📄 কন্যা সন্তান কি অপমান ডেকে আনে?
আসলে কুরআন ও তাওরাতের মধ্যকার নারী জাতি সংক্রান্ত আলোচনায় মতানৈক্য রয়েছে তার জন্মলগ্ন থেকেই।
উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় যে, বাইবেলে রয়েছে নারীরা কন্যা সন্তান জন্ম দিলে সন্তান প্রসবের পরে অপবিত্র থাকে ২ সপ্তাহ। পক্ষান্তরে পুত্র সন্তান জন্ম দিলে অপবিত্র থাকে ৭ দিন বা এক সপ্তাহ। (লেভিটিকাস: ১২/২-৫)
আর ক্যাথলিক বাইবেলে পরিস্কারভাবে বলা আছে যে, "কন্যা সন্তান জন্ম হওয়া একটা ক্ষতি বা লোকসান"। (এক্সিলেসিয়াস্টিকাস: ২২/৩) অপরদিকে ঐ সমস্ত পুরুষদেরকে প্রশংসা করেছে "যে তার পুত্র সন্তানকে শিক্ষাদান করে এবং শত্রুরা তাতে ঈর্ষান্বিত হয়"। (এক্সিলেসিয়াস্টিকাস: ৩০/৩)
দেখুন! ইয়াহুদী পন্ডিতের কার্যকলাপ। ইয়াহূদী পণ্ডিত ইয়াহুদীদেরকে তাগিদ দিচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য, সাথে সাথে ছেলে সন্তানদেরকে প্রাধান্য দিচ্ছে "তোমাদের জন্য পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়া হবে কল্যাণকর আর কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়া হবে অকল্যাণকর। সবাই পুত্র সন্তানের জন্মে খুশি হয় কিন্তু, কন্যা সন্তানের জন্ম হলে তারা চিন্তিত হয়"। "যখন পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করে তখন তা দুনিয়ায় শান্তি আসার কারণ হয়; পক্ষান্তরে কন্যা সন্তানের জন্মে কিছুই হয় না"।⁷
কন্যা সন্তান তার পিতামাতার জন্য বোঝা এবং অপমানের কারণ হিসেবে পরিগণিত হয়। "যদি তোমার কন্যা অবাধ্য হয় তাহলে সতর্ক থেক সে তোমার শত্রুদেরকে হাসাবে এবং সে এলাকাবাসীর গল্পের উপভোগ্য হয়ে তোমার জন্য অপমান ডেকে আনবে"। (এক্সিলেসিয়াস্টিকাস: ৪২/১১)
অবাধ্য নারীর প্রতি তোমার কঠোর হওয়া আবশ্যক। অন্যথায় তোমার নির্দেশ অমান্য করবে এবং ভুলের ভিতর দিনাতিপাত করবে। যখন সে তোমার অপমানের কারণ হয়, তখন তুমি আশ্চর্য না হয়ে বরং বিচক্ষণতার পরিচয় দাও। (এক্সিলেসিয়াস্টিকাস: ২৬/১০-১১)
আর এমনটিই করেছিল জাহেলী যুগের কাফিররা। তারা কন্যা সন্তানদেরকে জীবন্ত কবর দিত। কুরআন তাদের এ কু-কর্মকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেছে। আল্লাহ তা 'আলা বলেন,
"আর যখন তাদেরকে কন্যা সন্তান জন্মের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায় এবং অসহ্য মনোযন্ত্রনায় ভুগতে থাকে। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের থেকে মুখমণ্ডল গোপন করে থাকে। সে ভাবে, সে কি অপমান সহ্য করে তাকে দুনিয়ায় থাকতে দেবে নাকি তাকে মাটির নিচে পুতে ফেলবে। শুনে রাখ! তাদের কৃত ফয়সালা অত্যন্ত নিকৃষ্ট।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৫৮-৫৯]
যদি আর-কুরআনে এটাকে নিষিদ্ধ না করা হত, তাহলে এ নিকৃষ্ট কাজটি আজও দুনিয়ায় অব্যাহত থাকত। কুরআন শুধুমাত্র এ কাজটিকে নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয় নি বরং কুরআন পুরুষ ও নারীর ভিতরে কোনো পার্থক্যেরও সৃষ্টি করে নি। এটা বাইবেলের বিপরীত। আর-কুরআন কন্যা সন্তানের জন্মকে পুত্র সন্তানের মতোই আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ ও বিশেষ দান হিসেবে গণ্য করেছে।
প্রথমতঃ কন্যা সন্তানের জন্মকে আর-কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত বা অনুগ্রহ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
“নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব আল্লাহ তা'আলারই। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৪৯]
বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রচলনকে চিরতরে উৎখাত করার জন্য কন্যা সন্তানের লালন-পালন ও শিষ্টাচার শিক্ষাদানকারীকে সুমহান পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"যাকে কোনো কন্যা সন্তান দিয়ে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে এবং সে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করেছে তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে পর্দা হয়ে থাকবে”। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
"যে দুইজন কন্যা সন্তানকে বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত লালন পালন করেছে সে আর আমি কিয়ামতের দিন এভাবে আসব। অতঃপর তিনি তার আঙ্গুলিসমূহকে একত্রিত করলেন।” (সহীহ মুসলিম)
**টিকাঃ**
⁷ Swidler, op. cit., p. 140.
