📄 মসজিদের গুরুত্ব ও লক্ষ্য
‘সেজদাহ’ থেকে ‘মসজিদ’ শব্দের উৎপত্তি। সেজদাহর অর্থ আল্লাহর দরবারে মাথা নত করা এবং ভূলুণ্ঠিত মস্তকে তাঁর হুকুম মানা। সেজদাহ নামাযের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আরবী শব্দের গঠন ও রূপান্তরের নিয়ম অনুযায়ী শব্দটি ‘মাসজিদ’ না হয়ে ‘মাসজাদ’ হওয়া দরকার ছিল। যেমন ‘মাক্কাল’। কিন্তু ‘মাসজিদ’ হল কেন? অর্থাৎ ‘জিমের’ ওপরে ‘জবর’ না হয়ে নীচে ‘যের’ হল কেন? এই প্রশ্নের জওয়াবে বলা যায় যে, ‘মাসজিদ’ কেবল নামাযের জায়গাই নয়। শুধু নামাযের জায়গা হলে এটি হত ‘মাসজাদ’। মূলত মাসজিদের অর্থ আরো ব্যাপক। এতে নামাযসহ আরো বহু কাজ আঞ্জাম দিতে হয়। সেজন্য মসজিদ প্রথমদিন থেকেই আল্লাহর হক এবং বান্দার হকের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
পরিবারের পরেই মসজিদ হচ্ছে, ইসলামী সমাজের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট। এটাকে মুসলিম সমাজের সামষ্টিক কেন্দ্রও বলা যেতে পারে। মসজিদ থেকেই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে দিক নির্দেশ নিতে হবে। তাই মসজিদকে বহুমুখী ভূমিকা পালন করতে হয়। মসজিদকে তার আকাংখিত ভূমিকা, পয়গাম ও কর্মসূচী থেকে খালি রাখলে তা প্রাণহীন হয়ে পড়তে বাধ্য। ফলে গোটা সমাজ ও রাষ্ট্র এর কল্যাণ থেকে থাকবে বঞ্চিত।
রসূলুল্লাহ (স) মদীনায় তিনটি প্রাথমিক ভিত্তির ওপর নূতন সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। সেগুলো হচ্ছে, ১. মসজিদে নববীর প্রতিষ্ঠা। ২. মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব এবং ৩. মদীনা সনদ। সর্বোপরি, তিনি গোটা সমাজে কুরআন ও হাদীসের আইন চালু করেন। তিনি নিজেই ছিলেন সেই মসজিদ ও রাষ্ট্রের নেতা এবং আল্লাহর রসূল। বাস্তবে মসজিদ কি তা একটু বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। মসজিদ হচ্ছে মুসলমানদের দৈনিক সম্মেলন কেন্দ্র। দিন ও রাতে পাঁচবার নামাযের জন্য সেখানে তারা মিলিত হন।
অপরদিকে জুমাবার হচ্ছে, মুসলমানদের সাপ্তাহিক সম্মেলনের দিন। কেননা, দৈনিক সম্মেলনের চাইতে সাপ্তাহিক সম্মেলনের পরিসর আরো বড় ও প্রশস্ত। সেদিন অপেক্ষাকৃত বেশী লোক এক স্থানে জড় হয়। কেননা, অনেক ছোট মসজিদে জুমা হয় না। তাই সবাই বড় মসজিদগুলোতে আসার কারণে সেই সমাবেশটা বেশ বড় হয়। ইমাম সাহেব সবার উদ্দেশ্যে সময় ও প্রয়োজনের দাবী অনুযায়ী খোতবাহ বা বক্তৃতা করেন। এতে করে সবাই নেতা বা ইমাম থেকে সাপ্তাহিক উপদেশ গ্রহণের সুযোগ পান।
পক্ষান্তরে, মুসলমানের বার্ষিক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় মক্কার মসজিদে হারামকে কেন্দ্র করে। হজ্জ ইসলামের ৫ম রোকন। সেই হজ্জ পালন করার উদ্দেশ্যে মুসলমানগণ দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন আল্লাহর ঘর কা'বা শরীফে। ৯ই জিলহজ্জ তাঁরা হজ্জ আদায় করেন।
এভাবে মসজিদ পাড়া ও মহল্লা থেকে আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে এবং শুধু জাতিগত ঐক্য নয় বরং আন্তর্জাতিক মুসলিম ঐক্য ও সংহতির পয়গাম বিতরণ করে; এর ফলে মসজিদ বিশ্বের সকল মুসলমানকে একই পরিবারভুক্ত করতে সক্ষম হয়। এ জন্য আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ
