📄 মসজিদে নববীর বর্ণনা
মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পথে মহানবী (স) কুবায় প্রায় ২ সপ্তাহ অবস্থান করেন। তারপর মদীনা শহরের অভ্যন্তরে পৌঁছার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে বনী সালেম পল্লীতে শুক্রবারে জুমআর নামায পড়েন এবং জুমআ শেষে তিনি রওনা করেন। তাঁর উট মসজিদে নববীর বর্তমান স্থানে এসে বসে পড়ে। এই স্থানটি ছিল খেজুর শুকানোর স্থান ও উট-বকরীর আস্তাবল। ২ জন ইয়াতীম শিশু ছিল ঐ জায়গার মালিক রসূলুল্লাহ (স) ১০টি সোনার দীনারের বিনিময়ে ঐ সম্পত্তি কিনেন এবং হযরত আবু বকরকে মূল্য পরিশোধ করার আদেশ দেন। ঐ যমীনে খেজুর গাছ ও মুশরিকদের কবর ছিল এবং এক অংশ ছিল নীচু। তাতে বৃষ্টির পানি জমে থাকত। তিনি খেজুর গাছ কেটে ফেলেন এবং কবরের হাড়-গোড় বের করে অন্যত্র পুঁতে ফেলার নির্দেশ দেন। নিম্নাংশ ভরাট করেন। ১২ দিন পর্যন্ত তিনি খালি স্থানে নামায পড়েন। তারপর মসজিদ তৈরি করেন। তিনি এবং মোহাজের ও আনসার সাহাবায়ে কেরাম মিলে মসজিদ তৈরি করেন। আম্মার বিন ইয়াসার (রা) ছিলেন মসজিদের প্রধান রাজমিস্ত্রী ও নির্মাণ কৌশলী। রসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং নিজেও সাহাবায়ে কেরামের সাথে ইট-পাথর বহন করেন। তিনি নিজহাতে একটি পাথর দিয়ে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। মসজিদের ভিত্তিতে পাথর, দেয়ালে ইট, চালে খেজুর পাতা ও সুঘ্রাণ এজখের ঘাস এবং খুঁটিতে খেজুর গাছ ব্যবহার করা হয়। চালের ওপর কাদা মাটির প্রলেপ দেয়া হয় ঠাণ্ডার জন্য। একবার বৃষ্টির পানিতে মসজিদের মেঝে কর্দমাক্ত হয়ে যায়। স্বয়ং রসূলুল্লাহ (স)-এর কপাল ও দাড়িতে কাদা লাগে। সাহাবায়ে কেরাম মেঝেতে পাথরের নুড়ি ঢেলে দেন। ১ম হিজরী সনে নির্মিত মসজিদের আয়তন ছিল ৭০ x ৬০ গজ বা ৮৫০.৫ বর্গমিটার। উচ্চতা ছিল ২.৯ মিটার।
৭ম হিজরীতে খায়বার বিজয়ের পর ক্রমবর্ধমান মুসল্লীর সংকুলানের জন্য মসজিদকে সম্প্রসারিত করা হয়। এখন এর আয়তন দাঁড়ায় ১০০x১০০ গজ অর্থাৎ ২০২৫ বর্গমিটার এবং ছাদ ৭ গজ উঁচু করা হয়। রসূলুল্লাহ (স)-এর সময়ের মসজিদের সীমানা এখন পর্যন্ত চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। এ সময় মসজিদের ৩টি দরজা ছিল।
মসজিদে আকসার দিকে মুখ করে তিনি ১৭ মাস নামায পড়েন। তখন তাঁর মেহরাব ছিল মসজিদের উত্তর পার্শ্বে। পরে যখন কা'বা শরীফের দিকে মুখ করে নামায পড়ার আদেশ নাযিল হয় তখন তাঁর মেহরাব দক্ষিণ দিকে স্থানান্তরিত হয়। কা'বার দিকে মুখ করে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি ইমামতি করতেন সে স্থানটি চিহ্নিত আছে। তাতে বর্তমানে আরবীতে লেখা আছে-
هُذَا مُصَلَّى النَّبِيِّ عَلَيْهِ السَّلَام -
মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে ছিল দীনের কাজে সার্বক্ষণিক সময়দানকারী সাহাবায়ে কেরামের বাসস্থান। তাঁদেরকে বলা হত আসহাবে সুফফা। হযরত আবু হোরায়রাসহ অনেক বড় বড় সাহাবী সেখানে বাস করতেন। তাঁদের নিজেদের কোন আয়-রোজগার ছিল না। ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা হত।
মসজিদে ৫ ওয়াক্ত নামায নিয়মিত জামায়াত সহকারে অনুষ্ঠিত হয়। এতে নারী-পুরুষ সবাই অংশ গ্রহণ করে।
মসজিদের ভেতর রয়েছে ৮টি ঐতিহাসিক স্তম্ভ। সেগুলোর নাম হচ্ছে, ১. সুবাস স্তম্ভ (ওসতোয়ানা মোখাল্লাকা) ২. আয়েশা স্তম্ভ ৩. তাওবাহ স্তম্ভ ৪. শয়ন স্তম্ভ ৫. পাহারা স্তম্ভ ৬. প্রতিনিধি স্তম্ভ ৭. কবরের বর্গ স্তম্ভ ও ৮. তাহাজ্জুদ স্তম্ভ। প্রত্যেকটা স্তম্ভের রয়েছে বিরাট তাৎপর্য ও ঐতিহাসিক বর্ণনা। এখানে সে আলোচনার সুযোগ নেই।
মসজিদের ভেতর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান হচ্ছে, রাওদাহ বা 'বেহেশতের বাগান' নামক জায়গাটি। রাওদাহর দৈর্ঘ ২২ মিটার ও প্রস্থ ১৫ মিটার। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "আমার ঘর ও মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থান হচ্ছে বেহেশতের বাগান।” (বুখারী ও মুসলিম) এই জায়গায় ইবাদাত ও এতেকাফের ফযীলত ও সওয়াব অনেক বেশী।
প্রথম প্রথম রসূলুল্লাহ (স) মিম্বার ছাড়াই মসজিদের মেঝেতে দাঁড়িয়ে খুতবাহ দিতেন। এতে তিনি ক্লান্ত হয়ে যেতেন। তাই বিশ্রামের উদ্দেশ্যে হেলান দেয়ার জন্য পাশে একটা খেজুর গাছের কাণ্ড দাঁড় করানো হয় এবং সব শেষে তাঁর জন্য একটা মিম্বার তৈরি করা হয়। তিনি ১ম খুতবার পর মাঝখানে বসে বিশ্রাম গ্রহণ করতেন ও পরে ২য় বার খুতবা দিতে দাঁড়াতেন।
মসজিদে নববীর ফযীলত অনেক বেশী। হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "তিন মসজিদ ব্যতীত আর কোন পবিত্র স্থানে সওয়াবের নিয়তে যেন সফর করা না হয়। সে তিন মসজিদ হচ্ছে, মক্কার মসজিদে হারাম, মদীনার মসজিদে নববী এবং জেরুসালেমের মসজিদে আকসা।” (বুখারী ও মুসলিম)
হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "মসজিদে হারাম ছাড়া আমার এই মসজিদে নামায অন্যান্য মসজিদের নামায থেকে এক হাজার গুণ উত্তম।” (বুখারী)
মসজিদে নববীর অন্যান্য ইবাদাতের সওয়াবও নামাযের মতই অতিরিক্ত।
বিভিন্ন সময় মসজিদে নববীর সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। যারা সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেছেন, তাঁরা হলেন, ১। রসূলুল্লাহ (স) ২। ওমর (রা) ৩। ওসমান (রা) ৪। ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক ৫। খলীফা মাহদী ৬। আশরাফ কায়েতবায় ৭। সুলতান আবদুল মজিদ ৮। বাদশাহ আবদুল আযীয ৯। বাদশাহ ফয়সল বিন আবদুল আযীয ১০। বাদশাহ খালেদ বিন আবদুল আযীয এবং ১১। বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আযীয।
