📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 তুরস্কের মসজিদ

📄 তুরস্কের মসজিদ


আমরা এখন তুরস্কের মসজিদগুলো সম্পর্কে সাধারণ ধারণা লাভ করার উদ্দেশ্যে ইস্তাম্বুলের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ সম্পর্কে আলোচনা করব। এর নাম হচ্ছে, আয়াসুফিয়া জামে' মসজিদ। একমাত্র ইস্তাম্বুল শহরেই ৫শ মসজিদ রয়েছে। তুরস্কের প্রায় সকল মসজিদই উত্তম নকশা ও ডিজাইনের স্বাক্ষর। এদ্বারা তুর্কী প্রকৌশলের উন্নতমান প্রমাণিত হয়।
মুহাম্মাদ ফাতেহ খান ৮৫৭ হিঃ মোতাবেক, ১৪৫৩ খৃঃ ইস্তাম্বুল জয় করার পর এ মসজিদটি তৈরি করেন। একশ' প্রকৌশলীর তত্বাবধানে ১০ হাজার শ্রমিক দীর্ঘ ১৮ বছর কাজ করার পর মসজিদটি তৈরি হয়। তখনকার দিনে মসজিদের জন্য তুর্কী মুদ্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ হয়। মসজিদের দৈর্ঘ ২৭০ ফুট এবং প্রস্থ ২৪৫ ফুট।
মসজিদের রয়েছে অত্যন্ত সুন্দর গম্বুজ ও খুটি। গম্বুজের আয়তন ১১৫ বর্গফুট। মসজিদের মিনারার উচ্চতা হচ্ছে ১৮০ ফুট। মসজিদে ১৭০ টি স্তম্ভ বা খুঁটি আছে। এগুলোতে মার্বেল পাথরসহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতব পদার্থ লাগানো হয়েছে। মসজিদের ভেতর রয়েছে ঝাড় বাতি। মসজিদের বাঁদিকে রয়েছে, মহিলাদের নামাযের স্থান।
মসজিদের বিরাট ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। অভাবী লোকদেরকে সেই আয় থেকে খাবার দান করা হয়। মসজিদটি প্রথমে ছিল একটি গীর্জা। তারপর তা মুসলমানদের মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৪৫২ খৃঃ পর্যন্ত তা পুনরায় খৃষ্টানদের দখলে ছিল। ১৪৫২ থেকে তুর্কী শাসক মোস্তফা কামালের শাসন পর্যন্ত তা মুসলমানদের মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আতা তুর্ক মোস্তফা কামাল তুর্কী প্রজাতন্ত্র গঠনের সময় তুরস্কের সকল ইসলামী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। ফলে সে আয়াসুফিয়া জামে' মসজিদকে যাদুঘরে রূপান্তরিত করে। এখন পর্যন্তও সেই মসজিদটিকে খুলে দেয়া হয়নি। অথচ সেই মসজিদ থেকে তুরস্কে ইসলামের পয়গাম পৌঁছানো হয়েছিল।

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 মসজিদের ঐতিহাসিক ভূমিকার সার সংক্ষেপ

📄 মসজিদের ঐতিহাসিক ভূমিকার সার সংক্ষেপ


আমরা মুসলিম বিশ্বের ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ মসজিদগুলোর যে ভূমিকা ও অবদান আলোচনা করলাম তার সার-সংক্ষেপ হচ্ছে নিম্নরূপঃ
১. মসজিদ ইবাদাতের স্থান।
২. ওয়াজ-নসীহতের স্থান।
৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
৪. ভাল আচরণ শিক্ষা কেন্দ্র।
৫. নেতৃত্ব সৃষ্টির কেন্দ্র।
৬. ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির সূতিকাগার বা উৎস স্থান।
৭. ইসলামী শাসন ব্যবস্থার মৌলিক ও প্রাথমিক কেন্দ্র।
৮. সেনাবাহিনীর সমাবেশ ও যুদ্ধে রওনা হওয়ার স্থান।
১. নামাযের মাধ্যমে সর্বোত্তম সাম্য কেন্দ্র।
১০. বুদ্ধি বৃত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
১১. আদালত বা কোর্ট।
১২. বিদেশী দূত গ্রহণকেন্দ্র।
১৩. সামরিক নেতৃত্ব সৃষ্টির কেন্দ্র।
১৪. সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
১৫. সামাজিক নিরাপত্তা কেন্দ্র।
১৬. প্রেসিডেন্ট ভবন। এখান থেকে বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ ও সরকার প্রধানের নামে অফিসিয়াল চিঠি পাঠানো হত।
১৭. অহী লেখার কেন্দ্র।
১৮. সচিবালয়। এখান থেকে বিভিন্ন কর্মচারী নিয়োগ করা হত।
১৯. রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ঘোষণা কেন্দ্র।
২০. হাসপাতাল, বিশেষ করে সামরিক হাসপাতাল।
২১. ব্যক্তি ও সমাজ সংস্কার কেন্দ্র।
২২. দীনের দাওয়াত ও তাবলীগের কেন্দ্র।
২৩. দীনের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
২৪. মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার উৎস স্থান।
২৫. পারস্পরিক সহযোগিতার স্থান।