"মু'মিনরা একে অপরের ভাই। তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ করে দাও।” (আল-হুজুরাত-১০)
মসজিদ প্রসঙ্গে একজন কম্যুনিষ্ট নেতা মন্তব্য করেছিলেন, "যদি আমার কাছে লোকেরা দৈনিক পাঁচবার হাজির হয়, তাহলে, আমি গোটা দুনিয়াকে কম্যুনিষ্ট বানিয়ে দিতে পারবো।” (দৈনিক ওকাজ, জেদ্দা, ১৯৯০ খৃঃ)
কম্যুনিষ্ট নেতাটি মুসলমানের জীবনে মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদানের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েই ঐ মন্তব্য করেছিলেন। ভেঙ্গে পড়া (সাবেক) সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯১৭ খৃস্টাব্দে যে কম্যুনিজম কায়েম হয়, মুসলমানরা কিছুতেই সেই কম্যুনিজমের সাথে নিজেদেরকে মিশিয়ে নিতে পারেনি। কম্যুনিষ্টরা গবেষণা চালিয়ে বুঝতে পারল যে, এর জন্য দায়ী হচ্ছে মসজিদ। তখন সেই নাস্তিক কম্যুনিষ্ট ঐ মন্তব্য করেন যা পরবর্তীতে মসজিদ সম্পর্কে একটি সাধারণ দৃষ্টান্তে পরিণত হয়।
আজকের মুসলিম দেশগুলো বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি স্বাধীনতা লাভ করেছে। প্রায় দু' শতাব্দী যাবত মুসলিম দেশগুলো বৃটেন, ইটালী, হল্যান্ড ও ফরাসী উপনিবেশের অধীন ছিল। মুসলমানরা খৃস্টান ঔপনিবেশিক শাসনামলে নিজেদের বৈশিষ্ট্য, ঐতিহ্য, পরিচিতি ও আদর্শিক প্রেরণা হারিয়ে ফেলে। ১৮ শতকের মাঝামাঝি বৃটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটায়। ১৯ শতকের শেষদিকে, (১৮৮৩ খৃঃ) বৃটিশরা মিসর দখল করে।
অনুরূপভাবে, সিরিয়া, লিবিয়া, তিউনেশিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া ও অন্যান্য আফ্রিকান মুসলিম দেশগুলোসহ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় ছিল খৃষ্টান উপনিবেশ।
বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে মুক্তি পেয়েছে উজবেকিস্তান, আজারবাইজান, তাজিকিস্তান, কাজাকিস্তান, কিরগিজিয়া ও তুর্কমেনিস্তান আলবেনিয়া, বসনিয়া-হারজেগোভিনা, শিশেন ও দাগিস্তান স্বাধীনতা লাভ করেছে। স্বাধীনতার অপেক্ষায় আছে আরো অনেক মুসলিম ভূখন্ড।
দীর্ঘ দু' শতাব্দীর ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের ফলে মুসলমানদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় অনৈসলামী ভাবধারার প্রভাব পড়ে। যার ফলে মসজিদও তার স্বকীয়তা এবং মৌলিক ভূমিকা হারিয়ে ফেলে। আজকের স্বাধীন পরিবেশে মসজিদের পুনর্জাগরণ কাম্য। এখন আমরা মসজিদের লক্ষ্যগুলো সম্পর্কে আলোচনা করবো। মসজিদের রয়েছে বহুমুখী লক্ষ্য ও ভূমিকা। সেগুলো হচ্ছে, ১
১. মুসলমানদের অন্তরে ইসলামের আকীদা-বিশ্বাসকে বদ্ধমূল করা। বিভিন্ন কর্মসূচী, জ্ঞানচর্চা ও ইবাদাতের মাধ্যমে অন্তরে ইসলামী আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপন করে অনুকূল পরিবেশের মাধ্যমে তাকে লালন-পালন করা।
২. মুসলমানদের জীবনে রূহানী মূল্যবোধকে স্থায়ী করা। মসজিদে ইবাদাত ও রহমাতের (বেদআতমুক্ত) পরিবেশে আল্লাহর সাথে আত্মার গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।