বর্তমানে মসজিদের আয়তন হচ্ছে, ৯৮ হাজার ৫ শ বর্গমিটার। মসজিদের ভেতর ১ লাখ ৬৭ হাজার মুসল্লী, ছাদের ওপর ৯০ হাজার মুসল্লী এবং আঙ্গিনায় মোট ২ লাখ ৫০ হাজার মুসল্লী একই সময়ে নামায পড়তে পারে। সব মিলিয়ে একই সময় সাড়ে ৬ লাখ লোক একসাথে নামায পড়তে পারে। মসজিদে কেন্দ্রীয় এয়ার কন্ডিশনের ব্যবস্থা আছে। ফলে, গরমের সময় মুসল্লীরা ঠাণ্ডা অনুভব করে। এতে ১০ টি মিনারা ও ২৭ টি গম্বুজ আছে। এতে ৭টি প্রবেশ পথ ও ৮২টি দরজা আছে।
মসজিদে পর্যাপ্ত টয়লেট, অযুর জায়গা ও পান করার জন্য ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা আছে। মক্কা থেকে জমজমের পানি নিয়ে মুসল্লীদেরক পান করানো হয়। মসজিদের পার্শ্বে বিরাট গাড়ি পার্কিং এলাকা রয়েছে।
মসজিদের সাথেই রয়েছে রসূলুল্লাহ (স) এর হুজরাহ মোবারক এবং হযরত আলী ও ফাতেমার ঘর। বর্তমানে সে গুলো সম্প্রসারিত মসজিদের ভেতর অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে।
হুজরাহ মোবারকেই তাঁর পবিত্র দেহ মোবারক শায়িত আছেন। তাঁর কবরটি লোহার জালি দ্বারা আবৃত এবং কবরের চার পার্শ্বে শীশা ঢালাই করে কবর মজবুত করা হয়েছে। দুষ্কৃতিকারীরা কয়েকবার লাশ মোবারক চুরির উদ্যোগ নেয়ায় ঐ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
পার্শ্বেই রয়েছে তাঁর দুই সাথীর কবর। তাঁরা হলেন, হযরত আবু বকর ও ওমর (রা)। ৪র্থ কবরের স্থানটি আজ পর্যন্ত খালি পড়ে আছে।
প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মুসলমান মসজিদে নববী যেয়ারতে আসেন এবং সেখানকার ফযীলত কুড়িয়ে নেন। হজ্জ মওসুমে যেয়ারতকারীর সংখ্যা সর্বাধিক বৃদ্ধি পায়।
📄 মসজিদে নববীর ভূমিকা
দুনিয়ার মসজিদসমূহের ভূমিকা কি হওয়া উচিত তা জানার জন্য সবাইকে মসজিদে নববীর ভূমিকা জানতে হবে। কেননা, এটা হচ্ছে ট্রেনের ইঞ্জিনের মত। ট্রেনের বগীগুলোর অন্যদিকে যাওয়ার কায়দা নেই। ইঞ্জিন যেদিকে যায়, তাদেরকেও সেদিকেই যেতে হয়। অন্যান্য মসজিদগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাদেরকে অবশ্যই মদীনার মসজিদে নববীকে অনুসরণ করতে হবে। এটা রসূলুল্লাহ (স)-এর নিজ হাতে তৈরি ও পরিচালিত। তাই অন্যান্য মসজিদগুলোকে মূল উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। মূল উৎস হচ্ছে মসজিদে নববী। বরং এটাকে অন্যান্য সকল মসজিদের মা বলা যায়। তাই সেগুলোকে তার মাতৃসদনের আসল পরিচর্যা লাভ করতে হবে।
মসজিদে নববীতেই নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের আইন-কানুনগুলো প্রতিপালিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে গোটা দুনিয়ায় তা ছড়িয়ে পড়েছে। একই উদ্দেশ্যে মসজিদে নববীর অনুসরণে তৈরি হয়েছে অন্যান্য মসজিদ। ফলে, অন্যান্য সকল মসজিদের শিক্ষা ও পয়গাম মসজিদে নববীর মতই হওয়া জরুরী। সময়ের ব্যবধানে কিংবা ইসলামকে তার যথাযথ মর্যাদা না দিতে পারার কারণে, কোন কোন সময় মসজিদ তার আকাঙ্খিত লক্ষ্য ও ভূমিকা পালন করতে পারেনি, সেজন্য সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী বা সমাজ মসজিদের কাম্য অবদান থেকে বঞ্চিত থেকেছে।
মূলত মুসলিম সমাজ হচ্ছে, মসজিদ ভিত্তিক, তাই মসজিদ থেকেই সমাজের দীনী ও দুনিয়াবী খোরাক সরবরাহ করতে হবে। মসজিদকে সংকীর্ণ ও সীমিত লক্ষ্যে ব্যবহার করা যাবে না। বরং এটা হচ্ছে সকল কল্যাণকর কাজের উৎস। মসজিদের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত সমাজ জাহেলিয়াতের অশান্তিতে নিমজ্জিত হতে বাধ্য।
📄 জ্ঞান সেবা
এখন আমরা মসজিদে নববীর জ্ঞান সেবা সম্পর্কে আলোচনা করবো।
আমরা ইতিপূর্বে বলেছি যে, মসজিদে নববী ছিল ইবাদাতসহ মুসলিম মিল্লাতের একটি বহুমুখী প্রতিষ্ঠান বা কর্মশালা। সর্বোপরি তাঁর মসজিদ ছিল ইসলামের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর হাতে সর্বোত্তম শিক্ষা গ্রহণ করেছেন সাহাবায়ে কেরামের মত সুযোগ্য ব্যক্তিত্বসমূহ। তাঁরা তাঁর কাছে আল্লাহর দীন বুঝেছেন। তাঁরা কোন আয়াত শিখার সাথে সাথে তা জানা ও মানার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা-সাধনা করতেন। এরপর অন্যদের কাছে তা পৌঁছাতেন।
স্বভাবতই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সকলের জ্ঞানগত যোগ্যতা সমান ছিল না। তাঁরা নির্বিশেষে ইলেম, হেদায়াত, ফযীলত ও শিষ্টাচার অর্জন করেছেন। তবে সবার সুযোগও সমান ছিল না। অনেকেই ছিলেন অভাবগ্রস্ত। ফলে, জীবিকার দাবী মেটাতে গিয়ে সবাই জ্ঞান আহরণে সমান সময় দিতে সক্ষম ছিলেন না। অথচ, প্রত্যেক সাহাবীই সাধ্যানুযায়ী মসজিদে নববীতে হাযির হওয়ার চেষ্টা করতেন এবং যারপর নেই যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন। এমনকি হযরত ওমর (রা) তাঁর প্রতিবেশীর সাথে পালাক্রমে মসজিদে নববীতে আসতেন এবং ঐ দিনের আলোচনা পরস্পর পরস্পর থেকে জেনে নিতেন। এভাবে তাঁরা মসজিদে নববীর মহান শিক্ষকের শিক্ষাকে আত্মস্থ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতেন।
এ বিষয়ে বুখারী শরীফে بَابُ التَّنَاوُبِ فِي الْعِلم অধ্যায়ে বর্ণিত আছে। হযরত ওমর (রা) বলেন,
كُنْتُ أَنَا وَجَارِي مِنَ الْأَنْصَارِ نَتَنَاوَبُ النُّزُولَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ يَنْزِلُ يَوْمًا وَأَنْزِلُ يَوْمًا فَإِذَا نَزَلْتُ يَوْمًا جِئْتُهُ بِخَيْرٍ ذَلِكَ الْيَوْمِ وَإِذَا نَزَلَ فَعَلَ مِثْلَ ذَلِكَ -
