📘 ইসলামে নারী বনাম ইহুদী ও খৃষ্ট্রান ধর্মে নারী > 📄 হাওয়া আলাইহাস সালামের অপরাধের উত্তরাধিকার

📄 হাওয়া আলাইহাস সালামের অপরাধের উত্তরাধিকার


বাইবেলে বর্ণিত 'হাওয়া আলাইহাস সালাম আদম আলাইহিস সালামকে পথভ্রষ্ট করেছিলেন' বাক্যটি ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্মবিশ্বাসে নারী জাতিকে নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ধারণা করা হয় যে, নারী জাতি উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের আদি রমাতা হাওয়া-এর অপরাধের প্রায়শ্চিত্য ভোগ করে থাকে। অতএব, নারীদের ওপর নির্ভর করা যাবে না এবং তারা সচ্চরিত্রবান নয়। এছাড়াও বিশ্বাস করা হয় যে, নারী জাতির অপবিত্র হওয়া, গর্ভধারণ করা ও সন্তান প্রসব করা এগুলো হাওয়া আলাইহাস সালামের অপরাধের প্রায়শ্চিত্য হিসেবে স্থায়ী শাস্তি। নারীদের প্রতি নেতিবাচক আচরণ সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে আমাদেরকে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের দিকে মনোনিবেশ করা আবশ্যক।
তাহলে প্রথমে বাইবেলের 'পুরাতন নিয়ম' (old testament) এর কথায় আসা যাক। আমরা এর কারণ খুজতে গিয়ে দেখতে পাই যে, "মহিলারা মৃত্যুর চেয়েও বেশি তিক্ত। সে হচ্ছে ফাঁদের মতো, তার অন্তর ফিতার মতো এবং হাতগুলো বন্ধন। নেককার ব্যক্তি তাদের থেকে মুক্ত থাকবে। পক্ষান্তরে বদকারদেরকে এদের কারণে পাকড়াও করা হবে।"
দেখুন! আমি এটাই পেয়েছি।
“এক এক করে আমার মনের প্রশ্নের সমাধান খুঁজে দেখেছি। কিন্তু আমি তার জবাব খুঁজে পাইনি নি। হাজার পুরুষের মধ্যে একজনকে এ রকম পেয়েছি। কিন্তু, হাজারে একজন মহিলাকেও এ রকম পাই নি”।
ক্যাথলিক বাইবেলে আছে ‘এমন কোনো পাপ নেই যাকে নারীর পাপের সাথে তুলনা করা যায়। প্রত্যেক পাপের পিছনে আছে কোনো না কোনো মহিলা আর মহিলাদের কারণেই আমরা সবাই মরে যাব।’ (এক্সিলেসিয়াস্টিকাস: ২৫/১৯,২৪)
এক ইয়াহূদী আলিম প্রচার করছেন, জান্নাত থেকে বের হওয়ার কারণে মহিলাদেরকে ৯ টি অভিশাপ দেওয়া হয়েছে।
মহিলাদের ওপর মৃত্যুর আগে ৯টি অভিশাপ রয়েছে। সেগুলো হলো:
অপবিত্র হওয়া
কুমারিত্বের রক্ত
গর্ভধারণের কষ্ট
সন্তান প্রতিপালন ও সন্তান প্রসবের কষ্ট
মাথা ঢেকে রাখার বিধান, যেন সে শোক পালন করছে
তাদের কান ছিদ্র করতে হয়
তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়
এগুলোর পরে রয়েছে মৃত্যু।²
এখনও আর্থোডক্স ইয়াহূদী পুরুষগণ তাদের প্রার্থনায় বলে থাকে- আমরা আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করি এ জন্য যে, আল্লাহ আমাদেরকে নারী করে দুনিয়ায় পাঠান নি। আর নারীরা বলে: আমরা আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করি এ জন্যে যে, তিনি যেমন খুশি তেমনি করে আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন।
ইয়াহুদীদের গ্রন্থে আরেকটি প্রার্থনার উল্লেখ পাওয়া যায় তা হলো: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে মুর্তিপুজারী করে সৃষ্টি করেন নি। প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদেরকে নারী হিসেবে সৃষ্টি করেন নি, আর প্রশংসা সে আল্লাহর যিনি আমাদেরকে মূর্খ করে সৃষ্টি করেন নি।³
