📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 প্রকৃত পিতা ছাড়া অন্য কাউকে পিতা বলা

📄 প্রকৃত পিতা ছাড়া অন্য কাউকে পিতা বলা


নিজের ঔরসজাত সন্তানের পিতৃত্বকে অস্বীকার করা ইসলামে যেমন হারাম, তেমনি হারাম নিজের জন্মদাতা পিতা ছাড়া অন্য কাউকে পিতা বলা— নিজেকে অন্য কারো সন্তান বলা। নবী করীম (স) এ কাজকে নিকৃষ্টতম কার্যাবলীর মধ্যে গণ্য করেছেন। এর ফলে সে স্রষ্টা ও সৃষ্টি সকলেরই অভিশাপে পড়ে যায়। হযরত আলী (রা) বর্ণনা করেছেন— নবী করীম (স) বলেছেন: যে লোক নিজেকে প্রকৃত পিতা ছাড়া অপর কারো সন্তান বলে প্রচার করবে কিংবা নিজের মনিব ছাড়া অপর কারো গোলাম হওয়ার কথা বলে বেড়াবে, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমগ্র মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কাছ থেকে না তওবা কবুল করবেন, না কোন বিনিময়। (বুখারী, মুসলিম)

হযরত সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (স) ইরশাদ করেছেন: যে লোক নিজের পিতা ছাড়া অন্য কারো পুত্র হওয়ার দাবি করবে একথা জেনে শুনে যে, সে তার পিতা নয়, তাহলে জান্নাত তার জন্যে হারাম হবে।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 সন্তান হত্যা করো না

📄 সন্তান হত্যা করো না


এভাবেই ইসলাম মানব বংশকে রক্ষা করে তাকে অব্যাহত ধারায় অগ্রসর করে নিতে চাইছে। এজন্যে প্রত্যেক সন্তান ও পিতামাতার পরস্পরের অধিকার আদায় করা ওয়াজিব করে দিয়েছে, সে অধিকার ততখানি, যতখানি সন্তান বা পিতা হওয়ার দিক দিয়ে উপযুক্ত ও বাঞ্ছনীয় এবং এ অধিকারসমূহ পুরামাত্রায় সংরক্ষণের জন্যে কতগুলো বিষয় উভয়ের ওপর হারাম করে দিয়েছে।

সন্তানের রয়েছে জীবনে বেঁচে থাকার অধিকার। তাই পিতামাতার কোন অধিকার নেই সন্তানের জীবন বিনষ্ট করার, তাকে হত্যা করে হোক কিংবা গোপনভাবে তার অস্তিত্ব সঞ্চারিত হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করেই হোক। জাহিলিয়াতের যুগের পিতামাতারা তাই করত। করত কন্যা সন্তান ও পুত্র সন্তান উভয়কেই। এ জন্যে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিয়েছেন:

তোমরা দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তান হত্যা করো না। আমি তাদের রিযিক দিই, তোমাদেরও আমিই দিচ্ছি। তাদের হত্যা করা অত্যন্ত বড় গুনাহ ও মারাত্মক ভুল।

জীবন্ত প্রোথিত করা কন্যাকে যখন কিয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করা হবে কোন্ অপরাধে তাকে মেরে ফেলা হয়েছিল? (সূরা তাকভীর: ৮-৯)

এ জঘন্য ও বীভৎস কাজের উদ্বোধক যা-ই হোক, তা অর্থনৈতিক হোক- দারিদ্র্য ও খাবারের অভাব পড়ার ভয়েই হোক- কিংবা যেমন সামাজিক লজ্জার ভয়। মেয়ে হলে তদানীন্তন আরবে লজ্জায় তাকে হত্যা করা হতো। ইসলাম এ বর্বর ও পাশবিক কাজকে সম্পূর্ণ হারাম করে দিয়েছে। কেননা এ কাজের ফলে একটি জীবনকে হত্যা করা হয়, রক্ত সম্পর্কের অধিকার বিনষ্ট হয়। দুর্বল মানব সত্তার ওপর অত্যাচার ও জুলুম অনুষ্ঠিত হয়। এ কারণে নবী করীম (স)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: কোন্ গুনাহটি সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ?

উত্তরে তিনি বলেছিলেন:
তুমি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বানাবে- অথচ সেই এক আল্লাহই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর কোন্ গুনাহ বড় জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : তুমি তোমার সন্তানকে হত্যা করবে এ ভয়ে যে, সে তোমার সাথে খাওয়ায় শরীক হবে।

নবী করীম (স) পুরুষদের ন্যায় স্ত্রীলোকদের কাছ থেকেও এ কথার ওপর বায়আত গ্রহণ করেছেন যে, এ এক ভয়াবহ অপরাধ এবং সম্পূর্ণ হারাম। অতএব তা পরিহার করতে হবে। কুরআন মজীদে উদ্ধৃত হয়েছে :

এই যে, তারা আল্লাহর সাথে এক বিন্দু শির্ক করবে না, তারা চুরি করবে না, তারা জ্বেনা-ব্যভিচার করবে না এবং তারা তাদের সন্তান হত্যা করবে না। (সূরা মুমতাহিনা : ১২)

