📄 মদীনার বর্ণনা
মদীনা শরীফ মুসলমানদের অত্যন্ত প্রিয় স্থান। এটি হেজাযের একটি মরুদ্যান। যা ফলে-ফুলে শস্য শ্যামল। এটি ৩৯.৩৬ দ্রাঘিমা পূর্বে ও ২৪-২৮ অক্ষাংশ উত্তরে অবস্থিত। শহরের দক্ষিণ-পূর্বদিক উঁচু ভূমি এবং তা সাগরের স্তর থেকে ৬২০-৬৪০ মিটার ওপরে অবস্থান করছে। মদীনা শহরের আয়তন প্রায় ৫০ বর্গ কিলোমিটার।
শহরের চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা। বর্তমানে মদীনা শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। মদীনার জনগণের মধ্যে আজও আনসারদের নম্র ও সহযোগিতাপূর্ণ ব্যবহার বিদ্যমান।
মদীনায় শীতকালে প্রচণ্ড শীত এবং গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরম পড়ে। শরত ও বসন্তের আবহাওয়া স্নিগ্ধ ও মনোরম।
শহরের উত্তর-পশ্চিমে হচ্ছে সা'ল পাহাড়; দক্ষিণে আ'ইর পাহাড় ও আকীক উপত্যকা; উত্তরে ওহুদ ও সাওর পাহাড় এবং কানাহ উপত্যকা; পূর্বে হাররাহ শারকিয়া (নিম্ন পাহাড়ী এলাকা) এবং পশ্চিমে হাররাহ গাবিয়াহ অবস্থিত।
মদীনার হারাম সীমানা হচ্ছে। দক্ষিণে আ'ইর পাহাড়, উত্তরে সাওর পাহাড়, পশ্চিমে হাররাহ ওয়াররাহ এবং পূর্বে হাররাহ ওয়াকেম।
মদীনা শরীফের ৯৫ টা নাম আছে। দুনিয়ার আর কোন শহরের এত বেশী নাম নেই। এর মধ্যে তাইয়েবাহ, ইয়াসরেব, আরদুল্লাহ, কারইয়াতু রসূলিল্লাহ, মদীনাতুর রাসূল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ১
মদীনার রয়েছে অনেক ফযীলত। রসূলুল্লাহ (স) আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোয়া করেছেন, "হে আল্লাহ্! যে আমার ও আমার এই শহরের অধিবাসীদের ক্ষতি করার ইচ্ছা করে, তাকে তাড়াতাড়ি ধ্বংস করে দাও।"
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে, তিনি মদীনাকে অধিকতর প্রিয়, স্বাস্থ্যকর এবং সেখানকার পরিমাপ যন্ত্রে বরকতের জন্য দোয়া করেছেন।
টিকাঃ
১. বিশেষ দ্রষ্টব্য: মদীনা শরীফ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে লেখকের 'মদীনা শরীফের ইতিকথা' বইটি পড়ার অনুরোধ রইল।
📄 মসজিদে নববীর বর্ণনা
মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পথে মহানবী (স) কুবায় প্রায় ২ সপ্তাহ অবস্থান করেন। তারপর মদীনা শহরের অভ্যন্তরে পৌঁছার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে বনী সালেম পল্লীতে শুক্রবারে জুমআর নামায পড়েন এবং জুমআ শেষে তিনি রওনা করেন। তাঁর উট মসজিদে নববীর বর্তমান স্থানে এসে বসে পড়ে। এই স্থানটি ছিল খেজুর শুকানোর স্থান ও উট-বকরীর আস্তাবল। ২ জন ইয়াতীম শিশু ছিল ঐ জায়গার মালিক রসূলুল্লাহ (স) ১০টি সোনার দীনারের বিনিময়ে ঐ সম্পত্তি কিনেন এবং হযরত আবু বকরকে মূল্য পরিশোধ করার আদেশ দেন। ঐ যমীনে খেজুর গাছ ও মুশরিকদের কবর ছিল এবং এক অংশ ছিল নীচু। তাতে বৃষ্টির পানি জমে থাকত। তিনি খেজুর গাছ কেটে ফেলেন এবং কবরের হাড়-গোড় বের করে অন্যত্র পুঁতে ফেলার নির্দেশ দেন। নিম্নাংশ ভরাট করেন। ১২ দিন পর্যন্ত তিনি খালি স্থানে নামায পড়েন। তারপর মসজিদ তৈরি করেন। তিনি এবং মোহাজের ও আনসার সাহাবায়ে কেরাম মিলে মসজিদ তৈরি করেন। আম্মার বিন ইয়াসার (রা) ছিলেন মসজিদের প্রধান রাজমিস্ত্রী ও নির্মাণ কৌশলী। রসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং নিজেও সাহাবায়ে কেরামের সাথে ইট-পাথর বহন করেন। তিনি নিজহাতে একটি পাথর দিয়ে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। মসজিদের ভিত্তিতে পাথর, দেয়ালে ইট, চালে খেজুর পাতা ও সুঘ্রাণ এজখের ঘাস এবং খুঁটিতে খেজুর গাছ ব্যবহার করা হয়। চালের ওপর কাদা মাটির প্রলেপ দেয়া হয় ঠাণ্ডার জন্য। একবার বৃষ্টির পানিতে মসজিদের মেঝে কর্দমাক্ত হয়ে যায়। স্বয়ং রসূলুল্লাহ (স)-এর কপাল ও দাড়িতে কাদা লাগে। সাহাবায়ে কেরাম মেঝেতে পাথরের নুড়ি ঢেলে দেন। ১ম হিজরী সনে নির্মিত মসজিদের আয়তন ছিল ৭০ x ৬০ গজ বা ৮৫০.৫ বর্গমিটার। উচ্চতা ছিল ২.৯ মিটার।