📄 নারী শিক্ষা
তাওরাত ও কুরআনে বর্ণিত নারীদের চিত্রের মধ্যে যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে তা শুধুমাত্র নবজাতক কন্যা সন্তানের বেলায়ই সীমাবদ্ধ নয় বরং এ পার্থক্য জন্মের পরেও চলমান থাকে। এখন আমরা নারী শিক্ষা নিয়ে কুরআন ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করব।
ইয়াহুদীদের মৌলিক ধর্মগ্রন্থ হচ্ছে তাওরাত। তাওরাতে এসেছে- নারীদের তাওরাত পড়ার কোনো অধিকার নেই। জনৈক ইয়াহুদী পণ্ডিত এ কথাটাকে আরও স্পষ্ট করে দিয়ে বলেছেন: "মহিলারা তাওরাত পড়ার চেয়ে তাওরাতকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা উত্তম।” এ ছাড়াও এসেছে “কোনো পুরুষের অধিকার নেই তার কন্যা সন্তানকে তাওরাত শিক্ষাদানের”।⁸
পোল নতুন নিয়মে (new testament) বলেছেন: “তোমাদের স্ত্রীরা গীর্জার ভিতরে চুপ করে থাকবে। কেননা গীর্জার ভিতর কথাবার্তা বলার কোনো অধিকার তাদের নেই। এমনকি আইন যা বলবে তাকে বিনা প্রশ্নে নতশীরে মেনে নিবে। তবে যদি তারা কোনো কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে চায় তাহলে, তা শিখবে বাড়ীতে নিজ নিজ স্বামীর কাছ থেকে। কারণ, গীর্জার মধ্যে নারীদের কথা বলা অত্যন্ত জঘন্য কাজ”। (১ করিনথিয়ান্স: ১৪/৩৪-৩৫)
নারীদের যদি কথা বলার কোনো অনুমতি না থাকে, তাহলে তারা কীভাবে শিক্ষা গ্রহণ করবে? যদি কোনো কিছু বাধ্যতামুলকভাবে মেনে নিতে হয় তাহলে, তাদের চিন্তার বিকাশ ঘটবে কীভাবে? যদি একমাত্র স্বামীই হয় তার শিক্ষা গ্রহণের অবলম্বন তাহলে কীভাবে তারা বেশি বেশি জ্ঞানার্জন করবে? ন্যায় বিচার করতে গেলে অবশ্যই আমাকে প্রশ্ন করতে হবে যে, ইসলাম কি তার চেয়ে বিপরীত?