২৬. ইসলামের পুনর্জাগরণ কেন্দ্র।
২৭. পরামর্শ কেন্দ্র।
২৮. কল্যাণ কেন্দ্র- প্রতিদিন 'হাইয়া, আলাল ফালাহ' এই আওয়াযের মাধ্যমে কল্যাণের দিকে ছুটে আসার আহবান জানানো হয়।
২৯. বিজয়কেন্দ্র।
৩০. রাষ্ট্রীয় বায়তুলমাল বা কোষাগার।
৩১. দৈনিক মিটিং এর স্থান।
৩২. দীন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জিহাদের কেন্দ্র।
একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, প্রথম যুগের মসজিদগুলোতেই উপরোল্লিখিত ভূমিকা বাস্তবায়িত হয়েছে। সেগুলোই আমাদের অনুসরণযোগ্য। পক্ষান্তরে, পরবর্তী যুগের মসজিদগুলোর ভূমিকা ক্রমান্বয়ে দুর্বল ও সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। সেগুলো নামায, কুরআন পাঠ ও কিছু ওয়াজ-নসীহত ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা পালন করছে না।

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 মসজিদের ইমাম নির্ধারণ

📄 মসজিদের ইমাম নির্ধারণ


এখন আমরা একটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করব। সেটি হচ্ছে, মসজিদের ইমাম নির্ধারণ প্রসঙ্গ। কেননা, মসজিদের জন্য ইমাম অত্যাবশ্যক। ইমাম ছাড়া কোন মসজিদ চলতে পারে না। তিনি হলেন মসজিদের নেতা।
ইসলামী সমাজে মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকারী প্রশাসনযন্ত্রের লোকেরা ইসলাম সম্পর্কে ভাল জ্ঞান ও নেক আমলের অধিকারী হবেন। অন্যদের চাইতে তাদের ঈমান, ইসলাম, তাকওয়া ও এহসানের মানও হবে উন্নতমানের। সরকার প্রধান নিজে কিংবা তার প্রতিনিধিই মসজিদের ইমাম হবেন এবং নামাযসহ মসজিদের অন্যান্য সকল কাজের ইমামতি করবেন। তারা মুসল্লী সাধারণকে ইসলামের সঠিক পথে পরিচালনা করবেন। তাই তাদেরকে হতে হবে মডেল বা আদর্শ। তাদের চরিত্র, কথা ও কাজে কোন অসামঞ্জস্য থাকবে না এবং তারা হবেন সকল বিষয়ে আন্তরিক। অন্য কথায় ইমামত হচ্ছে নেতৃত্ব। মুসলমানের নেতৃত্ব এক ও একক। তাই যিনি রাষ্ট্রের নেতা, তিনি মসজিদেরও নেতা এবং তার প্রতিনিধিরা তারই নীতি অনুসরণ করেন বলে তাদের মাধ্যমে একই নেতৃত্ব বর্তমান থাকে। ইসলাম সমাজ, রাষ্ট্র ও মসজিদের নেতৃত্বকে একই জিনিস মনে করে। রসূলুল্লাহ (স) ছিলেন একাধারে আল্লাহর নবী ও মুসলমানদের নেতা। তিনি মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান হওয়ার কারণে মসজিদে নববীরও ইমাম ছিলেন। অন্য কাউকে ইমাম বানাননি। একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন হযরত আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলী (রা)। তাঁরা একদিকে ছিলেন খলীফা, আর অন্যদিকে ছিলেন মসজিদের ইমাম। মুসলমানের নেতার প্রধান মাপকাঠি সম্পর্কে কুরআন বলছে, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বাধিক সম্মানিত যিনি তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী।" তাকওয়া হল, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মানার নাম। যিনি সর্বাধিক আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মানেন তিনিই ইমামতি ও নেতৃত্বের যোগ্য। আর যাদের মধ্যে এ গুণের অভাব রয়েছে তারা নেতৃত্বের উপযুক্ত নয়।
কিন্তু যে মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট্রে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে কায়েম নেই এবং যেখানে ইসলামের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত নেই সে দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এবং তার প্রতিনিধিদের দ্বারা মুসলমানের সঠিক নেতৃত্ব আজাম পেতে পারে না। তারা স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মানবরচিত মতবাদে বিশ্বাসী হবে এবং ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবে। শুধু তাই নয় বরং ইসলাম সম্পর্কে তাদের ভ্রান্ত ও ভুল ধারণার শেষ নেই। তারা জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতা, ধর্মনিরপেক্ষতার কূপমণ্ডুকতা, সমাজতন্ত্র ও কম্যুনিজমের গোলক ধাঁধাঁ এবং পুজিবাদসহ অন্যান্য মানব রচিত মতবাদের মরিচিকার পেছনে দৌড়ে পেরেশান। ইসলাম সম্পর্কে তাদের চিন্তা-ভাবনা ও জানা-শুনার সুযোগ নেই। তাই মসজিদে তাদের ইমামত চলতে পারে না। ইমামতি তো দূরে থাক, তারা খুব কমই নামায পড়েন কিংবা মসজিদে যান। এমতাবস্থায় বিকল্প ইমাম ছাড়া কোন উপায় নেই। বর্তমান যুগের মুসলিম সমাজ ও মসজিদগুলোর বাস্তব চিত্র তাই। তাই সমাজের ইসলাম দরদী মুসলমানদেরকেই নিজেদের মধ্য থেকে ইমাম নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করতে হয়।
