📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান 📄 পিতামাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্নকরণ

📄 পিতামাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্নকরণ


সন্তানের ওপর পিতামাতার বহু অধিকার রয়েছে। তাদের আনুগত্য করা, তাদের সাথে ভালভাবে কথাবার্তা বলা, তাদের প্রতি সম্মান শ্রদ্ধা প্রদর্শন প্রভৃতি সন্তানদের কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। মানব প্রকৃতিই তা করার জন্য তাগিদ জানায়, সুশোভনভাবে এ সব কাজের জন্যে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। মা'র ক্ষেত্রে এই কর্তব্য অধিকতর তাগিদপূর্ণ। কেননা মা-ই তাকে গর্ভে স্থান দিয়েছে, ক্রমাগত দশ মাস কাল তাকে গর্ভে বহন করেছে, তাকে প্রসব করার মারাত্মক ও মর্মান্তিক যন্ত্রণা ভোগ করেছে, তাকে নিজের বুকের স্তন চুষিয়েছে, রক্ত পানি করা দুগ্ধ পান করিয়াছে এবং অশৈশব তার রক্ষণাবেক্ষণ ও লালন-পালন করেছে। এতে তার যে কষ্ট হয়েছে, তা কোন ভাষা দিয়ে বর্ণনা করা যায় না। আল্লাহ নিজেই বলেছেন:

আমরা মানুষকে তাগিদ করেছি এজন্যে, যেন তারা তাদের পিতামাতার সাথে ভাল ব্যবহার করে। তার মা কষ্ট স্বীকার করে তাকে বহন করেছে, প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করেছে। আর ত্রিশ মাস কাল পর্যন্ত তাকে বহন ও দুগ্ধ পান করিয়েছে। (সূরা আল-আহক্বাফ: ১৫)

এক ব্যক্তি এসে রাসূলে করীম (স)-কে জিজ্ঞেস করল :
আমার সর্বোত্তম সাহায্য ও সেবা-যত্ন পাওয়ার সকলের মধ্যে সবচাইতে বেশি অধিকার কার?
জবাবে তিনি বললেন : তোমার মা'র।
তারপর কে, তারপরে কে এবং তারপরে কে বেশি অধিকারী জিজ্ঞেস করা হলে রাসূলে করীম (স) প্রত্যেকবারই বললেন: তোমার মা, তোমার মা, তোমার মা। তার পরের অধিকারী হচ্ছে তোমার পিতা। (বুখারী, মুসলিম)

এ পিতামাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা, তাদের কষ্ট দেয়া সবচাইতে বড় কবীরা গুনাহ বলে নবী করীম (স) ঘোষণা করেছেন। তাঁর ঘোষণায় এ পাপটি হচ্ছে শিরকের পর বড় গুনাহ। নবী করীম (স) বলেছেন:

সবচাইতে বড় কবীরা গুনাহ কোনটি, আমি কি তা তোমাদের জানাব না ? এ প্রশ্ন নবী করীম (স) তিনবার করলেন। সাহাবিগণ বললেন : হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই তা আমাদের বলবেন। তখন তিনি বললেন : তা হচ্ছে আল্লাহর সাথে শরীক করা এবং পিতামাতার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা। (বুখারী, মুসলিম)

রাসূলে করীম (স) আরও বলেছেন:
তিনজন লোক কখনই জান্নাতে যাবে না। তারা হচ্ছে: পিতামাতার সাথে সম্পর্কচ্ছেদকারী, খারাপ ব্যবহারকারী, যে পুরুষ নিজ স্ত্রী দ্বারা খারাপ কাজ করায় এবং পুরুষালি চাল-চলন গ্রহণকারী নারী। (নাসায়ী, বাজ্জার, হাকেম)

তিনি অপর এক হাদীসে বলেছেন:
গুনাহগুলোর মধ্যে আল্লাহ যতটা চান তার শাস্তি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বিলম্বিত করবেন। কিন্তু তিনি পিতামাতার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ, খারাপ ব্যবহার করার পাপকে মৃত্যুর পূর্বে এ জীবনেই তড়িৎ ব্যবস্থায় শাস্তিতে পরিণত করবেন। (হাকেম)

বিশেষ করে পিতামাতা বার্ধক্যে পৌঁছলে তাদের কল্যাণ কামনার জন্যে অধিক তাগিদ করা হয়েছে। কেননা এ সময় তাদের শক্তি সামর্থ্য নিঃশেষ হয়ে যায়। তখন তাদের দৈনন্দিন ব্যাপারে অধিক লক্ষ্য দেয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, বেশি বেশি যত্ন নেয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে। এ সময় খুব দরদ সহানুভূতি ও ভক্তি-শ্রদ্ধা সহকারে যত্ন নেয়ার প্রয়োজন তীব্র হয়ে উঠে। এ কথাই আল্লাহ বলেছেন নিম্নোদৃত আয়াতেঃ