আল-কুরআনে খাওলা রাদিয়াল্লাহু আনহু সংক্রান্ত একটা ঘটনা এসেছে সেখানে উক্ত বিষয় গুলোকে অত্যন্ত সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। তার স্বামী আওস রাদিয়াল্লাহু আনহু রাগের বশঃবর্তী হয়ে বলেছিলেন: “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের মতো হারাম।" এ কথাটা ইসলাম পূর্ব যুগে আরব সমাজে তালাক ও বিবাহ বিচ্ছেদ হিসেবে ব্যবহৃত হত; কিন্তু স্ত্রীকে অন্যত্র বিবাহ বসা বা স্বামীর বাড়ী ত্যাগ করার অনুমতি ছিল না। খাওলা রাদিয়াল্লাহু আনহু স্বামীর মুখে এ ধরণের কথা শুনে অত্যন্ত চিন্তিত হলেন। সরাসরি চলে গেলেন বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ঘটনা বর্ণনা করতে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এহেন পরিস্থিতিতে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে কোনো সমাধান না থাকায় ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিলেন। কিন্তু খাওলা রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এটা নিয়ে বাদানুবাদ করতে থাকলেন নিজেদের বিবাহ বন্ধন অক্ষুন্ন রাখার মানসে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'আলা কুরআনের আয়াত নাযিল করে তার সমস্যার সমাধান দিয়ে এ ধরণের প্রথাকে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। এ সময় সূরা মুজাদালাহ নাযিল হয়। আল্লাহ বলেন,
"যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং অভিযোগ পেশ করছে আল্লাহ তা'আলার দরবারে। আল্লাহ তা'আলা তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ আপনাদের উভয়ের কথাবার্তা শুনেন। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ১]
কুরআন নারীকে অধিকার দেয় স্বয়ং আল্লাহর নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে বাদানুবাদ করার। তাদেরকে চুপ করিয়ে রাখার অধিকার কারো নেই। নারীকে এতেও বাধ্য করা হয় নি যে, তার একমাত্র শিক্ষাপ্রহণস্থল হবে তার স্বামী।
**টিকাঃ**
⁸ Denise L. Carmody, "Judaism", in Arvind Sharma, ed., op. cit., p. 197.
📄 ঋতুবতী নারী আশপাশের সব কিছুকে নাপাক করে দেয় কি?
বিশেষভাবে ইয়াহূদী বিধি-বিধান ঋতুবতী মহিলাদেরকে কঠোরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। পুরাতন নিয়ম (old testament) ঋতুবতী মহিলাদেরকে এবং তাদের আশে পাশের সব কিছুকে নাপাক হিসেবে গণ্য করেছে। যে কোনো জিনিস সে স্পর্শ করলেই পুরো দিনব্যাপী তা নাপাক থাকবে। যদি কোনো মহিলার শরীরে কোনো প্রবাহিত রক্ত থাকে যা গোশতের উপর প্রবাহিত হয়, তাহলে সে এক সপ্তাহ পর্যন্ত অপবিত্র থাকবে। যে তাকে স্পর্শ করবে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত নাপাক থাকবে। সে যার উপর বসবে বা শয়ন করবে তা নাপাক বলে গণ্য হবে। যে তার বিছানা স্পর্শ করবে তার শরীরের পোশাক ধৌত করতে হবে, গোসল করতে হবে এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত সে নাপাক থাকবে। সে যার উপর বসেছে এমন কোনো আসবাব পত্রকে স্পর্শ করলেও অনুরুপ তাকে গোসল ও তার পোশাক ধৌত করতে হবে। এমতাবস্থায় সে সন্ধ্যা পর্যন্ত নাপাক থাকবে। (লেভিটিকাস: ১৫/১৯-২৩)
এ কারণে মাঝে মাঝে নারীদেরকে কারো সাথে কোনো ধরনের আচার-আচরণ বা উঠাবসা করতে নিষেধ করা হত। তাদেরকে ঋতুবতী হলে উক্ত সময়টা কাটাতে 'নাপাক ভবন' এ পাঠিয়ে দেওয়া হত।⁹
ইয়াহুদী ধর্মশাস্ত্র ঋতুবতী মহিলাকে সে কাউকে স্পর্শ না করা সত্বেও হত্যাকারীনী হিসেবে গণ্য করে।
ইয়াহুদী পণ্ডিতের মতে, যদি কোনো ঋতুবতী মহিলা ঋতুর শুরুতে দুইজন পুরুষের মাঝ দিয়ে হেটে যায় তাহলে, তাদের একজন মারা যাবে। আর যদি ঋতুর শেষের দিকে হয় তাহলে, তাদের উভয়ের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি হবে।¹⁰
ঋতুবতী মহিলার স্বামীকেও ইয়াহুদীদের উপাসনালয়ে প্রবেশ করায় বাধা দেওয়া হত। কেননা তার স্ত্রী যে মাটির উপর চলাফেরা করেছে একই মাটির উপর চলাফেরা করার কারণে সেও নাপাক। যে ইয়াহূদী পণ্ডিতের স্ত্রী, কন্যা বা মাতা ঋতুবতী থাকে তাকে তাদের উপাসনালয়ে খুতবাহ দিতে দেওয়া হত না।¹¹
এ জন্য এখনও কিছু কিছু ইয়াহুদী মহিলা ঋতুকে "অভিশাপ" নামে আখ্যা দিয়ে থাকেন।¹²
কিন্তু ইসলাম কোনো ঋতুবতী মহিলাকে বলে না যে, সে তার আশেপাশের জিনিসকে নাপাক করে দেয়। তার ওপর অভিশাপ দেয় না। সালাত ও সাওমের মতো কয়েকটি ইবাদাত থেকে অব্যাহতি পাওয়া ব্যতীত সে সম্পূর্ণ সাধারণ জীবন যাপন করে।
**টিকাঃ**
⁹ Swidler, op. cit., p. 137.
