📄 মসজিদে নববীর সামরিক ভূমিকা
রসূলুল্লাহ (স) ছিলেন, ইসলামী সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা, নেতা, শিক্ষক-প্রশিক্ষক এবং অস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহকারী। তিনি নিজ চরিত্রের আলো দ্বারা সেনাবাহিনীর চরিত্রকে আলোকিত করেছেন। আর এটা করেছিলেন ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। ঐ ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে, নামায। নামাযে যে সাম্য, শৃংখলা, ঐক্য ও আনুগত্যের বাস্তব ট্রেনিং রয়েছে, তা কি দুনিয়ার আর কোন জাতির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে? এখানে ধনী-গরীব, বড়-ছোট, স্বাধীন-পরাধীন এবং আশরাফ ও আতরাফ সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই নেতার অধীন যে বাস্তব ট্রেনিং গ্রহণ করে তা অপূর্ব। তাই ইসলাম জামায়াতে নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং এর ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছে। আর নামায ও জামায়াত মসজিদেই অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে নামায পড়ার মাধ্যমে ইসলাম মুসলমানের মনে এ অনুভূতি সৃষ্টি করতে চায় যে, সবাইকে জামায়াতী জিন্দেগী বা সামষ্টিক জীবন যাপন করতে হবে এবং জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না। এ জামায়াতের শরীক অন্যান্য সদস্যদের সুখ-দুঃখে অংশগ্রহণ করানোও এর অন্যতম লক্ষ্য। মূলত মানবীয় শিক্ষার উদ্দেশ্যও তাই।
তাই অমুসলিম প্রাচ্যবিদরাও মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছেন যে, নামাযে রয়েছে মূল্যবোধের শিক্ষা। মূলত তা ছিল সামরিক ট্রেনিং এবং মসজিদ ছিল সামরিক মহড়া ও কুচকাওয়াজের স্থান। নামাযের মাধ্যমে সেই কুচকাওয়াজ সম্পন্ন হত। সামরিক বাহিনীতে বর্তমান যুগে উঠা, বসা ও শোয়ার যে ট্রেনিং দেয়া হয়, নামাযের সাথে এর কোন পার্থক্য নেই।
নামায ইসলামের ২য় খুঁটি বা রোকন। ইসলাম ও কুফরীর মধ্যে নামায হচ্ছে, পার্থক্য সৃষ্টিকারী। তাই রসূলুল্লাহ (স) বলেছেনঃ
الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ مَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ
"আমাদের ও তাদের (অমুসলমানদের) মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে নামাযের, যে নামায ত্যাগ করে, সে কুফরী করে।"
মসজিদ ভিত্তিক নামায ইসলামী শিক্ষা ও চরিত্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
মূলত 'মসজিদ একটি প্রশিক্ষণ শিবির। কিসের প্রশিক্ষণ শিবির? নিয়ম-নীতি ও শৃংখলার প্রশিক্ষণ শিবির। সময়ের নিয়মানুবর্তিতা ও এর মূল্য বুঝা এবং ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করার জন্য আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামায থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। নির্ধারিত নামাযসমূহের জন্য মসজিদে জামায়াতের সুনির্দিষ্ট সময় রয়েছে। সে সময় অনুযায়ী দিনে পাঁচ বার মসজিদে হাযির হতে হয়।
এরপর রয়েছে, সোজা ও সমানভাবে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো। কাতার সোজা না হলে গুনাহ হয় এবং নামায অসম্পূর্ণ থাকে। এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন:
صَفًّوا صُفُوقَكُمْ فَإِنْ تَصْفِيَّةَ الصُّفُوفِ مِنْ تَمَامِ الصَّلَاةِ
"তোমরা কাতার সোজা করে দাঁড়াও। কাতারের মাধ্যমে নামায পরিপূর্ণ হয়।"
এটা মু'মিনের ব্যবহারিক জীবনের জন্য বিরাট শিক্ষা।
মুসল্লীকে প্রতি মুহূর্তে ইমামের প্রতিটি নড়াচড়া ও বিশ্রামের অনুসরণ করতে হয়। যেমন, ইমাম রুকূ'তে গেলে মুসল্লীকেও রুকূতে যেতে হয় এবং ইমাম বসলে মুসল্লীকেও বসতে হয়। এভাবে ইমামের অনুসরণ করে নিজের জীবনে যুক্তিসঙ্গত কাজ ও শৃংখলার শিক্ষা নিতে হয়।