৭ম হিজরীতে খায়বার বিজয়ের পর ক্রমবর্ধমান মুসল্লীর সংকুলানের জন্য মসজিদকে সম্প্রসারিত করা হয়। এখন এর আয়তন দাঁড়ায় ১০০x১০০ গজ অর্থাৎ ২০২৫ বর্গমিটার এবং ছাদ ৭ গজ উঁচু করা হয়। রসূলুল্লাহ (স)-এর সময়ের মসজিদের সীমানা এখন পর্যন্ত চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। এ সময় মসজিদের ৩টি দরজা ছিল।
মসজিদে আকসার দিকে মুখ করে তিনি ১৭ মাস নামায পড়েন। তখন তাঁর মেহরাব ছিল মসজিদের উত্তর পার্শ্বে। পরে যখন কা'বা শরীফের দিকে মুখ করে নামায পড়ার আদেশ নাযিল হয় তখন তাঁর মেহরাব দক্ষিণ দিকে স্থানান্তরিত হয়। কা'বার দিকে মুখ করে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি ইমামতি করতেন সে স্থানটি চিহ্নিত আছে। তাতে বর্তমানে আরবীতে লেখা আছে-
هُذَا مُصَلَّى النَّبِيِّ عَلَيْهِ السَّلَام -
মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে ছিল দীনের কাজে সার্বক্ষণিক সময়দানকারী সাহাবায়ে কেরামের বাসস্থান। তাঁদেরকে বলা হত আসহাবে সুফফা। হযরত আবু হোরায়রাসহ অনেক বড় বড় সাহাবী সেখানে বাস করতেন। তাঁদের নিজেদের কোন আয়-রোজগার ছিল না। ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা হত।
মসজিদে ৫ ওয়াক্ত নামায নিয়মিত জামায়াত সহকারে অনুষ্ঠিত হয়। এতে নারী-পুরুষ সবাই অংশ গ্রহণ করে।
মসজিদের ভেতর রয়েছে ৮টি ঐতিহাসিক স্তম্ভ। সেগুলোর নাম হচ্ছে, ১. সুবাস স্তম্ভ (ওসতোয়ানা মোখাল্লাকা) ২. আয়েশা স্তম্ভ ৩. তাওবাহ স্তম্ভ ৪. শয়ন স্তম্ভ ৫. পাহারা স্তম্ভ ৬. প্রতিনিধি স্তম্ভ ৭. কবরের বর্গ স্তম্ভ ও ৮. তাহাজ্জুদ স্তম্ভ। প্রত্যেকটা স্তম্ভের রয়েছে বিরাট তাৎপর্য ও ঐতিহাসিক বর্ণনা। এখানে সে আলোচনার সুযোগ নেই।
মসজিদের ভেতর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান হচ্ছে, রাওদাহ বা 'বেহেশতের বাগান' নামক জায়গাটি। রাওদাহর দৈর্ঘ ২২ মিটার ও প্রস্থ ১৫ মিটার। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "আমার ঘর ও মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থান হচ্ছে বেহেশতের বাগান।” (বুখারী ও মুসলিম) এই জায়গায় ইবাদাত ও এতেকাফের ফযীলত ও সওয়াব অনেক বেশী।
প্রথম প্রথম রসূলুল্লাহ (স) মিম্বার ছাড়াই মসজিদের মেঝেতে দাঁড়িয়ে খুতবাহ দিতেন। এতে তিনি ক্লান্ত হয়ে যেতেন। তাই বিশ্রামের উদ্দেশ্যে হেলান দেয়ার জন্য পাশে একটা খেজুর গাছের কাণ্ড দাঁড় করানো হয় এবং সব শেষে তাঁর জন্য একটা মিম্বার তৈরি করা হয়। তিনি ১ম খুতবার পর মাঝখানে বসে বিশ্রাম গ্রহণ করতেন ও পরে ২য় বার খুতবা দিতে দাঁড়াতেন।
মসজিদে নববীর ফযীলত অনেক বেশী। হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "তিন মসজিদ ব্যতীত আর কোন পবিত্র স্থানে সওয়াবের নিয়তে যেন সফর করা না হয়। সে তিন মসজিদ হচ্ছে, মক্কার মসজিদে হারাম, মদীনার মসজিদে নববী এবং জেরুসালেমের মসজিদে আকসা।” (বুখারী ও মুসলিম)
হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "মসজিদে হারাম ছাড়া আমার এই মসজিদে নামায অন্যান্য মসজিদের নামায থেকে এক হাজার গুণ উত্তম।” (বুখারী)
মসজিদে নববীর অন্যান্য ইবাদাতের সওয়াবও নামাযের মতই অতিরিক্ত।
বিভিন্ন সময় মসজিদে নববীর সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। যারা সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেছেন, তাঁরা হলেন, ১। রসূলুল্লাহ (স) ২। ওমর (রা) ৩। ওসমান (রা) ৪। ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক ৫। খলীফা মাহদী ৬। আশরাফ কায়েতবায় ৭। সুলতান আবদুল মজিদ ৮। বাদশাহ আবদুল আযীয ৯। বাদশাহ ফয়সল বিন আবদুল আযীয ১০। বাদশাহ খালেদ বিন আবদুল আযীয এবং ১১। বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আযীয।