"আমি এবং আমার আনসার প্রতিবেশী রসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে পালাক্রমে যেতাম। তিনি একদিন এবং আমি অপরদিন যেতাম। আমি যেদিন যেতাম সেদিনের খবর প্রতিবেশীকে জানাতাম এবং তিনি যেদিন যেতেন, সেদিনের খবর তিনি আমাকে জানাতেন।” (বুখারী ইলম অধ্যায়)
এ ব্যবস্থার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল রসূলুল্লাহ (স)-এর শিক্ষার আসরে অংশ নেয়া। এরকম না হলে, রসূলুল্লাহ (স)-এর বহু শিক্ষা আসর থেকে বঞ্চিত থাকার আশংকা ছিল।
রসূলুল্লাহ (স)-এর ঐ মসজিদটি উত্তম মানুষ ও সুযোগ্য ব্যক্তিত্ব সৃষ্টির প্রতিষ্ঠান ছিল। যেখান থেকে কুরআনের স্পর্শে বহু ছাগল ও উটের রাখাল এবং মূর্তি পূজারী হেদায়াতের ইমাম ও পথ প্রদর্শক হয়েছন। তাঁরা ছিলেন, আল্লাহর দিকে আহবানকারী, বিচারক ও রক্ষক, রাত্রের নিদ্রাত্যাগী ও দিনের শাহসওয়ার। তাঁরা গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন এবং ইসলাম ও শান্তির বাণী প্রচার করেছেন। তাঁরাই মানবতার অজানা মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁদের এ দীনকে আল্লাহ 'সহজ-সরল দীনে ইবরাহীমী' বলে আখ্যায়িত করেছেন।
মসজিদে নববী ছিল যমীনের সাথে আসমানের সংযোগস্থল। এখানেই এমন একটি আসমানী উম্মাহ তৈরি হয়েছে যার কোন নজীর নেই। কেননা, অহীর আলোকে সেটি ছিল মসজিদেরই সৃষ্ট উম্মাহ। অহীর ভিত্তিতে মসজিদে নববী মোমেন ও একদল নেক লোক সৃষ্টি করেছে। ঐ মসজিদ থেকেই হযরত আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী, সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস, যোবায়ের বিন আ'ওয়াম, খালেদ বিন ওয়ালিদ, আবদুর রহমান বিন আওফ, মেকদাদ বিন আসওয়াদ, মেকদাদ বিন আমর এবং আবু ওবায়দাহ বিন জাররাহ (রা)-এর মত নেক ও প্রতিভাবান লোক তৈরি হয়েছিলেন। তাঁরা এমন ধরনের সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাঁরা নিজেদের চরিত্র ইনসাফ ও দীনী গুণ-বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে তীর ও তলোয়ারের আগেই দুনিয়া জয় করেছিলেন। তাঁরা ছিলেন বিশ্বের শিক্ষক ও সম্রাট।
মসজিদে নববী থেকে প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম ও যুগস্রষ্টা মনীষী তৈরি হয়েছেন। আরো তৈরি হয়েছেন ফকীহ ও মোহাদ্দিস। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ, আবদুল্লাহ বিন ওমর, ইমাম আবু হানীফা, মালেক বিন আনাস, মুহাম্মাদ, শাফেঈ, আহমদ বিন হাম্বল, বুখারী ও মুসলিমের মত প্রথিতযশা প্রদীপ ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূর্য। তাঁদের জ্ঞান সাগরে ডুব দিয়ে কত লোক ঝিনুক কুড়িয়েছে এবং তাদের সাহিত্য ও চরিত্র এবং প্রজ্ঞা থেকে কতলোক সিন্ধু সেঁচে মুক্তা পেয়েছে!
এ বিষয়ে কেউ কেউ বলেছেন, কিছু কিছু আলেম বিশেষ বিশেষ মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মদীনার মসজিদে নববীতে ইমাম মালেক বিন আনাস, ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইদরিস শাফেঈ (র) মিসরের ফোস্তাত জামে মসজিদে, কুফা ও বাগদাদের মসজিদে ইমাম আবু হানীফা নোমান এবং বাগদাদের মসজিদে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এটাতো গেল ফিকাহ শাস্ত্র।
হাদীস শাস্ত্রের ইমামগণও মসজিদ ভিত্তিক গবেষণা, সংগ্রহ ও শিক্ষাদানে ব্যস্ত ছিলেন। এসহাক বিন রাহওয়াই, ইমাম বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ মসজিদেই হাদীস শাস্ত্রের সেবা আঞ্জাম দিয়েছেন।
অনুরূপভাবে, প্রখ্যাত. আরবী সাহিত্যিক জাহেজসহ আরো অগণিত সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবী পণ্ডিতেরা মসজিদেই লেখা-পড়া করেছেন। বর্তমান যুগের প্রসিদ্ধ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁরা বের হননি।
রসূলুল্লাহ (স) ছিলেন, মহান মসজিদে নববীর শিক্ষক ও মানবতার পথপ্রদর্শক। আল্লাহ্ তাঁকে এ দায়িত্ব সহকারে পাঠিয়ে বলেছেন:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّينَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ أَيْتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ ، وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضللٍ مُّبِين - (الجمعة : (٢)
“তিনি (আল্লাহ) সেই সত্তা যিনি নিরক্ষর লোকদের মাঝে তাদের মধ্য থেকে একজন রসূল পাঠিয়েছেন। রসূল তাদের কাছে আয়াত পাঠ করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও কৌশল শিক্ষা দান করেন। অথচ ইতিপূর্বে তারা প্রকাশ্য গোমরাহীর মধ্যে ছিল।” (সূরা জুমআঃ ২)
এ আয়াতে আল্লাহ রসূলুল্লাহ (স)-কে শিক্ষক ও পরিশুদ্ধকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি তাত্ত্বিক জ্ঞানের সাথে সাথে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণও দান করেছেন। পরিশুদ্ধ করার অর্থ হল, ব্যবহারিক (Practical) প্রশিক্ষণ। কুরআন যে সকল আচরণ ও গুণাবলী অর্জন এবং দোষ-ত্রুটি থেকে দূরে থাকার কথা বলেছে, তিনি সেই আলোকে সাহাবায়ে কেরামকে বাস্তব ট্রেনিং দিয়েছেন, ছাত্ররা সেই বাস্তব ট্রেনিং-এর আলো গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ করেছেন, ইসলামী আদর্শ এক অতুলনীয় মানব কল্যাণমূলক জীবন ব্যবস্থা। শুধু তাই নয়, অতি অল্প সময়ের মধ্যে তদানীন্তন বিশ্বের দুই পরাশক্তি রোম ও পারস্য, ইসলামী শক্তির প্রভাবাধীনে এসে যায়। মানবতার মুক্তিদূত মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহর তাত্ত্বিক ও বাস্তব প্রশিক্ষণ লাভ করার পর ঐ বিজয় কেন কঠিন হবে?