¹⁰ bpes.111a
¹¹ Ibid., p. 138.
¹² Sally Priesand, Judaism and the New Woman (New York: Behrman House, Inc., 1975) p. 24.
📄 সাক্ষ্যদানের অধিকার
আরেকটি বিষয় নারীদের সাক্ষ্যদানের অধিকার। কুরআন ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের মধ্যে এটা নিয়ে বেশ মতবিরোধ রয়েছে। আর-কুরআন মুমিনদেরকে কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদনের সময় দুইজন পুরুষ বা একজন পুরুষ ও দুইজন নারীকে সাক্ষী রাখার বিধান রেখেছে।
আল্লাহ বলেন,
“তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্যে দুইজনকে সাক্ষী রাখ। যদি দুই জন পুরুষ না থাকে তাহলে একজন পুরুষ ও দুইজন নারীকে সাক্ষী রাখ যাদের সাক্ষ্য তোমরা পছন্দ কর তাদের মধ্য থেকে; একজন যদি ভুলে যায়, তাহলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৮২]
কুরআনের অন্য স্থানে নারীর সাক্ষ্যকে পুরুষের সমান বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীর সাক্ষ্য পুরুষের সাক্ষ্যকে বাতিল করে দেয়। যদি কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয় আর-কুরআন তাকে নির্দেশ দেয় তার অভিযোগের স্বপক্ষে পাঁচবার কসম করতে। অনুরুপ স্ত্রী যদি তা অস্বীকার করে এবং নিজের মতের স্বপক্ষে পাচবার কসম করে তাহলে সে অপরাধী সাব্যস্ত হবে না। উপরোক্ত উভয় অবস্থায় তাদের বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
“এবং যারা তাদের স্ত্রীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে এবং তারা নিজেরা ছাড়া তাদের কোনো সাক্ষী না থাকে, এরূপ ব্যক্তির সাক্ষ্য হবে- সে আল্লাহর কসম খেয়ে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে অবশ্যই সত্যবাদী। এবং পঞ্চমবার বলবে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তার ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত। এবং স্ত্রীর শাস্তি রহিত হয়ে যাবে যদি সে আল্লাহর কসম খেয়ে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, তার স্বামী অবশ্যই মিথ্যাবাদী। এবং পঞ্চমবার বলে যে, যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয় তবে তার (নিজের) ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসবে। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে এবং আল্লাহ তওবা কবুলকারী, প্রজ্ঞাময় না হলে কত কিছুই যে হয়ে যেত। যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে নিজেদের জন্য খারাপ মনে করো না; বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের প্রত্যেকের জন্য ততটুকু আছে যতটুকু সে গোনাহ করেছে এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে তার জন্য রয়েছে বিরাট শাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৬-১]
আগে ইয়াহুদী সমাজে নারীদেরকে সাক্ষ্যদানের অধিকার দেওয়া হত না।¹³
ইয়াহুদী পণ্ডিতের মতে- জান্নাত থেকে বের হওয়ার পর নারীদের প্রতি যে সমস্ত অভিশাপ এসেছে তন্মধ্যে একটি হচ্ছে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য না হওয়া। বর্তমানেও ইসরাঈলে ইয়াহূদীদের ধর্মীয় কোর্টে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না।¹⁴