এবার আমরা ঐ বিকল্প ইমামের যোগ্যতা ও গুণাবলী সম্পর্কে আলোচনা করব।
মসজিদ তার ভূমিকা পালন ও যথার্থ অবদান রাখতে পারবে কিনা তা নির্ভর করে মসজিদের ইমামের ওপর। ইমাম যোগ্য ও দক্ষ হলে এবং বুদ্ধিমান ও বিজ্ঞ হলে মসজিদ তার মৌলিক ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে। পক্ষান্তরে ইমাম যদি দুর্বল, অদক্ষ, বেশী সহজ-সরল ও কম জ্ঞানের অধিকারী হয় এবং পর্যাপ্ত চালাক-চতুর না হয়, তাহলে মসজিদ ইবাদাতখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে এবং সে তার আসল ও মৌলিক পয়গাম পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে। যে পাড়া বা মহল্লায় মসজিদ আছে, কমপক্ষে সেই পাড়া বা মহল্লার সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তিকে ইমামতির যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তোলা দরকার। যদি আরো বেশী যোগ্যতাসম্পন্ন হয়, আরো ভাল। কিন্তু পাড়া বা মহল্লার লোকদের চাইতে সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি ইমাম না হলে তিনি তাদেরকে কিছু দিতে পারবেন না। দেয়ার ক্ষমতা না থাকলে দিবেন কিভাবে? অনুরূপভাবে, বড় মসজিদ বা কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমামকেও দেশের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী-গুণীদের অন্যতম হতে হবে।

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 বর্তমান যুগে মসজিদের কি ধরনের ভূমিকা পালন করা উচিত?

📄 বর্তমান যুগে মসজিদের কি ধরনের ভূমিকা পালন করা উচিত?


ব্যক্তি ও সমাজের প্রয়োজনেই মসজিদের সৃষ্টি। মুসলমানের ওপর রয়েছে দু' ধরনের অধিকার। ১টা হচ্ছে, আল্লাহর হক বা অধিকার। আর সেটি হচ্ছে তাঁর ইবাদাত করা ও নামায পড়াসহ অন্যান্য আদেশ-নিষেধ মানা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বান্দাহর হক। মানুষের অধিকার পূরণের জন্য রয়েছে মসজিদের বিরাট ভূমিকা। ব্যক্তি ও সমাজের জন্য মসজিদের রয়েছে বহুমুখী কাজ ও কর্মসূচী।
সমস্যা হচ্ছে, এ সকল ক্ষেত্রে মসজিদ আগে যে ভূমিকা পালন করত, বর্তমান যুগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা এবং সরকারী ও বেসরকারী বিভাগ সে সকল ভূমিকা পালন করছে। যেমন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, অফিস-আদালত, কোর্ট-কাচারী ইত্যাদি। প্রশ্ন হচ্ছে, মসজিদের বহু করণীয় অন্যান্য স্থান ও প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরিত হওয়ার ফলে মসজিদকে কি সেগুলো পুনরায় করতে হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, প্রয়োজনীয় কাজগুলো আঞ্জাম দেয়াই বড় কথা। এখন মসজিদের কাজ ও ভূমিকা যদি অন্য কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান পালন করে এবং সেটা মসজিদের মতই আকাঙ্খিত ও পবিত্র উপায়েই যথার্থভাবে করে, তাহলে ধরে নিতে হবে যে, সেটা মসজিদের কাজেরই সম্প্রসারণ।