নারীদের প্রতি এ নেতিবাচক ধারণার কুপ্রভাব ইয়াহুদী ধর্মের চেয়ে খৃষ্টান ধর্মে বেশি প্রকট আকার ধারণ করেছে। হাওয়া আলাইহাস সালামের অপরাধের ব্যাপারটা খৃষ্টান ধর্ম বিশ্বাসে বড় ধরণের প্রভাব ফেলছে। ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর বিধানের সাথে হাওয়া আলাইহিস সালামের নাফরমানীর ফলাফল। তিনি প্রথম নাফরমানী করেছেন এবং আদম আলাইহিস সালামকে ও তা করার প্ররোচনা দিয়েছেন। ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নামিয়ে দিয়েছেন এবং সে অভিশপ্ত হয়েছে। আল্লাহ তাদের এ অপরাধ ক্ষমা করেন নি; বরং তা সমস্ত মানুষের কাছে স্থানান্তরিত হয় প্রত্যেকেই এ গুনাহের বোঝা নিয়ে দুনিয়ায় আসে। এ সমস্ত মানুষের উক্ত অপরাধের প্রায়শ্চিত্য হিসেবে ঈসা আলাইহিস সালামকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। (খৃষ্টানদের ধারণা অনুযায়ী ঈসা আলাইহিস সালাম মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু ঈসা আলাইহিস সালামকে জীবিত উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। -অনুবাদক) তাকে স্রষ্টার পুত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ সমস্ত কারণে হাওয়া আলাইহাস সালাম তার নিজের, স্বামীর ও সমস্ত মানুষের প্রথম পাপের জন্য দায়ী এমনকি ঈসা আলাইহিস সালামের ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করার জন্যেও দায়ী। অন্য কথায় বলতে গেলে সমস্ত মানুষের জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নেমে আসার কারণ হচ্ছে শুধুমাত্র একজন নারী।
এটা গেল প্রথম মানবী হাওয়া আলাইহাস সালামের কথা। কিন্তু তার কন্যাগণের অবস্থা কী? তারাও তার সমান অপরাধী। তাদের সাথে অপরাধীদের সাথে যেমন আচরণ করতে হয় তেমনি আচরণ করতে হবে।
নতুন নিয়মে (new testament) পল বলেছেন: “মহিলারা চুপিসারে ও নতশীরে শিক্ষা গ্রহণ করবে। আমি কোনো মহিলাকে অনুমতি দেব না কোনো পুরুষকে শিক্ষাদানের বা পুরুষের ওপর কর্তৃত্ব করার, বরং তারা চুপ করে থাকবে (বিনা প্রশ্নে সবকিছু মেনে নেবে)। কারণ, আদম প্রথমে সৃষ্টি হয়েছেন তারপর হাওয়া। আদম নিজে পথভ্রষ্ট হন নি, বরং হাওয়া তাকে পথভ্রষ্ট করে দিয়ে বাড়াবাড়ি করেছেন”। (১ তীমথিয়: ২/১১-১৪)
খৃষ্টান আলিম তারতোলিয়ান উক্ত পোপের চেয়ে আরও বেশি কঠোর ছিলেন। তিনি তার খৃষ্টান মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলতেন: "তোমরা কি জান যে, তোমরা সবাই একেকজন হাওয়া? তোমাদের ওপর আল্লাহ তা'আলা যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা আজও বিদ্যমান আছে। পাপ কাজগুলোও আজ বিদ্যমান। তোমরা হচ্ছ ঐ সমস্ত দরজা যা দ্বারা শয়তান প্রবেশ করে। নিষিদ্ধ গাছের পাপাচারের জন্য তোমরাই দায়ী। তোমরাই সর্ব প্রথম পাপ কাজ করেছিলে। যে আদমকে শয়তান পথভ্রষ্ট করতে পারে নি, তাকে তোমরাই পথভ্রষ্ট করেছ। তোমরা আল্লাহ তা'আলার সাথে মানুষের সম্পর্ককে গুড়িয়ে দিয়েছ। আর তোমাদেরই পাপের কারণেই ইশ্বরের পুত্র ঈসা (খৃষ্টানদের মতে) শুলে বিদ্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করেছেন।"
