📄 জেরুসালেমের বর্ণনা
মসজিদে আকসা সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে জেরুসালেম শহর সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা দরকার।
এ শহরেই মসজিদে আকসা অবস্থিত। এটি একটি বহুজাতিক শহর ও পৃথিবীর সর্ববৃহৎ তীর্থকেন্দ্র। মুসলমান, খৃষ্টান ও ইহুদীরা শহরটিকে পবিত্রস্থান মনে করে। শহরটির গোড়াপত্তন করেন আরব ইয়াবুসী গোত্রের মালেক সাদেক। তিনি শান্তিপ্রিয় ছিলেন বলে তাকে সালেম বলা হয়। তার নামানুসারেই শহরের জেরুসালেম নামকরণ করা হয়।
এ শহরের সাথে হযরত ইবরাহীম, ইয়াকুব, দাউদ, সোলাইমান, মূসা, মরিয়ম, ঈসা, যাকারিয়া, ইয়াহইয়া এবং শেষ নবী মুহাম্মাদ (স)-এর ইতিহাস জড়িত রয়েছে। কাজেই এত নবীর ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেরুসালেম। আল্লাহ কুরআনে শহরটিকে বরকতময় বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, الَّذِي بٰرَكْنَا حَوْلَهٗ
"আমরা মসজিদে আকসার আশ-পাশ বরকতপূর্ণ করে দিয়েছি।" (বনি ইসরাঈল : ১)
📄 মসজিদে আকসার বর্ণনা
আবু যার গিফারী (রা) থেকে বর্ণিত। আমি রসূলুল্লাহ (স)-কে প্রশ্ন করি, যমীনে প্রথম মসজিদ কোন্টি? তিনি উত্তরে বলেন, 'মসজিদে হারাম।' আমি জিজ্ঞেস করি, এরপর কোন্টি? তিনি বলেন, 'মসজিদে আকসা।' আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করি, এ দু'টোর মধ্যে সময়ের ব্যবধান কত? তিনি বলেন, '৪০ বছর'।
বনুল যাওজী বলেছেন, সোলায়মান (আ) মসজিদে আকসার নির্মাতা নন বরং তিনি হচ্ছেন পুনর্নির্মাণকারী। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বংশের কেউ তাঁর কা'বা শরীফ পুনর্নির্মাণের ৪০ বছর পর মসজিদে আকসা নির্মাণ করেছেন। উল্লেখ্য যে, ইবরাহীম (আ)-এর ১ হাজার বছর পর সোলায়মান (আ)-এর আগমন ঘটে।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ইবরাহীম (আ) কা'বা নির্মাণের ৪০ বছর পরই মসজিদে আকসা তৈরি করেন।১ 'মসজিদে আকসা'র অর্থ দূরবর্তী মসজিদ। সম্ভবত এটি মক্কা থেকে দূরে বলে এটিকে মসজিদে আকসা বলা হয়। মে'রাজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুরআনের সূরা ইসরাঈলে সর্বপ্রথম 'মসজিদে আকসা' শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এর আগে এর নাম ছিল বায়তুল মোকাদ্দাস।
বর্তমানে মসজিদে আকসা নামে যে মসজিদ ভবন আছে তা শুধু মসজিদে আকসা নয়। ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিতে মসজিদের সীমানার চার দেয়ালের ভেতরের সবটুকু অংশই মসজিদে আকসা। এর ভেতর মসজিদ গম্বুজে সাখরা, মসজিদে নেসা ও বিভিন্ন মাদ্রাসাসমূহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মসজিদে আকসা পুরাতন জেরুসালেম শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত।
রসূলুল্লাহ (স) মেরাজের সময় মসজিদে আকসায় যান এবং সেখানে সকল নবীর রূহানী উপস্থিতিতে তাঁদের নামাযের ইমামতি করেন। তিনি মে'রাজ থেকে ফিরে আসার সময় পুনরায় সেখানে অবতীর্ণ হন এবং সকল আম্বিয়ায়ে কেরামকে নিয়ে পুনরায় নামায পড়েন। তিনি মসজিদের দেয়ালের সাথে মক্কা থেকে আসা বোরাক বেঁধে যান এবং মে'রাজ থেকে ফিরে এসে পুনরায় সেই বোরাকে আরোহণ করে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন।
রসূলুল্লাহ (স) যে তিন মসজিদ সফরের অনুমতি দিয়েছেন, তার মধ্যে মসজিদে আকসা অন্যতম। এটা مسلمانوں প্রথম কেবলাহ ছিল এবং রসূলুল্লাহ (স)-সহ মুসলমানরা ১৭ মাস মসজিদে আকসার দিকে মুখ করে নামায আদায় করেন।