ইসলামে মসজিদের ভূমিকা হচ্ছে, গণ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মত। তাতে দারস ও শিক্ষা এবং ওয়াজ-নসীহত চলে। ছোট বড় ও নারী পুরুষ সবার জন্য ঐ শিক্ষা। প্রত্যেকেই নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ অনুযায়ী সেই সকল শিক্ষা থেকে উপকৃত হয়।
مسজিদকে মাদ্রাসা বা বিদ্যালয় এজন্য বলা হয় যে, তাতে ইসলামী সংস্কৃতির ভিত্তি রচনা করা হয় এবং পরে এর দেয়াল ও ছাদ নির্মাণ করা হয়। মসজিদে দীনী ও দুনিয়াবী সকল ধরনের শিক্ষা দেয়া হয়। কুরআন, হাদীস, ইসলামী শরীয়াহ বা আইন, ফিকাহ্, ভাষা, বিজ্ঞান, দর্শন, অংক, সমাজ বিজ্ঞান ও সাহিত্য শিক্ষা দিতে কোন বাধা নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে, জাগতিক বা দুনিয়াবী জ্ঞান অর্জন ফরযে কেফায়াহ। একদল শিক্ষা লাভ করলে অন্যদের ওপর থেকে ফরযে কেফায়াহর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়।
মসজিদের জ্ঞান সেবার ব্যাপারে রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন,
مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتِ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُوْنَهُ بَيْنَهُمْ إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفْتُهُمُ الْمَلَائِكَةُ وَذَكَرَ هُمُ اللَّهُ فِيْمَنْ عِنْدَهُ -
"কোন সম্প্রদায় যদি আল্লাহর ঘরে একত্রিত হয়ে কুরআন পাঠ করে ও তার শিক্ষা গ্রহণ করে, তাহলে তাদের ওপর শান্তি নাযিল হয়, আল্লাহর রহমত তাদেরকে ঢেকে ফেলে, ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে এবং মহান আল্লাহ তাঁর নিকট মওজুদ ফেরেশতাদের কাছে তাদের কথা আলোচনা করেন।” (মুসলিম)
আমাদের কতই না সৌভাগ্য। ইবাদাতের জন্য মসজিদে ঢুকে আত্মার পবিত্রতা অর্জনের সাথে সাথে দীন ও দুনিয়ার জন্য চলার উপযোগী জ্ঞান নিয়ে আমরা বের হয়ে আসতে পারি।
শিক্ষা ইসলামী দাওয়াতী কাজের উৎস এবং অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন। ইসলাম যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, তাই তাকে জানা ও বুঝা অত্যন্ত জরুরী। ইসলাম একটি কল্যাণ রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। সেখানে সুখ-শান্তি অবশ্যই থাকবে। তাই সেখানে ইসলামের দাওয়াতী কাজের জন্য ইসলামের জ্ঞানের অস্ত্রে সজ্জিত একদল লোককে তৈরি করতে হবে। যাদের নিকট দলীল-প্রমাণ ও বিরোধীদের প্রশ্ন এবং আক্রমণের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়ার ক্ষমতা থাকবে। সে জন্য ইসলামী শিক্ষার বিস্তার প্রয়োজন। আর রসূলুল্লাহ (স)-কে এ ব্যাপারে নিজ হাতে প্রথমে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়েছে। তাই তিনি মসজিদে নববীকে মাদ্রাসা হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে তাতে শিক্ষা দেন।
ইতিহাস সাক্ষী, ইসলামের পূর্বে আরবদের মধ্যে ভালভাবে লেখা-পড়ার অধিকারী লোকের সংখ্যা খুব বেশী ছিল না। কাল্কাসনাদী বলেছেন, রসূলুল্লাহ (স) নবুয়াত লাভের সময় আরবদের মধ্যে লেখকের সংখ্যা তের থেকে ১৯ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। ১
রসূলুল্লাহ (স)-এর লক্ষ্য ছিল, মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের জ্ঞান বিস্তার করা। যাতে করে তারা দীনী দাওয়াতের ঝাণ্ডা বহন করতে সক্ষম হয়। রসূলুল্লাহ (স) জ্ঞান শিক্ষাদানে কত বেশী আগ্রহী ছিলেন তা বুঝা যায় বদরযুদ্ধের বন্দীদেরকে জ্ঞান শিক্ষাদানের বিনিময়ে মুক্তি দেয়ার ঘটনা থেকে। তিনি অর্থদানে অক্ষম শিক্ষিত বন্দীদের মুক্তির মোকাবিলায় প্রত্যেককে ১০ জন মুসলিম শিশুকে লেখা ও পড়া শিক্ষাদানের শর্ত আরোপ করেন।
শিক্ষা গ্রহণের জন্য রসূলুল্লাহ (স) যথেষ্ট উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, 'সুদূর চীন দেশে গিয়ে হলেও জ্ঞান অর্জন কর।' অনুরূপভাবে, যারা, মসজিদে শিক্ষা গ্রহণ কিংবা শিক্ষাদানের জন্য আসেন তিনি তাদেরকে আল্লাহর রাস্তার মোজাহিদের সমমর্যাদার অধিকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পক্ষান্তরে যারা মসজিদে দর্শক হিসেবে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে কোন কিছু শিখে না, তাদের এই আচরণকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ মর্মে হয়রত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :
مَنْ دَخَلَ مَسجِدَنَا هَذَا لِيَتَعَلَّمَ خَيْرًا أَوْ لِيُعَلِّمَهُ كَانَ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَنْ دَخَلَهُ لِغَيْرِ ذَلِكَ كَانَ كَالنَّاظِرِ إِلَى مَا لَيْسَ لَهُ -
"যে আমাদের এ মসজিদে কিছু ভাল জিনিস শিখতে কিংবা শিখাতে- আসে, সে যেন আল্লাহর পথের মোজাহিদ। আর যে এটা ব্যতীত মসজিদে প্রবেশ করে, সে যেন এমন জিনিসের দর্শক যা তার জন্য নেই।" (নাইলুল আওতার, ২য় খণ্ড, ১৬৫ পৃঃ)
রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "প্রত্যেক নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরয।" তিনি আরো বলেছেন, "মানুষ দুই প্রকার- জ্ঞানী ও ছাত্র। এই দুই ধরনের লোক ব্যতীত অন্যদের মধ্যে কোন কল্যাণ নেই।" ১
তিনি আরো বলেছেন, "যে জ্ঞান অর্জন করে, আল্লাহ তার রিযকের জিম্মাদার হন।” ২
তিনি আরো বলেন, "তোমরা শৈশবের দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান আহরণ কর।” ৩
তিনি এ পর্যন্ত বলেই ক্ষান্ত হননি। বরং অব্যাহত জ্ঞান আহরণের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন:
لَا يَزَالُ الرَّجُلُ عَالِمًا مَا طَلَبَ العِلْمَ فَإِذَا ظَنَّ أَنَّهُ قَدْ عَلِمَ فَقَدْ جَهِلَ -
"ব্যক্তি যে সময় পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করে সে সময় পর্যন্ত আলেম বা জ্ঞানী থাকে। যখন সে ধারণা করে যে, শিখে ফেলেছে, তখনই সে অজ্ঞ-মূর্খের কাতারে নাম লেখায়। ১
রসূলুল্লাহ (স) নিজে মসজিদে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ শিক্ষা দিতেন। তিনি মসজিদে নামাযের বাস্তব প্রশিক্ষণ দিতেন। একজন গ্রামীন আরব বেদুইন মসজিদে নববীতে এসে নামায পড়া শুরু করল। কিন্তু ঠিকমত পড়তে পারল না। তখন রসূলুল্লাহ (স) তাঁকে বিশুদ্ধ পদ্ধতিতে নামায এবং নামাযে প্রয়োজনীয় বিনয় ও প্রশান্তির শিক্ষা দান করেন। তিনি বেদুইনকে তিনবার নামায পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে তা ভালভাবে শিক্ষা দেন। তিন-তিনবার নামাযের ভুলের জন্য তিনি তাকে তিরস্কার কিংবা ভর্ৎসনা করেননি। বরং তিনি তাকে এমন উত্তম পদ্ধতিতে নামায শিক্ষা দিয়েছেন, সে বুঝতেই পারেনি রসূলুল্লাহ (স) রাগ করেছেন।
