📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 কা’বার বর্ণনা

📄 কা’বার বর্ণনা


কা'বা ঘর হচ্ছে মুসলমানদের কেবলাহ। কা'বার দিকে মুখ করে দুনিয়ার সকল মুসলমান নামায আদায় করে। যমীনে যখন মানুষ সৃষ্টি করা হয়নি তখন ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশে মক্কায় কা'বা শরীফ নির্মাণ করে কা'বার তওয়াফ করেন।
তারপর যখন আদম (আ)-কে যমীনে পাঠানো হল, তখন তিনি মক্কায় এই কা'বা ঘরকে কেন্দ্র করে আল্লাহর ইবাদাত করেন। তিনি কা'বার তওয়াফ করেন ও হজ্জ পালন করেন। আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে আসমানে মক্কার কা'বা বরাবর মসজিদে বাইতুল মা'মূরের তওয়াফের নির্দেশ দেন। প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা বাইতুল মা'মূরের তওয়াফ করেন। তারা কিয়ামতের আগে ২য় বার আর সেই মসজিদের তওয়াফের সুযোগ পাবে না। এভাবে প্রতিদিন তওয়াফ চলছে।
যমীনের কা'বা তওয়াফকারী মানুষের জন্য বাইতুল মা'মুর তওয়াফকারী ফেরেশতারা দোয়া করেন। ফেরেশতাদের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। তবে যে সকল মানুষের আয়-রোজগার হালাল নয়, আল্লাহ তাদের ইবাদাত ও দোয়া কবুল করেন না।
ফেরেশতা ও আদম (আ)-এর তৈরি কা'বা দীর্ঘদিন পর মিটে গেছে। বিশেষ করে হযরত নূহের প্লাবনের সময় কা'বা ঘর ধ্বংস হয়ে যায়। তারপর হযরত ইবরাহীম (আ) জিবরীলের ইঙ্গিতে পূর্বের প্রতিষ্ঠিত ভিত্তির ওপর দেয়াল নির্মাণ করে কা'বা পুনর্নির্মাণ করেন। ইতিহাসে কা'বা শরীফ নির্মাণকারীদের সংখ্যা ১১ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হচ্ছেন, ১. ফেরেশতা ২. আদম (আ) ৩. শীষ (আ) ৪. ইবরাহীম (আ) ৫. আমালেকা সম্প্রদায় ৬. জোরহোম গোত্র ৭: কুসাই বিন কিলাব ৮. কোরাইশ ৯. আবদুল্লাহ বিন যোবায়ের (রা) ১০. হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এবং ১১. সুলতান মুরাদ।
কা'বা শরীফের দরজা বিশিষ্ট সামনের দেয়ালের দৈর্ঘ ৩৩ হাত, এর বরাবর পেছনের দেয়ালের দৈর্ঘ ৩২ হাত, হিজরে ইসমাইল এবং মীযাবে কা'বার দিকের দেয়ালের দৈর্ঘ ২৭ হাত এবং হাজরে আসওয়াদ ও রোকনে ইয়ামানীর মাঝামাঝি দেয়ালের দৈর্ঘ ২০ হাত।
কা'বা শরীফের বর্তমান দরজা ২৮৬ কিলোগ্রাম খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। বনী শায়বা গোত্র হচ্ছে কা'বার চাবি রক্ষক। কা'বা শরীফের দরজা খুলতে হলে, তাদের কাছে রক্ষিত চাবি এনে তা খুলতে হয়। রসূলুল্লাহ (স) বনি শায়বা গোত্রকে কা'বার চাবি রাখার চিরস্থায়ী অধিকার দিয়ে গেছেন।
কা'বা শরীফের পেছন দেয়ালে রয়েছে পাপমুক্তির স্থান। এটাকে আরবীতে 'আল-মোস্তাজাব' বলে। রোকনে ইয়ামানী থেকে কা'বা শরীফের পেছনে বিলুপ্ত দরজা পর্যন্ত ৪ হাত জায়গাকে মোস্তাজাব বলে। এখানে দোয়া করলে গুনাহ মাফ হয় এবং দোয়া কবুল হয়।
কা'বা শরীফের রোকনে ইয়ামানী অত্যন্ত সম্মানিত। রসূলুল্লাহ (স) একে হাতে স্পর্শ করেছেন। ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, রোকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করলে গুনাহ মাফ হয়।
হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "রোকনে ইয়ামানীতে ৭০ জন ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছে। যারা সেখানে 'রাব্বানা আতেনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ ওয়া ফিল আখেরাতে হাসানাহ ওয়াক্বেনা আযাবান্নার' এই দোয়াটি পড়বে, ঐ ফেরেশতারা আমীন বলবে।” (ইবনে মাজাহ)