আরেক খৃষ্টান পণ্ডিত আগাস্টাইন ছিলেন তার পুর্বসুরীদের মতোই। তিনি তার বন্ধুকে লিখেছিলেন যে, স্ত্রী আর মায়েদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারা উভয় অবস্থায়ই হাওয়া এর অনুরুপ যিনি আদমকে পথভ্রষ্ঠ করেছিলেন। সুতরাং আমাদের সকলের উচিৎ তাদের থেকে সতর্ক থাকা। আমাদের বুঝে আসে না নারীদেরকে কেন যে সৃষ্টি করা হয়েছে? সন্তান জন্মদান ছাড়া তাদের দ্বারা আর কোনো ফায়দা হয় না।⁵
তার কয়েকশতক পর পণ্ডিত টমাস আকবীনাস বিশ্বাস করত যে, মহিলাদের দিয়ে কোনো লাভ হয় না। তার বক্তব্য হচ্ছে: নারীরা কোনো উপকারে আসে না। পক্ষান্তরে পুরুষেরা নেককার হয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং তাদের পুত্র সন্তানগণও নেককার হয়; কিন্তু নারীরা জন্মলগ্ন থেকে তাদের পূর্বেকার নারী হাওয়া এর অপরাধের কারণে কলঙ্ক নিয়ে দুনিয়ায় আসে।
সর্বশেষে প্রখ্যাত খৃষ্টান পণ্ডিত মার্টিন লুথার তিনিও সন্তান জন্ম দান ছাড়া নারীদের দিয়ে আর কোনো উপকার হয় বলে মনে করেন না। তিনি বলেন, যখন তারা ক্লান্ত হয়ে যায় বা মারা যায়, সেটা কোনো ব্যাপারই নয়। সন্তান জন্মের পর তারা তাদেরকে আদর যত্ন করবে এটাই তাদের দায়িত্ব।⁶
হাওয়া আদম আলাইহিস সালামকে পথভ্রষ্ট করেছেন এ বিশ্বাসের কারণে নারীরা খৃষ্টান ধর্মে তিরস্কারের পাত্রে পরিণত হয়েছে। যেমনটি সাফারুত তাকবীনে বর্ণিত হয়েছে।
সংক্ষেপে বলা যায়, ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্মবিশ্বাসে হাওয়া আলাইহিস সালাম ও তার কন্যা সন্তানগণকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয়।
এবার আসি আল-কুরআন মাজীদে নারীদের সম্বন্ধে কী বলা হয়েছে তা জেনে নিই। অচিরেই আমরা দেখতে পাব যে, আল-কুরআন ও ইয়াহূদী বা খৃষ্টান ধর্মে বর্ণিত নারীদের চিত্রের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান।
কুরআন নিজেই বলছে:
“নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, সাওম পালনকারী পুরুষ ও সাওম পালনকারী নারী, লজ্জাস্থান হিফাযতকারী পুরুষ ও লজ্জাস্থান হিফাযতকারী নারী, আল্লাহর অধিক যিকিরকারী পুরুষ ও আল্লাহর অধিক যিকিরকারী নারীদের জন্য আল্লাহ তা'আলা প্রস্তুত করে রেখেছেন ক্ষমা ও মহা পুরস্কার"। [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৫]
আল-কুরআনের বাণী:
"আর ঈমানদার নারী ও ঈমানদার পুরুষ একে অপরের সহায়ক ও বন্ধু। তারা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে বাধা দেয়। নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে আর আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করে। অচিরেই আল্লাহ তা'আলা এদের ওপর দয়া পরবশ হবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআ'লা পরাক্রমশালী, সুকৌশলী।" [সূরা আত-তওবাহ, আয়াত: ৭১]
আল-কুরআনের বাণী:
