📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 ইরানের মসজিদ

📄 ইরানের মসজিদ


ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে লিখেছেন, ১ শিরাজ শহরে এক বিরাট ও প্রশস্ত মসজিদ আছে। এর নাম হচ্ছে, মসজিদে আতীক। মসজিদের আঙ্গিনা বিরাট। বিল্ডিংটি অত্যন্ত সুন্দর। দেয়ালে মারবেল পাথর লাগানো হয়েছে। শহরের নেক ও আলেমগণ তাতে একত্রিত হন এবং মসজিদে জামায়াত সহকারে নামায আদায় করেন।
মসজিদে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবারে ওয়ায করা হয়। এ মসজিদে মহিলা মুসল্লীর সংখ্যা অত্যধিক। শহরের স্ত্রীলোকেরা নেক্কার ও ভাল চরিত্রের অধিকারিনী। প্রায় ২ হাযার মহিলা নামাযের জন্য মসজিদে আসেন। ইবনে বতুতা আরো লিখেছেন, তিনি মহিলাদের এত বড় সমাবেশ আর কোন মসজিদে দেখেননি।
ইবনে বতুতা শিরাজ শহরের আরেক মসজিদের কথা উল্লেখ করেছেন। ২ মসজিদটি দেখতে খুবই সুন্দর। তাতে বহু কুরআন শরীফ রাখা হয়েছে। তিনি মসজিদের এক কোণে একজন বৃদ্ধ লোককে গভীর মনোযোগ সহকারে কুরআন পড়া অবস্থায় দেখতে পান। তিনি তাঁকে গিয়ে সালাম করেন এবং আলাপ করেন। বৃদ্ধ লোকটি বলেন, "আমি নিজেই মসজিদটি তৈরি করেছি এবং এর জন্য বহু সম্পত্তি ওয়াক্‌ফ করেছি। এর আয় দিয়ে মসজিদের ব্যয় নির্বাহ করা হয়। আমি আমার জন্য তৈরি কবরের ওপর বসা। এর ওপর কাঠ দিয়ে তাতে বসার ব্যবস্থা করেছি। বিছানা ও কাঠ উঠিয়ে তিনি নিজ কবর তাঁকে দেখান এবং বলেন, এ শহরে আমার মৃত্যু হলে, এখানেই আমাকে দাফন করা হবে। নিকটে একটি বাক্সে কাফনের কাপড় ও কিছু অর্থ রাখা আছে, যেন আমার মৃত্যুর পর হঠাৎ করে দাফনের বিষয়ে কোন সংকট সৃষ্টি না হয়।"
ইবনে বতুতা তাবরীজের ঐতিহাসিক মসজিদের কথাও উল্লেখ করেছেন। ইরানে আরো বহু মসজিদ আছে। কিন্তু আমরা দু'একটি মসজিদ সম্পর্কে আলোচনা করে ইরানের অন্যান্য মসজিদ সম্পর্কে একটি ধারণালাভের চেষ্টা করেছি। অন্যান্য মসজিদগুলোতেও বিভিন্ন রকম কর্মতৎপরতা পরিলক্ষিত হয়। এলেম চর্চাসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তৎপরতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