মসজিদে নববীতে সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে লোকেরা তাঁকে ইসলামের রোকন কিংবা মৌলিক বিষয়গুলোসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করতেন এবং তিনি জবাব দিতেন।
এ প্রসঙ্গে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, "একদিন আমরা মসজিদে বসা। তখন এক ব্যক্তি উটের ওপর আরোহণ করে মসজিদে প্রবেশ করে এবং উটটিকে মসজিদে বেঁধে জিজ্ঞেস করে 'তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ কে?' রসূলুল্লাহ (স) আমাদের মাঝে হেলান দেয়াবস্থায় বসা ছিলেন। আমরা জবাব দিলাম, 'হেলান দেয়া সাদা লোকটি।' লোকটি জিজ্ঞেস করেন, 'হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।' রসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলেন, 'জ্বি-হাঁ।' লোকটি বলেন, "আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবো এবং কড়াভাবেই জিজ্ঞেস করবো। আপনি কিছু মনে করবেন না।”
রসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলেন, 'আপনার যা ইচ্ছা তাই জিজ্ঞেস করুন।' লোকটি বলেন, 'আমি আপনাকে আপনার ও আপনার পূর্ববর্তী লোকদের রবের কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি। আল্লাহ কি আপনাকে সকল মানুষের কাছে রাসূল করে পাঠিয়েছেন?' রসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'ইয়া আল্লাহ! হাঁ।' লোকটি বলেন, 'আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ সহকারে জিজ্ঞেস করছি, 'আল্লাহ কি আপনাকে দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন?' রসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'ইয়া আল্লাহ! হাঁ।' লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, 'আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, 'আল্লাহ কি আপনাকে এই মাসে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন?' রসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'ইয়া আল্লাহ! হাঁ।' লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করেন, 'আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, 'আল্লাহ কি আপনাকে আমাদের ধনীদের কাছ থেকে যাকাত নিয়ে গরীবদের মধ্যে বন্টনের আদেশ দিয়েছেন?' রসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'ইয়া আল্লাহ! হাঁ।' এবার লোকটি বলেন, "আমি আপনার নবুয়াতের প্রতি ঈমান আনলাম এবং আমার কাওমের লোকদের কাছে আপনার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবো। আমার নাম দামাম বিন সা'লাবা এবং আমি বনি সা'দ বিন বকরের ভাই।” (বুখারী-কিতাবুল ইলম)
ইমাম বুখারী (র) এ বিষয়ে আরো উল্লেখ করেছেন, "একদিন রসূলুল্লাহ (স) লোকদের মাঝে বসা ছিলেন। তখন তিন ব্যক্তি আসল। দু'জন রসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে গেলেন এবং অন্যজন চলে গেলেন। দু'জনের মধ্যে একজন মসজিদের মজলিসে একটুখানি জায়গা পেয়ে সেখানে বসেন। অন্যজন বসেন পেছনে। ৩য় ব্যক্তি মসজিদ থেকে চলে গেল। রসূলুল্লাহ (স) অবসর হওয়ার পর বললেন, "আমি কি তোমাদেরকে এই তিনব্যক্তি সম্পর্কে কিছু বলবো না? তাদের একজন আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছেন; আল্লাহ তাকে আশ্রয় দিয়েছেন। অন্যজন লজ্জাবোধ করেছেন; আল্লাহও তার ব্যাপারে লজ্জা বোধ করেন। ৩য় জন ফিরে গেল; আল্লাহও তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।" (বুখারী-কিতাবুল ইলম)
একদিন রসূলুল্লাহ (স) নিজ হুজরাহ থেকে বেরিয়ে মসজিদে প্রবেশ করেন এবং তাতে দুইদল লোককে বসা দেখতে পান। এক দলে রয়েছেন এমন লোক যারা কুরআন পড়তে পারেন এবং আল্লাহকে ডাকতে পারেন। অপর দলে রয়েছেন এমন লোক যারা লোকদেরকে দীন শিক্ষা দিচ্ছেন। রসূলুল্লাহ (স) বলেন, "তোমরা প্রত্যেকেই ভাল। (প্রথমোক্ত) দল কুরআন পড়েন ও আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে দানও করতে পারেন কিংবা নিষেধও করতে পারেন। আর (২য় দল) তারা নিজেরা শিখে ও লোকদেরকে শিখায় এবং আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।" তারপর তিনি তাদের কাছে (২য় দল) যান ও সেখানে বসেন। (ইবনে মাজাহ-১ম খণ্ড, পৃঃ ৪৯)
এ ছাড়াও রসূলুল্লাহ (স) মসজিদে বসতেন এবং সাহাবায়ে কেরام তাঁর কাছে বসে জ্ঞান বা ইলম চর্চা করতেন। বিশেষ করে, তিনি অহী লেখক সাহাবায়ে কেরামের কাছে যখন যতটুকু অহী নাযিল হত তা তেলাওয়াত করতেন এবং তাঁরা তা লিখতেন। হযরত যায়েদ বিন সাবেত সহ বেশ কয়েকজন সাহাবী অহী লেখক ছিলেন।
অপরদিকে, সাহাবায়ে কেরাম সকালে নামায পড়ার পর বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে মসজিদে নববীতে কুরআন পাঠ করতেন এবং ফরয ও ওয়াজিব শিক্ষা গ্রহণ করতেন।
রসূলুল্লাহ (স)-এর মদীনার জিন্দেগীতে সাহাবায়ে কেরামের সাথে ঘরে বসে কোন বৈঠক, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও শলা-পরামর্শ করার কোন নজীর নেই। বরং জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে সকল আলোচনা, শিক্ষা, ওয়াজ-নসীহত এবং আদেশ-নিষেধ মসজিদে বসেই দিয়েছেন। সে জন্য পৃথক কোন ঘর বা অফিস তৈরি করেননি। ছোট থেকে বড় সকল বিষয়ে তিনি মসজিদে নববীতে বসেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং যুদ্ধ-সন্ধি, অর্থনীতি-রাজনীতি ও সামাজিক পরিকল্পনা মসজিদে বসেই গ্রহণ করেছেন।
রসূলুল্লাহ (স)-এর দুনিয়া ত্যাগের পর সাহাবায়ে কেরাম (রা) মসজিদে নববীতে লোকদেরকে দীন শিক্ষা দিতেন। সেখানে প্রশ্নোত্তরের আসর বসত এবং বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্নের জবাব দিতেন। হযরত ওমর বিন খাত্তাব, আলী বিন আবী তালেব, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ, আবদুল্লাহ বিন ওমর, আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস, আনাস বিন মালেক, যায়েদ বিন সাবেত, মু'আয বিন জাবাল, আবু হোরায়রা, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস, আবু মূসা আশআরী এবং ওবাদাহ বিন সামেত (রা) প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম (রা) মসজিদে নববীতে লোকদেরকে শিক্ষা দান করতেন।
হযরত ওবাদাহ বিন সামেত (রা) আহলে সুফফাহকে পড়া ও লেখা শিক্ষা দিতেন।