তাই ঐ ক্ষেত্রে মসজিদকে এ ব্যাপারে কোন ভূমিকা পালন না করলেও চলে। কিন্তু যখন দেখা যাবে যে, ঐ সকল প্রতিষ্ঠান ঠিকমত ও নির্ভেজাল উপায়ে ঐ কাজ আঞ্জাম দিচ্ছে না, তখনই মসজিদকে পূর্বের আসল ভূমিকায় ফিরে যেতে হবে। তখন ধরে নিতে হবে যে, মসজিদের ভূমিকা অন্য জায়গায় সম্প্রসারিত হয়নি। তখন সে অবস্থার ক্ষতিপূরণ করতে হবে। এ ছাড়াও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো মসজিদের অবশিষ্ট যে ভূমিকা পালন করছে না, বর্তমান যুগের মসজিদকে অবশ্যই সেগুলো আঞ্জাম দিতে হবে। সর্বোপরি মসজিদ নূতন ও কল্যাণমূলক যে কোন কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে সমাজকে উন্নতি ও অগ্রগতির পথ দেখাতে পারে। মুসলিম সমাজে মসজিদের কোন বিকল্প প্রতিষ্ঠান নেই এবং এটি হচ্ছে মুসলিম সমাজের প্রাণ। তাই যে কোন মুসলিম সমাজকে মসজিদভিত্তিক সমাজে রূপান্তরের চেষ্টা সার্বজনীন ও চিরন্তন। এ চেষ্টা থেকে কোন মুসলমান দূরে থাকতে পারে না। সমাজের সকল স্থানে বঞ্চনা থাকলেও মসজিদ হবে আশা ভরসার সর্বশেষ কেন্দ্র, বঞ্চিত ও শোষিত মানুষের ভরসার স্থান। কেননা, এটি মানুষের কল্যাণ কেন্দ্র।
কোন মুসলিম সমাজে আল্লাহর দীন কায়েম না থাকলে সে সমাজে ইসলামের সকল দিক ও বিভাগের অনুপস্থিতির কারণে মসজিদকে তার আসল ও পূর্ণাঙ্গ ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা, এই মসজিদ থেকেই মসজিদের বাইরের অংশে আল্লাহর দীনের ঝাণ্ডা বুলন্দ করতে হবে। মসজিদে নববীসহ সকল মসজিদ যেমন করে দীন কায়েম করেছিল। এ ক্ষেত্রে মসজিদগুলো নিষ্ক্রিয় থাকলে গোটা সমাজ আল্লাহর দীনের রহমত থেকে বঞ্চিত থাকতে বাধ্য।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো যতই মসজিদের বিকল্প ভূমিকা পালন করুক না কেন, তারপরও মসজিদের বহু ভূমিকা অবশিষ্ট থেকেই যাবে। তাই সর্বকালে ও সর্বদেশে এবং সকল পরিস্থিতিতে অবস্থার বিচারে মসজিদকে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করতে হবে। এক কথায় কোন অবস্থাতেই মসজিদকে শুধুমাত্র ইবাদাত বা নামাযের জন্য সীমিত করা যাবে না। এর অসীম ও বহুমুখী ভূমিকাকে স্বীকার করতে হবে এবং একে সমাজ নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা যাবে না। অর্থাৎ যেখানে ইবাদাত ছাড়া সমাজের মানুষের আর কোন প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা থাকবে না, এমন হওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে, প্রতিটি দেশে রয়েছে অগণিত মসজিদ। স্বয়ং বাংলাদেশেই আছে আড়াই লাখের বেশী মসজিদ। মসজিদের জন্য নির্ধারিত এই বিরাট ভূখণ্ডকে ইবাদাত ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহার করা না হলে ইসলামের দৃষ্টিতে সেটা অবশ্যই ভূমির অসদ্ব্যবহার হবে। কিন্তু ইসলামে কোন অপচয় নেই। তাই মসজিদে বেশী বেশী তৎপরতা চালাতে হবে। মসজিদকে কিছুতেই খৃষ্টান, বৌদ্ধ ও হিন্দুদের উপাসনালয়ের মত সমাজ নিরপেক্ষ করে রাখা যাবে না। অমুসলিমরা পূজা ও উপাসনা ছাড়া তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে আর কোন দুনিয়াবী কাজ করে না। সেটা ইহুদী, খৃষ্টান ও হিন্দুদের সিনাগগ, গীর্জা, মন্দির ও প্যাগোডার জন্য মানানসই হলেও ইসলামের মসজিদের জন্য মানানসই নয়।
সমাজ সংশোধন ও সংস্কারের জন্য মসজিদ ভিত্তিক পরিবর্তন প্রচেষ্টা কাম্য। মসজিদ ভিত্তিক প্রচেষ্টা মসজিদের বাইরের প্রচেষ্টা থেকে অনেক বেশী কার্যকর ও সফল। যারা মসজিদ ভিত্তিক দাওয়াতী কাজ করেন, তারা আজও সেই সাফল্য নিজ চোখে দেখতে পারেন। অতীতের সকল ইসলামী দাওয়াত, তাবলীগ ও আন্দোলন মসজিদকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠেছে। তাই তাদের প্রতি জনগণের সাড়াও ছিল সর্বাধিক। যে কোন সংস্কার আন্দোলনকে গণমুখী করতে হলে গণ সংগঠন গড়ে তোলা দরকার। তাই যেখানে জনগণের আগমন সে জায়গা থেকেই গণমুখী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর তা হচ্ছে মসজিদ। যেই দাওয়াতী কাজের সাথে মসজিদের সম্পর্ক বেশী সেই দাওয়াতী কাজের শিকড় জনগণের গভীরে প্রোথিত এবং তা ঝড়-ঝাপটায় মূলোৎপাটিত হবে না। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বড় ইসলামী দাওয়াতী আন্দোলনগুলো মসজিদকেই ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে সাফল্য লাভ করেছে। পক্ষান্তরে, অফিস ভিত্তিক দাওয়াতী কাজ কম সফল ও ব্যয়বহুল। অসংখ্য অফিসের বিরাট আর্থিক বোঝা বহন করতে হয়। অথচ মসজিদ ভিত্তিক কাজে অর্থনৈতিক চাপ নেই। স্বল্প খরচে বেশী কাজ করা সম্ভব।