বর্তমানে মসজিদের আয়তন হচ্ছে, ৯৮ হাজার ৫ শ বর্গমিটার। মসজিদের ভেতর ১ লাখ ৬৭ হাজার মুসল্লী, ছাদের ওপর ৯০ হাজার মুসল্লী এবং আঙ্গিনায় মোট ২ লাখ ৫০ হাজার মুসল্লী একই সময়ে নামায পড়তে পারে। সব মিলিয়ে একই সময় সাড়ে ৬ লাখ লোক একসাথে নামায পড়তে পারে। মসজিদে কেন্দ্রীয় এয়ার কন্ডিশনের ব্যবস্থা আছে। ফলে, গরমের সময় মুসল্লীরা ঠাণ্ডা অনুভব করে। এতে ১০ টি মিনারা ও ২৭ টি গম্বুজ আছে। এতে ৭টি প্রবেশ পথ ও ৮২টি দরজা আছে।
মসজিদে পর্যাপ্ত টয়লেট, অযুর জায়গা ও পান করার জন্য ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা আছে। মক্কা থেকে জমজমের পানি নিয়ে মুসল্লীদেরক পান করানো হয়। মসজিদের পার্শ্বে বিরাট গাড়ি পার্কিং এলাকা রয়েছে।
মসজিদের সাথেই রয়েছে রসূলুল্লাহ (স) এর হুজরাহ মোবারক এবং হযরত আলী ও ফাতেমার ঘর। বর্তমানে সে গুলো সম্প্রসারিত মসজিদের ভেতর অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে।
হুজরাহ মোবারকেই তাঁর পবিত্র দেহ মোবারক শায়িত আছেন। তাঁর কবরটি লোহার জালি দ্বারা আবৃত এবং কবরের চার পার্শ্বে শীশা ঢালাই করে কবর মজবুত করা হয়েছে। দুষ্কৃতিকারীরা কয়েকবার লাশ মোবারক চুরির উদ্যোগ নেয়ায় ঐ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
পার্শ্বেই রয়েছে তাঁর দুই সাথীর কবর। তাঁরা হলেন, হযরত আবু বকর ও ওমর (রা)। ৪র্থ কবরের স্থানটি আজ পর্যন্ত খালি পড়ে আছে।
প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মুসলমান মসজিদে নববী যেয়ারতে আসেন এবং সেখানকার ফযীলত কুড়িয়ে নেন। হজ্জ মওসুমে যেয়ারতকারীর সংখ্যা সর্বাধিক বৃদ্ধি পায়।
📄 মসজিদে নববীর ভূমিকা
দুনিয়ার মসজিদসমূহের ভূমিকা কি হওয়া উচিত তা জানার জন্য সবাইকে মসজিদে নববীর ভূমিকা জানতে হবে। কেননা, এটা হচ্ছে ট্রেনের ইঞ্জিনের মত। ট্রেনের বগীগুলোর অন্যদিকে যাওয়ার কায়দা নেই। ইঞ্জিন যেদিকে যায়, তাদেরকেও সেদিকেই যেতে হয়। অন্যান্য মসজিদগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাদেরকে অবশ্যই মদীনার মসজিদে নববীকে অনুসরণ করতে হবে। এটা রসূলুল্লাহ (স)-এর নিজ হাতে তৈরি ও পরিচালিত। তাই অন্যান্য মসজিদগুলোকে মূল উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। মূল উৎস হচ্ছে মসজিদে নববী। বরং এটাকে অন্যান্য সকল মসজিদের মা বলা যায়। তাই সেগুলোকে তার মাতৃসদনের আসল পরিচর্যা লাভ করতে হবে।
মসজিদে নববীতেই নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের আইন-কানুনগুলো প্রতিপালিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে গোটা দুনিয়ায় তা ছড়িয়ে পড়েছে। একই উদ্দেশ্যে মসজিদে নববীর অনুসরণে তৈরি হয়েছে অন্যান্য মসজিদ। ফলে, অন্যান্য সকল মসজিদের শিক্ষা ও পয়গাম মসজিদে নববীর মতই হওয়া জরুরী। সময়ের ব্যবধানে কিংবা ইসলামকে তার যথাযথ মর্যাদা না দিতে পারার কারণে, কোন কোন সময় মসজিদ তার আকাঙ্খিত লক্ষ্য ও ভূমিকা পালন করতে পারেনি, সেজন্য সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী বা সমাজ মসজিদের কাম্য অবদান থেকে বঞ্চিত থেকেছে।
মূলত মুসলিম সমাজ হচ্ছে, মসজিদ ভিত্তিক, তাই মসজিদ থেকেই সমাজের দীনী ও দুনিয়াবী খোরাক সরবরাহ করতে হবে। মসজিদকে সংকীর্ণ ও সীমিত লক্ষ্যে ব্যবহার করা যাবে না। বরং এটা হচ্ছে সকল কল্যাণকর কাজের উৎস। মসজিদের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত সমাজ জাহেলিয়াতের অশান্তিতে নিমজ্জিত হতে বাধ্য।
📄 জ্ঞান সেবা
এখন আমরা মসজিদে নববীর জ্ঞান সেবা সম্পর্কে আলোচনা করবো।
আমরা ইতিপূর্বে বলেছি যে, মসজিদে নববী ছিল ইবাদাতসহ মুসলিম মিল্লাতের একটি বহুমুখী প্রতিষ্ঠান বা কর্মশালা। সর্বোপরি তাঁর মসজিদ ছিল ইসলামের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর হাতে সর্বোত্তম শিক্ষা গ্রহণ করেছেন সাহাবায়ে কেরামের মত সুযোগ্য ব্যক্তিত্বসমূহ। তাঁরা তাঁর কাছে আল্লাহর দীন বুঝেছেন। তাঁরা কোন আয়াত শিখার সাথে সাথে তা জানা ও মানার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা-সাধনা করতেন। এরপর অন্যদের কাছে তা পৌঁছাতেন।
