📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 মসজিদ সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের মন্তব্য

📄 মসজিদ সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের মন্তব্য


ক্রেজওয়েল সহ বিভিন্ন প্রাচ্যবিদ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (স) এজন্য মসজিদে নববী তৈরি করেননি যে, তা সামষ্টিকভাবে মুসলমানদের নামাযের কেন্দ্র, কিংবা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কমাও কেন্দ্র হবে। তিনি মূলত নিজে একটি বাসস্থান এবং পার্শ্বে দেয়ালঘেরা একটি আঙ্গিনা তৈরি করেন। এতে মুসলমানরা নামায পড়তে পারত। মসজিদে নববী সম্পর্কে এটা হচ্ছে প্রাচ্যবিদদের মিথ্যা প্রচারের একটি নমুনা। অথচ কে না জানে যে, মসজিদে নববীর পরিচয় রসূলুল্লাহ (স)-এর বাসস্থান হিসেবে নয়, মসজিদ হিসেবেই খ্যাত। বরং বাসস্থানের বিষয়টি গৌণ এবং মসজিদের বিষয়টিই মুখ্য।
প্রাচ্যবিদরা আরো বলেছেন, ইসলাম নামাযের জন্য মসজিদ তৈরির কথা বলেনি। বরং মুসলমানরাই রসূলুল্লাহ (স)-এর ইন্তেকালের পর নামাযের জন্য মসজিদ তৈরি করেছে। ক্রেজওয়েলের মতে, নবীর ঘরে মানুষ আসত বলে তাদের বসার জন্য একটা ছায়াঘেরা জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়। পরবর্তীতে লোকেরা এটাকে মসজিদ বিবেচনা করে যথারীতি তাতে নামায পড়তে থাকে এবং সেটাকে মসজিদের মর্যাদা দেয়। মসজিদে নববী সহ অন্যান্য মসজিদের ব্যাপারে এটা হচ্ছে তার মত। শুধু তাই নয়, ক্রেজওয়েল আরো বলেছে, পরবর্তীতে মুসলমানরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে মসজিদ তৈরি করেছে। তার মতে, জামায়াতে নামায পড়ার উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম যিয়াদ বিন আবীহ ৪৪ হিজরীতে বসরার মসজিদ সম্প্রসারণ করে। উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন গোত্রে অবস্থিত মসজিদ থেকে লোকদেরকে একটি জামে মসজিদে জড় করে তাদের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক বক্তৃতা (খোতবাহ) করা।
ক্রেজওয়েল আরো দাবী করেছে, হিজরী ৫৪ সাল পর্যন্ত মদীনাবাসীদের কোন জামে মসজিদ ছিল না। এমনকি নবী (স) মুসলমানদের জন্য কোন মসজিদ তৈরি করেননি।
মসজিদ সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের ঐসকল বক্তব্য সম্পূর্ণ কল্পনা বিলাস, ভিত্তিহীন ও অবাস্তব। তারা ঐতিহাসিক সত্যকে দিনে-দুপুরে অস্বীকার করেছে।
কেননা রসূলুল্লাহ (স) হিজরতের পর কুবায় পৌঁছে সর্বপ্রথম যে মসজিদ নির্মাণ করেন তা কুবা মসজিদ নামে ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়ে সেই স্মৃতির কথা আজো স্মরণ করিয়ে দেয়। মক্কী জিন্দেগীতেই নামায ফরয হয়েছিল। তাই রসূলুল্লাহ (স) কুবা থেকে মদীনার অভ্যন্তরে শুক্রবারে রওনা করার পথে বনী সালেম পল্লীতে জুমার নামায ফরয হয়। তিনি সেখানেই জুমার নামায আদায় করেন এবং তখন থেকে এ পর্যন্ত সেখানে একটি মসজিদ বিদ্যমান আছে।
স্বয়ং রসূলুল্লাহ (স)-এর জীবদ্দশায় অবতীর্ণ কুরআনের আয়াতে জামে মসজিদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। সূরা তাওবার ১৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ "কেবলমাত্র তারাই মসজিদ আবাদ করতে পারে যারা আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমান রাখে, নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না, আশা করা যায় যে, তারা হেদায়াত লাভ করবে।"
সূরা তাওবার ১৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেনঃ "মোশরেকরা আল্লাহর মসজিদ আবাদ করতে পারে না।"
কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন জায়গায় মসজিদের উল্লেখ রয়েছে। সেগুলোতে মসজিদের ভূমিকা ও কার্যাবলী সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তাই প্রাচ্যবিদরা মসজিদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে মূলত ইসলামকেই অস্বীকার করতে চায়। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের অধ্যয়ন ও জ্ঞান-গবেষণা এ উদ্দেশ্যেই নিবেদিত।
প্রাচ্যবিদদের বক্তব্য ঐতিহাসিক তথ্যেরও বিপরীত। মাকরীজী বলেছেন, "হযরত ওমর (রা) যখন বিভিন্ন শহর জয় করেন তখন তিনি বসরার শাসক আবু মূসা আশআরীকে এক চিঠিতে জামায়াত কায়েম করার উদ্দেশ্যে মসজিদ তৈরির নির্দেশ দেন এবং বলেন, জুমার দিন যেন সবাই জামে মসজিদে জুমার নামায জামায়াত সহকারে আদায় করে। তিনি অনুরূপভাবে, কুফার শাসক সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস এবং মিসরের শাসক আমর বিন আসের কাছেও নির্দেশ পাঠান, তিনি সিরিয়ার এলাকার গভর্ণরদের কাছেও অনুরূপ চিঠি পাঠিয়ে মসজিদ তৈরির নির্দেশ দেন এবং তাদেরকে গ্রাম ছেড়ে শহরে বাস করার অনুরোধ জানান। তাদের প্রতি প্রত্যেক শহরে একটি করে জামে' মসজিদ নির্মাণের আদেশ দেন। লোকেরা হযরত ওমর (রা) এর নির্দেশ পালন করেন।”১.
এ সকল ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ করে যে, বসরায় যিয়াদ বিন আবীহর মসজিদ নির্মাণের আগেই হযরত ওমর (রা) বিভিন্ন শহরে মসজিদ নির্মাণের আদেশ দিয়েছেন। ফলে মসজিদের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের বক্তব্য ও মন্তব্য বিলাসী কল্পনার ফানুস ছাড়া আর কি হতে পারে? মুসলমানদের সামাজিক জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মিলনকেন্দ্র মসজিদ সম্পর্কে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। মুসলিম সমাজে মসজিদ না থাকলে তা মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থেকে বঞ্চিত থাকবে। আর এটাই প্রাচ্যবিদদের তথাকথিত স্বর্গীয় স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন হবে। আল্লাহ আমাদেরকে তাদের নাপাক দূরভিসন্ধি থেকে রক্ষা করুন।