বর্তমান যুগে মসজিদ নিম্নোক্ত ভূমিকা পালন করতে পারে
১. কুরআন ও হাদীসের দারস চালু করা। যাতে করে মহল্লাবাসীরা সরাসরি কুরআন-হাদীসের সংস্পর্শে আসতে পারে। কুরআন-হাদীসের শিক্ষার আলোকে বর্তমান যুগের সমস্যাবলীর সমাধান পেশ করতে হবে। মোট কথা, সুন্দরভাবে কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা করতে হবে, যারা দীনী বা মাদ্রাসা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি এবং যারা শুধু দুনিয়াবী শিক্ষা গ্রহণ করেছে তারা যেন এর মাধ্যমে নিজেদের দীনী জ্ঞানের অভাব পূরণ করতে পারেন। সাথে ফিকহ সম্পর্কিত আলোচনাও করতে হবে যেন মানুষ প্রয়োজনীয় মাসলা-মাসায়েল শিখতে পারে। কেননা, মাসলা-মাসায়েল ছাড়া কোন ইবাদাতই সুষ্ঠুভাবে আদায় করা সম্ভব নয়। কুরআন ও হাদীসের দারস ধারাবাহিকভাবে বিশেষ কোন তাফসীর ও বিশুদ্ধ ছয় হাদীসগ্রন্থের যে কোন একটা হাদীসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে। এক তাফসীর ও হাদীস গ্রন্থ শেষ হলে, অন্য তাফসীর ও হাদীসগ্রন্থ শুরু করতে হবে। দারসের একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করতে হবে, যাতে বেশীর ভাগ লোক তাতে উপস্থিত থাকতে পারে। এ কথা সত্য যে, অজ্ঞতা ও ফাসেকীর অন্ধকার দীনী জ্ঞানের আলো ছাড়া দূর করা সম্ভব নয়। তাই জ্ঞান বিস্তারের ওপর সর্বাধিক জোর দিতে হবে। সময় বেশী নেয়া যাবে না। যেন মানুষ বিরক্ত না হয়।
২. কুরআন হেফজ করার ব্যবস্থা করতে হবে। পার্শ্বে ছাত্রদের থাকার জায়গার ব্যবস্থা করলে তারা মসজিদে বসে কুরআন মুখস্থ করতে পারবে। ফলে মসজিদকে হেফজখানা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। কোরআন হেফজ করা বিরাট সওয়াবের বিষয়।
৩. তাজবীদ শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। অধিকাংশ লোক কুরআন শুদ্ধ করে পড়তে পারে না। তাদেরকে উত্তম তাজবীদসহ বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষা দিতে হবে।
৪. কুরআন পড়া শিক্ষা দেয়া। যারা কুরআন পড়তে পারে না, তাদেরকে কুরআন শিক্ষা দেয়া যায়। পেশাব নিয়ন্ত্রণকারী শিশুদের জন্য মসজিদকেই ফোরকানিয়া মাদ্রাসা হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তবে মসজিদের পবিত্রতার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। একবার এক বেদুইন মসজিদে নববীতে পেশাব করে দেয়ায় রসূলুল্লাহ (স) এক বালতি পানি ঢেলে দেয়ার নির্দেশ দেন এবং বলেন, এতেই তা পবিত্র হয়ে যাবে। বয়স্ক লোকদের জন্যও মসজিদে কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. মসজিদকে বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। অশিক্ষা ও নিরক্ষরতা ইসলামে হারাম এবং জ্ঞান অর্জন করা ফরয। তাই ঐ হারাম থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য এবং জ্ঞান অর্জনের মত ফরয কাজ আঞ্জাম দেয়ার উদ্দেশ্যে বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র চালু করা দরকার। এতে সমাজ ও দেশের কল্যাণ হবে।
৬. ওয়াজ-নসীহত করা। মসজিদে নিয়মিত ওয়াজ-নসীহতের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ইমামসহ বাইরের বক্তা ও অন্য মসজিদের ইমাম দিয়ে কমপক্ষে সাপ্তাহিক নিয়মিত ওয়াজের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন ধর্মীয় দিবস যেমন, ঈদ, শবেকদর, আশুরা ও মে'রাজ উপলক্ষে বিশেষ আলোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে লোকদের ঈমান ও আমল মজবুত ও শক্তিশালী হতে থাকবে।
৭. মসজিদে দীনী ও অন্যান্য উপকারী জ্ঞানের বই রাখতে হবে এবং তাতে লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যারা মসজিদে বসেই বই পড়তে চায় তারা মসজিদেই পড়বে। আর যারা বই ঘরে ধার নিতে চায় তাদেরকে লাইব্রেরীর দায়িত্বশীল বই ধার দেবেন ও রেজিস্ট্রারে নাম ও বিলির তারিখ উল্লেখ করে পরে তা নির্দিষ্ট তরিখে উশুল করতে হবে। লাইব্রেরীর বই যেন না হারায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এ জন্য মসজিদে একটি আলমারী কিংবা তালাযুক্ত সেল্ফ থাকতে পারে। এটা পরিষ্কার যে, লাইব্রেরী হচ্ছে জ্ঞান বিতরণের সর্বশ্রেষ্ঠ কেন্দ্র। একই উদ্দেশ্যে ইসলামের দৃষ্টিতে তৈরি অডিও-ভিডিও ক্যাসেট লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।