অনুরূপভাবে সাহাবাদেরকে দর্শনকারী তাবেঈগণও সাহাবাদের অনুসরণে মসজিদে নববীতে বসে লোকদেরকে ওয়াজ-নসীহত করতেন এবং তাদেরকে দীনের মৌলিক বিষয়গুলো শিক্ষা দিতেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হচ্ছেন, সাঈদ বিন মুসাইয়্যেব, ওরওয়াহ বিন যোবায়ের, আবদুল্লাহ বিন ওমরের দাস সালেম, মুজাহিদ, সাঈদ বিন জোবায়ের এবং মালেক বিন আনাস প্রমুখ। রাবীআ'তুররায় মসজিদে নববীতে মালেক বিন আনাস (মালেকী মাযহাবের ইমাম) এবং হাসান বসরীকে শিক্ষা দিয়েছেন। রাবীআ'তুররায় ছিলেন সেই যুগের শ্রেষ্ঠ ফকীহ্।
তাঁর সম্পর্কে ইমাম মালেক বলেন, রাবীআ'র মৃত্যুর পর ফেকাহ শাস্ত্রের মজা বিদায় নিয়ে গেছে। ১
হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়েব (রা) সহ মদীনার অন্যান্য ফকীহগণ মসজিদে নববীতে ফতোয়া দিতেন এবং ইসলামী জ্ঞান-গবেষণা ও ইজতিহাদে ব্যস্ত থাকতেন। অপর দিকে, ইমাম মালেক (র) মসজিদে নববীতে বসেই হাদীস বর্ণনা করতেন এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে বসেই প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থ 'আল-মুআত্তা' রচনা করেন।
মসজিদে নববী ছিল ফেকাহ শাস্ত্রের কেন্দ্র ইমাম মালেক (র)-এর মালেকী মাযহাবের উৎপত্তি এ মসজিদ থেকেই। এর পরবর্তী যুগে, ইমাম বাকের ও জা'ফর সাদেক মসজিদে নববীতে লোকদেরকে ফেকাহ ও অসুলে ফেকাহ শিক্ষা দেন।
মসজিদ পাঠাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। দীনী বই-পুস্তকসমূহ মসজিদে রেখে পাঠকদের চাহিদা পূরণ করা হত। সাধারণত ধনী ও জ্ঞানী-গুণী লোকেরা মসজিদে কিতাব-পত্র ও বই-পুস্তক দান করতেন। পরবর্তীতে দেখা গেছে, খাতীব বাগদাদী নিজ কিতাবসমূহ মসজিদে ওয়াক্ফ করে গেছেন এবং মৃত্যুর আগে তা নিজ বন্ধু আবুল ফজ্বল বিন খাইরুনের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। এ ছাড়া আবদুল্লাহ্ বিন আহমদ আল-মা'রুফ বিন খাশাবসহ আরো অনেকে নিজ কিতাবসমূহ মসজিদে ওয়াক্ফ করে গেছেন।
এ সকল দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, মসজিদ সকল জ্ঞান-গবেষণার উপযুক্ত স্থান। রসূলুল্লাহ (স)-এর মসজিদ থেকেই ঈমান, জিহাদ ও জ্ঞানের ঝাণ্ডা উত্তোলন করা হয়েছে। তাই দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে ওলামায়ে কেরাম মসজিদে বসেই অনুরূপ সেবা আঞ্জাম দিয়েছেন ও দিচ্ছেন।
টিকাঃ
১. সোবহুল আ'সা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১৫।
১. রেসালাতুল মসজিদ ফিল ইসলাম-ডঃ আবদুল আযীয লোমাইলাম-সৌদি আরব।
২. ঐ
৩. ঐ
১. হায়াতু সাইয়েদিল মোরসালিন-১১৮।
১. ওয়াফইয়াতুল আ'ইয়ান- ২য় খন্ড, পৃ:২৯০।
📄 মসজিদে নববীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা
মসজিদ হচ্ছে, তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ গঠন কেন্দ্র। এখানে মানুষকে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ শিক্ষা দেয়া হয় এবং তাদের সকল কাজে উপদেশ দেয়া হয়। সর্বোপরি মসজিদেই আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও ইসলামী আইন-কানুন মানার সর্বোত্তম পরিবেশ পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী।” (আল-কুরআন)
মসজিদে সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধন মজবুত হয় এবং দৈনিক পাঁচবারের সাক্ষাতের ফলে তা আরো সুদৃঢ় হয়। সমাজের শাস্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অনুরূপ সুদৃঢ় সম্পর্কের প্রয়োজন রয়েছে।
মসজিদ অত্যন্ত পবিত্র স্থান। মনের পবিত্রতার ওপর স্থানের পবিত্রতার কার্যকর প্রভাব রয়েছে। আর এর মাধ্যমেই সমাজের বৃহত্তম পবিত্রতার রাজপথ খুলে যাবে। তাই পবিত্রতা অর্জন ছাড়া মুসলমানরা মসজিদে যায় না। তাই পবিত্রতা অর্জনের জন্য উৎসাহিত করে রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "আমি কি তোমাদেরকে এমন কাজের কথা বলবো না যার দ্বারা আল্লাহ গুনাহ মাফ করেন ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন? আর তা হচ্ছে, ভাল করে সুন্দরভাবে অযু করা, বেশী পদক্ষেপ সহকারে মসজিদে যাওয়া এবং মসজিদে নামাযের অপেক্ষা করা। এটা তোমাদের জন্য জিহাদের ময়দানে অবস্থান করে পাহারার কাজের সমতুল্য।” তিনি একথা দু'বার বলেন।' এর মাধ্যমে আমরা সহজেই মসজিদ ভিত্তিক পবিত্রতার সামাজিক অভিযানের মূল্যায়ন করতে পারি।
মসজিদ মুসলমানের জীবনে বিপদ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। বিপদগ্রস্ত লোকেরা দলে দলে কিংবা একাকী মসজিদে দৌড়ে আসে ও আশ্রয় নেয়। সেই কঠিন মুহূর্তে মুসলিম দায়িত্বশীলরা সেখানে একত্রিত হয়ে দুর্যোগের মোকাবিলার উপায় বের করেন।
মসজিদ আদালতের ভূমিকা পালন করে। মসজিদের বিছানা ও খুটির মাঝ থেকে বিচারকের এমন ইনসাফপূর্ণ রায় ঘোষিত হয়েছে যা গোটা মানবতার বিচারের ইতিহাসে সোনালী অক্ষরে লেখা আছে। মসজিদে বসেই বিচারক উটের রাখালের পক্ষে ও আবাসী খলীফা মানসুরের বিরুদ্ধে ইনসাফপূর্ণ রায় ঘোষণা করেছিলেন। বিচারক খলীফার বিরুদ্ধে দরিদ্র-অসহায়-দিনমজুরের পক্ষে রায় ঘোষণা করতে কোন পরোয়া করেননি। ১
মসজিদে প্রবেশের জন্য বয়সের সুনিদ্দিষ্ট কোন সীমা নেই। বরং তাতে বড়-ছোট সবাই প্রবেশ করতে পারে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন বংশ, গোত্র ও বর্ণের লোকদের জন্য মসজিদের দরজা সমানভাবে খোলা। সে জন্যই আমরা দেখি কুরাইশ বংশীয় আবু বকর সিদ্দীক, ভিন্ন গোত্রের আবু যার গিফারী, ইথিওপিয়ার নিগ্রো বেলাল, রোমের শেতাঙ্গ সোহাইব ও পারস্যের সালমান (রা) সমানভাবে মসজিদে প্রবেশাধিকার পেয়েছেন। যিনি বেশী তাকওয়ার অধিকারী তাকেই বেশী সম্মান দেখানো হত।
মসজিদে নারীদেরও প্রবেশাধিকার রয়েছে। তা শুধু পুরুষদের জন্যই সীমাবদ্ধ নয়। নারীরাও মসজিদের জামায়াতে অংশ গ্রহণ করতে পারে এবং মসজিদের খোতবাহ, বক্তৃতা ও ওয়াজ নসীহত শুনতে পারে। আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন,
لَا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللَّهِ مَسَاجِدَ اللَّهِ "তোমরা আল্লাহর দাসীদেরকে মসজিদে বাধা দিও না।"
