📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 পালক পুত্র গ্রহণ হারাম

📄 পালক পুত্র গ্রহণ হারাম


পিতার যেমন তার ঔরসজাত সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করার অধিকার নেই। অনুরূপভাবে যে সন্তান তার নিজ ঔরসজাত নয়, তাঁকে নিজের পুত্র বানান ও নিজের পুত্র বলে পরিচয় দেয়া ও দাবি করারও অধিকার নেই। জাহিলিয়াতের যুগে আরবরা অপরাপর জাতির লোকদের ন্যায় পালক পুত্র রেখে যার সাথে ইচ্ছা নিজের বংশ সম্পর্ক স্থাপন করত। যাকে ইচ্ছা নিজের পুত্র বানিয়ে নিত। এ পালিত পুত্রের কর্তব্য অধিকার ঠিক আপন ঔরসজাত পুত্রদের মতই হতো। পালিত পুত্রের পিতা ও বংশধারা জানা অবস্থায়ও এরূপ পালিত পুত্র বানানো হতো।
ইসলামের আগমনকালেও এরূপ পালক পুত্র বানানর রেওয়াজ ছিল তদানীন্তন আরব সমাজে। নবী করীম (স) যায়দ ইবনে হারিসাকে এ জাহিলিয়াতের যুগে নবুওয়্যত প্রাপ্তির পূর্বে পুত্র বানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু ইসলাম ব্যাপরটিকে একটি অবাস্তব ও অসত্য ঘটনা রূপে দেখেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এক ভিন্ন ও অনাত্মীয় ব্যক্তিকে নিজ বংশের লোক বানিয়ে নেয়া ঘরের মেয়দের সাথে ঠিক মুহররম পুরুষের মতো তাকে নিভৃত একাকীত্বে থাকতে দেয়া অথচ প্রকৃতপক্ষে সে এ মর্যাদার ব্যক্তি নয় এবং এ মেয়েরা তার জন্যে মুহররম নয়।
যে লোক কাউকে পালিত পুত্র বানায়, সে তাকে নিজের উত্তরাধিকারীও বানায়। এরূপ অবস্থায় আসল নিকটাত্মীয় উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তির অংশ পাওয়ার অধিকারী হয়েও তারা তা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। তার দরুন প্রকৃত আত্মীয়দের মনে এই মুখে-ডাকা পুত্রের প্রতি একটা গোপন ক্ষোভ ও হিংসা-প্রতিহিংসা অতি স্বাভাবিকভাবেই জেগে উঠে। তার ফলে বিবাদ বিসম্বাদ ও সম্পর্কের অবনতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। কুরআন মজীদ এসব কারণেই এ জাহিলী ব্যবস্থাকে বাতিল ও সম্পূর্ণ অকাট্য হারাম ঘোষণা করেছে। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ ، ذَلِكُمْ قَوْلُكُمْ بِأَفْوَاهِكُمْ ، وَاللَّهُ يَقُولُ الْحَقِّ وَهُوَ يَهْدِي السَّبِيلَ - أَدْعُوهُمْ لِأَبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ ، فَإِنْ لَّمْ تَعْلَمُوا آبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّيْنِ وَمَوَاليْكُمْ -
তোমাদের মুখে-ডাকা পুত্রদেরকে তিনি (আল্লাহ্) তোমাদের প্রকৃত পুত্র বানিয়ে দেন নি। এ তো তোমাদের মুখ নিঃসৃত কথা মাত্র। কিন্তু আল্লাহই তো সত্য কথা বলেন, সঠিক ও নির্ভুল পথের সন্ধান দেন। ওদের ডাক ওদের পিতাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে। আল্লাহর কাছে এটাই অধিকতর ইনসাফপূর্ণ কথা। কিন্তু ওদের পিতা যদি তোমাদের জানা না থাকে তাহলে ওরা তোমাদের দ্বীনি ভাই মাত্র। তোমাদের সাহায্যকারী বন্ধু মাত্র। (الاحزاب : ٤ - ٥ )