টিকাঃ
১. রেহলাহ ইবনে বতুতা - ১ম খণ্ড, ১৫১ পৃঃ।
২. ঐ

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 তুরস্কের মসজিদ

📄 তুরস্কের মসজিদ


আমরা এখন তুরস্কের মসজিদগুলো সম্পর্কে সাধারণ ধারণা লাভ করার উদ্দেশ্যে ইস্তাম্বুলের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ সম্পর্কে আলোচনা করব। এর নাম হচ্ছে, আয়াসুফিয়া জামে' মসজিদ। একমাত্র ইস্তাম্বুল শহরেই ৫শ মসজিদ রয়েছে। তুরস্কের প্রায় সকল মসজিদই উত্তম নকশা ও ডিজাইনের স্বাক্ষর। এদ্বারা তুর্কী প্রকৌশলের উন্নতমান প্রমাণিত হয়।
মুহাম্মাদ ফাতেহ খান ৮৫৭ হিঃ মোতাবেক, ১৪৫৩ খৃঃ ইস্তাম্বুল জয় করার পর এ মসজিদটি তৈরি করেন। একশ' প্রকৌশলীর তত্বাবধানে ১০ হাজার শ্রমিক দীর্ঘ ১৮ বছর কাজ করার পর মসজিদটি তৈরি হয়। তখনকার দিনে মসজিদের জন্য তুর্কী মুদ্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ হয়। মসজিদের দৈর্ঘ ২৭০ ফুট এবং প্রস্থ ২৪৫ ফুট।
মসজিদের রয়েছে অত্যন্ত সুন্দর গম্বুজ ও খুটি। গম্বুজের আয়তন ১১৫ বর্গফুট। মসজিদের মিনারার উচ্চতা হচ্ছে ১৮০ ফুট। মসজিদে ১৭০ টি স্তম্ভ বা খুঁটি আছে। এগুলোতে মার্বেল পাথরসহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতব পদার্থ লাগানো হয়েছে। মসজিদের ভেতর রয়েছে ঝাড় বাতি। মসজিদের বাঁদিকে রয়েছে, মহিলাদের নামাযের স্থান।
মসজিদের বিরাট ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। অভাবী লোকদেরকে সেই আয় থেকে খাবার দান করা হয়। মসজিদটি প্রথমে ছিল একটি গীর্জা। তারপর তা মুসলমানদের মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৪৫২ খৃঃ পর্যন্ত তা পুনরায় খৃষ্টানদের দখলে ছিল। ১৪৫২ থেকে তুর্কী শাসক মোস্তফা কামালের শাসন পর্যন্ত তা মুসলমানদের মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আতা তুর্ক মোস্তফা কামাল তুর্কী প্রজাতন্ত্র গঠনের সময় তুরস্কের সকল ইসলামী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। ফলে সে আয়াসুফিয়া জামে' মসজিদকে যাদুঘরে রূপান্তরিত করে। এখন পর্যন্তও সেই মসজিদটিকে খুলে দেয়া হয়নি। অথচ সেই মসজিদ থেকে তুরস্কে ইসলামের পয়গাম পৌঁছানো হয়েছিল।

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 মসজিদের ঐতিহাসিক ভূমিকার সার সংক্ষেপ