৮. মসজিদে সাংস্কৃতিক তৎপরতা চালানো যায়। ইসলামী গান ও কবিতা আবৃত্তি, ইসলামী নাটক ও ফিল্ম প্রদর্শন এবং বিভিন্ন ইসলামী বিষয়ে জ্ঞান প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ ইত্যাদি।
৯. বিনোদনমূলক প্রোগ্রাম করা যায়। যেমন সামষ্টিক নাস্তা বা খাবার গ্রহণ কিংবা মসজিদের মহল্লার লোকদেরকে নিয়ে বাইরে কোথাও ভ্রমণ কিংবা পর্যটনে যাওয়া ইত্যাদি।
১০. মহল্লার মুসল্লীদের বাড়ীতে সামষ্টিক সাক্ষাত ও বেড়ানোর প্রোগ্রাম রাখা যায়। সেখানে হালকা চা-নাস্তারও ব্যবস্থা থাকতে পারে।
১১. মসজিদের মহল্লার অসচ্ছল মুসল্লীদেরকে আর্থিক সাহায্য দেয়ার ব্যবস্থা করা। তাদেরকে সাধারণ দান, যাকাত ও সাদকা দান এবং আর্থিক সমস্যা কাটিয়ে উঠার জন্য ভাল পরামর্শ ও উত্তম সহযোগিতা করা দরকার। মসজিদ কমিটিকে চাঁদা ও দান সংগ্রহ এবং যাকাত ও সাদকাহ সংগ্রহ করে তা বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। হাদীসে রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, “তুমি যদি নিজে পেটপুরে খাও আর তোমার প্রতিবেশী উপোষ থাকে, তাহলে, তুমি মুসলমান নও।” নিজেদেরকে সত্যিকার মুসলমান বানানোর উদ্দেশ্যে এ সকল সমাজকল্যাণ মূলক কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে।
১২. মসজিদে দাতব্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। মহল্লার লোকদের ছোট-খাট রোগ-শোকের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সে জন্য এলোপ্যাথিক কোন ডাক্তারকে সপ্তাহের বিশেষ দিনে, যেমন শুক্রবারে মসজিদে বসানো যেতে পারে। এ ছাড়াও হোমিও, হেকিমী কিংবা আকুপাংচারসহ বিভিন্ন চিকিৎসাবিদকে সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য মসজিদে বসানো যায়। অবশ্য বড় ধরনের রোগ-शোক হলে রোগীকে হাসপাতালে পাঠাতে হবে।
১৩. নামাযের সময় মসজিদের মহল্লায় সকল দোকান পাট বন্ধ রাখা এবং সবাইকে নামাযে আসার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া দরকার। দোকানপাট ও বাজার খোলা থাকলে দোকানদার স্বয়ং নিজে নামাযের জন্য মসজিদে আসতে পারে না। এবং খরিদ্দারও একই কারণে আটকে পড়ে। দুর্বল ঈমানদারদেরকে রক্ষার জন্য উত্তম পরিবেশ সৃষ্টি করা খুবই জরুরী।
১৪. মসজিদ তহবিল গঠন করা। টাকা হলে বহু কাজ করা যায়। অবশ্য টাকা ছাড়াও অনেক কাজ করা যায়। কিন্তু টাকা কাজের জন্য সহায়ক। তাই মহল্লাবাসী, মুসল্লী কিংবা ধনীদের কাছ থেকে সাধারণ চাঁদা কিংবা বিশেষভাবে এককালীন চাঁদা সংগ্রহ করে মসজিদের তহবিল সৃষ্টি করতে হবে। সেই তহবিল থেকে সমাজকল্যাণমূলক কাজসহ মসজিদের অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করা হবে।
১৫. মসজিদ কমিটি গঠন করতে হবে এবং মুসল্লীদের ভোটে সৎ লোকদেরকে কমিটির সদস্য নির্বাচন করতে হবে। কমিটি যাবতীয় কাজ আঞ্জাম দেবে। পৃথকভাবে, মহিলা ও যুবকদের সাব-কমিটি করে তাদের বিভাগীয় কাজ পরিচালনা করা উত্তম।
১৬. চাকুরীসহ বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে মসজিদের ইমাম সাহেবের চারিত্রিক সার্টিফিকেট গ্রহণ করা উচিত। কেননা, তিনি মহল্লার লোককে ভালোভাবে জানেন এবং সততার সাথে সাক্ষ্য দেবেন।
১৭. মসজিদে নারীদের নামায, শিক্ষা, পেশা, চিকিৎসা ও সাহায্যের বিশেষ ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোন নারী মসজিদে নামায পড়তে চাইলে কিংবা ওয়াজ-নসীহত শুনতে চাইলে অথবা দীনী জ্ঞান হাসিল করতে চাইলে সে ব্যবস্থাও রাখতে হবে। তাদের জন্য দোতলা মসজিদের উপরতলা কিংবা একতলা মসজিদের এক পার্শ্বে পর্দা দিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে হবে। নারীরা নারীদেরকে শিক্ষা দেবেন কিংবা মাইক থাকলে নারীরা পুরুষের কণ্ঠেও শিখতে পারেন। মসজিদে নারীদের সেলাই শিক্ষাসহ বিভিন্ন গার্হস্থ্য বিষয়ে শিক্ষা দেয়া যায়।