পিতার প্রতি সন্তানের দ্বিতীয় অধিকার হচ্ছে, পিতা তার জন্যে সুন্দর একটা নাম নির্দিষ্ট করবে। অতএব পিতার কর্তব্য সন্তানের এমন নাম না রাখা যার দরুন সে বড় হয়ে কোনরূপ লজ্জা কষ্ট পেতে পারে। দ্বিতীয়ত আল্লাহ ছাড়া অপর কারো বান্দা বা গোলাম হওয়ার অর্থের নামকরণও হারাম, যেমন আবদুনবী- নবীর দাস, আবদুল মসীহ- ঈসা মসীর গোলাম ইত্যাদি।

তৃতীয়ত সন্তানের অধিকার হচ্ছে সে পুরোমাত্রার আদর-যত্ন পাবে, ভাল লালন-পালন ও খোর-পোশ পাবে। অতএব এসব ব্যাপারে কোনরূপ ঔদাসীন্য বা উপেক্ষা কিছু মাত্র জায়েয নয়। নবী করীম (স) এ পর্যায়ে বলেছেন :
তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

তিনি বলেছেন :
যার ওপর যাকে খাওয়ান-পরানর দায়িত্ব, সে ব্যাপারে উপেক্ষা ও অবহেলা করাই তার গুনাহগার হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। (আবূ দাউদ, নিসায়ী, হাকেম)

আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন- এ বিষয়ে যে, সে তার দায়িত্ব পালন করেছে, না তার প্রতি উপেক্ষা দেখিয়েছে, তা বিনষ্ট হতে দিয়েছে। এমনকি প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার পরিবারবর্গ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা

📄 সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা


দেয়া-থোয়ার ব্যাপারে সন্তানদের মধ্যে সুষম ও পক্ষপাতহীন নীতি অবলম্বন করা, সমানভাবে স্নেহ মমতা করা ও সমানভাবে সকলের কল্যাণ কামনা পিতার কর্তব্য।

স্নেহ-বাৎসল্য, আদর-যত্ন ও দান-দক্ষিণা বিনা কারণে কাউকে অপরের অপেক্ষা অগ্রাধিকার দান- কোনরূপ বেশি-কম বা পক্ষপাতিত্ব করা সম্পূর্ণ হারাম। কেননা তাতে বঞ্চিত বা পেছনে পড়ে থাকা সন্তানদের মন প্রতিহিংসা জেগে উঠে। তাদের মনে শত্রুতা ও প্রতিহিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে পারে। এক্ষেত্রে পিতা ও মাতার উভয়ের সমান দায়িত্ব। নবী করীম (স) ইরশাদ করেছেন:

তোমরা তোমাদের পুত্র সন্তানদের মধ্যে পূর্ণ ইনসাফ করবে, তোমাদের পুত্র সন্তানদের মধ্যে পূর্ণভাবে সাম্য রক্ষা করবে, তোমাদের পুত্র-সন্তানদের মধ্যে সুষম বন্টন করবে সবকিছু। (আহমদ, নিসায়ী, আবূ দাউদ)

এ হাদীসের পটভূমিতে ঘটনা রয়েছে। বশীর ইবনে সায়দুল আনসারীর স্ত্রী তার পুত্র নুমান ইবনে বশিরের জন্যে তাঁর কাছে বিশেষ ধন-মাল যেমন বাগান ও ক্রীতদাস দেবার জন্যে দাবি করে ও এই দানকে সুদৃঢ় করিয়ে দেবার ইচ্ছা করে। আর এজন্যে এই দানের ওপর রাসূলে করীম (স)-কে সাক্ষী বানানরও দাবি জানায়। হযরত বশীর তখন নবী করীম (স)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন:

হে রাসূল! অমুকের মেয়ে (অর্থাৎ তার স্ত্রী) আমার কাছে দাবি করছে যে, আমি তার (আমার) পুত্রকে আমার ক্রীতদাস দিয়ে দেব। নবী করীম (স) জিজ্ঞেস করলেন: তার কি আরও ভাই-বোন আছে? বললেন: হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন: তাহলে তাদের প্রত্যেককেই কি এই রকম করম দেবে? বললেন: না। তখন নবী করীম (স) বললেন: তাহলে তা কিছুতেই ভাল হবে না। আর আমি তো সত্য ও সুবিচার ছাড়া অন্য কিছুতেই সাক্ষী হতে পারব না। (মুসলিম, আহমদ, আবু দাউদ)

অপর বর্ণনায় রাসূলের কথার শেষ অংশ এইঃ
আমাকে তুমি অবিচার ও হুকুমরে ওপর সাক্ষী বানিও না। তোমার পুত্রদের যে অধিকার তোমার ওপর রয়েছে, তার মধ্যে এও একটি যে, তুমি তাদের মধ্যে ইনসাফপূর্ণ বন্টন করবে। যেমন তোমার অধিকার রয়েছে তাদের ওপর এবং যে, তারা তোমার খেদমত করবে। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ ও সুবিচার করবে। (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ)