কা'বা শরীফের দেয়ালের অন্য কোণে রয়েছে হাজরে আসওয়াদ। এটিকে তওয়াফের সময় চুমু দেয়া সুন্নাত। রসূলুল্লাহ (স) তাতে চুমু খেয়েছেন। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন 'এটি বেহেশতের পাথর।' এক হাদীসে এসেছে, 'তাতে ৭০ জন ফেরেশতা নিয়োজিত আছেন। তারা রুকু সেজদাহকারী এবং তওয়াফকারীদের জন্য গুনাহ মাফ চায়।' (আল ফাকেহী) অন্য এক হাদীসে এসেছে, 'যে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে, সে যেন আল্লাহর সাথে হাত মিলায় এবং মোসাফাহা করে।” (ইবনে মাজাহ)
হাজরে আসওয়াদ ও কা'বার দরজা মধ্যবর্তী স্থানকে মোলতাযাম বলে, রসূলুল্লাহ (স) এটি আঁকড়ে ধরে দোয়া করেছিলেন। এটি দোয়া কবুলের জায়গা। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "মোলতাযাম দোয়া কবুলের স্থান, এখানে যে দোয়া করবে তা অবশ্যই কবুল হবে।”
কা'বার ছাদের পানি সরার জন্য একটি নল লাগানো হয়েছে। সেই নলকে মীযাব বলে। আতা (রা) বলেছেন, মীযাবের নীচে দোয়া কবুল হয়। (আখবারে মক্কা, আযরাকী)
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, 'কা'বা শরীফের দিকে নজর করা ইবাদাত।' অন্য এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (স) এরশাদ করেছেন, কা'বা শরীফের ওপর প্রত্যেক দিন ও রাত ১২০ টি রহমত নাযিল হয়। এর মধ্যে তওয়াফকারীদের জন্য ৬০টি, এতেকাফকারীদের জন্য ৪০ টি এবং কা'বার প্রতি দৃষ্টিদানকারীদের জন্য ২০টি রহমত নাযিল হয়। অন্য এক বর্ণনায় নামাযীদের জন্য ৪০টি রহমত নাযিলের কথা উল্লেখ আছে।
কা'বা শরীফের চারদিকে তওয়াফ করা বিরাট সওয়াব, তওয়াফ করলে গুনাহ মাফ হয়, আল্লাহর রহমত নাযিল হয় এবং গোলাম আযাদের সওয়াব পাওয়া যায়। আল্লাহর যিকরের জন্যই তওয়াফের বিধান চালু হয়েছে। তওয়াফ নামাযের হুকুমের অধীন, নামাযের সাথে এর ব্যতিক্রম হচ্ছে, নামাযে কথা বলা যায় না, তবে তওয়াফে প্রয়োজনীয় কথা বলা যায়। তাই তওয়াফ করার সময় ভাল কথা ছাড়া অন্য ধরনের কথা বলা যাবে না।
কা'বা শরীফের উত্তর পার্শ্বের অর্ধবৃত্ত দেয়ালের ভেতরের গোলাকার স্থানকে হিজরে ইসমাইল বলা হয়। হযরত ইসমাইল তাতে বাস করতেন এবং তাতে ভেড়া-বকরী রাখতেন। কথিত আছে যে, এখানেই তাঁর এবং তাঁর মা হাজেরার কবর আছে।
অপরদিকে কোরাইশরা কা'বা নির্মাণের সময় অর্থাভাবে উত্তর দিকে কাবার সাড়ে ৬ হাত অংশ ছেড়ে দেয় যা এখন হিজরে ইসমাইলের সাথে মিশে আছে। একে হাতীমে কা'বা বলা হয়। একবার হযরত আয়েশা (রা) কা'বার ভেতর নামায পড়তে চেয়েছিলেন। রসূলুল্লাহ (স) তাঁকে হাতীমে কা'বায় ঢুকিয়ে দিয়ে বলেন, এখানেই নামায পড়, যদি তুমি কা'বার ভেতর নামায পড়তে চাও। কেননা, এটি কা'বারই অংশ।
হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (স) আবু হোরায়রা (রা) কে বলেছেন, হিজরে ইসমাইলের দরজায় একজন ফেরেশতা দাঁড়িয়ে থাকে। তিনি তাতে দু'রাকাত নামায আদায়কারী মুসল্লীর উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন, 'তোমার অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে গেছে, এখন থেকে নতুনভাবে আমল কর।'

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 মসজিদে হারামের বর্ণনা

📄 মসজিদে হারামের বর্ণনা


কা'বা শরীফের চারদিকের খালি স্থানকে মসজিদে হারাম বলা হয়। যেখানে তাওয়াফ করা হয় এটাকে মাতাফ বলে। এটিই মসজিদে হারাম। ক্রমান্বয়ে মসজিদে হরামের সম্প্রসারণ হয় এবং পরবর্তীতে মসজিদের বিশাল ভবন তৈরি হয়।