“অতঃপর তাদের পালনকর্তা তাদের দো'আ এই বলে কবুল করে নিলেন যে, আমি তোমাদের কোনো আমলকারীর আমল নষ্ট করি না। চাই সে পুরুষ বা নারী, যেই হোক না কেন। তোমরা পরস্পর এক। অতঃপর যারা হিজরত করেছে তাদেরকে নিজেদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের প্রতি উৎপীড়ন করা হয়েছে আমার পথে এবং যারা লড়াই করেছে ও মৃত্যু বরণ করেছে, অবশ্যই আমি তাদের ওপর থেকে অকল্যাণকে অপসারণ করব আর তাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতে যার নিচ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহমান। এই হলো আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে বিনিময়। আর আল্লাহ তা'আলার নিকট রয়েছে উত্তম বিনিময়। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯৫]
“যে মন্দ কাজ করে সে কেবল তার অনুরুপ প্রতিফল পাবে, আর যে পুরুষ অথবা নারী মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করে তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে। সেখানে তাদেরকে বেহিসাব রিযিক দেওয়া হবে”। [সূরা গাফির, আয়াত: ৪০]
“যে সৎকর্ম করে এবং সে ঈমানদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী, আমরা তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের কাজের বিনিময়ে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করব। [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৯৭]
আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, কুরআনে পুরুষ ও নারীর মাঝে কোনো বৈষম্য রাখা হয় নি। আল্লাহ তাদের উভয়কে সৃষ্টি করেছেন যেন তারা তার ইবাদত করে, সৎ কাজ করে এবং খারাপ থেকে দূরে থাকে।
আল্লাহ তা'আলা তাদের উভয়ের কাজের জন্য হিসাব নেবেন। আল-কুরআনে কোথাও বলা হয় নি যে, নারীরা শয়তানের প্রবেশদ্বার বা তারা জন্ম নিয়েছে প্রতারণার জন্য। এমনও বলা হয় নি যে, পুরুষেরা স্রষ্টার প্রতিকৃতি বরং পুরুষ নারী উভয়ই আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি। আল-কুরআনের আয়াতসমূহ পরিস্কার করে বলেছে যে, নারীদের দায়িত্ব শুধুমাত্র সন্তান জন্মদান নয় বরং পুরুষের মতোই সমানে সমান তারও দায়িত্ব রয়েছে নেক আমল করার।
আল-কুরআন বলে নি যে, নেককারিনী নারী পাওয়া দুষ্কর, বরং তার বিপরীতে নারী ও পুরুষদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নেককারিনী নারী মারইয়াম আলাইহাস সালাম ও ফিরআউনের স্ত্রী প্রমুখদের অনুসরণ করতে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
"আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের জন্য ফিরআউনের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বলল: হে আমার রব! আপনার নিকট জান্নাতে আমার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফিরআউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে যালিম সম্প্রদায় থেকে রক্ষা করুন। আর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন ইমরানের কন্যা মারইয়াম আলাইহিস সালামের। যিনি তার সতীত্ব বজায় রেখেছিলেন। অতঃপর আমি তার মধ্যে আমার পক্ষ থেকে জীবন ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং তিনি তার রবের বাণী ও কিতাবকে সত্যে পরিণত করেছিলেন। তিনি ছিলেন বিনয় প্রকাশকারীনীদের একজন'। [সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ১১-১২]