৩. মুসলিম ঐক্য সুদৃঢ় করা। অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী সৃষ্টি করে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা গ্রহণের উদ্দেশ্যে মসজিদের যাবতীয় তৎপরতা নিবদ্ধ থাকে।
৪. মুসলমানের জীবনে সহযোগিতা ও সহমর্মীতার ভাব সৃষ্টি করা। মসজিদে পরস্পর পরিচিতি লাভের পর একে অপরের সুখ-দুঃখে অংশ গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক কর্মসূচীর মাধ্যমে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরী হয়।
৫. মুসলমানের জীবনে উন্নত চরিত্র ও উত্তম মানবীয় মৌলিক গুণাবলী সৃষ্টি করা। মসজিদে তাত্ত্বিক ও বাস্তব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবাধিকার ও মানবতার মুক্তির অনুভূতি জাগ্রত করা হয়।
৬. সর্বোত্তম উপায়ে মসজিদে ইবাদাত বন্দেগীর সুযোগ রয়েছে। মসজিদের দীনী ও নৈতিক পরিবেশের আধ্যাত্মিক ছোঁয়ায় গভীর মনোযোগের সাথে আল্লাহর ইবাদাত করা যায় যা অন্য কোন জায়গায় সম্ভবপর নয়।
৭. মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী সংস্কৃতির উন্নয়ন করা। ইসলামী জীবন বিধানের আওতায় ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ সাধন করা জরুরী। মসজিদ হচ্ছে, ইসলামী সংস্কৃতি বিকাশের কেন্দ্র। মসজিদ থেকে যে সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রিত হবে তা অন্য যে কোন সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দাবীদার হবে। ইসলামী সংস্কৃতি বলতে, আচার-অভ্যাস, কৃষ্টি, আনন্দ উৎসবসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে গৃহীত পদ্ধতির মডেলকে বুঝায়। মসজিদ সেগুলোকে জাহেলিয়াত তথা অনৈসলামী পদ্ধতি থেকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে।
৮. সমাজ সংস্কার মসজিদের অন্যতম লক্ষ্য। মানব সমাজে প্রচলিত মানুষের সৃষ্ট মতবাদ ও আমলের মাধ্যমে যে কুসংস্কার ও কুপ্রথা চালু হয় তা সমাজের গতিশীলতার জন্য বিরাট বাধা। সেই কুসংস্কারকে মোকাবিলা করতে না পারলে সমাজকে আকাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই মসজিদের শিক্ষার মাধ্যমে ঐসকল কুসংস্কার দূর করে সমাজে প্রগতির ধারা সৃষ্টি করা হয়।
৯. সমাজকল্যাণ মসজিদের একটি অবিচ্ছেদ্য লক্ষ্য ও অংশ। সমস্যাগ্রস্ত লোকদের সমস্যার সমাধান করে তাদেরকে সমাজে খাপ খাইয়ে চলতে সাহায্য করা জরুরী। সমাজকল্যাণের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সমাজকর্ম কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। মসজিদের রয়েছে সেই অপূর্ব সুযোগ। সংশ্লিষ্ট এলাকার লোক ও মুসল্লীদের সমস্যার সমাধান করার মাধ্যমে গোটা সমাজ সমস্যামুক্ত হতে পারে।
১০. ওপরে বর্ণিত সকল লক্ষ্যের সফল বাস্তবায়নের জন্য জ্ঞান চর্চার প্রয়োজন। মসজিদে ইসলামের জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে এ সকল লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সহজ। বরং জ্ঞান চর্চাকে সর্বাধিক বড় লক্ষ্য হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে।
মসজিদ হচ্ছে, আল্লাহ প্রেমিকের আকুতি-মিনতির কেন্দ্র। তাই জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বলেছেন,
"কত দরবেশ ফকির রে ভাই মসজিদের আঙ্গিনাতে, আল্লাহর নাম জিকর করে লুকিয়ে গভীর রাতে।”