১৭ হিজরীতে, সর্বপ্রথম হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা) মসজিদে হারাম সম্প্রসারণ করেন এবং সর্বশেষ সম্প্রসারণ করেন বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আযীয ১৪০৯ হিঃ মোতাবেক ১৯৮৮ খৃষ্টাব্দ।
বর্তমানে মসজিদে হারামে ৩টি স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিঁড়ি চালু আছে।
মসজিদে হারামে রয়েছে মাকামে ইবরাহীম। এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক বেশী। আমর বিন আস রাসূলুল্লাহ (স) থেকে বর্ণনা করেছেন, "হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীম বেহেশতের দুটো মূল্যবান ইয়াকুত পাথর, আল্লাহ ঐ দু'টো পাথরের জ্যোতি মিটিয়ে দিয়েছেন। তা না করা হলে, এ দু'টোর আলোতে পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সমস্ত ভূখণ্ড আলোকোজ্জ্বল হয়ে যেত।” (তিরমিযী)
তওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহীমের পাশে দু'রাকাত নামায পড়া সুন্নাত।
মসজিদে হারামে এক রাকাত নামাযে অন্য স্থানের এক লাখ রাকাতের সওয়াব পাওয়া যায়। অন্যান্য ইবাদাতের সওয়াবও এক লাখ গুণ বেশী হয়। নারী-পুরুষ সবাই মসজিদে হারামে নামায পড়ে। তাই প্রতি বছর হজ্জ উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ লোক মক্কায় আসে এবং মসজিদে হারামে আল্লাহর ইবাদাত করে।
হজ্জের রয়েছে বিরাট সওয়াব। হাদীসে এসেছে, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, আরাফার দিবসে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাহর প্রার্থনার অপেক্ষা করেন। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "আরাফার দিনের চাইতে অন্য কোন দিন আল্লাহ তাঁর এতবেশী বান্দাহকে দোযখের আগুন থেকে মুক্তি দেন না।"
অন্য আরেক হাদীসে এসেছে, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "আরাফাতের দিনের চাইতে শয়তানকে অন্য কোন দিন এত বেশী ছোট, অভিশপ্ত, ঘৃণিত ও রাগান্বিত দেখা যায়নি।"
মসজিদে হারামকে কেন্দ্র করেই হজ্জসহ আল্লাহর বহু রহস্য লুকায়িত রয়েছে। আর হজ্জে রয়েছে মানুষের বিরাট কল্যাণ।

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 মসজিদে হারামের ভূমিকা

📄 মসজিদে হারামের ভূমিকা


হযরত আদম (আ) আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক কা'বা শরীফ নির্মাণ করে তাতে খালেসভাবে তাঁর আদেশ-নিষেধ ও আইন পালনের মাধ্যমে এটিকে বিশ্ব মুসলমানের আনুগত্যের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের রূপ দান করেন। একই কারণে তিনি কা'বা শরীফকে কেন্দ্র করে হজ্জ আদায়ের মাধ্যমে কা'বার শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেন। সেদিন পৃথিবীতে আল্লাহর আইন ও বিধান ছাড়া আর কোন কিছু ছিল না। মানুষ বহু পরে এসে আল্লাহর আইনের পরিবর্তে নিজেরাই বিভিন্ন মত ও পথ আবিষ্কার করে অশান্তির মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। শান্তির মালিককে বাদ দিয়ে এবং তার বিধান থেকে দূরে সরে শান্তি আনার সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হতে বাধ্য।