কুরআনের কথা: 'এ তো তোমাদের মুখ-নিঃসৃত কথা স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছে যে, মুখ-ডাকা পুত্র বা ধর্ম-পুত্র একেবারে অন্তঃসারশূন্য কথা, এর পাশ্চাতে সত্য ভিত্তি বলতে কিছু নেই।
বস্তুত মুখ-নিঃসৃত কথা না প্রকৃত সত্যকে বদলে দিতে পারে, না পারে বাস্তবতাকে বদলে দিতে। অনাত্মীয় ব্যক্তি এর দ্বারাই আত্মীয় হয়ে যেতে পারে না। মুখে-ডাকা পুত্র কখনও হতে পারে না প্রকৃত নিজ ঔরসজাত সন্তান। মুখ-নিঃসৃত কথা পালিত পুত্রের দেহে রগে শিরায় কোলদার লালন-পালনকারী ব্যক্তির রক্ত প্রবাহিত করে দিতে পারে না, পারে না লালন পালনকারী ব্যক্তির অন্তরে প্রকৃত পিতার পুত্র-বাৎসল্য ও স্নেহ-মমতা সৃষ্টি করতে। অনুরূপভাবে পালিত পুত্রের অন্তরে পিতৃভক্তির ভাবধারাও সৃষ্টি করতে পারে না। তার মধ্যে এ পরিবারের দৈহিক বিবেক-বুদ্ধিগত ও মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য-বিশেষত্বও সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণ অসমর্থ।
এ পালক পুত্র গ্রহণ ব্যবস্থার সব রূপরেখা- উত্তরাধিকার আইন, পালিত পুত্রের (তালাক প্রদত্ত) স্ত্রীকে বিয়ে করা হারাম হওয়া ইত্যাদিও সম্পূর্ণরূপে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। কুরআন মজীদে যে উত্তরাধিকার আইন উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে রক্তের-স্ত্রীত্বের প্রকৃত নিকটাত্মীয়তার নয় এমন সম্পর্কের ওপর কোন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। মীরাসে তাকে কোন অংশও দেয়া হয়নি।
وَأُولُوا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَولَى بِبَعْضٍ فِي كِتٰبِ اللهِ .
রক্ত-সম্পর্কের আত্মীয়রা আল্লাহ্ আইনে পরস্পরের কাছে অধিক অধিকার সম্পন্ন। (الانفال : ٧٥)
বিয়ে সম্পর্কে কুরআন ঘোষণা করেছে যে, নিজ ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীরাই হারাম-মুহাররম, মুখে ডাকা পুত্রদের স্ত্রীরা নয়।
وَحَلَائِلُ ابْنَائِكُمُ الَّذِيْنَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ -
তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীরাই তোমাদের জন্যে হারাম। (النساء : 23)
কাজেই পালিত পুত্রের স্ত্রী বিয়ে করা হারাম নয়, বরং সম্পূর্ণ জায়েয। কেননা প্রকৃতপক্ষে সে এক অনাত্মীয় ব্যক্তির স্ত্রী। অতএব সে যখন তার স্ত্রীকে তালাক দেবে (কিংবা সে মরে যাবে) তখন তাকে বিয়ে করতে কোন দোষ থাকতে পারে না。