**টিকাঃ**
² Leonard j.swidler, women in Judaism: the status of women in formative Judaism (Metuchen, N.J: Scarecrow press, 1976) p.115
³ Thena kendath, "memories of an orthodox youth" in Susannah heschel, ed. On being a jewish feminist (New york: schocken books, 1983), pp.96-97
⁴ Swidler, op. cit., pp. 80-81.
⁵ Rosemary R. Ruether, "Christianity", in Arvind Sharma, ed. Women in World Religions (Albany: State University of New York Press, 1987) p. 209.
⁶ For all the sayings of the prominent Saints, see Karen Armstrong, The Gospel According to Woman (London: Elm Tree Books, 1986) pp. 52-62. See also Nancy van Vuuren, The Subversion of Women as Practiced by Churches, Witch-Hunters, and Other Sexists (Philadelphia: Westminister Press) pp. 28-30.

📘 ইসলামে নারী বনাম ইহুদী ও খৃষ্ট্রান ধর্মে নারী > 📄 কন্যা সন্তান কি অপমান ডেকে আনে?

📄 কন্যা সন্তান কি অপমান ডেকে আনে?


আসলে কুরআন ও তাওরাতের মধ্যকার নারী জাতি সংক্রান্ত আলোচনায় মতানৈক্য রয়েছে তার জন্মলগ্ন থেকেই।
উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় যে, বাইবেলে রয়েছে নারীরা কন্যা সন্তান জন্ম দিলে সন্তান প্রসবের পরে অপবিত্র থাকে ২ সপ্তাহ। পক্ষান্তরে পুত্র সন্তান জন্ম দিলে অপবিত্র থাকে ৭ দিন বা এক সপ্তাহ। (লেভিটিকাস: ১২/২-৫)
আর ক্যাথলিক বাইবেলে পরিস্কারভাবে বলা আছে যে, "কন্যা সন্তান জন্ম হওয়া একটা ক্ষতি বা লোকসান"। (এক্সিলেসিয়াস্টিকাস: ২২/৩) অপরদিকে ঐ সমস্ত পুরুষদেরকে প্রশংসা করেছে "যে তার পুত্র সন্তানকে শিক্ষাদান করে এবং শত্রুরা তাতে ঈর্ষান্বিত হয়"। (এক্সিলেসিয়াস্টিকাস: ৩০/৩)
দেখুন! ইয়াহুদী পন্ডিতের কার্যকলাপ। ইয়াহূদী পণ্ডিত ইয়াহুদীদেরকে তাগিদ দিচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য, সাথে সাথে ছেলে সন্তানদেরকে প্রাধান্য দিচ্ছে "তোমাদের জন্য পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়া হবে কল্যাণকর আর কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়া হবে অকল্যাণকর। সবাই পুত্র সন্তানের জন্মে খুশি হয় কিন্তু, কন্যা সন্তানের জন্ম হলে তারা চিন্তিত হয়"। "যখন পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করে তখন তা দুনিয়ায় শান্তি আসার কারণ হয়; পক্ষান্তরে কন্যা সন্তানের জন্মে কিছুই হয় না"।⁷
কন্যা সন্তান তার পিতামাতার জন্য বোঝা এবং অপমানের কারণ হিসেবে পরিগণিত হয়। "যদি তোমার কন্যা অবাধ্য হয় তাহলে সতর্ক থেক সে তোমার শত্রুদেরকে হাসাবে এবং সে এলাকাবাসীর গল্পের উপভোগ্য হয়ে তোমার জন্য অপমান ডেকে আনবে"। (এক্সিলেসিয়াস্টিকাস: ৪২/১১)