মসজিদে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আযান হয়। মুয়াযযিনের আযানেরও রয়েছে সুললিত কণ্ঠস্বর। তাই একই কবি বলেছেন:
'ও আযান ও কি পাপিয়ার ডাক, কোকিলের কুহুতান, মোআজ্জিনের কণ্ঠে ও কি ও তোমারি সে আহবান।'
কবি জীবিত অবস্থায় যে আযানের সুললিত কণ্ঠে মুগ্ধ, তিনি মৃত্যুর পরেও তা শুনার জন্য আগ্রহী। তাই তিনি বলেছেনঃ
'মসজিদের পাশে আমার কবর দিও ভাই, যেন গোরে থেকে ও মুআজ্জিনের আজান শুনতে পাই।'
টিকাঃ
১. রেসালাতুল মাসজিদ ফিল ইসলাম : ডঃ আবদুল আযীয মুহাম্মদ -রিয়াদ, প্রকাশ -১৯৮৭
📄 মসজিদের ফজীলত
এখন আমরা মসজিদের ফযীলত সম্পর্কে আলোচনা করবো। এক হাদীসে এসেছে,
أَحَبُّ الْبِلادِ إِلَى اللَّهِ مَسَاجِدُهَا - “আল্লাহর কাছে প্রিয়তম স্থান হচ্ছে, মসজিদ।”
আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য তাঁর প্রিয় স্থানে যাওয়ার প্রয়োজন আছে।
রসূলুল্লাহ (স) আরো বলেছেন: مَنْ بَنَى لِلَّهِ مَسْجِدًا بَنَى اللَّهُ لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ - (طبراني) “যে আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি মসজিদ তৈরি করে, আল্লাহ বেহেশতে তার জন্য একটি ঘর তৈরি করেন।” (তাবরানী)
মসজিদ তৈরি করলে তার বিনিময়ে বেহেশত লাভ করা যাবে।
রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "আল্লাহ বলেন, মসজিদগুলো যমীনে আমার ঘর। সেগুলোতে ইবাদাতকারীরা আমার যেয়ারতকারী। যে ব্যক্তি নিজ ঘরে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয়ে আমার ঘরে এসে যেয়ারত করে, তার জন্য সুখবর; যেয়ারতকারী মেহমানকে সম্মান করা মেজবানের দায়িত্ব ও কর্তব্য।”১ এ হাদীসে মসজিদের গুরুত্ব ও মর্যাদা কতবেশী, তা পরিষ্কার হয়ে ওঠেছে।
হযরত ওসমান (রা) থেকে বর্ণিত: سمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُولُ مَنْ بَنَى مَسْجِدًا يَبْتَغِي بِهِ وَجْهَ اللَّهِ بَنَى اللَّهُ لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ - “আমি রসূলুল্লাহ (স)-কে বলতে শুনেছি, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি মসজিদ তৈরি করে, আল্লাহ তার জন্য বেহেশতে একটি ঘর তৈরি করবেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مَنْ بَنَى بَيْتًا يَعْبُدُ اللَّهَ فِيْهِ مِنْ مَّالٍ حَلَالٍ بَنَى اللَّهُ لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ مِنْ دُرِّ وَ يَاقُوت -
"রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদাতের উদ্দেশ্যে হালাল অর্থ-সম্পদ দিয়ে একটি মসজিদ তৈরি করে, আল্লাহ বেহেশতে তার জন্য মূল্যবান মুক্তা ও ইয়াকুত পাথর বিশিষ্ট একটি ঘর তৈরি করবেন।” (তাবরানী)
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন: مَنْ بَنَى مَسْجِدًا لا يُرِيدُو بِهِ رِيَاء وَلَا سُمْعَةً بَنَى اللَّهُ لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ -
"যে ব্যক্তি লোক দেখানো কিংবা সুনাম অর্জনের উদ্দেশ্য ব্যতীত একটি মসজিদ তৈরি করে, আল্লাহ তার জন্য বেহেশতে একটি ঘর তৈরি করবেন।” (তাবরানী)
এ সকল হাদীস দ্বারা মসজিদের মর্যাদা ও ফযীলত পরিষ্কার হয়ে ওঠেছে যে, মুসলিম সমাজে মসজিদের প্রয়োজন কত বেশী!
রসূলুল্লাহ (স) আরো বলেছেন: مَن بَنَى لِلَّهِ مَسْجِدًا وَلَوْ كَمَفَحَصِ قَطَاةٍ بَنَى اللَّهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করে, সেটি যদি একটি ছোট পাখির বাসার মতও ছোট হয়, আল্লাহ তার জন্য বেহেশতে একটি ঘর তৈরি করবেন।” (আল-হাদীস)
এ হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, সামর্থহীন লোকেরাও যেন মসজিদ তৈরির উদ্যোগ নেয়। স্বল্প ব্যয়ে ছোট মসজিদ তৈরি করলেও আল্লাহ এর বিনিময়ে বেহেশতে একটি ঘর তৈরি করবেন।
হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, عُرِضَتْ عَلَى أُجُورُ أُمَّتِي حَتَّى الْقَذَاةَ يُخْرِجُهَا الرَّجُلُ مِنَ المسجد -
“আমার সামনে আমার উম্মাহর সওয়াব ও পুরস্কার পেশ করা হয়েছে, এমন কি যে ব্যক্তি মসজিদ থেকে ময়লা-আবর্জনা দূর করে, তার পুরস্কারও পেশ করা হয়েছে।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে খোযায়মাহ)
এ হাদীস দ্বারা আমরা মসজিদ পরিষ্কার রাখার প্রয়োজনীয়তা ও এর পুরষ্কারের কথা জানতে পারি। মসজিদ পবিত্রস্থান বলে এর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও বিরাট সওয়াবের কাজ। তাই মসজিদে থুথু ফেলা নিষেধ। কেউ থুথু ফেললে গুনাহর ক্ষতিপূরণ স্বরূপ তাকে তা পুঁতে ফেলতে হবে কিংবা পরিষ্কার করে দিতে হবে।
মসজিদের সাথে সম্পর্ককে ঈমানের চিহ্ন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ (স) বলেছেনঃ
إِذَا رَأَيْتُمُ الرَّجُلَ يَعْتَادُ الْمَسْجِدَ فَاشْهَدُوا لَهُ بِالْإِيْمَانِ -
"তোমরা যদি কারো মধ্যে মসজিদে যাওয়ার অভ্যাস দেখ তাহলে, তার ঈমানের স্বাক্ষী দাও।” অর্থাৎ সে মোমেন।
এই হাদীসে মসজিদ ও ঈমানকে অভিন্ন ও অবিচ্ছেদ্য বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
টিকাঃ
১. রেসালাতুল মাসজিদ ফিল ইসলাম- ডঃ আবদুল আযীয মোহাম্মদ প্রকাশ- ১৯৮৭, বৈরুত।
📄 মসজিদ সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের মন্তব্য
ক্রেজওয়েল সহ বিভিন্ন প্রাচ্যবিদ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (স) এজন্য মসজিদে নববী তৈরি করেননি যে, তা সামষ্টিকভাবে মুসলমানদের নামাযের কেন্দ্র, কিংবা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কমাও কেন্দ্র হবে। তিনি মূলত নিজে একটি বাসস্থান এবং পার্শ্বে দেয়ালঘেরা একটি আঙ্গিনা তৈরি করেন। এতে মুসলমানরা নামায পড়তে পারত। মসজিদে নববী সম্পর্কে এটা হচ্ছে প্রাচ্যবিদদের মিথ্যা প্রচারের একটি নমুনা। অথচ কে না জানে যে, মসজিদে নববীর পরিচয় রসূলুল্লাহ (স)-এর বাসস্থান হিসেবে নয়, মসজিদ হিসেবেই খ্যাত। বরং বাসস্থানের বিষয়টি গৌণ এবং মসজিদের বিষয়টিই মুখ্য।
প্রাচ্যবিদরা আরো বলেছেন, ইসলাম নামাযের জন্য মসজিদ তৈরির কথা বলেনি। বরং মুসলমানরাই রসূলুল্লাহ (স)-এর ইন্তেকালের পর নামাযের জন্য মসজিদ তৈরি করেছে। ক্রেজওয়েলের মতে, নবীর ঘরে মানুষ আসত বলে তাদের বসার জন্য একটা ছায়াঘেরা জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়। পরবর্তীতে লোকেরা এটাকে মসজিদ বিবেচনা করে যথারীতি তাতে নামায পড়তে থাকে এবং সেটাকে মসজিদের মর্যাদা দেয়। মসজিদে নববী সহ অন্যান্য মসজিদের ব্যাপারে এটা হচ্ছে তার মত। শুধু তাই নয়, ক্রেজওয়েল আরো বলেছে, পরবর্তীতে মুসলমানরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে মসজিদ তৈরি করেছে। তার মতে, জামায়াতে নামায পড়ার উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম যিয়াদ বিন আবীহ ৪৪ হিজরীতে বসরার মসজিদ সম্প্রসারণ করে। উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন গোত্রে অবস্থিত মসজিদ থেকে লোকদেরকে একটি জামে মসজিদে জড় করে তাদের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক বক্তৃতা (খোতবাহ) করা।