স্বভাবতই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সকলের জ্ঞানগত যোগ্যতা সমান ছিল না। তাঁরা নির্বিশেষে ইলেম, হেদায়াত, ফযীলত ও শিষ্টাচার অর্জন করেছেন। তবে সবার সুযোগও সমান ছিল না। অনেকেই ছিলেন অভাবগ্রস্ত। ফলে, জীবিকার দাবী মেটাতে গিয়ে সবাই জ্ঞান আহরণে সমান সময় দিতে সক্ষম ছিলেন না। অথচ, প্রত্যেক সাহাবীই সাধ্যানুযায়ী মসজিদে নববীতে হাযির হওয়ার চেষ্টা করতেন এবং যারপর নেই যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন। এমনকি হযরত ওমর (রা) তাঁর প্রতিবেশীর সাথে পালাক্রমে মসজিদে নববীতে আসতেন এবং ঐ দিনের আলোচনা পরস্পর পরস্পর থেকে জেনে নিতেন। এভাবে তাঁরা মসজিদে নববীর মহান শিক্ষকের শিক্ষাকে আত্মস্থ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতেন।
এ বিষয়ে বুখারী শরীফে بَابُ التَّنَاوُبِ فِي الْعِلم অধ্যায়ে বর্ণিত আছে। হযরত ওমর (রা) বলেন,
كُنْتُ أَنَا وَجَارِي مِنَ الْأَنْصَارِ نَتَنَاوَبُ النُّزُولَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ يَنْزِلُ يَوْمًا وَأَنْزِلُ يَوْمًا فَإِذَا نَزَلْتُ يَوْمًا جِئْتُهُ بِخَيْرٍ ذَلِكَ الْيَوْمِ وَإِذَا نَزَلَ فَعَلَ مِثْلَ ذَلِكَ -
"আমি এবং আমার আনসার প্রতিবেশী রসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে পালাক্রমে যেতাম। তিনি একদিন এবং আমি অপরদিন যেতাম। আমি যেদিন যেতাম সেদিনের খবর প্রতিবেশীকে জানাতাম এবং তিনি যেদিন যেতেন, সেদিনের খবর তিনি আমাকে জানাতেন।” (বুখারী ইলম অধ্যায়)
এ ব্যবস্থার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল রসূলুল্লাহ (স)-এর শিক্ষার আসরে অংশ নেয়া। এরকম না হলে, রসূলুল্লাহ (স)-এর বহু শিক্ষা আসর থেকে বঞ্চিত থাকার আশংকা ছিল।
রসূলুল্লাহ (স)-এর ঐ মসজিদটি উত্তম মানুষ ও সুযোগ্য ব্যক্তিত্ব সৃষ্টির প্রতিষ্ঠান ছিল। যেখান থেকে কুরআনের স্পর্শে বহু ছাগল ও উটের রাখাল এবং মূর্তি পূজারী হেদায়াতের ইমাম ও পথ প্রদর্শক হয়েছন। তাঁরা ছিলেন, আল্লাহর দিকে আহবানকারী, বিচারক ও রক্ষক, রাত্রের নিদ্রাত্যাগী ও দিনের শাহসওয়ার। তাঁরা গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন এবং ইসলাম ও শান্তির বাণী প্রচার করেছেন। তাঁরাই মানবতার অজানা মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁদের এ দীনকে আল্লাহ 'সহজ-সরল দীনে ইবরাহীমী' বলে আখ্যায়িত করেছেন।
মসজিদে নববী ছিল যমীনের সাথে আসমানের সংযোগস্থল। এখানেই এমন একটি আসমানী উম্মাহ তৈরি হয়েছে যার কোন নজীর নেই। কেননা, অহীর আলোকে সেটি ছিল মসজিদেরই সৃষ্ট উম্মাহ। অহীর ভিত্তিতে মসজিদে নববী মোমেন ও একদল নেক লোক সৃষ্টি করেছে। ঐ মসজিদ থেকেই হযরত আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী, সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস, যোবায়ের বিন আ'ওয়াম, খালেদ বিন ওয়ালিদ, আবদুর রহমান বিন আওফ, মেকদাদ বিন আসওয়াদ, মেকদাদ বিন আমর এবং আবু ওবায়দাহ বিন জাররাহ (রা)-এর মত নেক ও প্রতিভাবান লোক তৈরি হয়েছিলেন। তাঁরা এমন ধরনের সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাঁরা নিজেদের চরিত্র ইনসাফ ও দীনী গুণ-বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে তীর ও তলোয়ারের আগেই দুনিয়া জয় করেছিলেন। তাঁরা ছিলেন বিশ্বের শিক্ষক ও সম্রাট।
মসজিদে নববী থেকে প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম ও যুগস্রষ্টা মনীষী তৈরি হয়েছেন। আরো তৈরি হয়েছেন ফকীহ ও মোহাদ্দিস। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ, আবদুল্লাহ বিন ওমর, ইমাম আবু হানীফা, মালেক বিন আনাস, মুহাম্মাদ, শাফেঈ, আহমদ বিন হাম্বল, বুখারী ও মুসলিমের মত প্রথিতযশা প্রদীপ ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূর্য। তাঁদের জ্ঞান সাগরে ডুব দিয়ে কত লোক ঝিনুক কুড়িয়েছে এবং তাদের সাহিত্য ও চরিত্র এবং প্রজ্ঞা থেকে কতলোক সিন্ধু সেঁচে মুক্তা পেয়েছে!