অবাধ্য নারীর প্রতি তোমার কঠোর হওয়া আবশ্যক। অন্যথায় তোমার নির্দেশ অমান্য করবে এবং ভুলের ভিতর দিনাতিপাত করবে। যখন সে তোমার অপমানের কারণ হয়, তখন তুমি আশ্চর্য না হয়ে বরং বিচক্ষণতার পরিচয় দাও। (এক্সিলেসিয়াস্টিকাস: ২৬/১০-১১)
আর এমনটিই করেছিল জাহেলী যুগের কাফিররা। তারা কন্যা সন্তানদেরকে জীবন্ত কবর দিত। কুরআন তাদের এ কু-কর্মকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেছে। আল্লাহ তা 'আলা বলেন,
"আর যখন তাদেরকে কন্যা সন্তান জন্মের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায় এবং অসহ্য মনোযন্ত্রনায় ভুগতে থাকে। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের থেকে মুখমণ্ডল গোপন করে থাকে। সে ভাবে, সে কি অপমান সহ্য করে তাকে দুনিয়ায় থাকতে দেবে নাকি তাকে মাটির নিচে পুতে ফেলবে। শুনে রাখ! তাদের কৃত ফয়সালা অত্যন্ত নিকৃষ্ট।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৫৮-৫৯]
যদি আর-কুরআনে এটাকে নিষিদ্ধ না করা হত, তাহলে এ নিকৃষ্ট কাজটি আজও দুনিয়ায় অব্যাহত থাকত। কুরআন শুধুমাত্র এ কাজটিকে নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয় নি বরং কুরআন পুরুষ ও নারীর ভিতরে কোনো পার্থক্যেরও সৃষ্টি করে নি। এটা বাইবেলের বিপরীত। আর-কুরআন কন্যা সন্তানের জন্মকে পুত্র সন্তানের মতোই আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ ও বিশেষ দান হিসেবে গণ্য করেছে।
প্রথমতঃ কন্যা সন্তানের জন্মকে আর-কুরআনে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত বা অনুগ্রহ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
“নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব আল্লাহ তা'আলারই। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৪৯]
বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রচলনকে চিরতরে উৎখাত করার জন্য কন্যা সন্তানের লালন-পালন ও শিষ্টাচার শিক্ষাদানকারীকে সুমহান পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"যাকে কোনো কন্যা সন্তান দিয়ে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে এবং সে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করেছে তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে পর্দা হয়ে থাকবে”। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
"যে দুইজন কন্যা সন্তানকে বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত লালন পালন করেছে সে আর আমি কিয়ামতের দিন এভাবে আসব। অতঃপর তিনি তার আঙ্গুলিসমূহকে একত্রিত করলেন।” (সহীহ মুসলিম)