শুধু তাই নয়, নারীরা মসজিদের আলোচ্য বিষয়েও অংশগ্রহণ করতে পারে। এর উত্তম প্রমাণ হচ্ছে, একবার হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা) বিয়ের দেন-মোহর বেশী বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকায় তা সীমিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং আদেশ দেন "তোমরা ৪০ উকিয়ার বেশী স্ত্রীদের দেন-মোহর নির্ধারণ করবে না। কেউ বেশী নির্ধারণ করলে, অতিরিক্ত অংশ বাইতুল মালে জমা করা হবে।" তখন মসজিদে উপস্থিত একজন মহিলা প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, "হে ওমর! বিষয়টি তোমার এখতিয়ারে নয়। তুমি এ রকম কি করে করবে”? অথচ আল্লাহ বলেছেন :
وَإِنْ أَرَدْتُمُ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَّكَانَ زَوْجٍ وَ أَتَيْتُمْ أَحَدُ هُنَّ قِنْطَارًا فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا ، آتَاخُذُونَهُ بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِيناً -
"তোমরা যদি এক স্ত্রীর পরিবর্তে অন্য স্ত্রীকে বিয়ে করতে চাও এবং তাকে যদি বিপুল পরিমাণ সম্পদ (দেন-মোহর) দিয়ে থাক, তাহলে তা থেকে কোন কিছু রেখে দেবে না। তোমরা কি তা অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহর জন্য গ্রহণ করবে?" (আন নিসা : ২০)
যাই হোক, হযরত ওমর (রা) মহিলার কথা ভালভাবে চিন্তা করলেন এবং যখন বুঝতে পারলেন যে, মহিলার বক্তব্য ঠিক, তখন তিনি নিজের মত পরিবর্তন করতে মোটেই ইতস্তত করলেন না। এ প্রসঙ্গেই একটি ঐতিহাসিক প্রবাদ তৈরি হয়েছে। আর তাহল, أَخْطَأَ عُمَرُ وَاصَابَتْ إِمْرَأَةً "ওমর ভুল করেছেন এবং স্ত্রীলোকটি ঠিক বলেছে।” এভাবে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নারীদের প্রতি মসজিদের ভূমিকা কিংবা মসজিদে নারীদের ভূমিকা কি ছিল। তারা মসজিদ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন এবং ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার বিকাশে অংশ নিয়েছেন। আরেক হাদীসে রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, 'তাদের জন্য ঘরই উত্তম।' মহিলাদের জন্য ঘর উত্তম হওয়া সত্ত্বেও তারা মসজিদে যেতে চাইলে বাধা দেয়া যাবে না। হযরত আয়েশার মতে, ফেতনার আশংকা থাকলে নারীরা মসজিদে যেতে পারবে না। তিনি বলেন, মহিলারা পরবর্তীতে যে ফেতনা সৃষ্টি করছে তা যদি রসূলুল্লাহ (স) দেখতেন, তাহলে তাদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করতেন।
রসূলুল্লাহ (স) মসজিদে ন্যায়-নীতি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং বিভিন্ন দণ্ডবিধি ও শান্তি কার্যকর করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল, যেন ধনী-গরীব, ছোট-বড়, শক্তিশালী ও দুর্বল সবাই ঐ ন্যায়-নীতি দেখে চরিত্র গঠন করতে পারে। মসজিদে অবস্থিত এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (স)-কে লক্ষ্য করে আহবান জানায়, হে আল্লাহর রসূল। আমি যেনা করেছি। রসূলুল্লাহ (স) তাঁর দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন। তারপর সেই ব্যক্তি নিজের অপরাধের ব্যাপারে চারবার সাক্ষ্য দেয়ার পর রসূলুল্লাহ (স) তাকে প্রশ্ন করেন, 'তুমি কি পাগল'? লোকটি বলেন, 'না'। তারপর তাকে প্রশ্ন করেন, 'তুমি কি বিয়ে করেছ?' সে জওয়াব দেয়, 'হাঁ'। তখন রসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'তাকে নিয়ে যাও এবং পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা কর।' ১
হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ (স) জুমার নামাযের খুতবাহ দেয়ার সময় এক ব্যক্তি এসে বলেন, হে আল্লাহর রসূল। আমার ওপর দণ্ডবিধি কার্যকর করুন।
অনুরূপ আরেক ঘটনা হচ্ছে, এক ব্যক্তি এক বাগানের মালিককে হত্যা করে। তারপর নিহত ব্যক্তির দুই ছেলে হত্যাকারীর বিরুদ্ধে হযরত ওমরের কাছে বিচার প্রার্থনা করে। কিন্তু বাদী পক্ষ হত্যাকারীর সত্যবাদিতা দেখে তাকে ক্ষমা করে দেয়।
মসজিদে বর্ণিত দীনী জ্ঞান চর্চাই সব কিছু ছিল না। বরং তা ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চারও উপযুক্ত ময়দান। তাতে যুদ্ধের বিজয় গাঁথাও গাওয়া হত। হযরত হাসান বিন সাবিত মসজিদে নববীতে কবিতা আবৃত্তি করতেন। কিন্তু রসূলুল্লাহ (স) তাঁকে নিষেধ করেননি। যে গান বা কবিতায় আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রশংসা কিংবা ইসলামের প্রতিরক্ষার বিষয়বস্তু থাকবে, তা অবশ্যই উত্তম জিনিস। তাই রসূলুল্লাহ (স) তাঁকে বারণ করেননি।
একদিন হযরত হাসান (রা) কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। হযরত ওমর (রা) মসজিদে তাঁর দিকে নজর দেন। তখন হাসান বলেন, 'আমি এই মসজিদে আপনার চাইতে উত্তম ব্যক্তির উপস্থিতিতে কবিতা আবৃত্তি করেছি। তখন ওমর (রা) চলে যান এবং বুঝতে পারেন যে, হাসান রসূলুল্লাহর (স) প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
একদিন কা'ব বিন যোহাইর মসজিদে নববীতে রসূলুল্লাহ (স)-সহ সাহাবায়ে কেরামের সামনে ফজর বাদ 'বানাত্ সোআদ' নামক প্রখ্যাত আরবী কবিতাটি পাঠ করেন। অথচ, ইতিপূর্বে রসূলুল্লাহ (স) তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণা করেছিলেন। তারপর যোহাইর নবীর (স) কাছে ঐ কবিতার দোহাই দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এরপর নবী (স) তাঁর ওপর থেকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রত্যাহার করেন এবং মৃত্যুদণ্ডের বিনিময়ে ১শ উট দানের নির্দেশ দেন।
এ প্রসঙ্গে ইবনে কাসীর উল্লেখ করেছেন ১ কা'ব বিন যোহাইর ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি তাঁর উল্লেখিত কবিতায় রসূলুল্লাহ (স)-এর প্রশংসা করেছেন। তারপর উটের পিঠে সওয়ার হয়ে মসজিদে নববীর দরজায় এসে অবতরণ করেন এবং মসজিদে প্রবেশ করেন। তখন রসূলুল্লাহ (স) মসজিদে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামের গোলাকার অধিবেশনে আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। কা'ব বলেন, আমি মসজিদের দরজায় উট থেকে নেমে পড়ি, রসূলুল্লাহকে তাঁর গুণাবলীর মাধ্যমে চিনতে পেরে তাঁর কাছে গিয়ে বসি এবং ইসলাম কবুলের ঘোষণা দেই। আমি বলি, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং আপনি মুহাম্মাদ (স) হচ্ছেন আল্লাহর রসূল। হে আল্লাহর রসূল। আমাকে নিরাপত্তা দিন।” রসূলুল্লাহ (স) তাঁকে নিরাপত্তা দান করেন।
মসজিদ মুসলমানদের সামাজিক কার্যক্রমের কেন্দ্রও বটে। এতে মুসলমানরা একে অপরের সাথে মিলিত হয়। ফলে মসজিদ মিলনকেন্দ্রের কাজ করে। সমাজের অন্যান্য মিলনকেন্দ্রের মতই মসজিদও একই ভূমিকা পালন করে।
মসজিদে ঈদোৎসব সহ বিভিন্ন দীনী ও ধর্মীয় উৎসব পালন করা হয়। ফলে, মসজিদ দীনী উৎসবের পালনকেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা পালন করে থাকে।
