📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 জামে' কর্ডোভা

📄 জামে' কর্ডোভা


উমাইয়া খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেকের সেনাপতি মূসা বিন নাসীর হিজরী ৯২ সালে তারেক বিন যিয়াদের ওপর স্পেন বিজয়ের দায়িত্ব অর্পণ করেন। ইতিপূর্বে উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চল মুসলমানদের হাতে এসে যায়। তখনই তারেকের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীকে স্পেন বিজয়ের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। তারেকের হাতে স্পেন বিজিত হওয়ার পর তা দীর্ঘ ৮শ বছর যাবত مسلمانوں শাসনাধীন থাকে। ১৭০ হিজরী সাল মোতাবেক ৭৮০ খৃঃ স্পেনের উমাইয়া শাসক আবদুর রহমান আদ-দাখেল কর্ডোভায় 'জামে' কর্ডোভা' বা কর্ডোভা মসজিদ তৈরি করেন। এর দৈর্ঘ ৭৫ মিটার এবং প্রস্থ ৬৫ মিটার। তিনি এটাকে দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের মত করে তৈরি করেন। মসজিদটিকে সম্প্রসারিত করার পর এর সৌন্দর্য অনেক গুণ বেড়ে যায়। কোন কোন ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতত্ত্ববিদ এটাকে মধ্যযুগের সবচেয়ে সুন্দর ও উৎকৃষ্ট বিল্ডিং বলে মন্তব্য করেছেন।
মনসুর বিন মুহাম্মাদ বিন আবি আ'মের মসজিদের সম্প্রসারণ করেন। তিনি তামার পাত দ্বারা মোড়ানো ২১ টা দরজা তৈরি করেন। এতে মহিলাদের জন্যও একটা কক্ষ ছিল। মসজিদে মারবেল পাথর লাগানো মোট ১২শ ৩৯টি খুঁটি আছে। মেহরাবের অংশের মোজাইক দেয়ালের ওপর সোনার প্রলেপ দেয়া হয়েছে। পরে মসজিদের প্রস্থ দাঁড়ায় ১২৫ মিটার এবং দৈর্ঘ ১৮০ মিটার। ফলে, মোট আয়তন দাঁড়ায় ২২ হাজার ৫শ বর্গ মিটার। আজও এ আয়তন বহাল আছে। এটি বিশ্বের বড় মসজিদসমূহের একটি, তাতে সন্দেহ নেই।
কেউ কেউ বলেছেন, কর্ডোভার জামে' মসজিদ স্থাপত্য শিল্পের ক্ষেত্রে مسلمانوں নজীরহীন এক উপহার। স্পেনে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের দীর্ঘদিন পর কর্ডোভা জামে' মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৪৯২ খৃঃ আবু আবদুল্লাহ সগীর স্পেনের ইসাবেলা ও ফারনান্দোর কাছে পরাজিত হওয়ার পর স্পেন مسلمانوں হাতছাড়া হয়। সেখানে যদি মুসলিম শাসন অব্যাহত থাকত তাহলে আজ পর্যন্ত গোটা ইউরোপ ইসলামের পতাকাতলে এসে যেত। কিন্তু স্পেনে মুসলিমদের মধ্যকার বিরোধ এবং পূর্ব আরব অঞ্চলে উমাইয়াদের সাথে আব্বাসীয়দের সংঘর্ষের ফলে শেষ পর্যন্ত মুসলমানরা দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তারই অনিবার্য পরিণতি হিসেবে স্পেন مسلمانوں হাতছাড়া হয়।
কর্ডোভার জামে' মসজিদ থেকে ইউরোপে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে। এতে সকল বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হত। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্ররা পড়ার উদ্দেশ্যে সেখানে ছুটে আসত। এতে ৩৯০-৩৯৪ হিঃ, পোপ ২য় সলভেস্টারও লেখা-পড়া করেন। তিনি চিকিৎসা ও অংকশাস্ত্র পড়ার উদ্দেশ্যে গোটা স্পেন ঘুরে বেড়ান এবং শেষ পর্যন্ত এ মসজিদে তিনি যে পরিমাণ বিদ্যা শিখেন তাকে যাদুকরী বলা যেতে পারে। এ ছাড়াও পোপ ২য় সলভেস্টার কারওইন জামে' মসজিদেরও ছাত্র ছিলেন।
একজন প্রাচ্যবিদ বলেছেন, আবদুর রহমান খৃষ্টানদের গীর্জা কিনে একেই জামে' মসজিদে রূপান্তরিত করেছেন। তার এ বক্তব্য ঠিক নয়। তিনি গীর্জা ভেঙ্গে সে জায়গায় সম্পূর্ণ নতুন মসজিদ তৈরি করেন এবং তাতে মেহরাব, কেবলা ও মিনারা সহ সকল ইসলামী বৈশিষ্ট্য যোগ করেন। ইসলামে মসজিদ গীর্জার ধারণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। খৃষ্টানরা গীর্জার পাদ্রীর সহযোগিতায় আল্লাহর নৈকট্য কামনা করে। পাদ্রী বান্দাহ ও আল্লাহর মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। কিন্তু ইসলামে এ জাতীয় ধ্যান-ধারণা অনুপস্থিত। এখানে কেউ কারো মধ্যস্থতাকারী নয়। বরং প্রত্যেককেই আল্লাহর কাছে জওয়াবদিহি করতে হবে।
স্পেনের বহু খৃষ্টান আরবী শিখেছে এবং আরবী ভাষায় সংরক্ষিত ইসলামী সভ্যতার সাথে পরিচিত হয়েছে। এ ছাড়াও তারা مسلمانوں কাছ থেকে অন্যান্য জ্ঞানও আহরণ করেছে। ফলে, তারা সেখানে মুসলিম শাসনামলেও বড় বড় চাকুরীতে বহাল ছিল।
কর্ডোভা তখন বিশ্বের ইসলামী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র ছিল এবং তা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ লাভ করেছিল। কিন্তু স্পেনে মুসলিম শাসনের পর সেই অবস্থা আর বিদ্যমান থাকল না। ক্যাথলিক খৃষ্টান শাসকরা মসজিদটি গীর্জায় পরিণত করে। ১৫২৩ খৃঃ মসজিদের কেন্দ্রস্থলে একটি খৃষ্টান উপাসনালয় তৈরি করে। মসজিদের সৌন্দর্য নষ্ট করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু সম্রাট ৫ম কার্লস ওরফে শারলিকান এই নির্মাণকাজের নিন্দা করেন। এত কিছু সত্ত্বেও মসজিদটি مسلمانوں ইবাদাতখানা হিসেবে নিজস্ব সৌন্দর্য ও স্থাপত্য নিয়ে টিকে আছে। মসজিদের শিক্ষা পদ্ধতির ওপর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোন তদারকী ছিল না। পণ্ডিত ব্যক্তিরাই এর কারিকুলাম ও সিলেবাস তৈরি করতেন।
কর্ডোভার জামে' মসজিদ শুধু জ্ঞানসেবার মধ্যেই সীমিত ছিল না। বরং বিচারক প্রতিদিন মসজিদে বসে লোকদের মামলা-মোকদ্দমার বিচার করতেন। বিচারকের সাথে পেশকার, মুহুরী, উকিল এবং বাদী-বিবাদী একই সাথে উপস্থিত থাকতেন। এ মসজিদের ভূমিকা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00