📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 দামেস্কের উমাইয়া জামে' মসজিদ

📄 দামেস্কের উমাইয়া জামে' মসজিদ


উমাইয়া খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক হিজরী ৮৮-৯৬ সালে, মোতাবেক (৭০৭-৭১৪খৃঃ) মুসলিম বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, রাজমিস্ত্রী ও শ্রমিক আনেন এবং তাদের সহযোগিতায় ঐ মসজিদ তৈরি করেন। মসজিদের জায়গায় আগে মূর্তিপূজারীদের মন্দির ছিল। পরে খৃষ্টানরা সেখানে গীর্জা তৈরি করে। খলীফা ওয়ালিদ খৃষ্টানদের সাথে আলোচনা করে তাদের সম্মতির ভিত্তিতে সেখানে মসজিদ তৈরি করেন এবং তাদেরকে গীর্জার ক্ষতিপূরণ দান করেন।
ইবনে আসাকের উল্লেখ করেছেন, দামেস্ক বিজয়ের পর মুসলমানরা গীর্জার এক অংশে নামায পড়ত এবং বাকী অর্ধেকের মধ্যে খৃষ্টানরা তাদের প্রার্থনা জানাত। পরে খৃষ্টানরা খলীফা ওয়ালিদের আবেদনক্রমে গীর্জার বাকী অংশ মুসলমানদের কাছে হস্তান্তর করতে রাজী হয় এবং খলীফা তাদেরকে শহরের অন্যত্র গীর্জা তৈরির ব্যবস্থা করে দেন। ১
৬শ' হিজরী সালের শেষ দিকে, ইবনে জোবায়ের তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে লিখেছেন, 'মসজিদটি খুবই সুন্দর, মজবুত ও উত্তম কারুকার্য সম্পন্ন। খলীফা ওয়ালিদ কনস্ট্যান্টিনোপলে রোম সম্রাটের কাছে তার দেশের ১২ হাজার শ্রমিক চেয়ে পাঠান এবং তাদের সাহায্যে মজবুত ও সুন্দর করে মসজিদ তৈরি করেন।২
মসজিদের আঙ্গিনার দৈর্ঘ হচ্ছে, ১৬০মিটার এবং প্রস্থ হচ্ছে ১০০ মিটার। মসজিদের কেবলার দিকের দেয়ালের দৈর্ঘ হচ্ছে, ১৩৬ মিটার এবং প্রস্থ হচ্ছে, ৭৩ মিটার। বিভিন্ন সময়ে মসজিদটির সংস্কার করা হয়েছে। এটি তৈরি করতে ৭ বছর সময় লেগেছিল এবং সেজন্য ৭ বছরের খাজনা ব্যয় করতে হয়েছিল। মসজিদটি ইসলামের কারুকার্যের উত্তম নিদর্শন এবং ইসলামী শিল্পকার্যের উজ্জ্বল প্রতীক। এতে একটি উঁচু গম্বুজ সহ আরো ৩টি ছোট গম্বুজ রয়েছে। মসজিদে মোজাইক করা হয়েছে এবং সোনার তৈরি ৬শ শিকল ও রূপার তৈরি বহু শিকল দিয়ে বাতি ঝুলানো হত। এর ফলে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থাভাব দেখা দেয়। ওমর বিন আবদুল আযীয খলীফা হওয়ার পর মসজিদের এ সব ব্যয়বাহুল্য দেখে সোনালী শিকলগুলো খুলে ফেলার চিন্তা শুরু করেন। ঠিক ঐ সময় রোম সম্রাটের দূতেরা মসজিদটি দেখার জন্য দামেস্ক আসে। প্রতিনিধিদল মসজিদের ভেতর প্রবেশ করে এর শোভা ও সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন এবং প্রতিনিধি দলের নেতা মাথা অবনত করে তার সাথীদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আমাদের ধারণা ছিল, আরব মুসলমানদের শাসনের মেয়াদ বেশীদিন টিকে থাকবে না। কিন্তু এখন আমরা তাদের যে কর্মকুশলতা দেখলাম, তাতে আমাদের বিশ্বাস জাগল যে, তাদের শাসন অবশ্যই সুনির্দিষ্ট সময় সীমা পর্যন্ত পৌঁছবে।” ওমর বিন আবদুল আযীযের কানে এ কথা পৌঁছার পর তিনি মসজিদ থেকে সোনালী শিকল প্রত্যাহারের চিন্তা বাতিল করেন এবং বলেন, 'তোমাদের এ মসজিদ কাফেরদের ঈর্ষার কারণ।' ১