এ বিষয়ে কেউ কেউ বলেছেন, কিছু কিছু আলেম বিশেষ বিশেষ মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মদীনার মসজিদে নববীতে ইমাম মালেক বিন আনাস, ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইদরিস শাফেঈ (র) মিসরের ফোস্তাত জামে মসজিদে, কুফা ও বাগদাদের মসজিদে ইমাম আবু হানীফা নোমান এবং বাগদাদের মসজিদে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এটাতো গেল ফিকাহ শাস্ত্র।
হাদীস শাস্ত্রের ইমামগণও মসজিদ ভিত্তিক গবেষণা, সংগ্রহ ও শিক্ষাদানে ব্যস্ত ছিলেন। এসহাক বিন রাহওয়াই, ইমাম বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ মসজিদেই হাদীস শাস্ত্রের সেবা আঞ্জাম দিয়েছেন।
অনুরূপভাবে, প্রখ্যাত. আরবী সাহিত্যিক জাহেজসহ আরো অগণিত সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবী পণ্ডিতেরা মসজিদেই লেখা-পড়া করেছেন। বর্তমান যুগের প্রসিদ্ধ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁরা বের হননি।
রসূলুল্লাহ (স) ছিলেন, মহান মসজিদে নববীর শিক্ষক ও মানবতার পথপ্রদর্শক। আল্লাহ্ তাঁকে এ দায়িত্ব সহকারে পাঠিয়ে বলেছেন:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّينَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ أَيْتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ ، وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضللٍ مُّبِين - (الجمعة : (٢)
“তিনি (আল্লাহ) সেই সত্তা যিনি নিরক্ষর লোকদের মাঝে তাদের মধ্য থেকে একজন রসূল পাঠিয়েছেন। রসূল তাদের কাছে আয়াত পাঠ করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও কৌশল শিক্ষা দান করেন। অথচ ইতিপূর্বে তারা প্রকাশ্য গোমরাহীর মধ্যে ছিল।” (সূরা জুমআঃ ২)
এ আয়াতে আল্লাহ রসূলুল্লাহ (স)-কে শিক্ষক ও পরিশুদ্ধকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি তাত্ত্বিক জ্ঞানের সাথে সাথে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণও দান করেছেন। পরিশুদ্ধ করার অর্থ হল, ব্যবহারিক (Practical) প্রশিক্ষণ। কুরআন যে সকল আচরণ ও গুণাবলী অর্জন এবং দোষ-ত্রুটি থেকে দূরে থাকার কথা বলেছে, তিনি সেই আলোকে সাহাবায়ে কেরামকে বাস্তব ট্রেনিং দিয়েছেন, ছাত্ররা সেই বাস্তব ট্রেনিং-এর আলো গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ করেছেন, ইসলামী আদর্শ এক অতুলনীয় মানব কল্যাণমূলক জীবন ব্যবস্থা। শুধু তাই নয়, অতি অল্প সময়ের মধ্যে তদানীন্তন বিশ্বের দুই পরাশক্তি রোম ও পারস্য, ইসলামী শক্তির প্রভাবাধীনে এসে যায়। মানবতার মুক্তিদূত মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহর তাত্ত্বিক ও বাস্তব প্রশিক্ষণ লাভ করার পর ঐ বিজয় কেন কঠিন হবে?
ইসলামে মসজিদের ভূমিকা হচ্ছে, গণ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মত। তাতে দারস ও শিক্ষা এবং ওয়াজ-নসীহত চলে। ছোট বড় ও নারী পুরুষ সবার জন্য ঐ শিক্ষা। প্রত্যেকেই নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ অনুযায়ী সেই সকল শিক্ষা থেকে উপকৃত হয়।
مسজিদকে মাদ্রাসা বা বিদ্যালয় এজন্য বলা হয় যে, তাতে ইসলামী সংস্কৃতির ভিত্তি রচনা করা হয় এবং পরে এর দেয়াল ও ছাদ নির্মাণ করা হয়। মসজিদে দীনী ও দুনিয়াবী সকল ধরনের শিক্ষা দেয়া হয়। কুরআন, হাদীস, ইসলামী শরীয়াহ বা আইন, ফিকাহ্, ভাষা, বিজ্ঞান, দর্শন, অংক, সমাজ বিজ্ঞান ও সাহিত্য শিক্ষা দিতে কোন বাধা নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে, জাগতিক বা দুনিয়াবী জ্ঞান অর্জন ফরযে কেফায়াহ। একদল শিক্ষা লাভ করলে অন্যদের ওপর থেকে ফরযে কেফায়াহর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়।
মসজিদের জ্ঞান সেবার ব্যাপারে রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন,
مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتِ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُوْنَهُ بَيْنَهُمْ إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفْتُهُمُ الْمَلَائِكَةُ وَذَكَرَ هُمُ اللَّهُ فِيْمَنْ عِنْدَهُ -
"কোন সম্প্রদায় যদি আল্লাহর ঘরে একত্রিত হয়ে কুরআন পাঠ করে ও তার শিক্ষা গ্রহণ করে, তাহলে তাদের ওপর শান্তি নাযিল হয়, আল্লাহর রহমত তাদেরকে ঢেকে ফেলে, ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে এবং মহান আল্লাহ তাঁর নিকট মওজুদ ফেরেশতাদের কাছে তাদের কথা আলোচনা করেন।” (মুসলিম)