ক্রেজওয়েল আরো দাবী করেছে, হিজরী ৫৪ সাল পর্যন্ত মদীনাবাসীদের কোন জামে মসজিদ ছিল না। এমনকি নবী (স) মুসলমানদের জন্য কোন মসজিদ তৈরি করেননি।
মসজিদ সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের ঐসকল বক্তব্য সম্পূর্ণ কল্পনা বিলাস, ভিত্তিহীন ও অবাস্তব। তারা ঐতিহাসিক সত্যকে দিনে-দুপুরে অস্বীকার করেছে।
কেননা রসূলুল্লাহ (স) হিজরতের পর কুবায় পৌঁছে সর্বপ্রথম যে মসজিদ নির্মাণ করেন তা কুবা মসজিদ নামে ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়ে সেই স্মৃতির কথা আজো স্মরণ করিয়ে দেয়। মক্কী জিন্দেগীতেই নামায ফরয হয়েছিল। তাই রসূলুল্লাহ (স) কুবা থেকে মদীনার অভ্যন্তরে শুক্রবারে রওনা করার পথে বনী সালেম পল্লীতে জুমার নামায ফরয হয়। তিনি সেখানেই জুমার নামায আদায় করেন এবং তখন থেকে এ পর্যন্ত সেখানে একটি মসজিদ বিদ্যমান আছে।
স্বয়ং রসূলুল্লাহ (স)-এর জীবদ্দশায় অবতীর্ণ কুরআনের আয়াতে জামে মসজিদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। সূরা তাওবার ১৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ "কেবলমাত্র তারাই মসজিদ আবাদ করতে পারে যারা আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমান রাখে, নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না, আশা করা যায় যে, তারা হেদায়াত লাভ করবে।"
সূরা তাওবার ১৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেনঃ "মোশরেকরা আল্লাহর মসজিদ আবাদ করতে পারে না।"
কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন জায়গায় মসজিদের উল্লেখ রয়েছে। সেগুলোতে মসজিদের ভূমিকা ও কার্যাবলী সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তাই প্রাচ্যবিদরা মসজিদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে মূলত ইসলামকেই অস্বীকার করতে চায়। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের অধ্যয়ন ও জ্ঞান-গবেষণা এ উদ্দেশ্যেই নিবেদিত।
প্রাচ্যবিদদের বক্তব্য ঐতিহাসিক তথ্যেরও বিপরীত। মাকরীজী বলেছেন, "হযরত ওমর (রা) যখন বিভিন্ন শহর জয় করেন তখন তিনি বসরার শাসক আবু মূসা আশআরীকে এক চিঠিতে জামায়াত কায়েম করার উদ্দেশ্যে মসজিদ তৈরির নির্দেশ দেন এবং বলেন, জুমার দিন যেন সবাই জামে মসজিদে জুমার নামায জামায়াত সহকারে আদায় করে। তিনি অনুরূপভাবে, কুফার শাসক সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস এবং মিসরের শাসক আমর বিন আসের কাছেও নির্দেশ পাঠান, তিনি সিরিয়ার এলাকার গভর্ণরদের কাছেও অনুরূপ চিঠি পাঠিয়ে মসজিদ তৈরির নির্দেশ দেন এবং তাদেরকে গ্রাম ছেড়ে শহরে বাস করার অনুরোধ জানান। তাদের প্রতি প্রত্যেক শহরে একটি করে জামে' মসজিদ নির্মাণের আদেশ দেন। লোকেরা হযরত ওমর (রা) এর নির্দেশ পালন করেন।”১.
এ সকল ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ করে যে, বসরায় যিয়াদ বিন আবীহর মসজিদ নির্মাণের আগেই হযরত ওমর (রা) বিভিন্ন শহরে মসজিদ নির্মাণের আদেশ দিয়েছেন। ফলে মসজিদের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের বক্তব্য ও মন্তব্য বিলাসী কল্পনার ফানুস ছাড়া আর কি হতে পারে? মুসলমানদের সামাজিক জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মিলনকেন্দ্র মসজিদ সম্পর্কে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। মুসলিম সমাজে মসজিদ না থাকলে তা মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থেকে বঞ্চিত থাকবে। আর এটাই প্রাচ্যবিদদের তথাকথিত স্বর্গীয় স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন হবে। আল্লাহ আমাদেরকে তাদের নাপাক দূরভিসন্ধি থেকে রক্ষা করুন।
টিকাঃ
১. আল-খোতাত আল-মাকরীযিয়াহ, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১০৭।
📄 মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
রসূলুল্লাহ (স) মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় যান এবং ৬২২ খৃঃ মোতাবেক ১২ই রবিউল আউয়াল তিনি কুবায় পৌঁছেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি প্রথমেই কুবায় যে মসজিদ তৈরি করেন, তা ছিল ইসলামের প্রথম মসজিদ। কুবায় দুই সপ্তাহ অবস্থান করার পর তিনি মদীনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছেন এবং যেখানে তাঁর উট বসে পড়েছিল সেখানেই তিনি মসজিদ তৈরি করেন। এটাকে মসজিদে নববী বলা হয়। এটা ছিল ইসলামের দ্বিতীয় মসজিদ। মসজিদ তৈরির পর মসজিদের পূর্ব পার্শ্বে তাঁর বাসস্থান তৈরি করেন।
নামায ও ইবাদাতের স্থান নির্ধারণ, সাহাবায়ে কেরামের সাথে রসূলুল্লাহ (স)-এর মিলনস্থান, জিহাদে গমনকারী মুজাহিদ মুসলমানদের কমাণ্ডস্থান এবং মুসলমানদের ইলম ও আমল চর্চার কেন্দ্র হিসেবে মসজিদে নববী নির্মাণ করা হয়েছিল।
ইসলামের আগমনের কারণে আরবদের জীবনে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অন্যান্য জাতির মধ্যেও ইসলাম বিরাট প্রভাব সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন সভ্যতা-সংস্কৃতি ইসলাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে।
আরব সমাজ যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ঝগড়া-ফ্যাসাদে লিপ্ত ছিল। রসূলুল্লাহ (স) ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যব ব্যবস্থা কায়েম করে সেই সকল দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ বন্ধ করেন। তিনি মদীনাকে রাজধানী করে যে রাষ্ট্র কায়েম করেন তাতে করে আরবরা ইসলাম গ্রহণ করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায়। রসূলুল্লাহ (স) ইসলামী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক কাঠামো ঘোষণা করেন।
ইসলাম একটি বিশ্বাস, আদর্শ পদ্ধতি ও সর্বোচ্চ নৈতিক নীতিমালা সহকারে প্রেরিত হয়েছে। তাই মদীনা একদিকে দারুল হিজরাহ এবং অন্যদিকে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। মক্কা বিজয়ের পর মদীনা পুরো হেজাজ অঞ্চলের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। হযরত আলী (রা) কর্তৃক কুফায় রাজধানী স্থানান্তরের আগ পর্যন্ত দীর্ঘদিনব্যাপী মদীনা ছিল নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী।
মানুষ দলে দলে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হতে লাগল এবং অগণিত লোক মুসলমান হওয়া শুরু করল। মূর্তি ও প্রতিমা পূজা ইসলামী আদর্শের মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে লাগল। ইসলাম শিরকের মূলোৎপাটন ঘোষণা করল এবং হালাল ও হারাম, ইসলামী আইন ও বিধান এবং নামাযের জন্য আযান চালু করল। ধনীদের ওপর যাকাত ফরয করে ইসলাম গরীবদের প্রতি সহানুভূতির পদ্ধতি চালু করে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার এবং মোমেনদের নিয়ে সেনা বাহিনী তৈরি করা হল। ইসলাম বিরোধী শক্তি যেন তা দেখে ভয় পায়।
মানুষের মন-মগজের রাজ্যে ইসলামই প্রথম সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের নীতির কথা প্রচার করে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন নাগরিকদের মধ্যে বর্ণ-বংশ ও ভাষার ঊর্ধে উঠে তা বাস্তবায়ন করে। ফরাসী বিপ্লবের নেতা রুশোর স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের নীতির এক হাজার বছর আগে মদীনায় ইসলামের সেই নীতি বাস্তবায়িত হয়। মহানবী (স) ঘোষণা করেছেনঃ
النَّاسُ سَوَاسِيَةً كَأَسْنَانِ الْمُشْطِ الأَفَضْلَ لِعَرَ بِي عَلَى عَجَمِي الا بالتقوى .