পরবর্তীতে, হযরত ইবরাহীম (আ) হযরত আদম (আ)-এর তৈরি ভিত্তির ওপর পুনরায় কা'বা শরীফ নির্মাণ করেন। কা'বা পুনর্নির্মাণের উদ্দেশ্যও একই। আর তা হচ্ছে, পুনরায় আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্ব এবং তাঁর আইনের প্রতি আনুগত্যের জন্য বিশ্বের মানুষকে আহবান জানানো।
হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মাদ (স) পর্যন্ত যে সকল নবী কা'বা শরীফে হাজিরা দিয়েছেন, তাদের সবার উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। আর তা হল, আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্বের প্রতি স্বীকৃতি দিয়ে তাওহীদের অনুসরণ করা, আল্লাহ ছাড়া আর কারুর আদেশ-নিষেধ না মানা এবং আল্লাহ বিরোধী সকল মত ও পথ থেকে লোকদেরকে দূরে রাখা।
দাওয়াতে দীন: উপরোক্ত দৃষ্টিকোণ থেকে হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে হযরত ইবরাহীম (আ) এবং হযরত মুহাম্মাদ (স) পর্যন্ত মসজিদে হারাম ছিল দীনের দাওয়াতী কেন্দ্র। এখান থেকে বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে আল্লাহর দীনের দাওয়াত দেয়া হত।
শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-ও কা'বা শরীফ এবং মসজিদে হারামকে কেন্দ্র করে দীনের দাওয়াত দেন। তাদানীন্তন সমাজের মানুষ আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে শেরক ও বিদআত এবং কুসংস্কারে লিপ্ত ছিল। তারা মূর্তি পূজা করত। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ এবং আইন-কানুনের পরিবর্তে মনগড়া ধ্যান-ধারণা ও ভ্রান্ত মতবাদ অনুযায়ী নিজেদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করত। তিনি তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানান এবং সমাজে প্রচলিত ব্যবস্থা, রীতি-নীতি ও আচার-আচরণকে জাহেলিয়াত বা অজ্ঞতা বলে চিহ্নিত করেন। কেননা, সেগুলোর উৎসমূলে আল্লাহর বিধান কার্যকর ছিল না। তিনি কা'বা শরীফের পার্শ্বে অবস্থান করতেন এবং ইবাদাত করতেন। আর পার্শ্ববর্তী দারুল আরকামে গোপনে দীনের তা'লীম দিতেন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি সাফা পাহাড়ে সবাইকে জড় করে দীনের দাওয়াত দেন এবং মসজিদে হারামে বসে মে'রাজের বর্ণনা পেশ করেন। তিনি মসজিদে হারামে সুযোগমত দীনের দাওয়াত দিতেন।
তবে এ কথা সত্য যে, রসূলুল্লাহ (স)-এর জীবদ্দশায় মসজিদে হারামের সেই ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা ততটুকু স্পষ্ট হয়ে উঠেনি যতটুকু মদীনার মসজিদে নববীর ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তার প্রধান কারণ হল, মক্কার কারাইশদের অত্যাচার, নির্যাতন ও বৈরিভাবের কারণে তিনি মক্কায় দাওয়াতে দীন ও দীনের অন্যান্য বিষয়ে বেশী কিছু করতে পারেননি। যে কারণে তাঁকে শেষ পর্যন্ত মদীনায় হিজরত করতে হয়েছিল। অপরদিকে, মদীনাবাসীদের পক্ষ থেকে দীন প্রচারে বাধা ছিল না। সে জন্য তিনি দীনের সকল বিভাগে কাজ করে তাকে বিশাল বৃক্ষে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অপরদিকে মক্কার কাফেররা ইসলামের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছিল।
এ ছাড়াও মক্কাবাসীরা ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের আগে ব্যাপক হারে ইসলামে প্রবেশ করেনি। ফলে, তাঁর জীবদ্দশায় তিনি মদীনার তুলনায় মক্কায় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা সহ অন্যান্য ভূমিকা বেশী পালন করতে পারেননি। যদিও কা'বা শরীফ যুগ যুগ ধরে ঈমান ও জ্ঞান চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র ছিল।