আমাদের কতই না সৌভাগ্য। ইবাদাতের জন্য মসজিদে ঢুকে আত্মার পবিত্রতা অর্জনের সাথে সাথে দীন ও দুনিয়ার জন্য চলার উপযোগী জ্ঞান নিয়ে আমরা বের হয়ে আসতে পারি।
শিক্ষা ইসলামী দাওয়াতী কাজের উৎস এবং অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন। ইসলাম যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, তাই তাকে জানা ও বুঝা অত্যন্ত জরুরী। ইসলাম একটি কল্যাণ রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। সেখানে সুখ-শান্তি অবশ্যই থাকবে। তাই সেখানে ইসলামের দাওয়াতী কাজের জন্য ইসলামের জ্ঞানের অস্ত্রে সজ্জিত একদল লোককে তৈরি করতে হবে। যাদের নিকট দলীল-প্রমাণ ও বিরোধীদের প্রশ্ন এবং আক্রমণের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়ার ক্ষমতা থাকবে। সে জন্য ইসলামী শিক্ষার বিস্তার প্রয়োজন। আর রসূলুল্লাহ (স)-কে এ ব্যাপারে নিজ হাতে প্রথমে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়েছে। তাই তিনি মসজিদে নববীকে মাদ্রাসা হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে তাতে শিক্ষা দেন।
ইতিহাস সাক্ষী, ইসলামের পূর্বে আরবদের মধ্যে ভালভাবে লেখা-পড়ার অধিকারী লোকের সংখ্যা খুব বেশী ছিল না। কাল্কাসনাদী বলেছেন, রসূলুল্লাহ (স) নবুয়াত লাভের সময় আরবদের মধ্যে লেখকের সংখ্যা তের থেকে ১৯ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। ১
রসূলুল্লাহ (স)-এর লক্ষ্য ছিল, মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের জ্ঞান বিস্তার করা। যাতে করে তারা দীনী দাওয়াতের ঝাণ্ডা বহন করতে সক্ষম হয়। রসূলুল্লাহ (স) জ্ঞান শিক্ষাদানে কত বেশী আগ্রহী ছিলেন তা বুঝা যায় বদরযুদ্ধের বন্দীদেরকে জ্ঞান শিক্ষাদানের বিনিময়ে মুক্তি দেয়ার ঘটনা থেকে। তিনি অর্থদানে অক্ষম শিক্ষিত বন্দীদের মুক্তির মোকাবিলায় প্রত্যেককে ১০ জন মুসলিম শিশুকে লেখা ও পড়া শিক্ষাদানের শর্ত আরোপ করেন।
শিক্ষা গ্রহণের জন্য রসূলুল্লাহ (স) যথেষ্ট উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, 'সুদূর চীন দেশে গিয়ে হলেও জ্ঞান অর্জন কর।' অনুরূপভাবে, যারা, মসজিদে শিক্ষা গ্রহণ কিংবা শিক্ষাদানের জন্য আসেন তিনি তাদেরকে আল্লাহর রাস্তার মোজাহিদের সমমর্যাদার অধিকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পক্ষান্তরে যারা মসজিদে দর্শক হিসেবে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে কোন কিছু শিখে না, তাদের এই আচরণকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ মর্মে হয়রত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :
مَنْ دَخَلَ مَسجِدَنَا هَذَا لِيَتَعَلَّمَ خَيْرًا أَوْ لِيُعَلِّمَهُ كَانَ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَنْ دَخَلَهُ لِغَيْرِ ذَلِكَ كَانَ كَالنَّاظِرِ إِلَى مَا لَيْسَ لَهُ -
"যে আমাদের এ মসজিদে কিছু ভাল জিনিস শিখতে কিংবা শিখাতে- আসে, সে যেন আল্লাহর পথের মোজাহিদ। আর যে এটা ব্যতীত মসজিদে প্রবেশ করে, সে যেন এমন জিনিসের দর্শক যা তার জন্য নেই।" (নাইলুল আওতার, ২য় খণ্ড, ১৬৫ পৃঃ)
রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "প্রত্যেক নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরয।" তিনি আরো বলেছেন, "মানুষ দুই প্রকার- জ্ঞানী ও ছাত্র। এই দুই ধরনের লোক ব্যতীত অন্যদের মধ্যে কোন কল্যাণ নেই।" ১
তিনি আরো বলেছেন, "যে জ্ঞান অর্জন করে, আল্লাহ তার রিযকের জিম্মাদার হন।” ২
তিনি আরো বলেন, "তোমরা শৈশবের দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান আহরণ কর।” ৩
তিনি এ পর্যন্ত বলেই ক্ষান্ত হননি। বরং অব্যাহত জ্ঞান আহরণের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন:
لَا يَزَالُ الرَّجُلُ عَالِمًا مَا طَلَبَ العِلْمَ فَإِذَا ظَنَّ أَنَّهُ قَدْ عَلِمَ فَقَدْ جَهِلَ -
"ব্যক্তি যে সময় পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করে সে সময় পর্যন্ত আলেম বা জ্ঞানী থাকে। যখন সে ধারণা করে যে, শিখে ফেলেছে, তখনই সে অজ্ঞ-মূর্খের কাতারে নাম লেখায়। ১
রসূলুল্লাহ (স) নিজে মসজিদে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ শিক্ষা দিতেন। তিনি মসজিদে নামাযের বাস্তব প্রশিক্ষণ দিতেন। একজন গ্রামীন আরব বেদুইন মসজিদে নববীতে এসে নামায পড়া শুরু করল। কিন্তু ঠিকমত পড়তে পারল না। তখন রসূলুল্লাহ (স) তাঁকে বিশুদ্ধ পদ্ধতিতে নামায এবং নামাযে প্রয়োজনীয় বিনয় ও প্রশান্তির শিক্ষা দান করেন। তিনি বেদুইনকে তিনবার নামায পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে তা ভালভাবে শিক্ষা দেন। তিন-তিনবার নামাযের ভুলের জন্য তিনি তাকে তিরস্কার কিংবা ভর্ৎসনা করেননি। বরং তিনি তাকে এমন উত্তম পদ্ধতিতে নামায শিক্ষা দিয়েছেন, সে বুঝতেই পারেনি রসূলুল্লাহ (স) রাগ করেছেন।