টিকাঃ
১. আল-খোতাত আল-মাকরীযিয়াহ, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১০৭।

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা

📄 মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা


রসূলুল্লাহ (স) মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় যান এবং ৬২২ খৃঃ মোতাবেক ১২ই রবিউল আউয়াল তিনি কুবায় পৌঁছেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি প্রথমেই কুবায় যে মসজিদ তৈরি করেন, তা ছিল ইসলামের প্রথম মসজিদ। কুবায় দুই সপ্তাহ অবস্থান করার পর তিনি মদীনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছেন এবং যেখানে তাঁর উট বসে পড়েছিল সেখানেই তিনি মসজিদ তৈরি করেন। এটাকে মসজিদে নববী বলা হয়। এটা ছিল ইসলামের দ্বিতীয় মসজিদ। মসজিদ তৈরির পর মসজিদের পূর্ব পার্শ্বে তাঁর বাসস্থান তৈরি করেন।
নামায ও ইবাদাতের স্থান নির্ধারণ, সাহাবায়ে কেরামের সাথে রসূলুল্লাহ (স)-এর মিলনস্থান, জিহাদে গমনকারী মুজাহিদ মুসলমানদের কমাণ্ডস্থান এবং মুসলমানদের ইলম ও আমল চর্চার কেন্দ্র হিসেবে মসজিদে নববী নির্মাণ করা হয়েছিল।
ইসলামের আগমনের কারণে আরবদের জীবনে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অন্যান্য জাতির মধ্যেও ইসলাম বিরাট প্রভাব সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন সভ্যতা-সংস্কৃতি ইসলাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে।
আরব সমাজ যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ঝগড়া-ফ্যাসাদে লিপ্ত ছিল। রসূলুল্লাহ (স) ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যব ব্যবস্থা কায়েম করে সেই সকল দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ বন্ধ করেন। তিনি মদীনাকে রাজধানী করে যে রাষ্ট্র কায়েম করেন তাতে করে আরবরা ইসলাম গ্রহণ করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায়। রসূলুল্লাহ (স) ইসলামী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক কাঠামো ঘোষণা করেন।
ইসলাম একটি বিশ্বাস, আদর্শ পদ্ধতি ও সর্বোচ্চ নৈতিক নীতিমালা সহকারে প্রেরিত হয়েছে। তাই মদীনা একদিকে দারুল হিজরাহ এবং অন্যদিকে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। মক্কা বিজয়ের পর মদীনা পুরো হেজাজ অঞ্চলের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। হযরত আলী (রা) কর্তৃক কুফায় রাজধানী স্থানান্তরের আগ পর্যন্ত দীর্ঘদিনব্যাপী মদীনা ছিল নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী।
মানুষ দলে দলে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হতে লাগল এবং অগণিত লোক মুসলমান হওয়া শুরু করল। মূর্তি ও প্রতিমা পূজা ইসলামী আদর্শের মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে লাগল। ইসলাম শিরকের মূলোৎপাটন ঘোষণা করল এবং হালাল ও হারাম, ইসলামী আইন ও বিধান এবং নামাযের জন্য আযান চালু করল। ধনীদের ওপর যাকাত ফরয করে ইসলাম গরীবদের প্রতি সহানুভূতির পদ্ধতি চালু করে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার এবং মোমেনদের নিয়ে সেনা বাহিনী তৈরি করা হল। ইসলাম বিরোধী শক্তি যেন তা দেখে ভয় পায়।