📄 মসজিদের ঐতিহাসিক ভূমিকার সার সংক্ষেপ


আমরা মুসলিম বিশ্বের ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ মসজিদগুলোর যে ভূমিকা ও অবদান আলোচনা করলাম তার সার-সংক্ষেপ হচ্ছে নিম্নরূপঃ
১. মসজিদ ইবাদাতের স্থান।
২. ওয়াজ-নসীহতের স্থান।
৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
৪. ভাল আচরণ শিক্ষা কেন্দ্র।
৫. নেতৃত্ব সৃষ্টির কেন্দ্র।
৬. ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির সূতিকাগার বা উৎস স্থান।
৭. ইসলামী শাসন ব্যবস্থার মৌলিক ও প্রাথমিক কেন্দ্র।
৮. সেনাবাহিনীর সমাবেশ ও যুদ্ধে রওনা হওয়ার স্থান।
১. নামাযের মাধ্যমে সর্বোত্তম সাম্য কেন্দ্র।
১০. বুদ্ধি বৃত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
১১. আদালত বা কোর্ট।
১২. বিদেশী দূত গ্রহণকেন্দ্র।
১৩. সামরিক নেতৃত্ব সৃষ্টির কেন্দ্র।
১৪. সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
১৫. সামাজিক নিরাপত্তা কেন্দ্র।
১৬. প্রেসিডেন্ট ভবন। এখান থেকে বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ ও সরকার প্রধানের নামে অফিসিয়াল চিঠি পাঠানো হত।
১৭. অহী লেখার কেন্দ্র।
১৮. সচিবালয়। এখান থেকে বিভিন্ন কর্মচারী নিয়োগ করা হত।
১৯. রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ঘোষণা কেন্দ্র।
২০. হাসপাতাল, বিশেষ করে সামরিক হাসপাতাল।
২১. ব্যক্তি ও সমাজ সংস্কার কেন্দ্র।
২২. দীনের দাওয়াত ও তাবলীগের কেন্দ্র।
২৩. দীনের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
২৪. মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার উৎস স্থান।
২৫. পারস্পরিক সহযোগিতার স্থান।
২৬. ইসলামের পুনর্জাগরণ কেন্দ্র।
২৭. পরামর্শ কেন্দ্র।
২৮. কল্যাণ কেন্দ্র- প্রতিদিন 'হাইয়া, আলাল ফালাহ' এই আওয়াযের মাধ্যমে কল্যাণের দিকে ছুটে আসার আহবান জানানো হয়।
২৯. বিজয়কেন্দ্র।
৩০. রাষ্ট্রীয় বায়তুলমাল বা কোষাগার।
৩১. দৈনিক মিটিং এর স্থান।
৩২. দীন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জিহাদের কেন্দ্র।
একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, প্রথম যুগের মসজিদগুলোতেই উপরোল্লিখিত ভূমিকা বাস্তবায়িত হয়েছে। সেগুলোই আমাদের অনুসরণযোগ্য। পক্ষান্তরে, পরবর্তী যুগের মসজিদগুলোর ভূমিকা ক্রমান্বয়ে দুর্বল ও সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। সেগুলো নামায, কুরআন পাঠ ও কিছু ওয়াজ-নসীহত ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা পালন করছে না।