মসজিদে নববীতে সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে লোকেরা তাঁকে ইসলামের রোকন কিংবা মৌলিক বিষয়গুলোসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করতেন এবং তিনি জবাব দিতেন।
এ প্রসঙ্গে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, "একদিন আমরা মসজিদে বসা। তখন এক ব্যক্তি উটের ওপর আরোহণ করে মসজিদে প্রবেশ করে এবং উটটিকে মসজিদে বেঁধে জিজ্ঞেস করে 'তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ কে?' রসূলুল্লাহ (স) আমাদের মাঝে হেলান দেয়াবস্থায় বসা ছিলেন। আমরা জবাব দিলাম, 'হেলান দেয়া সাদা লোকটি।' লোকটি জিজ্ঞেস করেন, 'হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।' রসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলেন, 'জ্বি-হাঁ।' লোকটি বলেন, "আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবো এবং কড়াভাবেই জিজ্ঞেস করবো। আপনি কিছু মনে করবেন না।”
রসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলেন, 'আপনার যা ইচ্ছা তাই জিজ্ঞেস করুন।' লোকটি বলেন, 'আমি আপনাকে আপনার ও আপনার পূর্ববর্তী লোকদের রবের কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি। আল্লাহ কি আপনাকে সকল মানুষের কাছে রাসূল করে পাঠিয়েছেন?' রসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'ইয়া আল্লাহ! হাঁ।' লোকটি বলেন, 'আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ সহকারে জিজ্ঞেস করছি, 'আল্লাহ কি আপনাকে দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন?' রসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'ইয়া আল্লাহ! হাঁ।' লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, 'আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, 'আল্লাহ কি আপনাকে এই মাসে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন?' রসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'ইয়া আল্লাহ! হাঁ।' লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করেন, 'আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, 'আল্লাহ কি আপনাকে আমাদের ধনীদের কাছ থেকে যাকাত নিয়ে গরীবদের মধ্যে বন্টনের আদেশ দিয়েছেন?' রসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'ইয়া আল্লাহ! হাঁ।' এবার লোকটি বলেন, "আমি আপনার নবুয়াতের প্রতি ঈমান আনলাম এবং আমার কাওমের লোকদের কাছে আপনার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবো। আমার নাম দামাম বিন সা'লাবা এবং আমি বনি সা'দ বিন বকরের ভাই।” (বুখারী-কিতাবুল ইলম)
ইমাম বুখারী (র) এ বিষয়ে আরো উল্লেখ করেছেন, "একদিন রসূলুল্লাহ (স) লোকদের মাঝে বসা ছিলেন। তখন তিন ব্যক্তি আসল। দু'জন রসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে গেলেন এবং অন্যজন চলে গেলেন। দু'জনের মধ্যে একজন মসজিদের মজলিসে একটুখানি জায়গা পেয়ে সেখানে বসেন। অন্যজন বসেন পেছনে। ৩য় ব্যক্তি মসজিদ থেকে চলে গেল। রসূলুল্লাহ (স) অবসর হওয়ার পর বললেন, "আমি কি তোমাদেরকে এই তিনব্যক্তি সম্পর্কে কিছু বলবো না? তাদের একজন আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছেন; আল্লাহ তাকে আশ্রয় দিয়েছেন। অন্যজন লজ্জাবোধ করেছেন; আল্লাহও তার ব্যাপারে লজ্জা বোধ করেন। ৩য় জন ফিরে গেল; আল্লাহও তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।" (বুখারী-কিতাবুল ইলম)
একদিন রসূলুল্লাহ (স) নিজ হুজরাহ থেকে বেরিয়ে মসজিদে প্রবেশ করেন এবং তাতে দুইদল লোককে বসা দেখতে পান। এক দলে রয়েছেন এমন লোক যারা কুরআন পড়তে পারেন এবং আল্লাহকে ডাকতে পারেন। অপর দলে রয়েছেন এমন লোক যারা লোকদেরকে দীন শিক্ষা দিচ্ছেন। রসূলুল্লাহ (স) বলেন, "তোমরা প্রত্যেকেই ভাল। (প্রথমোক্ত) দল কুরআন পড়েন ও আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে দানও করতে পারেন কিংবা নিষেধও করতে পারেন। আর (২য় দল) তারা নিজেরা শিখে ও লোকদেরকে শিখায় এবং আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।" তারপর তিনি তাদের কাছে (২য় দল) যান ও সেখানে বসেন। (ইবনে মাজাহ-১ম খণ্ড, পৃঃ ৪৯)