**টিকাঃ**
⁷ Swidler, op. cit., p. 140.

📘 ইসলামে নারী বনাম ইহুদী ও খৃষ্ট্রান ধর্মে নারী > 📄 নারী শিক্ষা

📄 নারী শিক্ষা


তাওরাত ও কুরআনে বর্ণিত নারীদের চিত্রের মধ্যে যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে তা শুধুমাত্র নবজাতক কন্যা সন্তানের বেলায়ই সীমাবদ্ধ নয় বরং এ পার্থক্য জন্মের পরেও চলমান থাকে। এখন আমরা নারী শিক্ষা নিয়ে কুরআন ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করব।
ইয়াহুদীদের মৌলিক ধর্মগ্রন্থ হচ্ছে তাওরাত। তাওরাতে এসেছে- নারীদের তাওরাত পড়ার কোনো অধিকার নেই। জনৈক ইয়াহুদী পণ্ডিত এ কথাটাকে আরও স্পষ্ট করে দিয়ে বলেছেন: "মহিলারা তাওরাত পড়ার চেয়ে তাওরাতকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা উত্তম।” এ ছাড়াও এসেছে “কোনো পুরুষের অধিকার নেই তার কন্যা সন্তানকে তাওরাত শিক্ষাদানের”।⁸
পোল নতুন নিয়মে (new testament) বলেছেন: “তোমাদের স্ত্রীরা গীর্জার ভিতরে চুপ করে থাকবে। কেননা গীর্জার ভিতর কথাবার্তা বলার কোনো অধিকার তাদের নেই। এমনকি আইন যা বলবে তাকে বিনা প্রশ্নে নতশীরে মেনে নিবে। তবে যদি তারা কোনো কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে চায় তাহলে, তা শিখবে বাড়ীতে নিজ নিজ স্বামীর কাছ থেকে। কারণ, গীর্জার মধ্যে নারীদের কথা বলা অত্যন্ত জঘন্য কাজ”। (১ করিনথিয়ান্স: ১৪/৩৪-৩৫)
নারীদের যদি কথা বলার কোনো অনুমতি না থাকে, তাহলে তারা কীভাবে শিক্ষা গ্রহণ করবে? যদি কোনো কিছু বাধ্যতামুলকভাবে মেনে নিতে হয় তাহলে, তাদের চিন্তার বিকাশ ঘটবে কীভাবে? যদি একমাত্র স্বামীই হয় তার শিক্ষা গ্রহণের অবলম্বন তাহলে কীভাবে তারা বেশি বেশি জ্ঞানার্জন করবে? ন্যায় বিচার করতে গেলে অবশ্যই আমাকে প্রশ্ন করতে হবে যে, ইসলাম কি তার চেয়ে বিপরীত?
আল-কুরআনে খাওলা রাদিয়াল্লাহু আনহু সংক্রান্ত একটা ঘটনা এসেছে সেখানে উক্ত বিষয় গুলোকে অত্যন্ত সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। তার স্বামী আওস রাদিয়াল্লাহু আনহু রাগের বশঃবর্তী হয়ে বলেছিলেন: “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের মতো হারাম।" এ কথাটা ইসলাম পূর্ব যুগে আরব সমাজে তালাক ও বিবাহ বিচ্ছেদ হিসেবে ব্যবহৃত হত; কিন্তু স্ত্রীকে অন্যত্র বিবাহ বসা বা স্বামীর বাড়ী ত্যাগ করার অনুমতি ছিল না। খাওলা রাদিয়াল্লাহু আনহু স্বামীর মুখে এ ধরণের কথা শুনে অত্যন্ত চিন্তিত হলেন। সরাসরি চলে গেলেন বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ঘটনা বর্ণনা করতে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এহেন পরিস্থিতিতে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে কোনো সমাধান না থাকায় ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিলেন। কিন্তু খাওলা রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এটা নিয়ে বাদানুবাদ করতে থাকলেন নিজেদের বিবাহ বন্ধন অক্ষুন্ন রাখার মানসে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'আলা কুরআনের আয়াত নাযিল করে তার সমস্যার সমাধান দিয়ে এ ধরণের প্রথাকে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। এ সময় সূরা মুজাদালাহ নাযিল হয়। আল্লাহ বলেন,
"যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং অভিযোগ পেশ করছে আল্লাহ তা'আলার দরবারে। আল্লাহ তা'আলা তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ আপনাদের উভয়ের কথাবার্তা শুনেন। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ১]
কুরআন নারীকে অধিকার দেয় স্বয়ং আল্লাহর নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে বাদানুবাদ করার। তাদেরকে চুপ করিয়ে রাখার অধিকার কারো নেই। নারীকে এতেও বাধ্য করা হয় নি যে, তার একমাত্র শিক্ষাপ্রহণস্থল হবে তার স্বামী।

**টিকাঃ**
⁸ Denise L. Carmody, "Judaism", in Arvind Sharma, ed., op. cit., p. 197.

📘 ইসলামে নারী বনাম ইহুদী ও খৃষ্ট্রান ধর্মে নারী > 📄 ঋতুবতী নারী আশপাশের সব কিছুকে নাপাক করে দেয় কি?