জ্ঞান সেবা: মক্কা বিজয়ের পর হোনাইনে যাত্রার আগে রসূলুল্লাহ (স) হযরত মোআয বিন জাবালকে মক্কায় রেখে যান। উদ্দেশ্য ছিল, তিনি মক্কাবাসীকে এলেম ও ঈমান শিক্ষা দেবেন, ইসলামের হালাল-হারাম ও ফরয ওয়াজিব সম্পর্কে অবহিত করবেন এবং তাদেরকে কুরআন শিখাবেন।
হযরত মোআয আনসার যুবকদের মধ্যে বিদ্যা-বুদ্ধি, আদব-শিষ্টাচার প্রজ্ঞার দিক থেকে শ্রেষ্ঠতর ছিলেন। তিনি ইসলামের আইনশাস্ত্রেও পণ্ডিত ছিলেন। সে জন্য রসূলুল্লাহ (স) তাঁকে ইয়েমেনের শাসক হিসেবে পাঠান। রসূলুল্লাহ (স) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'হে মোআয। যদি তোমার কাছে কোন মামলা আসে, তুমি কিভাবে বিচার করবে?' তিনি জবাব দেন, 'আল্লাহর কুরআনের আইন মোতাবেক ফয়সলা করবো।' রসূলুল্লাহ (স) পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, 'যদি কুরআনে তা না থাকে?' মোআয বলেন, 'তাহলে রসূলুল্লাহর হাদীস অনুযায়ী ফয়সলা করবো।' রসূলুল্লাহ (স) আবারও জিজ্ঞেস করেন, 'যদি তাতেও না থাকে?' তখন মোআয বলেন, 'আমি ইজতেহাদ করবো।' তখন রসূলুল্লাহ (স) মোআযের বুকে থাপ্পড় লাগিয়ে বলেন, 'আল্লাহর প্রশংসা যে, তিনি রসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতিনিধিকে রসূলুল্লাহর (স)-এর পসন্দসই কাজ করার তওফীক দিয়েছেন।' ১
হযরত মোআয থেকে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস সহ অনেক বড় বড় সাহাবায়ে কেরام হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি একাধারে হাদীস ও ফেকহ বিশারদ ছিলেন।
সম্ভবত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক প্রদত্ত জ্ঞান সেবাই মসজিদে হারামের সর্ববৃহৎ জ্ঞান চর্চা ছিল। তখন মুসলিম বিশ্বে মক্কার জ্ঞান চর্চার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি মসজিদে হারামে কুরআনের তাফসীর পেশ করতেন, লোকদেরকে উন্নত চরিত্রের পথ প্রদর্শন করতেন এবং ফিকহ বা ইসলামী আইন শিক্ষা দিতেন। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) সম্পর্কে মহানবী (স) আগেই বলে গেছেন, (مُحَبْرُ الْأُمَّةِ وَتَرْجُمَانُ الْقُرْآنِ ) 'তিনি উম্মাহর পণ্ডিত ও কুরআনের ভাষ্যকার।' তিনি তাঁর জন্য আরও দোয়া করিয়াছিলেন যে, (اَللَّهُمَّ فَقِّهُهُ فِي الدِّيْنِ وَعَلِّمُهُ التَّأْوِيلَ )
"হে আল্লাহ! তাকে দীন বুঝার তওফীক দাও এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার যোগ্যতা দাও।"
ইবনে আবাসের শিক্ষা বৈঠকে মক্কার ভেতর ও বাইরের বহু লোক যোগ দিত এবং হজ্জের মওসুমে বৈঠকের পরিধি অনেক বেশী বিস্তৃত হত। ইবনে আবাসের মসজিদে হারামের শিক্ষালয় থেকে বিরাট বিরাট জ্ঞানী-গুণী ও পণ্ডিত ব্যক্তি তৈরি হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রখ্যাত মোফাস্সের ও মুহাদ্দিস মোজাহিদ বিন জোবায়ের, আতা ইবনে আবি রেবাহ, তাউস ইবনে কিসান, সাঈদ ইবনে জোবায়ের ও ইবনে আব্বাসের গোলাম একরামাহ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। মসজিদে হারামের শিক্ষালয় থেকে এভাবে শিক্ষার্থীরা যুগের পর যুগ শিক্ষালাভ করে বেরিয়েছেন। সেখানকার শিক্ষক সুফিয়ান বিন উয়াইনাহর কাছ থেকে ইমাম শাফেঈ (র) শিক্ষা লাভ করেছেন। প্রখ্যাত আলেম আবদুল মালেক ইবনে আবদুল আযীয ইবনে জুরাইজ মক্কার শিক্ষালয়ের অন্যতম ছাত্র ছিলেন। তিনিই প্রথম হাদীস গ্রন্থ সংকলনের কাজ শুরু করেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে প্রখ্যাত আলেম আওযায়ী, সুফিয়ান সাওরী এবং সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনাহ ছিলেন অন্যতম। ইমাম শাফেঈ (র) সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনাহ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন "যদি মালেক ও ইবনে ওয়াইনাহ না থাকত, তাহলে হেজাযের এলেম বিদায় নিত।” তিনি মদীনার ইমাম মালেক ইবনে আনাস ও মক্কার সুফিয়ান ইবনে ওয়াইনাহর দিকে ইঙ্গিত দিয়ে ঐ মন্তব্য করেন।
সাহাবী, তাবেঈ ও তাবয়ে তাবেঈনের যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্তও মসজিদে হারামে শিক্ষার আসর অব্যাহত রয়েছে। হজ্জ ও রমযান মওসুমে তা আরো বেশী জমজমাট হয়। বিভিন্ন ওলামায়ে কেরাম নানা প্রকার মাসলা-মাসায়েল ও ফতোয়া দান করেন এবং লোকজনের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
রাজনৈতিক ভূমিকা: মসজিদে হারামের সেবা শুধু দাওয়াতে দীন, জ্ঞান ও সমাজ সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এ বিশ্ব শ্রেষ্ঠ মসজিদের রয়েছে ঐতিহ্যমণ্ডিত উজ্জ্বল রাজনৈতিক ভূমিকা। এখন আমরা এ সম্পর্কে কিছু ঘটনার উল্লেখ করবো।
মসজিদে হারামের দারুন নাদওয়া কোরাইশদের পরামর্শ সভা ছিল। তারা সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সিদ্ধান্ত নিত।
মক্কা বিজয়ের দিন রসূলুল্লাহ (স) কা'বা শরীফের দরজায় দাঁড়িয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেই ভাষণটি মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের অধিকার নিশ্চিত করেছে। তিনি বলেছেনঃ
"আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি নিজ ওয়াদা সত্য প্রমাণ করে দিয়েছেন, তাঁর বান্দাহকে সাহায্য করেছেন এবং সকল দলকে পরাজিত করেছেন। সাবধান! (জাহেলিয়াতের) সকল লেন-দেন ও রক্তপণ আমার দু'পায়ের নীচে, তবে কা'বা শরীফের সেবা ও হাজীদের পানি পান পদ্ধতি অব্যাহত থাকবে। সাবধান। ইচ্ছাকৃত হত্যার কাছাকাছি ভুল হত্যার ক্ষতিপূরণ বা দিয়াত হচ্ছে ১শত উট।
হে কোরাইশ সম্প্রদায়। আল্লাহ তোমাদের জাহেলিয়াতের গর্ব-দর্প উঠিয়ে নিয়েছেন এবং বাপসহ পূর্ব পুরুষের অহংকার চূর্ণ করে দিয়েছেন। সকল মানুষ আদম সন্তান আর আদম মাটির তৈরি। তারপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَٰكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَٰكُمْ شُعُوبًا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓا۟ ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ ٱللَّهِ أَتْقَىٰكُمْ ۚ
হে লোকেরা। আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও মহিলা থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করে দিয়েছি, যেন তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত যে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী অর্থাৎ যে সর্বাধিক আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে। (সূরা আল-হুজুরাত : ১৩)
হে কোরাইশ। তোমাদের সাথে আমি কি ধরনের আচরণ করবো বলে তোমরা মনে কর? তারা বলল, আমরা ভাল আচরণ আশা করি, আমরা আপনাকে সম্মানিত ভাই ও ভাতিজা মনে করি। তারপর তিনি বলেন, 'যাও তোমরা মুক্ত।” ১