তোমার আল্লাহ ফরমান জারী করেছেন যে, তোমরা কারোরই দাসত্ব করবে না, কেবল মাত্র তাঁকে ছাড়া। আর পিতামাতার সাথে ভাল ব্যবহার আচরণ গ্রহণ করবে। তোমার কাছে তাদের একজন বা দুজনই যদি বার্ধক্যে পৌঁছে যায়, তাহলে তখন তাদের মনে কষ্ট হয় এমন কথা বলবে না, তাদের ভর্ৎসনা তিরষ্কার করবে না বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলবে। তাদের খেদমতে বিনয় ও দরদমাখা বাহু বিছিয়ে দেবে এবং বলবে, হে আল্লাহ! তুমি এ দুজনের প্রতি রহমত কর, যেমন করে তারা আমাকে ছোট-অবস্থায় লালন-পালন করেছে। (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩-২৪)

এ আয়াতের সমর্থনে হাদীসে বলা হয়েছে :
পিতামাতাকে 'উহ' বলার অপেক্ষাও ছোট কোন ব্যবহার পিতামাতার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ ও খারাপ ব্যবহার পর্যায়ের থাকতে পারে বলে যদি আল্লাহ তা'আলা জানতেন, তাহলে তাও তিনি হারাম করে দিতেন।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান 📄 পিতামাতাকে গালাগাল দেয়ার কারণ ঘটানোও কবীরা গুনাহ্

📄 পিতামাতাকে গালাগাল দেয়ার কারণ ঘটানোও কবীরা গুনাহ্


এর চাইতেও বড় কথা হচ্ছে, নবী করীম (স) পিতামাতাকে গালি খাওয়ানর কারণ ঘটানকেও হারাম ঘোষণা করেছেন। বরং তা হচ্ছে কবীরা গুনাহ। তিনি বলেছেন:
পিতামাতাকে অভিশাপ দেয়াও সবচাইতে বড় কবীরা গুনাহ। কোন বুদ্ধিমান ঈমানদার মানুষ পিতামাতাকে অভিশাপ দিতে পারে— অথচ তাদের দরুণই তার জীবন ও অস্তিত্ব লাভ সম্ভবপর হয়েছে— তা লোকদের বোধগম্য হলো না। তারা বিস্ময় সহকারে প্রশ্ন করল : কেমন করে একজন লোক তার পিতামাতাকে অভিশাপ দিতে পারে? জবাবে রাসূলে করীম (স) বললেন : একজন অপর কারো পিতাকে গাল দেয়, সেও এর পিতাকে গাল দেয়। একজন অপর কারো মা'কে গালমন্দ বলে, সে-ও এর মা'কে গাল-মন্দ বলে— এভাবেই অভিশাপ দেয়ার কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে। (বুখারী, মুসলিম)

তাহলে যে লোক নিজেই তার পিতামাতাকে তাদের সম্মুখে গালাগাল করে, তার সম্পর্কে কি বলা যায়?

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান 📄 পিতামাতার অনুমতি ছাড়া জিহাদে যাওয়া

📄 পিতামাতার অনুমতি ছাড়া জিহাদে যাওয়া


পিতামাতার অনুমতি ছাড়া জিহাদে চলে যাওয়াও হারাম করে দেয়া হয়েছে। কেননা ইসলামের দৃষ্টিতে পিতামাতার সন্তুষ্টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ- অধিক কাম্য। তার তুলনায় জিহাদ হচ্ছে কম নফল কাজ, যদিও তাতে অনেক বেশি সওয়াব নিহিত রয়েছে, যা সারা রাত নামায পড়ে ও সারা বছর রোযা থেকেও পাওয়া যায় না।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনুল আ'স (রা) বলেছেন: এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স)-এর কাছে এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: তোমার পিতামাতা জীবিত আছেন? বললেন, হ্যাঁ। তখন নবী করীম (স) বললেন: তাহলে তুমি তাদের খেদমতে প্রাণপাত করে দাও। (বুখারী, মুসলিম)

অপর এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স)-এর কাছে এসে বললেনঃ আমি আপনার কাছে হিজরত ও জিহাদ করার বায়'আত করব, তা করে আমি আল্লাহর কাছ থেকে সওয়াব পেতে চাই।

নবী করীম (স) জিজ্ঞেস করলেন: তোমার পিতামাতার মধ্যে কেউ বেঁচে আছেন? বলল: হ্যাঁ, দুজনই বেঁচে আছেন। নবী করীম (স) জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কি সত্যই আল্লাহর কাছ থেকে সওয়াব লাভ কাতে চাও। বলল: হ্যাঁ, চাই, তখন নবী করীম (স) বললেনঃ তাহলে তুমি তোমার পিতা-মাতার কাছে ফিরে যাও এবং তাদের সাথে উত্তম সাহচর্য গ্রহণ কর। (মুসলিম)