মানুষের মন-মগজের রাজ্যে ইসলামই প্রথম সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের নীতির কথা প্রচার করে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন নাগরিকদের মধ্যে বর্ণ-বংশ ও ভাষার ঊর্ধে উঠে তা বাস্তবায়ন করে। ফরাসী বিপ্লবের নেতা রুশোর স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের নীতির এক হাজার বছর আগে মদীনায় ইসলামের সেই নীতি বাস্তবায়িত হয়। মহানবী (স) ঘোষণা করেছেনঃ
النَّاسُ سَوَاسِيَةً كَأَسْنَانِ الْمُشْطِ الأَفَضْلَ لِعَرَ بِي عَلَى عَجَمِي الا بالتقوى .
"মানুষ চিরুনীর দাঁতের মত সমান। অনারবের ওপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য নেই। শুধুমাত্র তাকওয়ার ভিত্তিতেই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হবে।”
তাকওয়া হচ্ছে, আল্লাহর আদেশ ও নিষেধসমূহ মেনে চলা। একথা-ই কুরআনেও বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ -
"তোমাদের কাছে সেই ব্যক্তিই বেশী সম্মানিত যিনি তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী।"
রসূলুল্লাহ (স) আনসার ও মুহাজির এবং ইহুদী ও খৃস্টানদের সবাইকে নিয়ে ঐতিহাসিক মদীনা সনদ তৈরি করেন এবং এর ভিত্তিতে মদীনার প্রশাসন এবং যুদ্ধ ও সন্ধি নীতি পরিচালনা করেন। এর আগে আরবরা কখনও কোন আদর্শিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিল না। বরং তাদের সামাজিক বন্ধন ছিল গোত্র, বংশ ও আত্মীয়তাভিত্তিক। ইসলামই প্রথম আদর্শিক রাষ্ট্র চালু করে এবং ইহুদী ও খৃস্টানদেরকেও মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক ঘোষণা করে। মদীনা সনদের ভিত্তিতে ইহুদী ও খস্টানরা মদীনার ওপর আক্রমণ হলে তার প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। এক কথায়, মদীনায় ইনসাফ, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও কল্যাণের এক নতন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
মসজিদ হচ্ছে, ইসলামী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তির অন্যতম। তাই রসূলুল্লাহ (স)-এর সময় থেকে মসজিদ নির্মাণের যে ধারা শুরু হয়েছে তা পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবয়ে তাবেঈনসহ মুসলিম খলীফা ও শাসকরা অব্যাহত রাখেন এবং সর্বত্র মসজিদ তৈরি করেন।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, প্রখ্যাত সাহাবী ওকবাহ্ বিন নাফে' আল-ফেহ্রী কায়রাওয়ানে ৫০ হিজরী সালে এক মসজিদ তৈরি করেন। মুসলিম শাসকরা পরবর্তীতে আফ্রিকা মহাদেশে বহু ত্যাগের বিনিময়ে মসজিদ নির্মাণের ধারা অব্যাহত রাখায় তা মরক্কো পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। তারপর ওকবাহ বিন নাফে' মুআবিয়া বিন হোদাইজ আস্-সুকুনী, আবুল মোহাজের দীনার, যোহাইর বিন কাইস আল-বাওয়া, হাসান বিন নো'মান আল-গাস্সানী, মূসা বিন নাসির এবং তারেক বিন জিয়াদের প্রচেষ্টায় স্পেন পর্যন্ত বিজয়ের ধারা ও মসজিদ নির্মাণের তৎপরতা অব্যাহত থাকে। তাঁরা আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করেন এবং মসজিদের মাধ্যমে ইসলামের বাণী সে সকল অঞ্চলে প্রচার করেন।
হযরত আবদুল্লাহ বিন সা'দ বিন আবি সারাহ (রা) ৩১ হিজরীতে দাক্বালা যুদ্ধে জয়লাভ করার পর সেখানকার অধিবাসীদের সাথে প্রথম যে চুক্তি করেন তাতে সেখানে নিজ হাতে তৈরি মসজিদ সম্পর্কে উল্লেখ করেনঃ "মুসলমানরা তোমাদের শহরের উপকণ্ঠে যে মসজিদ তৈরি করেছে তার হেফাজত করতে হবে, তাদেরকে মসজিদে এসে নামায পড়তে বাধা দেয়া যাবে না এবং তোমাদের উচিত, মসজিদ পরিষ্কার রাখা, বাতি দেয়া ও এর সম্মান করা।"