অন্য মসজিদের চাইতে মসজিদে আকসায় নামাযের ফযীলত পাঁচশ গুণ বেশী। অন্য এক বর্ণনায় ১ হাজার গুণ বেশী সওয়াবের কথা উল্লেখ আছে। নামায ছাড়াও অন্যান্য ইবাদাতেরও অনুরূপ সওয়াব রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স) বলেন, "কেউ যদি বেহেশতের কোন অংশ দেখতে চায়, সে যেন বায়তুল মাকদেসের দিকে তাকায়।" (আ'লামুল মাসাজেদ)
দেয়াল ঘেরা এলাকার দক্ষিণাংশে মসজিদে আকসার বর্তমান বিন্ডিং অবস্থিত। চার দেয়ালের ভেতরের মোট পরিমাণ হচ্ছে, ১ লাখ ৪০ হাজার ৯ শ বর্গমিটার। মসজিদের রয়েছে ১১ টি দরজা। এতে নয়টা গম্বুজ ও ৩টি মিনারা আছে।
খলীফা আবদুল মালেক বিন মারওয়ান মসজিদে আকসা নির্মাণ শুরু করেন এবং তার ছেলে ওয়ালিদ তা সমাপ্ত করেন। মসজিদ বিন্ডিং এর দৈর্ঘ হচ্ছে, ৮০ মিটার ও প্রস্থ ৫৫ মিটার। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালকে 'বোরাক শরীফ' বলা হয়। রসূলুল্লাহ (স) এতে বোরাক বেঁধেছিলেন।
টিকাঃ
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ মসজিদে আকসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে লেখকের বই 'আল-আকসা মসজিদের ইতিকথা' পড়ার অনুরোধ করা যাচ্ছে।
📄 মসজিদ গম্বুজে সাখরা
৬৯১ খৃঃ মোতাবেক, ৭০ হিজরীতে, খলীফা আবদুল মালেক বিন মারওয়ান মসজিদ গম্বুজে সাখরা তৈরি করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, ভূপৃষ্ঠে এটাই হচ্ছে, সর্বাধিক সুন্দর ইমারত।
'সাখরা' শব্দের অর্থ পাথর, পাথরের ওপরেই গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি তৈরি হয়েছে। পাথরটির রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ ইতিহাস। বর্ণিত আছে প্রথমে আদম (আ) এই পাথরের কাছে নামায পড়েন। ইবরাহীম (আ) এর কাছে কোরবানগাহ তৈরি করেছেন। ইয়াকুব (আ) এর উপর আগুনের স্তম্ভ দেখে একটা মসজিদ নির্মাণ করেন। ইউশা (আ) এর উপর গম্বুজ তৈরী করেন। দাউদ (আ) এর কাছে মেহরাব এবং সোলায়মান (আ) এর ওপর উপাসনালয় 'হাইকালে সোলাইমানী' তৈরি করেছিলেন। আর এই পাথরের ওপর রসূলুল্লাহ (স) বসেন ও মেরাজের রাতে এর ওপর থেকেই আসমানে যান।
এটা মূলত মসজিদ নয়। পাথরের হেফাজতের জন্যই সেখানে গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে। তবুও লোকেরা তাতে পৃথক পৃথক ভাবে নামায আদায় করে। এর মূল জামায়াত অনুষ্ঠিত হয় মসজিদে আকসায়।
মসজিদে সাখরার ইমারত ৮ কোণ বিশিষ্ট। এতে ৫৬ টি জানালা আছে এবং ওপরে রয়েছে একটি অত্যন্ত সুন্দর গোলাকার গম্বুজ। এই কারণে একে মসজিদ গম্বুজে সাখরা বলা হয়।
পাথরের নীচে রয়েছে একটি গুহা। গুহার ওপর পাথরটিকে আসমান ও যমীনের শূন্যস্থানে ঝুলন্ত বলে মনে হয়। গুহার আয়তন হচ্ছে, ৭x১৫ মিটার। বাইরে থেকে গুহার ভেতরে যাওয়ার জন্য রয়েছে ১৪টি স্তর বা সিঁড়ি।
মসজিদে আকসা ও সাখরা আজ ইসরাইলের জবর দখলে। ১৯৬৭ সালের ৫ই জুন, যুদ্ধের মাধ্যমে ইহুদীরা মসজিদে আকসা ও জেরুসালেম নগরী مسلمانوں হাত থেকে কেড়ে নিয়েছে। আজ ফিলিস্তিনী মুসলমানরা তা পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। মুসলিম বিশ্বও সে জন্য চেষ্টা করছে। কিন্তু দীর্ঘ ২৩ বছর যাবতও তা মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ইহুদীরা জেরুসালেমকে ইসরাইলের স্থায়ী রাজধানী ঘোষণা দিয়ে বলেছে, তারা কখনও তা হাতছাড়া করবে না। এই পরিপ্রেক্ষিতেই আজ প্রয়োজন, مسلمانوں সকল শক্তি সামর্থ একত্র করে জেরুসালেম ও মসজিদে আকসা পুনরুদ্ধারের জন্য জিহাদ শুরু করা। মুসলিম দেশ ও সরকার এবং ওলামা ও ইসলামী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে ঐ জিহাদ পরিচালনা করতে হবে।