অপর এক হাদীসের ভাষা এরূপ:
এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স)-এর কাছে এসে বলল: আমি আপনার কাছে হিজরতের বায়'আত করার উদ্দেশ্যে এসেছি আর আমার পিতামাতাকে ক্রন্দনরত অবস্থায় ফেলে রেখে এসেছি। একথা শুনে নবী করীম (স) বললেন: তুমি তোমার পিতামাতার কাছে ফিরে যাও এবং যেমন তুমি তাঁদের কাঁদিয়েছ, তেমনি তাদের মুখে হাসি ফোটাও। (মুসলিম)

হযরত আবু সায়ীদ (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, একজন ইয়ামেনী লোক হিজরত করে নবী করীম (স)-এর কাছে উপস্থিত হলেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়ামেনে তোমার কেউ আছে? বলেলেন: আমার পিতামাতা রয়েছেন। নবী করীম (স) জিজ্ঞেস করলেন: তাঁরা কি তোমাকে অনুমতি দিয়েছেন। বললেন: না। তখন নবী করীম (স) আদেশ করলেন: তুমি তোমার পিতামাতার কাছে ফিরে যাও এবং তাদের অনুমতি চাও, যদি তারা অনুমতি দেয়, তাহলে জিহাদে যাও নতুবা তাদের খেদমতে আত্মনিয়োগ করে থাক। (আবূ দাউদ)

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান 📄 মুশরিক পিতামাতার সাথে ব্যবহার

📄 মুশরিক পিতামাতার সাথে ব্যবহার


যেহেতু ইসলাম পিতামাতার ব্যাপারে খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করে এজন্যে তারা মুশরিক হলেও তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা ও তাদের প্রতি খারাপ আচরণ অবলম্বন করাকেও ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে। এমন কি তারা যদি শিরক কাজে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করে, শিরক কাজের প্রতি আহ্বান জানায়, তার প্রচারকও হয় এবং তাদের মুসলিম পুত্রকে সেই শিরক কাজে নিয়ে যেতে চায়, তবুও তাদের সাথে কোনরূপ খারাপ ব্যবহার করা বা সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে:

তুমি শোকর কর আমার এবং তোমার পিতামাতার। ফিরে আমার কাছেই যেতে হবে। তারা দুজন যদি তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে তোমার ওপর জোর প্রয়োগ করে, যে বিষয়ে তোমার কিছুই জানা নেই, তাহলে তাদের আনুগত্য করবে না। তবে তাদের সাথে ইহজীবনে ভাল সাহচর্য ও আচরণ অবলম্বন করবে। আর যে আমার দিকে একান্ত আত্মনিবেদিত, তুমি তার পথই অনুসরন কর। পরে আমার কাছেই তোমাদের সকলকে ফিরে আসতে হবে। তখন আমি তোমাদের জানিয়ে দেব তোমরা কি সব কাজকর্ম করছিলে? (সূরা লোকমান : ১৪-১৫)

এ আয়াত স্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছে যে, মুশরিক পিতামাতা শির্ক করতে বললে ও সেজন্যে বল প্রয়োগ করলে তাদের আনুগত্য করা বা তাদের আদেশ পালন করা যাবে না। কেননা আল্লাহর নাফরমানী হয় অপর যারই আনুগত্য করলে, তা কখনই করা যেতে পারে না। আল্লাহর সাথে শিরক করার তুলনায় বড় গুনাহ কি হতে পারে? কিন্তু তা সত্ত্বেও মুশরিক পিতামাতার সাথে দুনিয়ার জীবনে ভাল ব্যবহার করার আদেশ দেয়া হয়েছে। তাদের ঈমানী অবস্থা কি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করা যাবে না বরং কেবলমাত্র আল্লাহর হুকুম বরদার নেককার লোকদের পথই অনুসরণ করতে থাকতে হবে। কেননা আল্লাহই হচ্ছেন সবচাইতে বড় হুকুমদাতা, বড় বিচারক- সেদিন যেদিন পিতামাতা সন্তানের কোন কাজে আসবে না, কোন সন্তানও কোন উপকার করতে পারবে না তার পিতামাতার।

বস্তুত উদারতা, ক্ষমাশীলতা ও ন্যায়বিচারের এ এমন এক উচ্চ উন্নত দৃষ্টান্ত, যার কোন তুলনাই দুনিয়ার অপর কোন ধর্ম কোন মতাদর্শই পেশ করতে পারবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية