন্যা সন্তান কি অপমান ডেকে আনে? অধ্যায়টি)
যৌতুক স্বামীর জন্য উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। স্বামী তার মালিক হলেও তা বিক্রি করার অধিকার তার নেই। এ সম্পদে স্ত্রীরও কোনো অধিকার নেই। বিবাহের পর স্ত্রীর ওপর কাজকর্ম করা বাধ্যতামূলক তবে, যা রোজগার করবে সবই স্বামীর মালিকানায় চলে যাবে। কেননা সে তার ব্যাপারে দায়িত্বশীল। দু'টি অবস্থা ছাড়া তার মালিকানাধীন সম্পদ সে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার নেই। ১. তালাক দিলে অথবা ২. স্বামীর মৃত্যু।
স্বামীর জীবদ্দশায় স্ত্রী মারা গেলে স্বামী স্ত্রীর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হবে। আর স্ত্রীর জীবদ্দশায় স্বামী মারা গেলে স্ত্রী শুধুমাত্র বিবাহের সময় যৌতুক হিসেবে দেওয়া সম্পদের দাবী করতে পারবে, অন্য কোনো সম্পদ চাওয়ার অধিকার তার থাকবে না। স্বামী তার নতুন স্ত্রীকে উপহার সামগ্রী দিবে, তবে তাও স্বামীর অধিকারে থাকবে।²³
খৃষ্টান ধর্মও অতি সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত ইয়াহুদীদের উক্ত নিয়মাবলী পালন করে আসছিল। কনস্টান্টিনোপল সাম্রাজ্যের পরবর্তী খৃষ্টান রোমান সাম্রাজ্যের নাগরিক ও ধর্মীয় বিধানাবলীতে স্বামীর জন্য বিবাহের সময় মীরাসের (উত্তরাধিকার) শর্তারোপ করা হত। পরিবারকে তাদের কন্যাদের জন্য উঁচুমানের যৌতুক নির্ধারণ করে রাখতে হত। ফলশ্রুতিতে পুরুষেরা তড়িঘড়ি করে বিবাহ করত অথচ পরিবারের মহিলারা দেরীতে বিবাহ করতে বাধ্য হত।²⁴
খৃষ্টানদের গীর্জার নিয়মানুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেলে এবং ব্যভিচারের দোষে অভিযুক্ত না হলে স্ত্রী তার প্রদত্ত যৌতুকের মালামাল দাবী করতে পারে। আর ব্যভিচারের দোষে অভিযুক্ত হলে উক্ত সম্পদের দাবি জরিমানা হিসেবে ছেড়ে দিতে বাধ্য থাকবে।²⁵
নাগরিক ও গীর্জার ধর্মীয় বিধানানুযায়ী উনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত ইউরোপ ও আমেরিকার নারীদের নিজের অধিকারভূক্ত সম্পত্তিতে কোনো অধিকার ছিল না। ১৬৩২ খৃষ্টাব্দে প্রস্তুতকৃত নারী অধিকার আইনে বলা হয়েছিল "স্বামীর মালিকানাধীন সমস্ত সম্পদের মালিক স্বামী নিজেই, আর স্ত্রীর মালিকানাধীন সম্পদের মালিকও তার স্বামী"।²⁶
স্ত্রী বিবাহের পর তার অধিকারভুক্ত সম্পদের মালিকানাই শুধু হারায় না বরং তার নিজের ব্যক্তিত্বও হারায়। স্বেচ্ছায় কোনো কাজ করার অধিকারটুকুও সে পায় না। তার যে কোনো ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি বা কাজ বাতিল করার অধিকার দেওয়া হয়েছে স্বামীকে। এছাড়া যার সাথে নারী চুক্তিবদ্ধ হয়েছে সেও অপরাধী এবং অপরাধে সহযোগিতাকারী হিসেবে বিবেচিত হয়। তারা নিজের নামে বা স্বামীর বিরুদ্ধে আদালতে বিচার চাইতে পারে না।²⁷
আইনানুযায়ী বিবাহিত নারীদের সাথে শিশুদের মত ব্যবহার করতে হবে। সে স্বামীর মালিকানাধীন পণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে এবং নিজের মালিকানাধীন সম্পদ, ব্যক্তিত্ব ও বংশ পরিচয় সবকিছু হারিয়ে ফেলবে।²⁸
ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্ম নারীদেরকে নিকট অতীত পর্যন্ত যে সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল ইসলাম সে সকল অধিকার পরিপূর্ণভাবে প্রদান করেছে। মুসলিম নারীদের নিজ স্বামীকে কোনো কিছু যৌতুক হিসেবে দিতে হয় না এবং সে সমাজে দুশ্চিন্তার কারণ হিসেবে ধর্তব্য হয় না। ইসলাম নারীকে সম্মানিত করেছে তাই তার কোনো প্রয়োজন হয় না নিজের অর্থ সম্পদ দেখিয়ে কোনো যুবককে (বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ায়) প্রলুব্ধ করার, বরং স্বামীর জন্য অবশ্য কর্তব্য স্ত্রীকে উপহার তথা মোহরানা পরিশোধ করা। এ মোহরানার সম্পদের পরিপূর্ণ মালিকানা স্ত্রীর নিজের; স্বামী, পরিবারের সদস্য বা অন্য কারো তাতে অধিকার নেই। কিছু কিছু মুসলিম সমাজে এ মোহরানার পরিমাণ হয়ে থাকে ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) ডলারের সমপরিমান পর্যন্ত হয়ে থাকে।²⁹
তালাক হয়ে গেলেও তার সে সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হয় না। স্ত্রী স্বেচ্ছায় না দিলে তার মালিকানাধীন সম্পত্তিতে স্বামীর বিন্দুমাত্রও অধিকার নেই।³⁰
আল্লাহ তা'য়ালা বলেন,
"তোমরা খুশি মনে তোমাদের স্ত্রীদেরকে মোহরানা দিয়ে দাও। তারা যদি খুশি হয়ে তা থেকে কোনো অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর"। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪]
স্ত্রী তার নিজস্ব সম্পদে ইচ্ছামত হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে। কেননা তার নিজের ও তার সন্তানদের জীবন পরিচালনা করার দায়িত্ব স্বামীর ওপর ন্যস্ত।³¹
স্ত্রী যতই ধনী হোক না কেন পরিবারের কোনো খরচ পরিচালনা করা তার জন্য আবশ্যক নয়, তবে যদি সে করে তা ভিন্ন কথা। স্বামী মারা গেলে সে যেমন, তার উত্তরাধিকারী সম্পদে অংশীদার হবে তেমনি স্ত্রী মারা গেলেও স্বামী তার সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে। ইসলামে বিবাহের পরেও স্ত্রীর ব্যক্তিত্ব, স্বাধীনতা ও বংশগত ঐতিহ্য অবশিষ্ট থাকে।³²
একবার এক আমেরিকান বিচারক বলেছিলেন “মুসলিম নারীরা সূর্যের মতোই স্বাধীন। দশবারও যদি তারা বিবাহ করে তবুও তারা তাদের স্বাধীনতা ও বংশ পরিচয় ধরে রাখতে পারে"।³³
**টিকাঃ**
²⁰ Louis M. Epstein, The Jewish Marriage Contract (New York : Arno Press, 1973) p. 149.
²¹ Swidler, op. cit., p. 142.
²² Epstein, op. cit., pp. 164-165.
²³ Ibid., pp. 112-113. See also Priesand, op. cit., p. 15.
²⁴ James A. Brundage, Law, Sex, and Christian Society in Medieval Europe (Chicago: University of Chicago Press, 1987) p. 88.
²⁵ Ibid., p. 480.
²⁶ R. Thompson, Women in Stuart England and America (London: Routledge & Kegan Paul, 1974) р. 162.
²⁷ Mary Murray, The Law of the Father (London: Routledge, 1995) p. 67.
²⁸ Gage, op. cit., p. 143.
²⁹ For example, see Jeffrey Lang, Struggling to Surrender, (Beltsville, MD: Amana Publications, 1994) p. 167.
³⁰ Elsayyed Sabiq, Fiqh al Sunnah (Cairo: Darul Fatah lile'lam Al-Arabi, 11th edition, 1994), vol. 2, pp. 218-229.
³¹ Abdel-Haleem Abu Shuqqa, Tahreer al Mar'aa fi Asr al Risala (Kuwait: Dar al Qalam, 1990) pp. 109-112.
³² Leila Badawi, "Islam", in Jean Holm and John Bowker, ed,. Women in Religion (London: Pinter Publishers, 1994) p. 102.
³³ Amir H. Siddiqi, Studies in Islamic History (Karachi : Jamiyatul Falah Publications, 3rd edition, 1967) p. 138.