এর কারণ হিসেবে ইয়াহুদী পণ্ডিতদের ভাষ্য হচ্ছে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের স্ত্রী সারাহ মিথ্যা বলেছিলেন। (জেনেসিস: ১৬/৯-১৮) অথচ এ ঘটনাটি আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হওয়া সত্বেও কোথাও বলা হয় নি যে, সারাহ মিথ্যা বলেছিলেন।” [সূরা হুদ, আয়াত: ৬৯-৭৪, সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ২৪-৩০ দ্রষ্টব্য]
ধর্মীয় বা আধুনিক আইন বিশারদ পশ্চিমা খৃষ্টানগণের কেউ গত শতাব্দীর আগ পর্যন্ত কখনো নারীকে সাক্ষ্যদানের অধিকার দেয় নি।¹⁵
কোনো পুরুষ তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ দিলে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না। বাইবেলের নির্দেশনানুযায়ী অভিযুক্ত মহিলা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে গিয়ে অপমানজনকভাবে কোর্টে হাযির হবে। (নং ৫/১১-৩১) কোর্টে যদি সে দোষী সাব্যস্ত হয় তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আর যদি মহিলা নির্দোষ প্রমাণিত হয় তথাপিও অপবাদের কারণে স্বামীর কোনো শাস্তি হবে না। যদি কোনো পুরুষ কোনো মহিলাকে বিবাহ করে দাবী করে যে, সে কুমারী নয়; এ ক্ষেত্রেও নারীর সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয় বরং মহিলার পরিবারের ওপর দায়িত্ব এসে যাবে শহরের বয়স্ক লোকদের সামনে তাকে কুমারী হিসেবে প্রমাণ করা। যদি তারা তাকে কুমারী প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে মহিলাকে পিত্রালয়ের সামনে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। আর যদি তারা তাকে কুমারী প্রমাণ করতে পারে, তাহলে তার স্বামীর ওপর ১০০ রৌপ্যমুদ্রা জরিমানা করা হবে এবং আজীবনের জন্য তাকে তালাক দেওয়ার অধিকার খর্ব করা হবে।
বলা হয়েছে "যদি কোনো পুরুষ কোনো মহিলাকে বিবাহ করার পর তার নিকটবর্তী হয়ে তাকে অপছন্দ করে এবং সমাজে তার দুর্নাম করে বলে: আমি একে বিবাহ করে কুমারী হিসেবে পাই নি। তখন তার পিতামাতা তাকে নিয়ে যাবে এবং তাদের বাড়ীর সামনে অবস্থানরত সমাজের বয়স্কদের সামনে তার কুমারিত্বের প্রমাণ হাযির করে বলবে: আমি আমার কন্যাকে এই লোকের সাথে বিবাহ দিয়েছি। সে তাকে অপছন্দ করে কুমারী পায় নি বলে সমাজে দুর্নাম ছড়াচ্ছে। এই দেখুন! এটা তার কুমারিত্বের প্রমাণ বলে বয়স্কদেরকে তার কাপড় দেখাবে। তখন সমাজের বয়স্ক ব্যক্তিরা ঐ ছেলেকে ধরে নিয়ে শাসন করবে এবং ১০০ রৌপ্যমুদ্রা জরিমানা করে অপবাদের বিনিময় হিসেবে মেয়ের পিতাকে দেবে। আর ঐ মেয়ে হবে তার আজীবনের জন্য স্ত্রী। তালাক দেওয়ার কোনো অধিকার তার অবশিষ্ট থাকবে না; পক্ষান্তরে যদি কন্যার কুমারিত্ব না পাওয়া যায় তাহলে মেয়েকে পিত্রালয়ের সামনে নিয়ে এসে পুরুষেরা তাকে পাথর মেরে হত্যা করবে। কেননা সে ব্যভিচার করে তার পিত্রালয়কে কলঙ্কিত করেছে। তাই এ পাপিষ্টকে ওদের থেকে দূর করে ফেলতে হবে। (ডিউটারনমী: ২২/১৩-২১)
**টিকাঃ**
¹³ Swidler, op. cit., p. 115
¹⁴ Lesley Hazleton, Israeli Women The Reality Behind the Myths (New York: Simon and Schuster, 1977) p. 41.
¹⁵ Gage, op. cit. p. 142.