এ ছাড়াও তাতে সর্বোত্তম ব্যক্তিকে ইমামত বা নেতৃত্ব দানের শিক্ষা রয়েছে। কেননা, মুসল্লীদের মধ্যে যিনি সর্বোত্তম গুণাবলীর অধিকারী, ইমামতি করার যোগ্যতা ও অধিকার তার। যেন অপাত্রে কোন কিছু না রাখা হয়। কেননা, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, নেতৃত্ব বা পরিচালনার দায়িত্ব অপাত্রে দান করলে কেয়ামতের অপেক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ তা কেয়ামতের লক্ষণ।
নব্য উপনিবেশবাদী কিংবা সাম্রাজ্যবাদীরা কোন দেশ জয় করে বিজয়ের প্রতীক হিসেবে নিজেদের পতাকা উত্তোলন করে। পক্ষান্তরে, মুসলমানরা বিজয়ের পর মসজিদ তৈরি করে প্রমাণ করে যে, এটি ইসলামী রাষ্ট্রের অংশ হয়ে গেছে। মসজিদ তৈরির অন্য উদ্দেশ্য হল, সংশ্লিষ্ট যমীনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করা, বিজিতের ওপর বিজয়ীর সার্বভৌমত্ব নয়। কুবা ও মদীনায় পৌঁছে রসূলুল্লাহ (স) সর্বপ্রথম ঐ মসজিদ দু'টো তৈরি করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বই ঘোষণা করেছিলেন। আমরা আরো দেখতে পাই কুফা, ফোস্তাত ও কায়রাওয়ানে বিজয়ী মুসলমানরা নিজেদের গর্ব-অহংকারের কথা বাদ দিয়ে জুমআর খোতবায় শুধুমাত্র আল্লাহর শুকরিয়া ও প্রশংসা আদায় করেছেন।
মুসলমানের জীবনে মসজিদ সামরিক কেন্দ্র ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদ থেকে জিহাদের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী পাঠানো ছাড়াও ইসলাম গ্রহণেচ্ছু প্রতিনিধিদলকে মসজিদেই স্বাগত জানান। এর উত্তম উদাহরণ হল, ৯ম হিজরীর তাবুক যুদ্ধের পর রসূলুল্লাহ (স) সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধিবৃন্দের উদ্দেশ্যে মসজিদে নববীতে তাঁবু তৈরি করেন। উদ্দেশ্য ছিল, তারা যেন মসজিদে কুরআন শুনে, মুসল্লীদেরকে নামায পড়তে দেখে এবং তাদের আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়।
এ ছাড়াও তিনি যুদ্ধবন্দীদেরকে মসজিদে বেঁধে রাখতেন। এ ক্ষেত্রে সামামাহ বিন আসালের উদাহরণ দেয়া যায়। বন্দী অবস্থায় আসার পর রসূলুল্লাহ (স) তাঁকে চিনতে পেরে মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখার হুকুম দেন। এবং তার সাথে ভাল ব্যবহারের আদেশ দান করেন। যদিও সবার সাথেই ভাল ব্যবহার করা হত। রসূলুল্লাহ (স) তার কাছে তিনদিন পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন কিন্তু সামামাহ ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। তারপর রসূলুল্লাহ (স) তাঁকে মুক্তিদানের নির্দেশ দেন। মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথে তিনি গোসল করেন এবং নবী করীম (স)-এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। (বুখারী, কিতাবুস সালাত ১ম খণ্ড)
ইসলামী দাওয়াতের ইতিহাসে ঐ ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। নৈতিক প্রশিক্ষণ ও ইসলামী সংস্কৃতি বিস্তারের ক্ষেত্রে এটা হচ্ছে উত্তম পদ্ধতি। মসজিদ আল্লাহর সঠিক পরিচয় ও অন্তর থেকে অন্ধকার দূর করার উদ্দেশ্যে আলো বিকিরণের স্থান।
রসূলুল্লাহ (স) মসজিদের আঙ্গিনাকে সেনাবাহিনীর সমাবেশ এবং তাদের নেতা নির্বাচনের জন্য ব্যবহার করেন। এর উত্তম উদাহরণ হল, হযরত আয়েশার (রা) একটি বর্ণনা। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, হাবশীরা (নিগ্রো) মসজিদে নববীতে অস্ত্র নিয়ে খেলা শুরু করে। রসূলুল্লাহ (স) তা দেখেন কিন্তু নিষেধ করেননি।
বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, "হাবশীরা তাদের অস্ত্র নিয়ে ঈদের দিন মসজিদে খেলা শুরু করে। রসূলুল্লাহ (স) আমাকে ডাকেন। আমি তাঁর কাঁধের ওপর মাথা রাখি এবং তাদের খেলা দেখি যে পর্যন্ত না আমি তাদের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আসি। রসূলুল্লাহ (স) বলেন, হে বনী আরফেদা! খেলতে থাক। এতে তারা আরো উৎসাহিত হয় এবং খেলা অব্যাহত রাখে।"
সন্দেহ নেই যে, নিগ্রোদের ঐ খেলা নিছক খেল-তামাশা ছিল না। বরং এর মাধ্যমে তারা অস্ত্র ও যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছিলেন। তারা শুধু খেল-তামাশা করলে রসূলুল্লাহ (স) অবশ্যই তাদেরকে নিষেধ করতেন। কেননা, মসজিদ খেলা-ধূলার জায়গা নয়। এ হাদীস প্রমাণ করে যে, যুদ্ধের জন্য মসজিদে সামরিক প্রশিক্ষণ জায়েয আছে।
রসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কেরামকে মসজিদে তীর শিক্ষার জন্য উৎসাহিত করতেন। যেন তারা যুদ্ধ ও শত্রুর মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন।
রসূলুল্লাহ (স) মসজিদে যুদ্ধের পতাকা বাঁধেন। উল্লেখ্য যে, ইসলামে উপনিবেশবাদ কিংবা শোষণের উদ্দেশ্যে আক্রমণাত্মক যুদ্ধের অবকাশ নেই। ইসলামে শুধু আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের সুযোগ আছে। কেউ ইসলামী আকীদা-বিশ্বাসে বাধা দিলে এবং ইসলামের দাওয়াতী কাজে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালে তার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের অনুমতি রয়েছে। ইসলামের দাওয়াতী রোশনী প্রজ্জ্বলিত করার দায়িত্ব মুসলমানদের ওপর। দাওয়াতী মশাল হাতে নিয়ে তারা গোটা দুনিয়ায় হেরার রশ্মি ছড়িয়ে অন্ধকার দূর করে দেবে। কিন্তু কেউ যদি বান্দার কাছে আল্লাহর সেই নূর পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। যে পর্যন্ত না সে আল্লাহর রাস্তায় ফিরে আসে। কিন্তু আল্লাহর বাতি নিভানোর প্রচেষ্টাকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরাজিত হলে, তাদেরকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয় না। বরং দেশের প্রতিরক্ষার জন্য তাদের কাছে সামান্য একটা জিযিয়া কর ধার্য করা হয়। তারা তাদের অর্থ-সম্পদ থেকে তা আদায় করবে। পক্ষান্তরে, মুসলমানরা নিজেদের জান-মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে।
📄 মসজিদে নিষিদ্ধ কাজ
মসজিদ সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ (স) শিশু ও পাগলকে মসজিদে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, "তোমাদের মসজিদগুলো থেকে ছোট শিশু ও পাগলদেরকে দূরে রাখ। কেননা, তারা মসজিদের দেয়াল ময়লা করে এবং অপবিত্রতা থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখতে পারে না।" তাই দেখা যায়, অতীতে বাজারে কিংবা মসজিদের পার্শ্বে পৃথক ঘর তুলে শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হত।
মসজিদে বেচা-কেনা কিংবা নিখোঁজ জিনিসের ঘোষণা দেয়া নিষিদ্ধ। কেননা, তা মসজিদের উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আরবেও মক্তব ও ফোককানিয়া মাদ্রাসায় শিশুদের পৃথক ব্যবস্থার ঐ ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন:
إِذَا رَأَيْتُمْ مِّنْ يَّبِيعُ أَوْ يَبْتَاعُ فَقُولُوا لَا أَرْبَحَ اللَّهُ تِجَارَتَكَ وَإِذَا رَأَيْتُمْ مِّنْ يُنْشُدُ ضَالَّةً فَقُولُوا لَا رَدُّ اللَّهُ عَلَيْكَ -
"তোমরা যদি কাউকে মসজিদে বেচা-কেনা করতে দেখ, তখন বল, আল্লাহ তোমার ব্যবসায় কোন লাভ না দিক এবং যদি কাউকে হারানো জিনিসের ঘোষণা দিতে দেখ, তাহলে বল, আল্লাহ তোমাকে যেন তা ফিরিয়ে না দেয়।"
অনুরূপভাবে, মসজিদে খেলা-ধূলা করাও নিষিদ্ধ। রসূলুল্লাহ (স) এ হাদীসে ব্যবসার অকল্যাণ ও হারানো জিনিস না পাওয়ার জন্য বদ দোয়া করেছেন। ২
টিকাঃ
১. রেসালাতুল মসজিদ ফিল ইসলাম-ডঃ আবদুল আযীয মুস্তাম্মদ লোমাইলাম।
২. নাইলুল আওতার- ২য় খন্ড- পৃঃ ১৬৬।