এছাড়াও মসজিদে বিয়ে অনুষ্ঠান অন্যতম সামাজিক কাজ। তাই যারাকশী রসূলুল্লাহ (স) থেকে বর্ণিত এক হাদীসের আলোকে মসজিদে বিয়ে অনুষ্ঠানকে মোস্তাহাব বা উত্তম বলেছেন। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন,
أَعْلِنُوا هَذَا النِّكَاحَ وَاجْعَلُوهُ فِي الْمَسَاجِدِ -
"তোমরা মসজিদে বিয়ের ঘোষণা দাও এবং মসজিদে বিয়ে অনুষ্ঠান সম্পন্ন কর।” (তিরমিযী)
এ হাদীসের আলোকে মসজিদে বিয়ে অনুষ্ঠান সুন্নাত। মক্কার মসজিদে হারাম ও মদীনার মসজিদে নববীতে অতীত থেকে আজ পর্যন্ত অগণিত বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
মসজিদের সামাজিক ভূমিকা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে ইবনে জোবায়ের এবং ইবনে বতুতার মত বিশ্ব পর্যটকের মন্তব্য ও বক্তব্য থেকে। তাঁরা যখনই কোন নতুন দেশে গিয়েছেন, যেখানে কোন পরিচিত লোকজন নেই, সেখানেই তাঁরা প্রথমে মসজিদে হাযির হয়েছেন। মসজিদে স্থানীয় কিংবা প্রবাসী লোকজনের সাথে পরিচিত হওয়ার পর তাদের থাকা-খাওয়ার আর কোন সমস্যা হয়নি। স্থানীয় লোকেরা পর্যটক আলেমের সন্ধান পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং কোন কোন সময় তাদের যোগ্যতা ও মর্যাদা মোতাবেক উপযুক্ত কাজে যোগদানেরও আহবান জানান। ১
মূলত মসজিদ হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ এবং মুসলিম লোকজনের সাথে সাক্ষাতের উত্তম কেন্দ্র। আজও মসজিদ যে কোন বিদেশী মুসলমান মেহমানের যোগাযোগ ও আশ্রয়ের উত্তম কেন্দ্র। মেহমান বিদেশী হওয়া সত্ত্বেও মেজবান তাকে আপন মনে করে এবং ভাষা ও ভৌগলিক এলাকার ব্যবধান ভুলে একাকার হয়ে যায়। কেননা, তারা দীনী ভাই এবং একই উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত। মসজিদের বরকতে, বিদেশী কোন মুসলমান পরদেশেও নিজেকে পর মনে করে না। বরং স্থানীয় মুসলমানগণ বিদেশী কোন মুসলমানকে মসজিদে দেখলে তার প্রতি যথার্থ সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন।
মসজিদ দীন ও দুনিয়ার কল্যাণের দিশারী। যারা মসজিদে সমবেত হয় তাদের মধ্যে কোন হিংসা-বিদ্বেষ, গর্ব-অহংকার কিংবা শত্রুতা থাকে না। উপস্থিত সবাই নিজেকে আল্লাহর ঘরে আল্লাহর মেহমান মনে করে এবং স্বয়ং আল্লাহ তাদের তদারক করছেন বলে অনুভব করে। তাই সেখানে সমাজের উন্নয়নে কোন পরিকল্পনা নিলে তা স্বার্থপরতার উর্ধ্বে ও একান্ত কল্যাণের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হতে বাধ্য। এর বিপরীত কোন ক্লাব কিংবা হলে কাউকে আমন্ত্রণ জানালে এবং সেখানে উপস্থিত লোকদেরকে নিয়ে কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করলে তা স্বার্থপরতার দোষে দুষ্ট হতে পারে। মসজিদে কোন আমন্ত্রণকারী কিংবা আমন্ত্রিত কেউ নেই। স্বয়ং আল্লাহই হচ্ছেন সেখানকার আমন্ত্রণকারী এবং বান্দাহরা হচ্ছেন আমন্ত্রিত। তাই তারা আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে যে কোন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারেন। তাই ইবাদাতের সাথে সাথে মসজিদ পরোক্ষভাবে, মুসলমানদের হালাল কামাই রোজগারের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে।
মসজিদ হাসপাতাল হিসেবেও সেবা দান করে। ইসলামের ইতিহাসে সংঘটিত যুদ্ধসমূহে মসজিদের একাংশকে যুদ্ধাহত মোজাহেদীনের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হত। এর উত্তম উদাহরণ হল আহযাব যুদ্ধে আওস বংশের নেতা আহত সা'দ বিন মোআ'যকে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবার জন্য রসূলুল্লাহ (স) মসজিদে একটি তাঁবু কায়েমের নির্দেশ দেন। (বুখারী-১ম খণ্ড) সেখানে তাঁর চিকিৎসা করা হয়। আনসারী মহিলা সাহাবী রাফিদাহ (রা) ঐ তাঁবুতে যুদ্ধাহত মুসলিম সেনাদের চিকিৎসা-সেবা আঞ্জাম দেন। সম্ভবত আহযাব যুদ্ধের বেশ আগেই তাঁবুটি মসজিদে নির্মিত হয়েছিল।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, "মসজিদ হচ্ছে নেতাদের প্রশাসনিক ভবন এবং উম্মাহর সভাকক্ষ। রসূলুল্লাহ (স) তাকওয়ার ওপর নিজ মসজিদের ভিত্তি রচনা করেন। তাতে নামায, কেরাত, যিকর, জ্ঞান শিক্ষা, বক্তৃতার অনুশীলন, রাজনীতি চর্চা, যুদ্ধের পতাকা উত্তোলন, গভর্ণরদের প্রতি আদেশ, বিজ্ঞলোকদের পরিচিতি অনুষ্ঠান ইত্যাকার কাজসহ মুসলমানগণ নিজেদের দীনী ও দুনিয়াবী বিষয়ে আলোচনা ও সমাধানের জন্য মসজিদে একত্রিত হন।" ১
ওস্তাজ আলী তানতাভী আরব বিশ্বের একজন প্রখ্যাত আলেম ও পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি মসজিদের ভূমিকা সম্পর্কে বলেছেন: ২
"মসজিদ হচ্ছে, ইবাদাতের স্থান, পার্লামেন্ট, মাদ্রাসা, মজলিস ও আদালত।" তিনি এগুলোর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ইবাদাতখানা অর্থ হচ্ছে, মুসলমানরা হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, ফেতনা-ফাসাদ ও মন্দের অনুভূতি ত্যাগ করে ঈমানের উপযোগী খোলা মন নিয়ে বিনয়ের সাথে আকাশের দিকে রহমতের প্রত্যাশী হয়ে এক সারিতে দাঁড়ায়। এতে ছোট, বড়, ধনী-গরীব, উঁচু-নীচু সবাই একাকার হয়ে যায় এবং একজন অন্য জনের পায়ের সাথে পা, কাঁধের সাথে কাঁধ ও শরীরের সাথে শরীর লাগিয়ে সমানভাবে আল্লাহর দরবারে দাঁড়ায়। ইবাদাতের ময়দানে সবাই সমানভাবে নন্দিত ও সম্মানিত।
পার্লামেন্ট বলতে বুঝায়, মুসলমানদের জীবনে যখনই কোন বড় সংকট কিংবা নেতৃত্বের সমস্যা দেখা দেয় তখনই এই বলে ডাক দেয়া হয়, 'নামায কায়েম হতে যাচ্ছে।' লোকেরা নামাযে সমবেত হওয়ার পর আহূত সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা হয়। তাতে খলীফার নির্বাচন, বাইআত গ্রহণ, শরীয়াতের দৃষ্টিকোণ থেকে আইন প্রণয়নসহ এ জাতীয় সমস্যার সমাধান বের করে উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেয়া হয়।
মজলিস বলতে বুঝায়, কোন গভর্ণর কোন শহরে আগমন করলে তিনি প্রথমে সেই শহরের জামে' মসজিদে প্রবেশ করেন এবং মসজিদের মিম্বার থেকে সরকারের নীতি ও পদ্ধতি ঘোষণা করেন।
টিকাঃ
১. রেসালাতুল মসজিদ ফিল ইসলাম-ডঃ আবদুল আযীয লোমাইলাম।
১. আল-জামে আল-উমাতী ফি দিমাস্ক- শেখ আলী তানতাওয়ী।
১. ফাতহুল বারী- ১২শ খণ্ড, পৃঃ ১২০-১২২।
১. আসীরাতুন নাবুবিয়াত- ৩য় খণ্ড, ৭০৬ পৃঃ।
১. আসসীরাতুন নাবুবিয়াহ, ৩য় খণ্ড, ৭০৬ পৃঃ।
১. মাজমু' ফাতাওয়া-ইবনে তাইমিয়া-৩৫ খণ্ড, ৩৯ পৃষ্ঠা।
২. রেসালাতুল মাসাজিদ ফিল ইসলাম-ডঃ আবদুল আযীয।