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 মসজিদের ইমাম নির্ধারণ

📄 মসজিদের ইমাম নির্ধারণ


এখন আমরা একটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করব। সেটি হচ্ছে, মসজিদের ইমাম নির্ধারণ প্রসঙ্গ। কেননা, মসজিদের জন্য ইমাম অত্যাবশ্যক। ইমাম ছাড়া কোন মসজিদ চলতে পারে না। তিনি হলেন মসজিদের নেতা।
ইসলামী সমাজে মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকারী প্রশাসনযন্ত্রের লোকেরা ইসলাম সম্পর্কে ভাল জ্ঞান ও নেক আমলের অধিকারী হবেন। অন্যদের চাইতে তাদের ঈমান, ইসলাম, তাকওয়া ও এহসানের মানও হবে উন্নতমানের। সরকার প্রধান নিজে কিংবা তার প্রতিনিধিই মসজিদের ইমাম হবেন এবং নামাযসহ মসজিদের অন্যান্য সকল কাজের ইমামতি করবেন। তারা মুসল্লী সাধারণকে ইসলামের সঠিক পথে পরিচালনা করবেন। তাই তাদেরকে হতে হবে মডেল বা আদর্শ। তাদের চরিত্র, কথা ও কাজে কোন অসামঞ্জস্য থাকবে না এবং তারা হবেন সকল বিষয়ে আন্তরিক। অন্য কথায় ইমামত হচ্ছে নেতৃত্ব। মুসলমানের নেতৃত্ব এক ও একক। তাই যিনি রাষ্ট্রের নেতা, তিনি মসজিদেরও নেতা এবং তার প্রতিনিধিরা তারই নীতি অনুসরণ করেন বলে তাদের মাধ্যমে একই নেতৃত্ব বর্তমান থাকে। ইসলাম সমাজ, রাষ্ট্র ও মসজিদের নেতৃত্বকে একই জিনিস মনে করে। রসূলুল্লাহ (স) ছিলেন একাধারে আল্লাহর নবী ও মুসলমানদের নেতা। তিনি মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান হওয়ার কারণে মসজিদে নববীরও ইমাম ছিলেন। অন্য কাউকে ইমাম বানাননি। একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন হযরত আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলী (রা)। তাঁরা একদিকে ছিলেন খলীফা, আর অন্যদিকে ছিলেন মসজিদের ইমাম। মুসলমানের নেতার প্রধান মাপকাঠি সম্পর্কে কুরআন বলছে, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বাধিক সম্মানিত যিনি তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী।" তাকওয়া হল, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মানার নাম। যিনি সর্বাধিক আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মানেন তিনিই ইমামতি ও নেতৃত্বের যোগ্য। আর যাদের মধ্যে এ গুণের অভাব রয়েছে তারা নেতৃত্বের উপযুক্ত নয়।
কিন্তু যে মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট্রে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে কায়েম নেই এবং যেখানে ইসলামের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত নেই সে দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এবং তার প্রতিনিধিদের দ্বারা মুসলমানের সঠিক নেতৃত্ব আজাম পেতে পারে না। তারা স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মানবরচিত মতবাদে বিশ্বাসী হবে এবং ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবে। শুধু তাই নয় বরং ইসলাম সম্পর্কে তাদের ভ্রান্ত ও ভুল ধারণার শেষ নেই। তারা জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতা, ধর্মনিরপেক্ষতার কূপমণ্ডুকতা, সমাজতন্ত্র ও কম্যুনিজমের গোলক ধাঁধাঁ এবং পুজিবাদসহ অন্যান্য মানব রচিত মতবাদের মরিচিকার পেছনে দৌড়ে পেরেশান। ইসলাম সম্পর্কে তাদের চিন্তা-ভাবনা ও জানা-শুনার সুযোগ নেই। তাই মসজিদে তাদের ইমামত চলতে পারে না। ইমামতি তো দূরে থাক, তারা খুব কমই নামায পড়েন কিংবা মসজিদে যান। এমতাবস্থায় বিকল্প ইমাম ছাড়া কোন উপায় নেই। বর্তমান যুগের মুসলিম সমাজ ও মসজিদগুলোর বাস্তব চিত্র তাই। তাই সমাজের ইসলাম দরদী মুসলমানদেরকেই নিজেদের মধ্য থেকে ইমাম নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করতে হয়।
এবার আমরা ঐ বিকল্প ইমামের যোগ্যতা ও গুণাবলী সম্পর্কে আলোচনা করব।
মসজিদ তার ভূমিকা পালন ও যথার্থ অবদান রাখতে পারবে কিনা তা নির্ভর করে মসজিদের ইমামের ওপর। ইমাম যোগ্য ও দক্ষ হলে এবং বুদ্ধিমান ও বিজ্ঞ হলে মসজিদ তার মৌলিক ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে। পক্ষান্তরে ইমাম যদি দুর্বল, অদক্ষ, বেশী সহজ-সরল ও কম জ্ঞানের অধিকারী হয় এবং পর্যাপ্ত চালাক-চতুর না হয়, তাহলে মসজিদ ইবাদাতখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে এবং সে তার আসল ও মৌলিক পয়গাম পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে। যে পাড়া বা মহল্লায় মসজিদ আছে, কমপক্ষে সেই পাড়া বা মহল্লার সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তিকে ইমামতির যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তোলা দরকার। যদি আরো বেশী যোগ্যতাসম্পন্ন হয়, আরো ভাল। কিন্তু পাড়া বা মহল্লার লোকদের চাইতে সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি ইমাম না হলে তিনি তাদেরকে কিছু দিতে পারবেন না। দেয়ার ক্ষমতা না থাকলে দিবেন কিভাবে? অনুরূপভাবে, বড় মসজিদ বা কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমামকেও দেশের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী-গুণীদের অন্যতম হতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00