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 ইরানের মসজিদ

📄 ইরানের মসজিদ


ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে লিখেছেন, ১ শিরাজ শহরে এক বিরাট ও প্রশস্ত মসজিদ আছে। এর নাম হচ্ছে, মসজিদে আতীক। মসজিদের আঙ্গিনা বিরাট। বিল্ডিংটি অত্যন্ত সুন্দর। দেয়ালে মারবেল পাথর লাগানো হয়েছে। শহরের নেক ও আলেমগণ তাতে একত্রিত হন এবং মসজিদে জামায়াত সহকারে নামায আদায় করেন।
মসজিদে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবারে ওয়ায করা হয়। এ মসজিদে মহিলা মুসল্লীর সংখ্যা অত্যধিক। শহরের স্ত্রীলোকেরা নেক্কার ও ভাল চরিত্রের অধিকারিনী। প্রায় ২ হাযার মহিলা নামাযের জন্য মসজিদে আসেন। ইবনে বতুতা আরো লিখেছেন, তিনি মহিলাদের এত বড় সমাবেশ আর কোন মসজিদে দেখেননি।
ইবনে বতুতা শিরাজ শহরের আরেক মসজিদের কথা উল্লেখ করেছেন। ২ মসজিদটি দেখতে খুবই সুন্দর। তাতে বহু কুরআন শরীফ রাখা হয়েছে। তিনি মসজিদের এক কোণে একজন বৃদ্ধ লোককে গভীর মনোযোগ সহকারে কুরআন পড়া অবস্থায় দেখতে পান। তিনি তাঁকে গিয়ে সালাম করেন এবং আলাপ করেন। বৃদ্ধ লোকটি বলেন, "আমি নিজেই মসজিদটি তৈরি করেছি এবং এর জন্য বহু সম্পত্তি ওয়াক্‌ফ করেছি। এর আয় দিয়ে মসজিদের ব্যয় নির্বাহ করা হয়। আমি আমার জন্য তৈরি কবরের ওপর বসা। এর ওপর কাঠ দিয়ে তাতে বসার ব্যবস্থা করেছি। বিছানা ও কাঠ উঠিয়ে তিনি নিজ কবর তাঁকে দেখান এবং বলেন, এ শহরে আমার মৃত্যু হলে, এখানেই আমাকে দাফন করা হবে। নিকটে একটি বাক্সে কাফনের কাপড় ও কিছু অর্থ রাখা আছে, যেন আমার মৃত্যুর পর হঠাৎ করে দাফনের বিষয়ে কোন সংকট সৃষ্টি না হয়।"
ইবনে বতুতা তাবরীজের ঐতিহাসিক মসজিদের কথাও উল্লেখ করেছেন। ইরানে আরো বহু মসজিদ আছে। কিন্তু আমরা দু'একটি মসজিদ সম্পর্কে আলোচনা করে ইরানের অন্যান্য মসজিদ সম্পর্কে একটি ধারণালাভের চেষ্টা করেছি। অন্যান্য মসজিদগুলোতেও বিভিন্ন রকম কর্মতৎপরতা পরিলক্ষিত হয়। এলেম চর্চাসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তৎপরতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