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: সন্তানদের মধ্যে ধন বন্টনে পার্থক্য করা যায় যদি তার বাস্তবিকই কোন কারণ থাকে। যেমন দুর্বিপাকে পড়ার দরুন ঠেকায় পড়ে গেছে ও অপরাপরের অপেক্ষা বেশি অসুবিধার মধ্যে পড়ে যায়।

টিকাঃ
১. আল মুগনী গ্রন্থে বলা হয়েছে, কোন রোগ, প্রয়োজন, অন্ধত্ব কিংবা বেশি সংখ্যক সন্তান হওয়া বা তার জ্ঞান অর্জনে মশগুল থাকার দরুন তাকে কিছু পরিমাণ বা বিশেষ কোন জিনিস দেয়া হলে অথবা কোন ছেলে খারাপ হয়ে যাওয়ার কারণে তাকে কিছু না দিলে ইমাম আহমদের মতে তা জায়েয হবে। তিনি বলেন, কোন কোন সন্তানকে বিশেষভাবে ওয়াকফ করে দেয়া প্রয়োজনের দরুন জায়েয, তাতে কোন দোষ হবে না। তবে বিনা কারণে ও বিনা প্রয়োজনে কাউকে কিছু বেশি বা বিশেষভাবে দিলে তাতে মাকরূহ হবে। দানের ব্যাপারেও এই হুকুম।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 মীরাস বণ্টনে আল্লাহ্র আইন পালন

📄 মীরাস বণ্টনে আল্লাহ্র আইন পালন


মীরাস বন্টনের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ইনসাফপূর্ণ নীতি অবলম্বন করতে হবে। কাজেই কোন সন্তানকে মীরাস থেকে বঞ্চিত রাখা পিতার জন্যে জায়েয নয়। কোন আত্মীয়ের উত্তরাধিকারী আত্মীয়কে কৌশল করে বঞ্চিত রাখতে চেষ্টা করাও সম্পূর্ণ হারাম কাজ। কেননা মীরাস আল্লাহর জারী করা বিধান ও ব্যবস্থা। তিনি জেনে শুনে তার সুবিচার নীতি ও বিজ্ঞতা অনুযায়ী নিজেই এ ব্যবস্থা রচনা করেছেন। তাতে প্রত্যেক পাওনাদারকেই তার পাওনা অনুযায়ী অংশ দান করেছেন এবং তিনি লোকদের সেই বিধানের ওপর অবিচল হয়ে থাকার ও তদনুযায়ী কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব মীরাস বন্টনে যে লোক এ নিয়ম ও বিধান অমান্য ও লংঘন করবে, সে তো তার আল্লাহকে দোষী সাব্যস্ত করবে।

আল্লাহ তা'আলা কুরআন মজীদের তিনটি আয়াতে মীরাস সংক্রান্ত যাবতীয় কথা বলে দিয়েছেন। প্রথম আয়াতের শেষে বলেছেন:

তোমরা জান না, তোমাদের পিতা ও তোমাদের পুত্রদের মধ্যে ফায়দা ও উপকারের দিক দিয়ে তোমাদের অধিকতর নিকটবর্তী কে? এটা স্বয়ং আল্লাহরই অংশ বন্টন ও হিস্সা নির্ধারণ। আর আল্লাহই হচ্ছেন সর্বজ্ঞ ও সর্বাধিক বিজ্ঞানী।

দ্বিতীয় আয়াতটির শেষে বলেছেন:
কারো ক্ষতি না করেই- এটা আল্লাহর তরফ থেকে অসীয়ত। আর আল্লাহ সব কিছু জানেন ও পরম ধৈর্যশীল। এসব আল্লাহর নির্দিষ্ট সীমা। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য অনুসরণ করবে, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে দাখিল করবেন, তার পাদদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা সদ্য প্রবহমান। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আর এটা বিরাট সাফল্য। আর যে লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবে ও তাঁর নির্ধারিত সীমাগুলো লংঘন করবে, তাকে এমন জাহান্নামে দাখিল করবেন, যেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আর তার জন্যে লজ্জাকর অপমানকর আযাব রয়েছে।

মীরাস সংক্রান্ত তৃতীয় আয়াতের শেষে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
আল্লাহ তোমাদের কল্যাণের জন্যে সব কিছু স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছেন, যেন তোমরা গুমরাহ হয়ে না যাও। আর আল্লাহ তো সব বিষয়েই পূর্ণ অবহিত।

অতএব মীরাসের যে বিধান আল্লাহ দিয়েছেন, যে লোক তার বিরোধিতা করবে, সে আল্লাহর বিস্তারিতভাবে বলে দেয়া প্রকৃত সত্য থেকে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। আল্লাহর নির্ধারিত সীমাকেও সে লংঘন করেছে। কাজেই তাকে আল্লাহর আযাবের অপেক্ষায় থাকতে হবে। আর তা হচ্ছেঃ জাহান্নাম, চিরদিনই তাতে থাকবে এবং তার জন্যে আরও অপমানকর আযাব রয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00