১৮. মহল্লার কোন গরীব পরিবারের ছেলে-মেয়েদের বিয়ে না হলে, বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এ ব্যাপারে আর্থিক সাহায্যসহ সর্বাত্মক সাহায্য ও পরামর্শ দিতে হবে।
১৯. মহল্লার সকল নেক কাজে সহযোগিতা এবং খারাপ কাজে অসহযোগিতা করতে হবে। কেননা, আল্লাহ কুরআনে বলেছেন :
تَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
"তোমরা নেক ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা কর এবং গুনাহ ও অন্যায় কাজে সহযোগিতা করো না।"
২০. নিজ নিজ এলাকায় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের প্রতিরোধ করতে হবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন:
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ
"তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে।” তাই কোন মুসল্লী ও মু'মিন চুপচাপ থাকতে পারে না। তাকে সৎ কাজের আদেশ দিতে হবে এবং খারাপ ও গুনাহর কাজে বাধা সৃষ্টি করতে হবে ও প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এর ফলে মহল্লার লোকের পক্ষে চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই, মাস্তানী, মদপান, বেশ্যাবৃত্তি, মাতলামী, জুয়া, যুলুম-নির্যাতন, উলঙ্গপনা ও খারাপ আচরণের সুযোগ পাবে না। বরং গোটা এলাকার লোক পুরো শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে সুখে জীবন যাপন করতে পারবে। প্রথমে বিভ্রান্ত যুবকদেরকে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও সংশোধন না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাসহ সামাজিক বয়কট করতে হবে কিংবা মহল্লা থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। অসৎ কাজের প্রতিরোধ প্রসঙ্গে হাদীসে রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন : مَنْ رَأَى مِنْكُمُ الْمُنْكَرَ فَلْيُغَيِّرَهُ بِيَدِهِ وَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ وَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيْمَانِ -
* তোমাদের মধ্যে কেউ যদি মন্দ ও অন্যায় কাজ দেখে, সে যেন হাত দিয়ে শক্তি প্রয়োগ করে তার মোকাবেলা করে। যদি তা না পারে তাহলে মুখ দিয়ে এর বিরোধিতা করবে ও জনমত সৃষ্টি করবে এবং সেটাও না পারলে (যেমন কম্যুনিষ্ট বা স্বৈরাচারী শাসনে) অন্তর দিয়ে ঘৃণা করবে। তবে অন্তরের ঘৃণা সবচাইতে দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।” এ হাদীসে প্রতিরোধের পদ্ধতি বাতলানো হয়েছে। তাই প্রতিরোধ না করে চুপচাপ বসে থাকলে এবং নিজেকে নিয়ে নিজে সীমাবদ্ধ থাকলে মুসলমান হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
২১. মসজিদের খালি জায়গায় ফলমূল ও শাক-সব্জি লাগানো দরকার। ইমাম ও মুয়াযযিন তা ব্যবহার করতে পারেন কিংবা তা মসজিদের আয়ের জন্য করা যায়। অনুরূপভাবে কবুতর পালন, মধুর চাষ ও পানির হাউজে তেলাপিয়া সহ বিভিন্ন মাছের চাষ করে মসজিদের আয় বাড়ানো যেতে পারে। ইমাম সাহেবকে এ সব কাজসহ প্রাথমিক চিকিৎসার ট্রেনিং দেয়া যেতে পারে।
২২.. খোতবা হচ্ছে দীনের দাওয়াত ও তাবলীগ এবং জিহাদের বিরাট হাতিয়ার। তাই এর উপযুক্ত সদ্ব্যবহারের জন্য জাতীয় ভিত্তিক কোন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সমন্বিত খোতবার মাধ্যমে একই দিন দেশব্যাপী সর্বাধিক সংখ্যক লোকের কাছে বিশেষ বিশেষ বিষয়ে পরিকল্পিত দাওয়াত পৌঁছানো যায় ও বিভিন্ন বিষয়ে তাদেরকে ইসলামী জ্ঞান দেয়া যায়। তাই খোতবার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বার্ষিক একটি জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করে প্রতিমাসে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা যায়। স্মরণ রাখা দরকার যে, খোতবাহ যেন চর্বিতচর্বণ না হয় এবং একই বিষয়ে আলোচনার পুনরাবৃত্তি না করা হয়। খোতবাহ হবে সৃজনশীল ও প্রতিভাধর্মী সৃষ্টি। বই দেখে দেখে খোতবা পড়লে উক্ত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। ইমাম ও মুসল্লীর মাতৃভাষায় খোতবা হলেই কেবলমাত্র সবাই উপকৃত হতে পারবে।
জুময়ার খোতবায় এলাকা ও দেশের-দশের সমস্যার কথা আলোচনা করে ইসলামের দৃষ্টিতে সেগুলোর সমাধান পেশ করতে হবে। বিশেষ করে দীনী সমস্যাগুলোর সমাধানের প্রাধান্য দিতে হবে। এ ছাড়াও স্থানীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মুসলিম সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা জরুরী। খোতবা হচ্ছে বক্তৃতা ও উপদেশ। তাই প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহে পরামর্শ দিতে হবে।
সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহর দীন কায়েমের প্রয়োজনীয়তা এবং ইসলামী আইন-কানুন কায়েমের জন্য সরকারসহ জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে এবং মুসলমানরা যে অন্য কোন মানব রচিত মতবাদ ও মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না তা বুঝিয়ে বলতে হবে। কেননা, আল্লাহর কাছে ইসলাম ছাড়া আর কোন মতাদর্শ গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন:
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ -
"আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত দীন বা জীবন ব্যবস্থা হচ্ছে, ইসলাম।” এ বিষয়টি লোকেরা জানে না বলেই তারা ভুলের মধ্যে আছে। তাদের ভুল ভাঙ্গাতে হবে।”
২৩. প্রত্যেক বছর মসজিদের ভূমিকা ও পয়গাম পুনরুজ্জীবনের জন্য মসজিদ সপ্তাহ পালন করা যেতে পারে। সে উপলক্ষে ইসলামে মসজিদের ভূমিকা সম্পর্কে সকল মসজিদে ব্যাপক আলোচনা করা উচিত। এর মাধ্যমে দেশব্যাপী মসজিদগুলো সচল ও গতিশীল হয়ে উঠবে।
মসজিদকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য প্রত্যেক বছর মসজিদ সপ্তাহে বিভিন্ন কর্মসূচী নেয়া যায়। তাতে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, ক্লাব ও স্থানীয় মহল্লা ও পাড়ার ছাত্ররাসহ মুসল্লীরা অংশ গ্রহণ করবে। ফলে, 'পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক' এ হাদীসের স্বার্থক বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
২৪. মসজিদের বিভিন্ন তৎপরতা ও আলোচনার মাধ্যমে মুসল্লীদেরকে ধারণা দিতে হবে যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। তাই মসজিদে ইসলামের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা করে মুসল্লীদেরকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান দান করতে হবে। কেননা, ইসলামের এই পবিত্র স্থানে এসেও যদি তারা ইসলাম সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা না নিতে পারে, তাহলে তারা কোথা থেকে এই জ্ঞান লাভ করবে? তাদেরকে এথেকে বঞ্চিত রাখা যুলুম হবে।
২৫. মসজিদকে দলীয়করণ করা উচিত নয়। বরং তাতে সকল দলের লোকদেরকে জড়িত করা জরুরী। নচেৎ মসজিদের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। কেননা, মসজিদ হচ্ছে, মুসলমানের ঐক্য ও সংহতির কেন্দ্র। এখানে দলাদলির সুযোগ নেই। ইসলামে বিশ্বাসী সকল দলের লোকদেরকে নিয়ে সকল তৎপরতা পরিচালনা করা দরকার। দল বিশেষের নামে তৎপরতা চালালে দ্বন্দ্ব ও কোন্দল দেখা দেবে। তাই দলীয় ভিত্তিতে নয়, সামষ্টিক ও সামগ্রিক ভিত্তিতে সবাইকে নিয়ে মসজিদ কমিটি ও সাব-কমিটি গঠন করে সকল তৎপরতায় সবার অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করলে সবাই একই দলের অনুসারী হয়ে পড়বে। আর সে দলটি হচ্ছে কুরআন ও হাদীসের অনুসারী দল। আল্লাহ বলেছেন: “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে মজবুত করে আঁকড়ে ধর এবং বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত হয়ে যেয়ো না।” (আল-কোরআন)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00