এ ছাড়াও রসূলুল্লাহ (স) মসজিদে বসতেন এবং সাহাবায়ে কেরام তাঁর কাছে বসে জ্ঞান বা ইলম চর্চা করতেন। বিশেষ করে, তিনি অহী লেখক সাহাবায়ে কেরামের কাছে যখন যতটুকু অহী নাযিল হত তা তেলাওয়াত করতেন এবং তাঁরা তা লিখতেন। হযরত যায়েদ বিন সাবেত সহ বেশ কয়েকজন সাহাবী অহী লেখক ছিলেন।
অপরদিকে, সাহাবায়ে কেরাম সকালে নামায পড়ার পর বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে মসজিদে নববীতে কুরআন পাঠ করতেন এবং ফরয ও ওয়াজিব শিক্ষা গ্রহণ করতেন।
রসূলুল্লাহ (স)-এর মদীনার জিন্দেগীতে সাহাবায়ে কেরামের সাথে ঘরে বসে কোন বৈঠক, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও শলা-পরামর্শ করার কোন নজীর নেই। বরং জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে সকল আলোচনা, শিক্ষা, ওয়াজ-নসীহত এবং আদেশ-নিষেধ মসজিদে বসেই দিয়েছেন। সে জন্য পৃথক কোন ঘর বা অফিস তৈরি করেননি। ছোট থেকে বড় সকল বিষয়ে তিনি মসজিদে নববীতে বসেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং যুদ্ধ-সন্ধি, অর্থনীতি-রাজনীতি ও সামাজিক পরিকল্পনা মসজিদে বসেই গ্রহণ করেছেন।
রসূলুল্লাহ (স)-এর দুনিয়া ত্যাগের পর সাহাবায়ে কেরাম (রা) মসজিদে নববীতে লোকদেরকে দীন শিক্ষা দিতেন। সেখানে প্রশ্নোত্তরের আসর বসত এবং বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্নের জবাব দিতেন। হযরত ওমর বিন খাত্তাব, আলী বিন আবী তালেব, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ, আবদুল্লাহ বিন ওমর, আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস, আনাস বিন মালেক, যায়েদ বিন সাবেত, মু'আয বিন জাবাল, আবু হোরায়রা, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস, আবু মূসা আশআরী এবং ওবাদাহ বিন সামেত (রা) প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম (রা) মসজিদে নববীতে লোকদেরকে শিক্ষা দান করতেন।
হযরত ওবাদাহ বিন সামেত (রা) আহলে সুফফাহকে পড়া ও লেখা শিক্ষা দিতেন।
অনুরূপভাবে সাহাবাদেরকে দর্শনকারী তাবেঈগণও সাহাবাদের অনুসরণে মসজিদে নববীতে বসে লোকদেরকে ওয়াজ-নসীহত করতেন এবং তাদেরকে দীনের মৌলিক বিষয়গুলো শিক্ষা দিতেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হচ্ছেন, সাঈদ বিন মুসাইয়্যেব, ওরওয়াহ বিন যোবায়ের, আবদুল্লাহ বিন ওমরের দাস সালেম, মুজাহিদ, সাঈদ বিন জোবায়ের এবং মালেক বিন আনাস প্রমুখ। রাবীআ'তুররায় মসজিদে নববীতে মালেক বিন আনাস (মালেকী মাযহাবের ইমাম) এবং হাসান বসরীকে শিক্ষা দিয়েছেন। রাবীআ'তুররায় ছিলেন সেই যুগের শ্রেষ্ঠ ফকীহ্।
তাঁর সম্পর্কে ইমাম মালেক বলেন, রাবীআ'র মৃত্যুর পর ফেকাহ শাস্ত্রের মজা বিদায় নিয়ে গেছে। ১
হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়েব (রা) সহ মদীনার অন্যান্য ফকীহগণ মসজিদে নববীতে ফতোয়া দিতেন এবং ইসলামী জ্ঞান-গবেষণা ও ইজতিহাদে ব্যস্ত থাকতেন। অপর দিকে, ইমাম মালেক (র) মসজিদে নববীতে বসেই হাদীস বর্ণনা করতেন এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে বসেই প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থ 'আল-মুআত্তা' রচনা করেন।
মসজিদে নববী ছিল ফেকাহ শাস্ত্রের কেন্দ্র ইমাম মালেক (র)-এর মালেকী মাযহাবের উৎপত্তি এ মসজিদ থেকেই। এর পরবর্তী যুগে, ইমাম বাকের ও জা'ফর সাদেক মসজিদে নববীতে লোকদেরকে ফেকাহ ও অসুলে ফেকাহ শিক্ষা দেন।
মসজিদ পাঠাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। দীনী বই-পুস্তকসমূহ মসজিদে রেখে পাঠকদের চাহিদা পূরণ করা হত। সাধারণত ধনী ও জ্ঞানী-গুণী লোকেরা মসজিদে কিতাব-পত্র ও বই-পুস্তক দান করতেন। পরবর্তীতে দেখা গেছে, খাতীব বাগদাদী নিজ কিতাবসমূহ মসজিদে ওয়াক্ফ করে গেছেন এবং মৃত্যুর আগে তা নিজ বন্ধু আবুল ফজ্বল বিন খাইরুনের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। এ ছাড়া আবদুল্লাহ্ বিন আহমদ আল-মা'রুফ বিন খাশাবসহ আরো অনেকে নিজ কিতাবসমূহ মসজিদে ওয়াক্ফ করে গেছেন।
এ সকল দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, মসজিদ সকল জ্ঞান-গবেষণার উপযুক্ত স্থান। রসূলুল্লাহ (স)-এর মসজিদ থেকেই ঈমান, জিহাদ ও জ্ঞানের ঝাণ্ডা উত্তোলন করা হয়েছে। তাই দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে ওলামায়ে কেরাম মসজিদে বসেই অনুরূপ সেবা আঞ্জাম দিয়েছেন ও দিচ্ছেন।
টিকাঃ
১. সোবহুল আ'সা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং-১৫।
১. রেসালাতুল মসজিদ ফিল ইসলাম-ডঃ আবদুল আযীয লোমাইলাম-সৌদি আরব।
২. ঐ
৩. ঐ
১. হায়াতু সাইয়েদিল মোরসালিন-১১৮।
১. ওয়াফইয়াতুল আ'ইয়ান- ২য় খন্ড, পৃ:২৯০।