"মানুষ চিরুনীর দাঁতের মত সমান। অনারবের ওপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য নেই। শুধুমাত্র তাকওয়ার ভিত্তিতেই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হবে।”
তাকওয়া হচ্ছে, আল্লাহর আদেশ ও নিষেধসমূহ মেনে চলা। একথা-ই কুরআনেও বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ -
"তোমাদের কাছে সেই ব্যক্তিই বেশী সম্মানিত যিনি তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী।"
রসূলুল্লাহ (স) আনসার ও মুহাজির এবং ইহুদী ও খৃস্টানদের সবাইকে নিয়ে ঐতিহাসিক মদীনা সনদ তৈরি করেন এবং এর ভিত্তিতে মদীনার প্রশাসন এবং যুদ্ধ ও সন্ধি নীতি পরিচালনা করেন। এর আগে আরবরা কখনও কোন আদর্শিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিল না। বরং তাদের সামাজিক বন্ধন ছিল গোত্র, বংশ ও আত্মীয়তাভিত্তিক। ইসলামই প্রথম আদর্শিক রাষ্ট্র চালু করে এবং ইহুদী ও খৃস্টানদেরকেও মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক ঘোষণা করে। মদীনা সনদের ভিত্তিতে ইহুদী ও খস্টানরা মদীনার ওপর আক্রমণ হলে তার প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। এক কথায়, মদীনায় ইনসাফ, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও কল্যাণের এক নতন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
মসজিদ হচ্ছে, ইসলামী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তির অন্যতম। তাই রসূলুল্লাহ (স)-এর সময় থেকে মসজিদ নির্মাণের যে ধারা শুরু হয়েছে তা পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবয়ে তাবেঈনসহ মুসলিম খলীফা ও শাসকরা অব্যাহত রাখেন এবং সর্বত্র মসজিদ তৈরি করেন।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, প্রখ্যাত সাহাবী ওকবাহ্ বিন নাফে' আল-ফেহ্রী কায়রাওয়ানে ৫০ হিজরী সালে এক মসজিদ তৈরি করেন। মুসলিম শাসকরা পরবর্তীতে আফ্রিকা মহাদেশে বহু ত্যাগের বিনিময়ে মসজিদ নির্মাণের ধারা অব্যাহত রাখায় তা মরক্কো পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। তারপর ওকবাহ বিন নাফে' মুআবিয়া বিন হোদাইজ আস্-সুকুনী, আবুল মোহাজের দীনার, যোহাইর বিন কাইস আল-বাওয়া, হাসান বিন নো'মান আল-গাস্সানী, মূসা বিন নাসির এবং তারেক বিন জিয়াদের প্রচেষ্টায় স্পেন পর্যন্ত বিজয়ের ধারা ও মসজিদ নির্মাণের তৎপরতা অব্যাহত থাকে। তাঁরা আল্লাহর দীনকে বিজয়ী করেন এবং মসজিদের মাধ্যমে ইসলামের বাণী সে সকল অঞ্চলে প্রচার করেন।
হযরত আবদুল্লাহ বিন সা'দ বিন আবি সারাহ (রা) ৩১ হিজরীতে দাক্বালা যুদ্ধে জয়লাভ করার পর সেখানকার অধিবাসীদের সাথে প্রথম যে চুক্তি করেন তাতে সেখানে নিজ হাতে তৈরি মসজিদ সম্পর্কে উল্লেখ করেনঃ "মুসলমানরা তোমাদের শহরের উপকণ্ঠে যে মসজিদ তৈরি করেছে তার হেফাজত করতে হবে, তাদেরকে মসজিদে এসে নামায পড়তে বাধা দেয়া যাবে না এবং তোমাদের উচিত, মসজিদ পরিষ্কার রাখা, বাতি দেয়া ও এর সম্মান করা।"