📄 ঋতুবতী নারী আশপাশের সব কিছুকে নাপাক করে দেয় কি?


বিশেষভাবে ইয়াহূদী বিধি-বিধান ঋতুবতী মহিলাদেরকে কঠোরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। পুরাতন নিয়ম (old testament) ঋতুবতী মহিলাদেরকে এবং তাদের আশে পাশের সব কিছুকে নাপাক হিসেবে গণ্য করেছে। যে কোনো জিনিস সে স্পর্শ করলেই পুরো দিনব্যাপী তা নাপাক থাকবে। যদি কোনো মহিলার শরীরে কোনো প্রবাহিত রক্ত থাকে যা গোশতের উপর প্রবাহিত হয়, তাহলে সে এক সপ্তাহ পর্যন্ত অপবিত্র থাকবে। যে তাকে স্পর্শ করবে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত নাপাক থাকবে। সে যার উপর বসবে বা শয়ন করবে তা নাপাক বলে গণ্য হবে। যে তার বিছানা স্পর্শ করবে তার শরীরের পোশাক ধৌত করতে হবে, গোসল করতে হবে এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত সে নাপাক থাকবে। সে যার উপর বসেছে এমন কোনো আসবাব পত্রকে স্পর্শ করলেও অনুরুপ তাকে গোসল ও তার পোশাক ধৌত করতে হবে। এমতাবস্থায় সে সন্ধ্যা পর্যন্ত নাপাক থাকবে। (লেভিটিকাস: ১৫/১৯-২৩)
এ কারণে মাঝে মাঝে নারীদেরকে কারো সাথে কোনো ধরনের আচার-আচরণ বা উঠাবসা করতে নিষেধ করা হত। তাদেরকে ঋতুবতী হলে উক্ত সময়টা কাটাতে 'নাপাক ভবন' এ পাঠিয়ে দেওয়া হত।⁹
ইয়াহুদী ধর্মশাস্ত্র ঋতুবতী মহিলাকে সে কাউকে স্পর্শ না করা সত্বেও হত্যাকারীনী হিসেবে গণ্য করে।
ইয়াহুদী পণ্ডিতের মতে, যদি কোনো ঋতুবতী মহিলা ঋতুর শুরুতে দুইজন পুরুষের মাঝ দিয়ে হেটে যায় তাহলে, তাদের একজন মারা যাবে। আর যদি ঋতুর শেষের দিকে হয় তাহলে, তাদের উভয়ের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি হবে।¹⁰
ঋতুবতী মহিলার স্বামীকেও ইয়াহুদীদের উপাসনালয়ে প্রবেশ করায় বাধা দেওয়া হত। কেননা তার স্ত্রী যে মাটির উপর চলাফেরা করেছে একই মাটির উপর চলাফেরা করার কারণে সেও নাপাক। যে ইয়াহূদী পণ্ডিতের স্ত্রী, কন্যা বা মাতা ঋতুবতী থাকে তাকে তাদের উপাসনালয়ে খুতবাহ দিতে দেওয়া হত না।¹¹
এ জন্য এখনও কিছু কিছু ইয়াহুদী মহিলা ঋতুকে "অভিশাপ" নামে আখ্যা দিয়ে থাকেন।¹²
কিন্তু ইসলাম কোনো ঋতুবতী মহিলাকে বলে না যে, সে তার আশেপাশের জিনিসকে নাপাক করে দেয়। তার ওপর অভিশাপ দেয় না। সালাত ও সাওমের মতো কয়েকটি ইবাদাত থেকে অব্যাহতি পাওয়া ব্যতীত সে সম্পূর্ণ সাধারণ জীবন যাপন করে।

**টিকাঃ**
⁹ Swidler, op. cit., p. 137.
¹⁰ bpes.111a
¹¹ Ibid., p. 138.
¹² Sally Priesand, Judaism and the New Woman (New York: Behrman House, Inc., 1975) p. 24.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00