📄 মসজিদে আকসার ভূমিকা
মসজিদে আকসা ইসলামের সুমহান নেতৃস্থানীয় মসজিদসমূহের অন্যতম। অতীতে এ মসজিদ বহুমুখী ভূমিকা পালন করেছে। শিক্ষা, রাজনীতি ও সামাজিক ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে মসজিদটি অনন্য বৈশিষ্ট্যের দাবীদার। হযরত ইবরাহীম (আ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠা লাভ ও সোলাইমান (আ) কর্তৃক পুনর্নির্মাণের পর হাজার হাজার বছর ধরে এটি ছিল বহু সংখ্যক আম্বিয়ায়ে কেরামের দীনী, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কেন্দ্র। তদানীন্তন যুগের জন্য এটি ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ কেন্দ্র যাকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। বিভিন্ন নবী ও বাদশাহরা এখান থেকেই জেরুসালেম ভিত্তিক রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন।
মসজিদে আকসা মূলত সভ্যতা ও তমদ্দুনের উজ্জ্বল নিদর্শন এবং ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির অনন্য প্রতীক। এটি ইসলামী কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের ধারক।
মসজিদে আকসায় ইসলামী শিক্ষাদান করা হত এবং তা আজ পর্যন্তও অব্যাহত রয়েছে। বরং এর চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা ও লাইব্রেরী। অর্থাৎ সেখানে রয়েছে দারুল কুরআন, দারুল হাদীস ও বোর্ডিং। সেগুলোতে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট পর্যায়ে শিক্ষাদান অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়াও তাতে আরবী ভাষা, ইসলামী আইন, ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দেয়া হয়।
মোট কথা, মসজিদে আকসায় দীনী শিক্ষার সাথে সাথে ইতিহাস, অংক, তর্কশাস্ত্র ও দর্শনসহ অন্যান্য দুনিয়াবী বিদ্যা শিক্ষা দেয়া হত।
ওলামায়ে কেরাম, বিচারকমণ্ডলী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মসজিদে আকসায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করতেন।
এ মসজিদ থেকেই তদানীন্তন শাসকরা জনগণের উদ্দেশ্যে সরকারী পয়গাম ও বক্তৃতা-বিবৃতি প্রকাশ করতেন সেগুলো সেখানে পাঠ করার পর তা জনগণের জন্য বাধ্যতামূলক করা হত।
মসজিদে আকসার ভেতর অবস্থিত বিভিন্ন মাদ্রাসায় বহু প্রখ্যাত আলেম ও পন্ডিত ব্যক্তি শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তাদের মধ্যে মাদ্রাসা নাসারিয়ায় শেখ আবুল ফাতহ নাসার বিন ইবরাহীম আল-মাকদেসী অন্যতম। ইমাম গাযালী এবং আবু বকর বিন আল-আরবী তাঁর সাথে সেখানে সাক্ষাত করেন। পরবর্তীতে ইমাম গাযালী মসজিদে আকসায় বসে একটি বই লেখেন। বইটির নাম হচ্ছে, 'আর-রেসালাতুল কোসিয়াহ ফি কাওয়ায়েদিল আকায়েদ'। এ বিষয়টি তিনি 'এহইয়াউ উলুমিদ্দীন' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
আজ মসজিদে আকসা ইসরাইলের ইহুদীদের জবরদখলে থাকার কারণে মসজিদের পূর্বের ভূমিকা এখন আর নেই। মসজিদ ইহুদীদের জবরদখল থেকে মুক্তি লাভ করার পর আবার তার আকাঙ্খিত ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে, ইনশাআল্লাহ।