টিকাঃ
১. রেহলাহ ইবনে বতুতা - ১ম খণ্ড, ১৫১ পৃঃ।
২. ঐ

📘 ইসলামে মসজিদের ভূমিকা > 📄 তুরস্কের মসজিদ

📄 তুরস্কের মসজিদ


আমরা এখন তুরস্কের মসজিদগুলো সম্পর্কে সাধারণ ধারণা লাভ করার উদ্দেশ্যে ইস্তাম্বুলের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ সম্পর্কে আলোচনা করব। এর নাম হচ্ছে, আয়াসুফিয়া জামে' মসজিদ। একমাত্র ইস্তাম্বুল শহরেই ৫শ মসজিদ রয়েছে। তুরস্কের প্রায় সকল মসজিদই উত্তম নকশা ও ডিজাইনের স্বাক্ষর। এদ্বারা তুর্কী প্রকৌশলের উন্নতমান প্রমাণিত হয়।
মুহাম্মাদ ফাতেহ খান ৮৫৭ হিঃ মোতাবেক, ১৪৫৩ খৃঃ ইস্তাম্বুল জয় করার পর এ মসজিদটি তৈরি করেন। একশ' প্রকৌশলীর তত্বাবধানে ১০ হাজার শ্রমিক দীর্ঘ ১৮ বছর কাজ করার পর মসজিদটি তৈরি হয়। তখনকার দিনে মসজিদের জন্য তুর্কী মুদ্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ হয়। মসজিদের দৈর্ঘ ২৭০ ফুট এবং প্রস্থ ২৪৫ ফুট।
মসজিদের রয়েছে অত্যন্ত সুন্দর গম্বুজ ও খুটি। গম্বুজের আয়তন ১১৫ বর্গফুট। মসজিদের মিনারার উচ্চতা হচ্ছে ১৮০ ফুট। মসজিদে ১৭০ টি স্তম্ভ বা খুঁটি আছে। এগুলোতে মার্বেল পাথরসহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতব পদার্থ লাগানো হয়েছে। মসজিদের ভেতর রয়েছে ঝাড় বাতি। মসজিদের বাঁদিকে রয়েছে, মহিলাদের নামাযের স্থান।
মসজিদের বিরাট ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। অভাবী লোকদেরকে সেই আয় থেকে খাবার দান করা হয়। মসজিদটি প্রথমে ছিল একটি গীর্জা। তারপর তা মুসলমানদের মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৪৫২ খৃঃ পর্যন্ত তা পুনরায় খৃষ্টানদের দখলে ছিল। ১৪৫২ থেকে তুর্কী শাসক মোস্তফা কামালের শাসন পর্যন্ত তা মুসলমানদের মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আতা তুর্ক মোস্তফা কামাল তুর্কী প্রজাতন্ত্র গঠনের সময় তুরস্কের সকল ইসলামী প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। ফলে সে আয়াসুফিয়া জামে' মসজিদকে যাদুঘরে রূপান্তরিত করে। এখন পর্যন্তও সেই মসজিদটিকে খুলে দেয়া হয়নি। অথচ সেই মসজিদ থেকে তুরস্কে ইসলামের পয়গাম পৌঁছানো হয়েছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00