পিতার যেমন তার ঔরসজাত সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করার অধিকার নেই। অনুরূপভাবে যে সন্তান তার নিজ ঔরসজাত নয়, তাঁকে নিজের পুত্র বানান ও নিজের পুত্র বলে পরিচয় দেয়া ও দাবি করারও অধিকার নেই। জাহিলিয়াতের যুগে আরবরা অপরাপর জাতির লোকদের ন্যায় পালক পুত্র রেখে যার সাথে ইচ্ছা নিজের বংশ সম্পর্ক স্থাপন করত। যাকে ইচ্ছা নিজের পুত্র বানিয়ে নিত। এ পালিত পুত্রের কর্তব্য অধিকার ঠিক আপন ঔরসজাত পুত্রদের মতই হতো। পালিত পুত্রের পিতা ও বংশধারা জানা অবস্থায়ও এরূপ পালিত পুত্র বানানো হতো।
ইসলামের আগমনকালেও এরূপ পালক পুত্র বানানর রেওয়াজ ছিল তদানীন্তন আরব সমাজে। নবী করীম (স) যায়দ ইবনে হারিসাকে এ জাহিলিয়াতের যুগে নবুওয়্যত প্রাপ্তির পূর্বে পুত্র বানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু ইসলাম ব্যাপরটিকে একটি অবাস্তব ও অসত্য ঘটনা রূপে দেখেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এক ভিন্ন ও অনাত্মীয় ব্যক্তিকে নিজ বংশের লোক বানিয়ে নেয়া ঘরের মেয়দের সাথে ঠিক মুহররম পুরুষের মতো তাকে নিভৃত একাকীত্বে থাকতে দেয়া অথচ প্রকৃতপক্ষে সে এ মর্যাদার ব্যক্তি নয় এবং এ মেয়েরা তার জন্যে মুহররম নয়।
যে লোক কাউকে পালিত পুত্র বানায়, সে তাকে নিজের উত্তরাধিকারীও বানায়। এরূপ অবস্থায় আসল নিকটাত্মীয় উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তির অংশ পাওয়ার অধিকারী হয়েও তারা তা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। তার দরুন প্রকৃত আত্মীয়দের মনে এই মুখে-ডাকা পুত্রের প্রতি একটা গোপন ক্ষোভ ও হিংসা-প্রতিহিংসা অতি স্বাভাবিকভাবেই জেগে উঠে। তার ফলে বিবাদ বিসম্বাদ ও সম্পর্কের অবনতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। কুরআন মজীদ এসব কারণেই এ জাহিলী ব্যবস্থাকে বাতিল ও সম্পূর্ণ অকাট্য হারাম ঘোষণা করেছে। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ ، ذَلِكُمْ قَوْلُكُمْ بِأَفْوَاهِكُمْ ، وَاللَّهُ يَقُولُ الْحَقِّ وَهُوَ يَهْدِي السَّبِيلَ - أَدْعُوهُمْ لِأَبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ ، فَإِنْ لَّمْ تَعْلَمُوا آبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّيْنِ وَمَوَاليْكُمْ -
তোমাদের মুখে-ডাকা পুত্রদেরকে তিনি (আল্লাহ্) তোমাদের প্রকৃত পুত্র বানিয়ে দেন নি। এ তো তোমাদের মুখ নিঃসৃত কথা মাত্র। কিন্তু আল্লাহই তো সত্য কথা বলেন, সঠিক ও নির্ভুল পথের সন্ধান দেন। ওদের ডাক ওদের পিতাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে। আল্লাহর কাছে এটাই অধিকতর ইনসাফপূর্ণ কথা। কিন্তু ওদের পিতা যদি তোমাদের জানা না থাকে তাহলে ওরা তোমাদের দ্বীনি ভাই মাত্র। তোমাদের সাহায্যকারী বন্ধু মাত্র। (الاحزاب : ٤ - ٥ )
কুরআনের কথা: 'এ তো তোমাদের মুখ-নিঃসৃত কথা স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছে যে, মুখ-ডাকা পুত্র বা ধর্ম-পুত্র একেবারে অন্তঃসারশূন্য কথা, এর পাশ্চাতে সত্য ভিত্তি বলতে কিছু নেই।
বস্তুত মুখ-নিঃসৃত কথা না প্রকৃত সত্যকে বদলে দিতে পারে, না পারে বাস্তবতাকে বদলে দিতে। অনাত্মীয় ব্যক্তি এর দ্বারাই আত্মীয় হয়ে যেতে পারে না। মুখে-ডাকা পুত্র কখনও হতে পারে না প্রকৃত নিজ ঔরসজাত সন্তান। মুখ-নিঃসৃত কথা পালিত পুত্রের দেহে রগে শিরায় কোলদার লালন-পালনকারী ব্যক্তির রক্ত প্রবাহিত করে দিতে পারে না, পারে না লালন পালনকারী ব্যক্তির অন্তরে প্রকৃত পিতার পুত্র-বাৎসল্য ও স্নেহ-মমতা সৃষ্টি করতে। অনুরূপভাবে পালিত পুত্রের অন্তরে পিতৃভক্তির ভাবধারাও সৃষ্টি করতে পারে না। তার মধ্যে এ পরিবারের দৈহিক বিবেক-বুদ্ধিগত ও মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য-বিশেষত্বও সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণ অসমর্থ।
এ পালক পুত্র গ্রহণ ব্যবস্থার সব রূপরেখা- উত্তরাধিকার আইন, পালিত পুত্রের (তালাক প্রদত্ত) স্ত্রীকে বিয়ে করা হারাম হওয়া ইত্যাদিও সম্পূর্ণরূপে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। কুরআন মজীদে যে উত্তরাধিকার আইন উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে রক্তের-স্ত্রীত্বের প্রকৃত নিকটাত্মীয়তার নয় এমন সম্পর্কের ওপর কোন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। মীরাসে তাকে কোন অংশও দেয়া হয়নি।
وَأُولُوا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَولَى بِبَعْضٍ فِي كِتٰبِ اللهِ .
রক্ত-সম্পর্কের আত্মীয়রা আল্লাহ্ আইনে পরস্পরের কাছে অধিক অধিকার সম্পন্ন। (الانفال : ٧٥)
বিয়ে সম্পর্কে কুরআন ঘোষণা করেছে যে, নিজ ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীরাই হারাম-মুহাররম, মুখে ডাকা পুত্রদের স্ত্রীরা নয়।
وَحَلَائِلُ ابْنَائِكُمُ الَّذِيْنَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ -
তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীরাই তোমাদের জন্যে হারাম। (النساء : 23)
কাজেই পালিত পুত্রের স্ত্রী বিয়ে করা হারাম নয়, বরং সম্পূর্ণ জায়েয। কেননা প্রকৃতপক্ষে সে এক অনাত্মীয় ব্যক্তির স্ত্রী। অতএব সে যখন তার স্ত্রীকে তালাক দেবে (কিংবা সে মরে যাবে) তখন তাকে বিয়ে করতে কোন দোষ থাকতে পারে না。

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 পালক-পুত্র ব্যবস্থার বাস্তবভাবে রহিতকরণ

📄 পালক-পুত্র ব্যবস্থার বাস্তবভাবে রহিতকরণ


ব্যাপারটি কিছু মাত্র সহজ ছিল না। আরব সমাজের পালক পুত্র ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ় ভিত্তিশীল। সমাজের গভীরে তার শিকড় নিবদ্ধ ছিল, লোকদের জীবনে তা গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা শুধু কথার নির্দেশ দ্বারাই এ ব্যবস্থার মূলোৎপাটন সম্ভব বলে মনে করেন নি, যথেষ্ট মনে করেন নি। তাই কথার সাথে সাথে বাস্তবভাবেও তা কার্যকর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন।

আল্লাহ এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে স্বয়ং রাসূলে করীম (স)-কেই কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। যেন অতঃপর এ পর্যায়ে কোন শোবাহ সন্দেহ না থাকে, মুখে-ডাকা পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করা জায়েয হওয়া সম্পর্কে আবহমান কাল থেকে চলে আসা দ্বিধা-সংকোচ দূর করতে হলে এছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না, যথার্থ বা যথেষ্টও হতো না। আল্লাহ যা হালাল করেছেন চূড়ান্তভাবে তাকে হালাল মনে করা এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তাকেই চূড়ান্তভাবে হারাম মনে করার মতো দৃঢ় ঈমান ও বিশ্বাস সৃষ্টির জন্যে এটা ছিল একটা অপরিহার্য পদক্ষেপ।

হযরত যায়দ ইবনে হারিসা রাসূলে করীমের পালিত পুত্র ছিলেন। এ জন্যে তিনি সমাজে যায়দ ইবনে মুহাম্মাদ (স) নামে সুপরিচিতি ছিলেন। তিনি যয়নব বিনতে জাহাশ নাম্নী এক মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি ছিলেন নবী করীম (স)-এর ফুফাতো বোন। যয়নবের সাথে হযরত যায়দের দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতি ঘটে। হযরত যায়দ এ বিষয়ে নবী করীম (স)-এর কাছে বহু অভিযোগ করলেন। নবী করীম (স) তাঁকে নানাভাবে বোঝাতে ও শিক্ষা দিতে লাগলেন। যদিও তিনি আল্লাহর জানিয়ে দেয়া সূত্রে জানতেন যে, যায়দ তাঁকে তালাক দেবেন এবং পরে তিনি নিজেই তাঁকে বিয়ে করবেন। কিন্তু মানবীয় দুর্বলতা কোন কোন মুহূর্তে দেখা দিত বলে তিনি মানুষের কুটক্তি ও দোষযুক্ত সমালোচনার ভয় করতেন। এজন্যে তিনি প্রতিবারে যখনই হযরত যায়দ অভিযোগ করতেন, তাঁকে বলতেন:

হে যায়দ, তুমি তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছেই রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর।

এ সময় কুরআনের যে আয়াত নাযিল হয়, তাতে রাসূলে করীম (স)-কে ভর্ৎসনা করা হয়, বরং দীর্ঘকাল ধরে পালিত পুত্রের পরিত্যক্তা স্ত্রীকে বিয়ে করার ব্যাপারে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা ও কুসংস্কার দূর করার জন্যে সমাজের মুকাবিলা করতে তাঁকে উদ্বুদ্ধ করা হয়। তাতে বলা হয়:

আল্লাহ যাকে নিয়ামত দিয়েছেন (ঈমান আনার সুযোগ দিয়ে), এবং তুমি যাকে নিয়ামত দিয়েছ (দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিয়ে), সেই যায়দকে যখন তুমি বলতে, তুমি তোমার স্ত্রীকে তোমার নিজের জন্যে রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর, তখন তুমি তোমার মনে সেই কথা লুকিয়ে রাখতে যা আল্লাহ প্রকাশ করে দেবেন। আর তুমি মানুষকে ভয় পেতে অথচ আল্লাহকেই ভয় করা উচিত সর্বাধিক। পরে যায়দ যখন তার (স্ত্রী) থেকে তার প্রয়োজন পূর্ণ করে নিল, তখন তাকে সেই (যয়নব-যায়দের স্ত্রীকেই) তোমার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলাম, যেন মুমিনদের মনে মুখে-ডাকা পুত্রদের স্ত্রীদের যখন তারা তাদের থেকে নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করে দিয়ে ছেড়ে দেবে- বিয়ে করার ব্যাপারে কোনরূপ সংকোচ বা প্রতিবন্ধকতা অবশিষ্ট না থাকে। আর আল্লাহর ফরমান তো কার্যকর হবেই। (সূরা আহযাব: ৩৭)

পরবর্তী আয়াতে রাসূলের একাজে যে দোষারোপ করা হয়েছে তার প্রতিরোধ করা হয়েছে এবং বলিষ্ঠভাবে বলা হয়েছে যে, একাজ সম্পূর্ণ জায়েয, এতে কোন দোষ আদপেই নেই। বলা হয়েছে:

আল্লাহ যা ফরয করে দিয়েছেন তার জন্যে তা করায় নবীর কোন দোষ ছিল না। এই আল্লাহর নিয়ম অতীত কাল থেকে। আর আল্লাহর ফয়সালা তো পরিমাণ মতোই। যারা আল্লাহর রিসালাত যথাযথভাবে পৌঁছিয়ে দেয় এবং তাঁকেই ভয় করে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেই ভয় করে না, হিসেব লওয়ার জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট। মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যের কারোরই পিতা নয়; বরং সে আল্লাহর রাসূল নবীগণের পরিসমাপ্তিকারী। আর আল্লাহ তো সব বিষয়েই পূর্ণ মাত্রায় অবহিত।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 শুধু লালন-পালনের উদ্দেশ্যে পুত্র বানানো

📄 শুধু লালন-পালনের উদ্দেশ্যে পুত্র বানানো


এ পর্যন্ত যে পুত্র বানানো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, ইসলাম তাকে বাতিল ও হারাম ঘোষণা করেছে। তাতে এক ব্যক্তি জানে যে, পুত্র তার নয়, অপর কোন ব্যক্তির, তা সত্ত্বেও তাকে নিজের বংশ ও পরিবারের সাথে মিলিয়ে আপন করে নেয় এবং তার জন্যে আপন ঔরসজাত সন্তানের জন্যে প্রদত্ত যাবতীয় নিয়ম ও অধিকার প্রয়োগ করে। তাতে বংশের সংমিশ্রণ হয়, তার স্ত্রী বিয়ে করা হারাম হয়ে যায় এবং সে মীরাসের অংশ লাভ করে।

এছাড়া আরও এক প্রকার পুত্র বানানর রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু সে ধরনের পুত্র বানানকে ইসলাম হারাম করেনি। তা এ ভাবে হয় যে, কেউ কোন পরে পাওয়া কিংবা কোন ইয়াতীম ছেলে নিজের ঘরে নিয়ে নিল এবং তার প্রতি নিজের পুত্রের মতই স্নেহ-বাৎসল্য, আদার-যত্ন ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দিল, তাকে খাওয়াল, পরাল, লালন পালন করে বড় করে তুলল ঠিক নিজের সন্তানের মতোই। কিন্তু এত সব করার পরও তাকে 'নিজের পুত্র' বলে অভিহিত করল না, আপন পুত্রের জন্যে যে যে নিয়ম ও অধিকার তাও আরোপ করল না। এ ধরনের সেবা ও কল্যাণমূলক কাজ ইসলামে খুবই প্রশংসনীয় ও পছন্দনীয়। এরূপ কাজ যে করবে, সে নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে অশেষ সওয়াব পাবে, সে জান্নাত লাভ করবে। এ পর্যায়ে রাসূলে করীম (স) বলেছেন:

আমি এবং ইয়াতীমের দায়িত্ব গ্রহণকারী— লালন-পালনকারী জান্নাতে এ ভাবে থাকব— এই বলে তিনি তাঁর শাহাদাত অঙ্গুলী ও মধ্যম অঙ্গুলী দ্বারা ইঙ্গিত করে ও দুটির মধ্যে ফাঁক করে দেখালেন।

হারিয়ে যাওয়া ছেলে কেউ পেলে তাকে ইয়াতীম মনে করতে হবে। পার্থিব সম্পর্কেও এ শব্দটি ভালভাবেই প্রযোজ্য। ইসলাম তার প্রতি লক্ষ্য রাখার জন্যে খুব তাগিদ করেছে।

কারো যদি কোন সন্তানাদি না থাকে এবং এরূপ কোন ছেলেকে সে কোন আর্থিক উপকার করার ইচ্ছা করে, তাহলে সে তার জীবনে বেঁচে থাকা অবস্থায়ই তার ধন-মাল থেকে যা ইচ্ছা দান করতে পারে এবং মৃত্যুর পূর্বে মোট সম্পদ-সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশের মধ্যে কিছু দেয়ার অসিয়তও করে যেতে পারে।

📘 ইসলামে হালাল হারামের বিধান > 📄 কৃত্রিম উপায়ে গর্ভ সৃষ্টি

📄 কৃত্রিম উপায়ে গর্ভ সৃষ্টি


জ্বেনা-ব্যভিচার ও পালিত পুত্রকে পুত্র বানান হারাম করে দিয়ে ইসলাম বংশের মর্যাদা রক্ষা করেছে। খারাপ ভাবধারা থেকে বংশকে পবিত্র রেখেছে।

এ কারণে কৃত্রিম উপায়ে গর্ভ সঞ্চারকে ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে, যদি তা স্বামী ছাড়া অন্য কারো শুক্র দ্বারা করান হয়। এরূপ অবস্থায় তা এক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ ও ঘৃণ্য কাজ, সন্দেহ নেই। শায়খ শালতুত এ ফতোয়া দিয়েছেন। আসলে তা নতুন ধরনের জ্বেনা ছাড়া আর কিছু নয়, কেননা উভয় কাজের প্রকৃত অবস্থা সম্পূর্ণ অভিন্ন। তার ফলও এক। আর তা হচ্ছে স্বামী নয় এমন পুরুষের শুক্রবীজ গর্ভধারে ধারণ করা। প্রাকৃতিক আইন ও শরীয়তের বিধান- উভয়ের দৃষ্টিতেই এ কাজ অত্যন্ত জঘন্য।

কৃত্রিম উপায়ে গর্ভ সৃষ্টির কাজটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে হয়ত কোন আইন ভঙ্গকারী কাজ নয়। কিন্তু সেটা আইনের দুর্বলতা ও ত্রুটি। আসলে তা জ্বেনাই- যা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এমন অপরাধ, যার ওপর অপরাধীকে ‘হদ্দ’— কঠোর শাস্তি দেয়া বাঞ্ছনীয়।

গর্ভ সৃষ্টির এ অভিনব পদ্ধতি যে অত্যন্ত মারাত্মক ও জঘন্য অপরাধ, তাতে কোন সন্দেহ নেই। পরের পুত্রকে নিজের পুত্র বলা অপরাধের চাইতেও অনেক বেশি মাত্রার অপরাধ। কেননা এ উপায়ে যে সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে, তার মধ্যে দু ধরনেরই জঘন্যতা থাকবে। একটা হচ্ছে, পরের পুত্রকে নিজের পুত্র বলার জঘন্যতা। অর্থাৎ বংশে বংশের বাইরের লোককে গণ্য করা। আর দ্বিতীয় হচ্ছে চরিত্রহীনতা— জ্বেনার রূপ ধারণ। এ কাজকে না ইসলামী শরীয়ত সমর্থন করতে পারে, না কোন আইন। মনুষ্যত্বের মর্যাদার পক্ষে অত্যন্ত হানিকর এ কাজটি। মানুষ এ কাজে মনুষ্যত্বের সুমহান মর্যাদা হারিয়ে পশুত্বের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তার পক্ষে সামাজিক মর্যাদার চেতনা লাভ আদৌ সম্ভবপর নয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00