উমাইয়া জামে' মসজিদ ছিল তদানীন্তন মুসলিম জাহানের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ইসলামের আলেম ও পণ্ডিত ব্যক্তিরা তাতে শিক্ষা আসর জমাতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান করতেন। এতে বিদেশী ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থাও ছিল। মসজিদের বিভিন্ন অংশে ছাত্রদের পৃথক পৃথকভাবে লেখা-পড়ার বিশেষ সুযোগ ছিল।
ইবনে জোবায়ের তাঁর প্রখ্যাত ভ্রমণ কাহিনীতে লিখেছেন, দৈনিক মসজিদে ফজরের নামাযের পর লোকেরা একত্রিত হয়ে ৭ বার এবং আসরের পরেও ৭ বার কুরআন খতম করতেন।
ইবনে বতুতাও ঐ মসজিদের জ্ঞানচর্চার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মোহাদ্দেসগণ উঁচু চেয়ারে বসে হাদীস শিক্ষা দিতেন। ক্বারীগণ সকাল ও সন্ধ্যায় সুন্দর সুললিত কণ্ঠে কুরআন পাঠ করতেন। মসজিদের প্রত্যেক খুঁটিতে একজন করে শিক্ষক শিশুদেরকে কুরআন শিক্ষা দিতেন। লেখকগণ ছাত্রদেরকে কবিতা ও অন্যান্য বিষয়ে লেখা শিখাতেন। ইবনে বতুতা আরো বলেন, এই মসজিদে আমি শেখ মোআম্মারের কাছে পূর্ণ বুখারী শরীফ শুনেছি।
এ মসজিদেই ওলামায়ে কেরাম বসে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে ফতোয়া দিতেন। ঐতিহাসিক আল-ওমরী বলেন "মসজিদটি সারাদিন লোকে লোকারণ্য থাকত। কেননা, এটি স্কুল ও বাজারের পথে অবস্থিত ছিল। এতে এত আলেম, ফকীহ, ক্বারী, মুফতী ও মোহাদ্দেস ছিল যে, অন্য কোন মসজিদে তা ছিল না। কেউ নামায পড়ছে, কেউ কুরআন পড়ছে, কেউ শিক্ষা দিচ্ছে, কেউ এ'তেকাফ করছে এবং কেউ ওয়ায-নসীহত করছে। দেখা-সাক্ষাত, আলাপ-আলোচনা, প্রশ্নোত্তর ও বক্তৃতা-বিবৃতির কারণে তা সর্বক্ষণ সরগরম থাকতো।” ১
ঐ মসজিদে খতীবে বাগদাদীর মত প্রখ্যাত পণ্ডিতও শিক্ষাদান করেছেন। তিনি প্রত্যেক দিন সকালে দারসে হাদীস দিতেন। এ মসজিদেই ইমাম গাযালী (র) তাঁর প্রখ্যাত 'এহইয়াউ উলুমিদ্দীন' বইটি সমাপ্ত করেন।
এ মসজিদ থেকেই খৃষ্টান ক্রুসেডার, তাতার ও সবশেষে সিরিয়ার ওপর ফরাসী শাসনের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করা হয়। মসজিদে এ বিষয়ের ওপর আলোচনা এবং খোতবাহ (বক্তৃতা) দেয়া হত। মসজিদের মাঝামাঝি স্থানে রয়েছে নবী হযরত যাকারিয়া (আ)-এর কবর। কাল সিল্ক কাপড় দিয়ে কবরটি ঢাকা। এর ওপরে সাদা অক্ষরে এ আয়াতটি লেখা আছে: يَا زَكَرِيَّا إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَامِ نِ اسْمُهُ يَحْى
এ মসজিদের মিম্বার থেকে বিভিন্ন সরকারী প্রস্তাবাবলী পাঠ করে শুনানো হত এবং রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি ঘোষণা করা হত।
এ মসজিদে দাঁড়িয়েই আল-এজ্জু বিন আবদুস সালাম ক্রুসেডার ও তাতারের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করেন। এখান থেকেই ইমাম ইবনে তাইমিয়া ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে এক হাতে কুরআন এবং অন্য হাতে তলোয়ার নিয়ে তাতারদের বিরুদ্ধে একসময় যুদ্ধ এবং অন্য সময় যুক্তি-তর্ক পেশ করেন।
মসজিদের প্রতিষ্ঠা কাল থেকে আজ পর্যন্ত এর রয়েছে বিভিন্নমুখী সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ও বিবিধ ভূমিকা।

টিকাঃ
১. তাহজীবু তারীখি দিমাশক - ১ম খন্ড
২. রেহালাতু ইবনে জোবায়ের।
১. মাসালেকুল আবসার ফি মামালিকিল আমসার আল-ওমরী- ১ম খণ্ড।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00