এ ভাষণে মানবাধিকার সহ মানুষের যাবতীয় অধিকারকে স্বীকার করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রা) মক্কায় খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর মসজিদে হারামকেই তাঁর প্রধান কর্মস্থল হিসেবে ব্যবহার করেন। এখানে বসেই তিনি মক্কার শাসনকার্য পরিচালনা করেন। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে ইয়াযীদের যুদ্ধের সময় তিনি মসজিদে হারাম ও কা'বা শরীফে আশ্রয় নেন। তাঁর গোটা খেলাফত মসজিদে হারামকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।
উমাইয়া খলীফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান মসজিদে হারামে দাঁড়িয়ে তার সরকারের ভবিষ্যত নীতি ঘোষণা করেন। ভাষণে তিনি নিজেকে শক্তিশালী শাসক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "আমি হযরত ওসমানের মত দুর্বল খলীফা নই এবং মুআবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ানের মত উদারপন্থী নই। ২
আব্বাসী খলীফা আবু জাফর মনসুর মক্কায় আসেন এবং মসজিদে হারামে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, "আমি যমীনে আল্লাহর মনোনীত সুলতান। আমি তাঁর সাহায্য ও তাওফীকের মাধ্যমে তোমাদের ওপর শাসন করছি। তাঁর সম্পদের আমি পাহারাদার; তাঁর ইচ্ছায় আমি তা খরচ করছি, তাঁর হুকুমে আমি তা দান করি, তিনি আমাকে সম্পদের তালা বানিয়েছেন। তিনি ইচ্ছা করলে আমাকে খুলে দিতে পারেন যেন আমি তোমাদেরকে দান করতে পারি এবং ইচ্ছা করলে আমাকে বন্ধ রাখতে পারেন। তোমরা আল্লাহর আগ্রহী হও এবং আজকের এ দিনে তাঁর কাছে প্রার্থনা জানাও। তিনি তোমাদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন।' ১
আব্বাসী শাসনকাল শেষ হওয়ার পর দাউদ ইবনে আলী মক্কায় দাঁড়িয়ে এক ভাষণে বলেন, "আমি আপনাদের উদ্দেশ্যে কোন নদী প্রবাহিত করা কিংবা রাজপ্রাসাদ তৈরির জন্য বের হইনি। আমার ধারণা, আল্লাহর দুশমনগণ আর বিজয় লাভ করতে পারবে না। এখন অবস্থা সঠিক পর্যায়ে ফিরে এসেছে এবং সূর্য পূর্বদিকে উদিত হয়েছে। তীর তার ধনুকের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করেছে এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে। নবীর বংশধরের মধ্যে দয়ালু লোক রয়েছে। আপনারা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলুন, আল্লাহর প্রদত্ত নেয়ামতকে নিজেদের ধ্বংসের কারণ বানাবেন না। কেননা এর ফলে আল্লাহর নেয়ামত দূরে সরে যাবে।” ২
হেজাযের শাসকরা সর্বদাই মসজিদে হারামের জুমআর খোতবায় নিজেদের নীতি ঘোষণা করতেন এবং তারা কিংবা তাদের প্রতিনিধিরা খোতবাহ দিতেন। আজ পর্যন্তও মসজিদে হারামের জুমআর খোতবায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শাসকদের নীতি ও তৎপরতার বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে বর্তমানকাল পর্যন্ত মসজিদে হারামে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, তাঁর আইন ও তাঁর প্রদত্ত জীবন পদ্ধতির সকল দিক ও বিভাগে আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মসজিদে হারামের এ ভূমিকা সর্বকালের মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে নিবেদিত।

টিকাঃ
১. তাবকাতে কোবরা - ২য় খণ্ড।
১. ইবনে কাসীর-আস্-সীরাতুন নবুবিয়াহ- ৩য় খণ্ড, ৫৭০ পৃঃ।
২. আল-ইদুল ফরীদ- ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৫৪।
১. আল-ইকদুল ফরীদ- ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৬২।
২. ঐ ৪র্থ খণ্ড।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00